নুসা পেনিডার কেইলিংকিং, ক্রিস্টাল বে, অ্যাঞ্জেলস বে’তে ভ্রমণবিলাস

বালি থেকে দক্ষিণ-পূর্বে সুনীল সাগরের বুকে জড়াজড়ি করে ভেসে রয়েছে তিনটি দ্বীপ- নুসা লেম্বোগান, নুসা পেনিডা আর নুসা চেনিংগান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সম্পদ, আর জীববৈচিত্রে অতুলনীয় এই দ্বীপত্রয়ের মধ্যে জনপ্রিয়তার দিক থেকে এগিয়ে রয়েছে নুসা লেম্বোগান নামক সফেদ বালি আর প্রবালে ঘেরা দ্বীপটি। বালি থেকে ফাস্ট বোটে এই দ্বীপে যেতে আধা ঘণ্টা সময় লাগে, তাই অধিকাংশ ট্যুরিস্টরাই বালি থেকে একটি প্যাকেজ ডে ট্রিপ নিয়ে সকালে গিয়ে বিকেলেই ফিরে আসে।

কেউ চাইলে এই দ্বীপগুলোয় রাত কাটাতেও পারে। সেজন্য যাওয়ার আগে অনলাইনে হোটেল বুকিং দিয়ে গেলে সুবিধা হবে। প্যাকেজ ট্যুরে গেলে এজেন্সি ফাস্ট বোটে করে সবগুলো দ্বীপে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে। ফাস্ট বোটে সমুদ্র ভ্রমণ কিন্তু সবার জন্য খুব একটা সুখকর নয়। উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে চলে বোটের দুলুনি আর তাতে অনেকেই অস্বস্তি বোধ করতে পারেন।

সানুর বীচ। সোর্স: বৃষ্টি

দ্বীপত্রয়ের মধ্যে নুসা পেনিডা আইল্যান্ডে ঘোরার জন্য পোর্ট সানুর বীচে এসেছে বৃষ্টি আপুরা। এই সানুর বীচকে ব্ল্যাক স্যান্ড বীচ বলা যায়, কিন্তু ব্ল্যাক বীচ বলতে চোখে গেরুয়া গানের যে ভিউ আশা করছিল, তা পুরাই গুড়ে বালি। কালো কিন্তু নোংরা বীচ!

নুসা পেনিডা দ্বীপে এসে ব্রোকেন বীচ ঘোরা হলো। ব্রোকেন বীচের কাছেই অ্যাঞ্জেলস বিলাবং। অ্যাঞ্জেলস বিলাবংয়ের বীচ খুব শার্প। ধারালো প্রবালে সাবধানে পা ফেলে যেতে হয়। প্রবালের মাঝখানে মাঝখানে পানি। কিছুক্ষণ এই পানিতে পা ডুবিয়ে হেঁটে গেল ওরা। ঢেউ এসে এসে এখানটায় পানি আটকে যায়। হাঁটতে গিয়ে এক সেকেন্ডের জন্য স্যান্ডেল খুলে গেলো। ধারালো প্রবালে ব্যালেন্স রাখার জন্য পা রাখতে গিয়ে আপু টের পেল প্রবাল কতটা ধারালো হয়!

অ্যাঞ্জেলস বিলাবং। সোর্স: বৃষ্টি

জায়গাগুলোতে ইয়াং ছেলেমেয়ের গ্রুপের দেখা পেয়েছে ওরা। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ওখানে কোনো ভারতীয় টুরিস্ট নেই! অথচ আগের দিনের ট্যুরে যেখানেই যাওয়া হয়েছে, অসংখ্য ইন্ডিয়ানের দেখা পেয়েছে। এমনকি রাস্তাঘাটে, রেস্টুরেন্টের মার্টে অনেক ইন্ডিয়ান দেখা গিয়েছে।

মালয়েশিয়া থেকে বালি আসার প্লেনে তো ৮০ ভাগই ইন্ডিয়ান ছিল। কিন্তু এই দ্বীপে নেই। গাইডকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, নুসা পেনিডায় ইন্ডিয়ান আসে না যে তা নয়। তবে খুবই কম, প্রতিদিন একটা কি দুটো গ্রুপ কিংবা কোনো কোনো সপ্তাহে কেউই না।

