নুব্রাভ্যালী ও ক্যামেল সাফারির গল্প… (পার্পল ড্রিম-৩৫)

নানা রকম ভয়, শঙ্কা আর ভিরুভিরু বুকে আমাদের গাড়ি পাহাড়ি পথ ছেড়ে নুব্রাভ্যালীর দিকে ঘুরিয়ে দিল। কয়েকটা কারন ছিল কিছু শঙ্কা আর ভয়ের। যার মধ্যে অন্যতম হলো, সন্ধ্যা পেরিয়ে যাওয়ায় নুব্রাভ্যালীতে ঢুকতে দেবে কিনা? ঢুকতে দিলেও ওখানে বিখ্যাত দুই কুজের উটের দেখা পাবো কিনা? আর তিন বেশী রাত হয়ে গেলে আমাদেরকে থানা থেকে আবার কোন ঝামেলা করবে কিনা? এমন নানা রকম ভাবনা ভাবতে ভাবতেই একটা সময় একদম বালুময় সমতলে চলে গেল আমাদের গাড়ি। চারদিকে শুধু বালুর প্রান্তর, শীতের বাতাস আর দূরে আধো আলো, আধো অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে চলমান পাহাড় যেন কয়েকটা!

আসলে ওগুলো পাহাড় ছিলোনা। ছিল পাহাড়ের মতই প্রকাণ্ড দুই কুজের বিখ্যাত সেই উট। একটা, দুইটা, তিনটা করে অনেক অনেক গুলোই। কোনটা ধীরে ধীরে মানুষ পিঠে করে হেটে চলেছে, কোনটা বিশ্রাম নিচ্ছে আর কোন কোনটা একসাথে বসে ক্লান শরীর নিয়ে ঝিমুনি দিচ্ছে। বাহ এসব আয়োজন দেখে আমরা সবাই দারুণ খুশি। অপূর্ণ স্বপ্ন তবে পূর্ণ হতে যাচ্ছে একটু পরেই।

নুব্রাভ্যালীর অপরূপ বিকেল। ছবিঃ সংগৃহীত

কারন, আমরা যখন তুরতুক থেকে বিকেলের দিকে নুব্রাভ্যালীর দিকে যাত্রা শুরু করি, তখন কিছুতেই ভাবতে পারিনি যে এখানে পৌঁছে যেতে পারবো আর উটের দেখা পেয়ে তার পিঠে উঠে সাধ পূরণও করতে পারবো। রাস্তা এতো ভয়াবহ, দুর্গম আর ঝুঁকিপূর্ণ ছিল যে রাতে শুধু নুব্রাতে ঘুমানো ছাড়া আর কিছু পাচ্ছিনা বলে ধরেই নিয়েছিলাম। কারন পরদিন খুব সকালে উঠেই আমাদের চলে যেতে হবে চূড়ান্ত স্বপ্নের পথে, প্যাংগং লেকের দিকে। যার দূরত্ব নুব্রাভ্যালী থেকেও প্রায় ১০০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। যেতে সময় লাগবে অন্তত ৪ ঘণ্টা। আবহাওয়া খারাপ হলে আরও বেশী লাগতে পারে সময়। তাই নুব্রাভ্যালীতে থাকার আর তেমন সুযোগ নেই বলে, দুই কুজের উট দেখার আশা আমরা বাতিল করে দিয়েছিলাম।

কিন্তু না, বিধাতা আমাদের এই দুর্লভ ভ্রমণের কোন ইচ্ছাই অপূর্ণ রাখেননি যেমন, ঠিক তেমনি করে উটের পিঠে উঠে নুব্রাভ্যালীকে উপভোগের ইচ্ছাও পূর্ণ করেছিলেন রাতের আঁধারে হলেও। সবাই সেই স্বাদ দিয়েছিল যে যার মত করে। কেউ উটের পিঠে উঠে, কেউ বসে, কেউ হেটে হেটে শীতল সেই মরুভূমিতে। পূরণ করেছিলাম আরও একটি স্বপ্ন।  

