প্রাচীন ঢাকায় হেঁটে হেঁটে সারাদিন

ভোরে ঘুম ভাঙল বিরক্তি নিয়ে। একদিন বদ্ধ অবস্থায় ঢাকায় ঘরের মধ্যে বসে থাকাটা বরাবরই অস্বস্তির মনে হয় আমার কাছে। বন্ধু সারিয়াকে ডেকে বললাম পুরান ঢাকার কিছু জায়গায় হেঁটে ঘুরে আসা যাক। আগের দিন কিছু জায়গা ঘুরেছি কিন্তু বাকি ছিল আরো বেশ কিছু জায়গা। দ্রুত খাবার খেয়ে এক বোতল পানি আর কিছু শুকনা খাবার নিয়ে বের হয়ে গেলাম। আধুনিক ঢাকা ছাড়তে ছাড়তে তখন টিকাটুলির মোড় হয়ে পুরান ঢাকার দিকে ঢুকছি।

প্রচুর সবুজ আর নতুন কিছু গাছ দেখার উদ্দেশ্যে ঢুকলাম বলধা গার্ডেনে। ১৯০৯ সালে জমিদার নরেন্দ্রনারায়ন চৌধুরি এই উদ্যানটির সূচনা করেন। নাম রাখেন সাইকি। আর পরবর্তীতে এই উদ্যানের সাথে বাড়তি একটি অংশ যুক্ত করে নামরাখেন শিবলী। আশা অনুযায়ী পার্কটি বেশ ছোট, কিন্তু গাছে ভরপুর। ঘণ্টাখানেক পর বেশ কিছু গাছ দেখে, বিশ্রাম করে আবার হারিয়ে যেতে থাকলাম পুরান ঢাকার হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী সব প্রাচীন রাস্তাঘাটে।

শত বছরের বসতী। ছবিঃ লেখক 

আজ বেশ কিছু জায়গা টার্গেট করে এসেছি আমরা। ম্যাপিং করে পর পর আমরা ওই জায়গাগুলো ঘুরব। তাই প্লান মোতাবেক এগোচ্ছিলাম। তবে দিক ঠিক ছিল তাই যখন যে রাস্তা খুশী সেই রাস্তা দিয়ে এগোচ্ছিলাম সদর ঘাটের দিকে। উদ্দেশ্য ছিল বিউটি বোর্ডিং। তখনো ভালো একটা জানি না এই বোর্ডিং সম্পর্কে।

তবে পুরান ঢাকার কানাগলি যে কতটা ঘুরানো পেঁচানো হতে পারে তা ঠিক পেলাম শর্টকাট খুঁজতে গিয়ে। বেশ দীর্ঘ খানিকটা রাস্তা বাড়তি হেঁটে পৌঁছলাম বিশাল উঁচু প্রাচীন এক দালানের নিচের গেটে। সেটাকে বোর্ডিং ভেবে ভুল করলেও স্থানীয় একজন বিউটি বোর্ডিং দেখিয়ে দিল।

বিউটি বোর্ডিং। ছবিঃ লেখক 

বাংলা বাজারের শ্রীশদাস লেনে অবস্থিত দুইতলা এই ভবনটি মূলত কবি সাহিত্যিকদের আড্ডাখানা। বাংলা সাহিত্যের অনবদ্য কিছু কবি সাহিত্যিকরা এখানে একটা সময় কথার আসর বসাত। এখনো অনেকে আসেন এখানে। থাকা ও খাওয়ার বেশ ভালো ব্যবস্থা রয়েছে এখানে।

তাই দুপুরে এখানে খাব সেটা মনস্থির করে চলে এলাম বুড়িগঙ্গার তীরে অপরূপ মহল, আহসান মঞ্জিলে। ১৮৫৯ থেকে ১৮৬২ সালের মধ্যে এই প্রাসাদটি পুরনো ঢাকার ইসলামপুর, কুমারটুলি এলাকায় গড়ে তোলা হয় নবাবদের থাকার জায়গা ও জমিদারদের সদর কাচারি হিসেবে। নবাব আব্দুল গনী তার পুত্র খাজা আহসানুল্লাহর নাম অনুসারে এই সুদৃশ্য প্রাসাদের নাম দেন আহসান মঞ্জিল। 

আহসান মঞ্জিল। ছবিঃ লেখক 

আহসান মঞ্জীলের উপর রয়েছে একটি বিশাল গম্বুজ। এই গম্বুজটি এক সময় ঢাকার সব থেকে উঁচু গম্বুজ হিসেবে ছিল। এই সময়ে পৃথক দুটি ভবনই জাদুঘর হিসেবে রয়েছে। প্রায় ঘণ্টা দুই বা তার বেশী সময় ধরে পুরো জাদুঘর দেখা শেষ করে আবার চলে আসলাম বিউটি বোর্ডিংয়ে।

