নির্মল হাওয়ায় চন্দ্রনাথের চূড়ায়

দুপুরে খাওয়া শেষ করে মাত্রই বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছি। ক্লান্ত লাগছিল কিছুটা। ঘরের আরেক কোণে বসে আছে সাইমুন আর রিফাত। গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর করে কথা বলছে। অন্যদিকে, বন্ধু দেব আর শোভন বার বার ফোন করছে। কিছুক্ষণ পরে জানতে পারি তারা কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। তাদের পরিকল্পনায় এক রকম জোর করে আমাকেও সামিল করল।

ট্রেনে না যেতে পারলেও ছবি তুলে এনেছে; ছবি- সাইমুন ইসলাম

সন্ধ্যার মধ্যে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য চট্টগ্রাম। টাকা পয়সার টানাটানি থাকায় রাত ১০টার মেইল ট্রেনে যাওয়ার পক্ষে মত দেই। সেই অনুসারে স্টেশনে পৌঁছাই আমি, সাইমুন আর রিফাত। অন্যদিক থেকে দেব আর শোভন একসাথে আসে। ৫ জনের মধ্যে রিফাত ছাড়া আর কারও মেইল ট্রেনে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল না। দেব আর শোভন আগে থেকেই গড়িমসি করছে মেইল ট্রেনে যাওয়া নিয়ে। তারা চাইছে বাসে যেতে। কিন্তু মেইল ট্রেনে ভোট বেশি থাকায় তারা আপাতত পাত্তা পায়নি।

সাইমুন আর রিফাত টিকিট কিনে আনল। আমরা ততক্ষণে মেইল ট্রেনে ওঠার যুদ্ধে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এরই মধ্যে কখন যে সাইমুন আর রিফাত ট্রেনে উঠে সীট দখল করে ফেলছে বুঝতেই পারিনি। আমি দেব আর শোভন নিজের মনে করে উঠে গেছি কেবিনে। কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারি, আমরা ভুল জায়গায় উঠে পড়েছি। কারণ কেবিন আগে থেকে বুক করা থাকে। এইদিকে আমাদেরকে দেখতে না পেয়ে ওরা দুইজন ট্রেন থেকে নেমে গেছে। এবার ৫ জন একসাথে হয়ে ভাবলাম এখন সবাই একসাথে উঠবো।

কিন্তু সে গুড়ে বালি। তিল ধারনের ঠাঁই নেই কোথাও। আমাদের তিনজনের মন খারাপ হলেও দেব আর শোভন ব্যাপক খুশী। কারণ তাদের ইচ্ছার জয়জয়কার হয়েছে। অন্যদিকে, সাইমুন ট্রেনের টিকিটের শোকে পাথর হয়ে গেছে। তার ৬০০ টাকা জলে গেছে। এখন আবার বাসের টিকিট কাটতে হবে। এক্সট্রা খরচ। অগত্যা কোনো গতি করতে না পেরে মেনে নিতে হলো সব। রাত ১২টার বাসে করে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে যাত্রা।

পাথুরে দেয়াল; ছবি-সাইমুন ইসলাম

ভোর ভোর সীতাকুণ্ড পৌঁছাই। সেখান থেকে নেমে মিনিট পাঁচেক হেঁটে ভিতরে গিয়ে সিএনজি নিয়ে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যাই। আমাদের পরিকল্পনা ছিল সূর্যের উত্তাপ বাড়ার আগেই আমরা চন্দ্রনাথ পাহাড় আর মন্দির দেখা শেষ করবো। চন্দ্রনাথের পাদদেশে গিয়ে ব্যাগ রেখে হাল্কা খাবার আর পানি নিয়ে পাহাড় বাওয়া শুরু করি। আমি, সাইমুন আর রিফাতের পাহাড়ের ওঠার অভিজ্ঞতা থাকলেও দেব আর শোভন পুরোপুরি নতুন বলা যায়। তাই তাদের নিয়ে কিঞ্চিৎ চিন্তা হলো বৈকি।

আমি, দেব আর শোভন একসাথে হাঁটতে থাকি। বাকি দুইজন ছবি তোলায় ব্যস্ত থাকায় আমাদের দৃষ্টি সীমানার বাইরে চলে যায়। ওঠার সময় বেশ কয়েকটা মন্দির আর মঠ পেরিয়ে সামনের দিকে যাই। এর মধ্যে করি এক ভুল। সবাই যে পাশ দিয়ে ওঠে আমরা সে পাশ দিয়ে উঠিনি। যে পাশ দিয়ে নামে মানে সিঁড়ি করা পাশ দিয়ে আমরা উঠি। তাই কষ্ট দ্বিগুণ বেড়ে যায়।

রোদের তাপ গা পর্যন্ত না লাগলেও সিঁড়িগুলো বেশ খাড়া থাকায় প্রচুর কষ্ট হয়। চারপাশে সবুজের চাদর ঘিরে রেখেছে পাহাড়কে। গাছের ফাঁকফোকর দিয়ে দুই এক ফালি রোদের ঝলক দেখা যাচ্ছে কোথাও। সামনে এগোতেই ছোট একটা পানির ফোয়ারার দেখা মেলে। ঘেমে নেয়ে ওঠা মুখে ঠাণ্ডা পানির আঁজলা লাগতেই হিম হাওয়া বয়ে যায়। যত উপরের দিকে উঠছি বাতাসের বেগ ততই বাড়ছে। কোথাও কোথাও সিঁড়ির দু’পাশে পাথুরে দেয়াল ছাউনির মতো কাজ করছে।

