ব্রিটিশ শাসনের অভিশপ্ত স্মৃতিচিহ্ন: এক পুরনো থানার খোঁজে

একসময় এদেশ ইংরেজদের অধীনে ছিল। ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এক সুদীর্ঘ সময়ে তারা ক্রমাগত শোষণ করে গেছে এদেশকে। উপমহাদেশের লোকেরা যে মুখ বুজে সবকিছু মেনে নিয়েছে তা একদমই নয়। তারা আন্দোলন, সংগ্রাম আর বিদ্রোহ করেছে। ইংরেজদের অন্যতম ব্যবসা ছিল নীল চাষ। এখানে-সেখানে বাংলার উর্বর মাটিগুলো তারা তাদের পকেট ভারী করার জন্য নীল চাষের জমি হিসেবে ব্যবহার করতো।
এ দেশের চাষিদের দিয়ে তারা জোর করে নীল বুনাতো। তাদের কথা না শুনলে জুটত অকথ্য অত্যাচার। তাই সুযোগ পেলে দেশীয়রা তাদের উপর আক্রমণ করতো। বিশেষত মালবোঝাই নৌকাগুলো সুযোগ পেলেই হাপিশ করে দিত। সব কিছুকে সামাল দিতে আর এ দেশীয়দের উপর শাসন ব্যবস্থা বলবত রাখতে তারা প্রচলন করেছিল থানা-পুলিশ সিস্টেম।

অত্যাচারের উপর দাঁড়িয়ে ছিল ইংরেজ শাসনের ভীত; ছবিঃ অমিতাভ অরণ্য

কেমন ছিল সে সব থানা আর সেখানের পুলিশেরা? সেসব এখন আর জানার উপায় নেই ইতিহাসের সামান্য উল্লেখ ছাড়া। কিন্তু সেই আমলের একটি থানা ভবন দেখার সুযোগ হয়েছিল আমাদের। থানার নাম অভয়নগর থানা। আরো সুনির্দিষ্ট করে বললে অভয়নগর পুরাতন থানা ভবন। ভৈরব নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই থানা ভবন দেখার জন্য এক সকালে রওনা হলাম বাড়ি থেকে। পনের-বিশ কিলোমিটারের পথ আমার বাড়ি থেকে। একসময় আমিও এই থানার অধিবাসী ছিলাম। কিন্তু সে জায়গা থেকে ১৪ বছর আগে বাস গোটাতে বাধ্য হয়েছি এক প্রকারে। সে বড় দুঃখের কথা। তা মনে করে আর আজকের গল্প মাটি করতে মন চায় না। তার চেয়ে বরং সেই ঐতিহাসিক থানা ভবন দেখার গল্পে ফিরে যাই।
তো যা বলছিলাম, বাড়ির কাছেই হওয়ায় বাবার প্রিয় ফনিক্স সাইকেলে করে রওনা হলাম। সাথে বন্ধু মনির- সেই ছোটবেলার বন্ধু। শৈশবের যে কয়জন বন্ধু এখনো আমাকে ভুলে যায়নি মনির তার মধ্যে অন্যতম। সাইকেলের ক্যারিয়ারে তাকে উঠিয়ে নিয়ে হাওয়ার বেগে সাইকেল ছুটালাম। আমার পুরনো সেই জন্মভিটার খানিক দূর দিয়েই যেতে হয়। যেতে যেতে সেই সব পুরনো স্মৃতি ভিড় করে এলো মনে। কিন্তু বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের জীবন ক্রমাগত পরিবর্তন করে যেতে হয়। এটি পৃথিবীর নিয়ম। বেঁচে থাকার তাগিদেই প্রজাপতি হওয়ার আগে শূককীট হতে হয়।
কত শত কথা ভাবতে ভাবতে আমরা চলে এলাম সেই প্রাচীন থানা ভবনের সামনে। এখন এটি পরিত্যক্ত। পাশেই নতুন একটি ভবন বানানো হয়েছে। তবে থানার মূল কাজ আর এখানে হয় না। অভয়নগর উপজেলার একটি বন্দরনগরী নওয়াপাড়া।  বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত নদীবন্দরও বটে। কাজের চাপের আর বাণিজ্যের গুরুত্বে থানা সেখানেই স্থানান্তারিত হয়েছে।
উপরে ওঠার পথ; ছবিঃ অমিতাভ অরণ্য

