তাজিংডং থেকে ফেরার বিভীষিকার গল্প

আগের পর্বেই বলেছি যে, যেহেতু আজ তাজিংডংয়ের চূড়ায় উঠে তারপর নেমে এসে একটু খেয়ে থানচি ফিরবো, সেহেতু সবাই ধীর গতিতে চলছিলাম। চূড়া থেকে নেমে শেরকর পাড়া পর্যন্ত এসে কিছু আহার করে আর সেই সাথে পূর্বের আহার মানে, আগে থেকে পেটে যা ছিল সব উগড়ে দিয়ে ১ থেকে ১:৩০ ঘণ্টা বিশ্রাম!

কারণ, আগের রাতের মুরগী আসলে না ধুয়েই সেদ্ধ করে দিয়েছিল! যেটা রাতে বোঝা গিয়েছিল কিন্তু অন্ধকারে দেখাতো যায়নি আর তা হলো, মুরগীর মাংসের সাথে তার চামড়া বা পশম তেমনই লেপটে ছিল! সাথে অন্যান্য ত্যাজ্য উপাদানও! যা দেখে কেউই তার পেটের খাবার শত চেষ্টায়ও আর পেটে ধরে রাখতে পারিনি! উগড়েই দিতে বাধ্য হয়েছিলাম!

যাই হোক, এতেও কারো তেমন কোনো কষ্ট বা দুঃখ হয়নি এই আনন্দে যে একটু পরেই আমরা ফিরে যাবো! কিন্তু পথে যে কী বিভীষিকা অপেক্ষায় আছে, কেউই আঁচ করতে পারিনি বিন্দুমাত্র। আর আমার ব্যবসারও প্রসার বা মুনাফার থলেটা আরও ভারী হবে!কারণ এই প্রথম যেহেতু সকালে কেউই তেমন কিছু খেতে পারেনি তাই, সবার কাছে যে শুকনো খাবার ছিল তা মুহূর্তেই শেষ!

সন্ধ্যার বান্দরবান। ছবিঃ লেখক

এতে আমি খুব খুশী আর আনন্দিত। কারণ? আমার ব্যাগে তখনও অন্তত একজন মানুষের চার দিনের শুকনো খাবার মজুদ আছে! এই ক্ষেত্রেও সবাই উপেক্ষা করেছে আমাকে আর আমার দেয়া পরামর্শগুলোকে। তাই এবার আরও বড় শিক্ষা দেব, সাথে উপার্জন তো আছেই! কারণ,৩০ মিনিট যেতে না যেতেই সবার ক্ষুধা লাগবে, লাগবেই আমি নিশ্চিত!

তো শুরু হলো ১৫ মিনিট হাঁটা আর ১৫ মিনিট বিশ্রামের বিরক্তি আর কষ্টকর ট্রেক। এভাবে হাঁটতে আর বিশ্রাম নিতে নিতে আগের দিনের সেই স্বপ্ন ভ্যালীতে পৌঁছালাম বিকেল চারটারও বেশ পরে। শেষ শীতের ঠাণ্ডা সূর্য! তখন নিভু নিভু, চারিদিকে গোধূলির আয়োজন! অসাধারণ রঙ আর আলো ছড়ানো বিকেলে মুগ্ধতার পাশাপাশি ঘিরে ধরল ভয় ও শঙ্কা সাথে কিছু অনিশ্চয়তাও! কারণ থানচি এখনো অনেক দূরের পথ। মাঝে পড়ে আছে সেই সাথী হারানো বোর্ডিং পাড়ার নিদারুণ চড়াই আর উৎরাই! আর ফিরে যাওয়া সদস্যদের খোঁজ নেওয়া বা পাওয়া!

কারবারির রান্নাঘর। ছবিঃ লেখক

এবার সবাই নিজের তাগিদেই শুরু করলো দ্রুত চলা। কিন্তু কতক্ষণ কোনোমতে সন্ধ্যা নামার মাঝেই বোর্ডিং পাড়া পৌঁছলাম। এসেই শুনি ভয়াবহ কথা! যাদেরকে কাল এখানে রেখে গিয়েছিলাম তারা এখানে রাতে থাকেইনি, চলে গিয়েছে! কীভাবে, কার সাথে, কোথায়? নাকি কেউ ওদের ধরে-টরে নিয়ে গেছে অন্য কোথাও? সেই আতঙ্ক তখন চোখে-মুখে! আর আমাদেরই বা কী হবে সেই বিভীষিকায় আচ্ছন্ন সবাই!