পাহাড়ের ওঠার সিঁড়ি; ছবি- সাইমুন ইসলাম 

অনেক দিন ট্রেকিংয়ে না যাওয়ায় ১,২০০ ফিট পাহাড় বেয়ে উঠতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। দুই কদম যাই আর তিন কদম জিরাই এমন অবস্থা আমার। অন্যদিকে দেবেরও প্রথম ট্রেকিং হওয়ায় শুরুর দিকে বেশ কষ্ট হয়। আমি আর শোভন তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।

এরই মধ্যে সাইমুন আর রিফাতও আমাদেরকে ধরে ফেলেছে। চূড়ার খুব কাছাকাছি আমরা। পাহাড়ের ঢালে ঢালে বিভিন্ন ধরনের সবজি এবং ফল চাষ করেছে। বাজারে নেওয়ার জন্য তা বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

চূড়া থেকে দেখা; ছবি- রিফাত রাব্বি 

চূড়ায় যখন পৌঁছাই তখনও সূর্য তার উত্তাপ ছড়ানো শুরু করেনি। গা জুড়ানো নির্মল ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। হাছড়ে-পাছড়ে ওঠার কষ্ট মুহূর্তেই ভুলে যাই। চন্দ্রনাথ চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় পাহাড়। এর উচ্চতা ১,২০০ ফিট প্রায়। এই পাহাড়ে ওঠার জন্য রয়েছে সিঁড়ি। ৭৫০ বা এর অধিক সিঁড়ি আছে বলে শোনা যায়। এই সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় অনেকবার সঙ্গী সাথীদের প্রশ্ন করছি যে কে এই সিঁড়ি বানিয়েছে বা কীভাবে বানিয়েছে। নাম না জানা গাছপালা আর পাখির কিচিরমিচির এই পাহাড়কে দিয়েছে অন্য রকম রূপ।

সবুজে ঘেরা মন্দির; ছবি- সাইমুন ইসলাম 

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উপর চন্দ্রনাথ মন্দির। এ এলাকাকে হিন্দুদের সবচেয়ে বড় তীর্থস্থান বলা হয়। এখানে সর্বোচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় চন্দ্রনাথ মন্দির। এছাড়াও ছোট বড় আরও বেশ কিছু মন্দির ও আশ্রম আছে। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের চূড়ায় শিব মন্দির আছে। কথিত আছে, নেপালের এক রাজা স্বপ্নে ৫টি শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ পেয়েছিল। তার মধ্যে এটি একটি।

চূড়ার কাছে; ছবি- সাইমুন ইসলাম 

কথিত আছে, সতী দেবী ছিলেন মহাদেবের পত্নী। তিনি দেহ ত্যাগ করলে মহাদেব তার মৃত দেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রলয় নৃত্য শুরু করেন। তখন বিষ্ণু দেব তার সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ ছিন্নভিন্ন করে দেয়। তখন সতীর হস্ত এখানে এসে পড়ে। অন্যদিকে, রামসীতার বনবাসের কিছু সময় এখানে অতিবাহিত করেন বলে এর নাম সীতাকুণ্ড।

এভাবেই আর কিছুক্ষণ সময় চূড়ায় কাটিয়ে নিচে নামার পালা। এখন আর তেমন কষ্ট হচ্ছে না। সয়ে গেছে এতক্ষণে। দ্রুত পায়ে নেমে আসি পাহাড় থেকে। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে ছোট ছোট দোকান আছে। শুকনা খাবার, পানিসহ আশেপাশের বাগানে চাষ হওয়া ফলফলাদি আছে। কিন্তু এগুলোতে পেট ভরছে না। বাজারে এসে নাস্তা সেরে এবার পর্বরতী গন্তব্যের দিকে রওনা হই।

বিক্রির উদ্দেশ্যে সবজি নিয়ে যাচ্ছে; ছবি- সাইমুন ইসলাম 

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের বাসে উঠবেন। ভাড়া নন এসি ৪২০ থেকে ৪৮০ টাকা। সীতাকুণ্ড নেমে সিএনজি নিয়ে চন্দ্রনাথ। প্রতিজনের জন্য ২০ টাকা। সেখান থেকেই মূলত ট্রেকিং।

থাকা খাওয়া

সীতাকুণ্ড বাজারে খাবেন। থাকার ব্যবস্থাও সীতাকুণ্ড বাজারে আছে।

অবশ্যই করণীয়

*যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে দূরে থাকবেন।
*খেয়াল রাখবেন আপনার অতি উচ্ছ্বাসে প্রকৃতির যেন কোনো ক্ষতি না হয়।
*সঙ্গে নেওয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।

ফিচার ইমেজ- রিফাত রাব্বি

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার পাঁচটি আন্ডাররেটেড শহর

রোথাং পাসের দিনগুলো