সরষে দিয়ে ইলিশ মাছের পেটি আর আড় মাছের পেটির ঝোল দিয়ে যে পরিমাণ ভাত খেলাম তা হিসেবের বাইরে। খুব হালকা মসলার দারুণ সুঃস্বাদু এখানকার খাবার। খাওয়া শেষে এখানকার কর্মীদের সাথে কিছুক্ষণ গল্প করে আবার রাস্তায় নেমে পড়লাম।  উদ্দেশ্য ছিল সুপ্রাচীন আর্মেনিয়ান চার্চ। 

শাঁখারি বাজার। ছবিঃ Ranadipam Basu

শাঁখারি বাজারের মধ্যে দিয়ে হাঁটছি। দুই পাশে অজস্র শাখা, সুর যন্ত্রের দোকান, পুরনো মন্দির আর শত বছরের পুরনো বাড়িঘর। প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে এগোতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে মাঝে মাঝে। প্রায় ৪০ মিনিট হেঁটে পৌঁছলাম আর্মেনীয়ান চার্চের সামনে। প্রাচীন এই চার্চের সামনে আসতেই দেখলাম গেট বন্ধ। সারাদিন হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। গেটের দারোয়ানকে অনেক অনুরোধ করার পর, আর যশোর থেকে এসেছি শুনে আমাদের ভেতরে যাবার অনুমতি দিলেন।

আমরা খুশীতে আত্মহারা হয়ে ভেতরে ঢুকলাম। ১৭৮১ সালে পুরনো ঢাকার আর্মানিটোলায় স্থাপন করা হয় এই চার্চটি। গির্জার মূল ভবনটিতে ১৪ ফুট প্রশস্ত আঙিনা রয়েছে। আয়তাকার ভবনটি তিনটি আলাদা অংশে বিভক্ত। একপাশে রয়েছে রেলিং বেষ্টিত উচ্চ বেদী, একটি প্রার্থনাগৃহ, নারী ও শিশুদের জন্য গ্যালারির মতো একটি অংশ। ১০ ফুট উঁচু বেদীটি কাঠ দিয়ে তৈরি। বেদীটি দেয়াল থেকে ৪ ফুট দূরবর্তী অর্ধবৃত্তাকার গম্বুজবিশিষ্ট ছাদের নিচে স্থাপিত। 

আর্মেনিয়ান চার্চ। ছবিঃ সারিয়া মাহিমা  

ভেতরে ঘুরতে বেশ ভালো লাগছিল। প্রাচীন কবরগুলোর উপরে আর্মেনীয় ভাষায় লেখা আছে স্মারক। সেই সময়ের সমাজের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তি বর্গের সমাধি রয়েছে এখানে। ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেলাম এর কারুকার্য দেখে। বেশ কিছুক্ষণ প্রার্থনার সঙ্গী হয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম আমাদের শেষ গন্তব্য তারা মসজিদের দিকে। 

তারা মসজিদ, আর্মানিটোলা, ঢাকা । ছবিঃ সারিয়া মাহিমা 

আর্মানিটোলার আবুল খয়রাত সড়কে এসে একটু ঝামেলায় পড়ে গেলাম কোন দিকে যাব। গুগল ম্যাপ অনুযায়ী চলতে চলতে মাঝে মাঝেই বেশ খেই হারিয়ে কানাগলিতে আটকে যাচ্ছিলাম। এর পর কারো কাছে না শুনে এগুনো ছাড়া উপায় ছিল না। শুনে শুনে অবশেষে অসাধারণ স্থাপত্য তারা মসজিদেরর সামনে এসে দাঁড়ালাম।

আঠারো শতকের প্রথম দিকে মির্জা গোলাম পীর এই মসজিদের নির্মাণ কাজ শেষ করেন। সাদা মার্বেল পাথরের উপর নীল রঙের তারা খচিত চোখ জুড়ানো এই মসজিদটি। প্রথমত দৃশ্যমান তিনটি গম্বুজ থাকলেও ১৯২৬ সালে সংস্কারের পর আরো কিছু গম্বুজ তৈরি করা হয়। গম্বুজের ফাঁকে যখন দিনের শেষ আলোটুকু উঁকি দিচ্ছিল, ততক্ষণে সাক্ষী হয়ে গেলাম পুরনো ঢাকার শত শত বছরের ইতিহাসের। 

রুট ও খরচের খসড়া:

(টিকাটুলি- বলধা গার্ডেন- বিউটি বোর্ডিং – আহসান মঞ্জিল – শাখারীবাজার- আর্মেনিয়ান চার্চ – তারা মসজিদ) এইভাবে অথবা নিজে ম্যাপ দেখে রুট প্লান করে ঘুরতে পারেন। রিকশায় ঘুরলে সময় অনেক কম লাগবে এবং এর থেকে বেশী জায়গায় ঘুরতে পারবেন। দুপুরে যে কোনো হোটেল থেকে খেয়ে নিতে লাগবে ১০০-২০০ টাকা। আর বিউটি বোর্ডিংয়ে জনপ্রতি ২০০-৩০০ টাকার মধ্যে খাওয়া হয়ে যাবে। 

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রাজাদের জাদুঘর নামে খ্যাত হাসন রাজার জাদুঘর

তাজিংডং থেকে ফেরার বিভীষিকার গল্প