সুতরাং আবারো শুরু পথ চলা। কিন্তু বোর্ডিং পাড়ার খাড়া পাহাড়ের উপর উঠতে উঠতেই সন্ধ্যার আঁধার পুরোপুরি ঘিরে ধরেছে আমাদের সবাইকে চারদিক থেকে। সাথে ভয়-আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা তো রয়েছেই। রয়েছে গাইডহীন পথ হারিয়ে ফেলার ভীষণ সম্ভাবনা, যদিও চেনা পথ তবুও রাতের আঁধার আর মানসিক অস্থিরতা মিলিয়ে গুলিয়ে ফেলাই স্বাভাবিক।

পাহাড়ি সমাধি। ছবিঃ লেখক

এভাবে টানা ৩০ মিনিটেরও বেশী হাঁটার পরে আর পারি না বলে একজন বসে নয় শুয়েই পড়লো সেই অন্ধকার ঘন জঙ্গলে! সাথে অন্যরাও শুয়ে-বসে পড়ে রইলো বেশ কিছুক্ষণ। কিন্তু আবারো উঠতে হলো, শরীরের শক্তি না থাকা সত্ত্বেও। যেতে তো হবে। যেতেই হবে, কোন উপায় নেই! আবার শুরু কেউ এক পা-এক পা করে, কেউ নিজের পা, নিজেই টেনে নিয়ে, কেউ শুধু সাথের লাঠিতে ভর করে। এভাবে কোনো মতে কমলা বাগান!

রাত কত জানি না, ঘড়ি নেই, মোবাইলে চার্জ নেই, সাথে কোনো টর্চ নেই! চারদিকে ঘন অন্ধকার, পা পিছলে পড়ে গিয়ে আর খুঁজে না পাবার সম্ভাবনা, খুঁজবেই বা কে? সেই অবস্থায় কেউই নেই! সামনে কতটা পথ তাও জানা নেই, কয়টা পাহাড় আরও পেরুতে হবে সেও অজানা! নেই কোনো ঘর-বাড়ি এমনকি কোনো জুম ঘর বা এতটুকু আলোর রেখা, নেই কোনো মানুষের আনাগোনা বা সেই সম্ভাবনা!

কীভাবে, কতক্ষণে আর কতটা পরিশ্রান্ত হয়ে জানি না এক সময় দেখতে বা বুঝতে পারলাম আমরা আগের দিনের সেই প্রথম বিশ্রাম আর নাস্তা খাবার জায়গায় এসে পৌঁছেছি! এইটা বুঝতে পেরেই অনেকটা উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু আসার সময় আর সবটুকু জীবনীশক্তি শেষ করে ফেরার সময়ের মাঝে যে বিস্তর-বিস্তর ব্যবধান সে তখনও বোধের বাইরে। তাই সেই উজ্জীবনি শক্তি বেশিক্ষণ থাকেনি, মিইয়ে গিয়েছিল নিমেষেই!

শেষ বিকেলের পাহাড়। ছবিঃ লেখক

কারণ হাত-পা-মাথা বা শরীর কিছুই আর চলছে না কোনো স্বাভাবিক নিয়মে! সব এখন প্রকৃতি আর প্রার্থনার হাতে সমাহিত! ওরা যে বা যা করবে তাই মেনে নিতে হবে! আমাদের আর কিচ্ছু করার নেই! প্রতিটা ধাপ ফেলতেও যেন কেটে যাচ্ছিল অনন্ত সময়, এক-একটা পায়ের ওজন যেন তখন নিজের শরীরের চেয়েও বেশী! আর সাথের ব্যাগ বা অন্যান্য সেসব আর বলার মতো ভাষা আমার স্টকে নেই!

এভাবে খুড়িয়ে আর কঁকিয়ে-কঁকিয়ে চলতে-চলতে আচমকা দুইজন মানুষের সাথে দেখা তারা আমাদের দেখে যেন আঁতকে উঠেছিল, আর বলল “ভাই আপনাদের কি পাগলে পাইছে?” কেন? কালকে তিনজন এই রকম গভীর রাতে এই দিক দিয়ে আসলো আর আজকে আবার আপনারা? এইবার এই খবর শোনা মাত্র যেন বিদ্যুতের মতো শক্তি ফিরে এলো, ওরা এখানে আছে আর ঠিক আছে জেনে!

রাতের আঁধারে বান্দরবানে। ছবিঃ লেখক

সেই সুখবর শোনার শক্তিকে সাহসে পরিণত করে আমরাও পৌঁছে গেলাম থানচি বাজারে রাত তখন ১১টা নাগাদ! আমাদের দেখে মানুষজন এগিয়ে এলো, কোত্থেকে কিছুই জানি না,আমাদের ফিরে আসা বন্ধুরাও অপেক্ষা করছিল ওই বাজারে। কারণ আমরা কোনো রকম গাইড বা কাউকে না জানিয়ে চলে গিয়েছিলাম সেই গভীরে, যেখানে কেউ সাধারণত এভাবে যায় না! তাই সবাই ছিল উদ্বিগ্ন আর উৎকণ্ঠিত, সেটা এক অন্য রকম রোমাঞ্চ-আনন্দ আর জীবনের এক বিশেষ অর্জন বা সেরা অ্যাডভেঞ্চারের অভিজ্ঞতা।

গাইডহীন তাজিংডং জয়ের দুর্লভ অভিজ্ঞতা।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

প্রাচীন ঢাকায় হেঁটে হেঁটে সারাদিন

এস্তোনিয়া ভ্রমণ: যে ৭টি কাজ অবশ্যই করবেন