কিন্তু আজ থেকে দেড়শ বছর আগে অবস্থা এমনটি ছিল না। তখন নওয়াপাড়া নামে কোনো জায়গার অস্তিত্ব ছিল না। অভয়নগর তখন জমজমাট। এখানে ছিল রাজবাড়ি, জমকালো মন্দির আর স্রোতশালী নদী। অভয়নগর এগারো শিব মন্দির ভ্রমণের কাহিনী গত পর্বে নিশ্চয়ই পড়েছেন।
তো সেই সময়ে এই থানা ভবন ছিল অভয়নগরের একমাত্র প্রশাসনিক কেন্দ্র। ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ই মার্চ অভয়নগর মৌজায় তৎকালীন রাজা নীলকণ্ঠের কন্যা রানী অভয়ার নামানুসারে নামাঙ্কিত অভয়নগর মৌজাতে অভয়নগর থানা সদর প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে প্রশাসনিক কাঠামোতে বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ফলে নতুন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।  ফলে ১৯৮৪ সালের ১ আগস্ট তৎকালীন অভয়নগর থানা উপজেলার মর্যাদা লাভ করে।
এভাবেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এই উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। তৎকালে এটি নির্মাণে ইংরেজ শাসকেরা ভিক্টোরিয়ান নির্মাণ শৈলী ব্যবহার করে। শক্তপোক্ত আর যত্নে নির্মিত সেই পুরনো ভবনটি এখনো ভৈরব নদীর তীরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবে এটি বহুদিন পরিত্যক্ত। কতদিন তা অবশ্য আমরা জানতে পারিনি। চারিদিকে ঘাস লতাপাতা জমেছে। ইঁদুর-ছুঁচো আর চামচিকার গন্ধ এখান থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। ভেতরে সাপ থাকা বিচিত্র নয়। তাই ভয়ে ভয়ে আমরা ভেতরে প্রবেশ করলাম। ভবনটি দ্বিতল। মাঝখানে উপরে উঠে যাওয়ার সিঁড়ি।
সিড়ি, ছবিঃ অমিতাভ অরণ্য

সিঁড়ির রেলিং ভেঙে গেলেও কিছু ভাঙা অংশ এখনো লেগে রয়েছে। সিঁড়ির পাশেই গরাদ ঘর। সেদিকে তাকাতেই শিউরে উঠলাম। মোটা শক্ত লোহার রড দিয়ে তৈরি করা ভারী দরজা আর তার চেয়ে ভারী পাল্লা আমাদের দিকে অতীতের বুক থেকে উঠে আসা দুঃস্বপ্নের মতো লাগছিল। ভেতরে জমাট অন্ধকার। যেন এখনি নির্যাতিত কৃষকদের কান্না জমাট হয়ে সেই আঁধারে রূপ নিয়েছে। আমরা বাকি ঘরগুলোতে উঁকি দিলাম। চামচিকাগুলো এতক্ষণ নিরিবিলিতে বিশ্রাম নিচ্ছিল। আমাদের সাড়া পেয়ে তারা সমস্বরে চিৎকার করে উঠলো। মনে হলো এক খিটখিটে বুড়ো আমাদের দাঁত খিচিয়ে স্বাগত জানাচ্ছে।
আমরা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠলাম। সিঁড়ির রেলিঙে লেগে থাকা কাঠ দেখে বুঝতে পারলাম কী মজবুত ছিল তার গঠন। দেড়শ বছর আগের থানা ভবনের সিঁড়ি দিয়ে আমরা উপরে উঠছি ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিলো। আজ থেকে একশ বছর আগে কেমন ছিল এখানকার চিত্র? ফর্সা মোচওয়ালা এক ইংরেজ এখানে বসে তাদের অধস্তন দেশী পুলিশ দিয়ে তাদেরই দেশী ভাইদের গায়ের চামড়া ওঠাতে কেমন মজা পেত?
ছাদে দেখলাম লতা পাতা আর ঘাস জন্মেছে। কয়েকটি জীবন শড়া গাছও দেখতে পেলাম। মেঝেতে ইতস্তত ময়লার স্তূপ। চারদিকে ভেঙেচুরে গেছে। দরজা আর পাল্লা একটিও নেই। তবু কেমন নিরেট দেওয়াল। এখনো সংস্কার করলে এটি ব্যবহার করা সম্ভব। সরকারের কি সুনজর পড়বে? হবে কি সংস্কার?
থানার সামনে; ছবিঃ অমিতাভ অরণ্য

দেয়ালের দিকে তাকাতে আমাদের মুখ হাসিতে ভরে গেল। কোনো এক প্রেমিক তার ভালোবাসা অমর করতে দেয়ালে লিখেছে ‘রিমা+ আক্কাস’। সেটিকে আবার ভালোবাসার চিহ্ন দিয়ে ঘেরাটোপে বন্দী করেছে। মনে মনে বললাম আক্কাস আর রিমার ভালোবাসা অক্ষয় হোক। তবে আশেপাশে অনেক আক্কাসকে দেখা গেলো এমনভাবে তাদের নাম লিখতে। নানারকম চিত্রকলা, কবিতা আর গানের খোঁজও মিলল। খুব খারাপ একটি অভ্যাস আমাদের এটি। কোথাও গেলে চিকামারা চাই-ই চাই! বাথরুমের দেয়ালে পর্যন্ত আমরা কবিতার চর্চা করি। আর এ তো থানা ভবন।
ট্রিপ জোনের পাঠকেরা অনেক সচেতন। আশা করি আপনারা আরো মানুষের মাঝে এই সচেতনতা ছড়িয়ে দেবেন যে আমাদের সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই।

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে বাস কিংবা ট্রেনে যশোরের নওয়াপাড়া পৌঁছাবেন। নুরবাগ ঘাট পার হলে ভাড়ায় মোটরসাইকেল পাওয়া যাবে। মোটরসাইকেলে নেবে ১০০ টাকার মতো সর্বোচ্চ।
Feature Image: Amitav Aronno

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভুতিয়ার মায়াবী বিলে পদ্মের সন্ধানে

মস্কো ক্রেমলিন: রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন (ভিডিও)