ব্রোকেন বীচ এবং অ্যাঞ্জেলস বিলাবংয়ে ঘোরা শেষে রওনা হলো নতুন জায়গায়। কিন্তু একটা সমস্যা হয়ে গিয়েছে। যেহেতু ব্রোকেন বীচের পাহাড়ে চড়ার সময় আপু সানস্ক্রিন ব্যবহার করেনি, হ্যাটও পরেনি- তাই আপুর প্রচণ্ড সানবার্ন হয়েছে। গাড়িতে উঠে দেখা গেলো, সে পুরো লাল হয়ে গিয়েছে, টকটকে লাল। পানির বোতল খুলে যে পানি খাবে, সেই সাধ্যও নেই।

১৫-২০ মিনিট লাগল নরমাল হতে। গাড়ি তখন আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা ধরে চলছে Kelingking বীচের দিকে। ওখানে সময় যেতে লাগল ৩০ মিনিট। নেমে দেখতে পেল আরেকটি অসাধারণ ভিউ। পাহাড়ের চূড়ায় বাঁশের মাচার এক পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে অদ্ভুত সুন্দর কিছু দৃশ্য দেখা হলো। আপু কেবল ভাবছিলো, “এত সুন্দর সুন্দর বীচে যাওয়ার কি কোনো উপায় নেই? শুধু দেখেই মন ভরাতে হবে?” পরক্ষণে ভাবলো, “ভালো হয়েছে যাওয়া যায় না। বেশি ভালো লাগার কাছে যেতে নেই।”
কেলিংকিং বীচ দেখতে হয় পাহাড়ের চূড়ায় বাঁশের মাচায় উঠে। এখানে দাঁড়িয়েই নিচের অসহ্য সুন্দর বীচটির রূপ দেখা যায়।

কেইলিংকিং বীচ। সোর্স: বৃষ্টি

এখানে রেস্টুরেন্টে বৃষ্টি আপুদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা ছিল এজেন্সির পক্ষ থেকে। সেট মেন্যু, তিনটা থেকে একটা নিতে হবে। নাসি গোরেং, মি গোরেং, স্যুপ!

হাতি খেয়ে ফেলব টাইপ ক্ষিধে পেয়েছে, স্যুপে কী আর হবে? নাসি গোরেং নিলো সবাই। সাথে ফ্লেশ ফ্রুট জ্যুস। জ্যুসটা অসাধারণ! রোদে তেঁতে থাকা আত্মা ঠাণ্ডা হয়ে গেল।

কেইলিংকিং বীচ। সোর্স: বৃষ্টি

খেয়ে দেয়ে হেলতে দুলতে রওনা দিলো Crystal Bay এর উদ্দেশ্যে। মাঝপথে মা অসুস্থ হয়ে গেল। প্রচণ্ড মাথা ব্যথা শুরু হয়ে গেল তার। কিন্তু কী আর করা? যেতে তো হবেই। ৩৫ মিনিটে পৌঁছে গেলো অ্যাঞ্জেলস বে। পাতায়ার কোরাল আইল্যান্ড এর মতো বীচটির পানি সবুজ নীল।

ছুটতে ছুটতে গিয়ে নামলো সমুদ্রে, সবাই নামছে! কিন্তু লবণ পানিতে আপুর পায়ের ইনফেকশনের জায়গাটা জ্বলতে লাগল তাই তাড়াতাড়ি উঠে যেতে হলো।

ক্রিস্টাল বে। সোর্স: বৃষ্টি

বীচে শাওয়ার রুম পাওয়া গেল না কোথাও, ওয়াশরুম আছে, যেতে হলে ৫,০০০ IDR, ৩০-৩৫ টাকা খরচ করতে হবে। এক জায়গায় দেখা গেল, কুয়া থেকে বালতি করে পানি উঠানো যায়। আপু একের পর এক বালতি পানি কুয়া থেকে তুলতে লাগল, আর সেই পানি দিয়ে সবাই হাত মুখ ধুলো, বাবা ওজু করল।

ক্রিস্টাল বে। সোর্স: বৃষ্টি

এবার ফেরার পালা। পাঁচটার পরে এখান থেকে আর কোনো বোট ছাড়ে না। তাই এই বোট মিস করলে এখানেই থেকে যেতে হবে আজ রাত। তাড়াহুড়ো করে গাড়িতে উঠে পোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা করলো সবাই।

বোটে চড়ে ফিরে এলো সানুর বীচ। হাঁটু পানি পেরিয়ে যে জায়গা থেকে বোটে উঠেছিলাম নামার পথে সেখানে তখন কোমর পানি। বাবা নামতে গিয়ে একটুর জন্য পড়ে যায়নি। মা-ও টালমাটাল, শিশিরও ধপ করে পানিতে গিয়ে পড়ল! আপু কোনোমতে ক্যামেরার ব্যাগ দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরে কোমর পানিতে শরীর ছেড়ে দিলো। তারপর এগিয়ে এসে উঠলাম রাস্তায়। সকালে যে ব্ল্যাক স্যান্ড বিচ দেখে গিয়েছে, এখন তার কোনো অস্তিত্বই নেই। পুরোটা পানির নিচে!

গাড়ি বেশ দূরে পার্ক করা, হেঁটে হেঁটে যাবার পথে আইস্ক্রিম পাওয়া গেল, সফট কোণ। ৫,০০০ IDR করে। গাইডের জন্য সহ ছয়টা নেওয়া হলো। শপের মেয়েটার সাথে গল্প করছিল আপু। মেয়েটার নাম মালয়, বালিতেই জন্ম, হিন্দু সে। মালয়ও আপুর নাম ধাম জিজ্ঞেস করল। টাকা দেয়ার সময় সে পাঁচটার দাম রেখে একটার টাকা ফেরত দিল। বলল, “Your one is my gift! Gift for a beautiful Bangladeshi girl.”

৫,০০০ IDR ( ৩০ টাকা) বড় কথা না, তাদের আন্তরিকতা আর ভালবাসাটুকু ছুঁয়ে গেল আপুকে। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, বালির কোন জিনিসটা সবচেয়ে ভালো লেগেছে, সে প্রথমেই বলবে এদের আন্তরিকতা, দ্বিতীয়ত এদের আন্তরিকতা এবং তৃতীয়তেও এদের আন্তরিকতা। শুধু এই মেয়েটা নয়, প্রত্যেকটা মানুষ, হোটেলের প্রত্যেকটা স্টাফ, প্রত্যেকটা ড্রাইভার, প্রত্যেকটা মানুষ।

এঞ্জেল বেলাবং। সোর্স: বৃষ্টি

হোটেলে ফেরা হলো সন্ধ্যা ৬টায়। শেষ হলো নুসা পেনিডা ট্যুর। এই ট্যুর প্যাকেজটাও নেওয়া হয়েছিলো Chologhuri ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে। বিল ছিল প্রতিজন প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য 75 usd/ এবং বাচ্চাদের জন্য 40 usd/। আপুদের পাঁচজনের বিল ছিল 340 usd। সারাদিনের সবকিছু ইনক্লুডেড উইথ লাঞ্চ, ফ্রেশ জ্যুস, হোটেল পিক আপ এন্ড ড্রপ, নুসা পেনিডা ট্রান্সফার, অল ট্রান্সপোর্টেশন।

পেনিডা ঘোরা হলো, তবে বালির সবচেয়ে সুন্দর, নিরিবিলি এবং অভিজাত এলাকা হলো নুসা দুয়া। বিলাস বহুল, ফাইভ স্টার হোটেলগুলোও এই এলাকাতেই অবস্থিত। শুভ্র বালুকা বিস্তীর্ণ, শান্ত , গোছানো বীচ এই নুসা দুয়া। আর এর ওয়াটার ব্লো এর সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।

তীব্র গতিতে ছুটে আসা ঢেউ এসে পাথুরে বীচে বাধাগ্রস্ত হয়ে ছলকে উঠছে বেশ কয়েক ফিট উপরে। সেই ছলকানো পানির স্ফটিক শুভ্র ফোয়ারা আর উচ্ছসিত কলতান যেন এক অদ্ভুত জগতে ভ্রমণ করিয়ে আনে। মাঝেমধ্যে সেখানে চলে নুসাদুয়া লাইট উৎসব। তখন চারিদিকে রঙবেরঙের আলোয় উৎসব মুখর পরিবেশ তৈরি হয়।

মধুচন্দ্রিমার জন্য এই সৈকত খুবই আদর্শ। এই সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য কখনোও ভুলবার নয়। নীরব, নিঝুম একেবারে আদিম এক প্রকৃতি নিয়ে অপেক্ষা করছে এই সৈকত। মন ভরে সূর্য ও সমুদ্রস্নান দুটোই সারা যাবে এখানে।
ফিচার ইমেজ: বৃষ্টি

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কোণার্ক সূর্য মন্দিরের অসাধারণ চিত্রকলা ও অতীত ইতিহাস

একদিনেই ঘুরে আসুন মানিকগঞ্জের বালিয়াটি জমিদারবাড়ি থেকে