বিখ্যাত দুই কুজের উট, নুব্রাভ্যালী। ছবিঃ সংগৃহীত

নুব্রাভ্যালী ভারতের অত্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি প্রায় মরুভূমি অঞ্চল বলা যায়। লাদাখের লেহ শহর থেকেই এর দুরত্ত প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। যেতে সময় লাগে প্রায় ৬ ঘণ্টা। নুব্রাভ্যালীর বিশেষ বৈশিষ্ট হল এই চারপাশে পাহাড় ঘেরা ভ্যালীর পাশ দিয়েই বয়ে গেছে সায়ক নদী। কিন্তু তারপরেও মাইলের পর মাইল এটি একটি প্রায় রুক্ষ মরুভুমিসম! প্রায় ২৪ কিলোমিটার নুব্রভ্যালীর প্রায় পুরোটাই, শুষ্ক অঞ্চল, বালু, পাথর আর ঝুরো মাটির প্রান্তর। মাঝে কোথাও কোথাও একটু আধটু সবুজ দেখা দিলেও সেটা যত সামান্য মাত্র।

চারদিকে রুক্ষ পাহাড়ের দেয়াল, সেখান থেকে নিয়মিত ঝরে পরা বালু, পাথর, মাটি আর প্রতি নিয়ত প্রবল বাতাস সেখানে এক সত্যিকারের ঝড়ো মরুভুমির আবহ তৈরি করে রাখে সব সময়। তবে এতো কিছুর মাঝেও নুব্রাভ্যালীর দুটি ব্যাপার বিশেষ আকর্ষণীয়। একটি হল আকাশে যদি মেঘ না থাকে, তবে এমন নীল আকাশ পাওয়া অন্য কোথাও খুব কঠিন। আর ঝকঝকে নীল আকাশ দেখে মন ভালো হয়ে যায়না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাই এখানকার নীল আকাশ একটা বিশেষ আকর্ষণ, যেটা দেখলেই বোঝা যায়।

ক্যামেল সাফারি, নুব্রাভ্যালী। ছবিঃ সংগৃহীত

তবে এই নীল আকাশ নয়, নুব্রাভ্যালীর অন্যতম আকর্ষণ হচ্ছে এখান কার দুই কুজওয়ালা উট। বিশাল বিশাল এক একটা উটের পিঠে আপনি চড়তে পারেন কিছু সময়ের জন্য আর নিতে পারেন মরু ভুমিতে উটের পিঠে চড়ার অনন্য এক স্বাদ। তবে কিছুটা সাহসী হওয়া আবশ্যক। যদিও উট খুবই নিরিহ প্রকৃতির তবুও হুট করে এতো বড় একটা পশুর পিঠে উঠতে কিছুটা ভয় বা অসস্থি হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তাই সাহস করে উটের পিঠে উঠে পড়তে পারলেই আপনার সাথে সাথে মনে হবে যেন অন্য কোন পৃথিবীতে চলে এসেছেন বুঝি হুট করেই। নিজেকে মনে হতে পারে আরব বেদুঈন বা প্রাচীন যুগের কোন সওদাগর!

বেশ কিছু সময়, প্রায় ২০/৩০ মিনিট চড়তে পারবেন আপনি এই উটের পিঠে। বিনিময়ে দিতে হবে ২০০ ভারতীয় রুপী। উটের পিঠে চড়ে ঘুরে দেখবেন মরুভুমির বেশ কিছুটা অংশ ধীরে ধীরে। দারুণ একটা অভিজ্ঞতা হবে খুব অল্প সময়েই। চারদিকে রক্ষ পাহাড়ের দেয়াল, কাছে-দূরে বালুময় মরুভূমি, এখানে-সেখানে অল্পকিছু সবুজের জেগে থাকা, উপরে ঝকঝকে নীল আকাশ, হুটহাট ঝড়ো বাতাস, বেশ কিছুটা দূরে সায়ক নদীর ছুঁটে চলার শব্দ। চাইলে উটের শাওয়ারিকে বলে একটু দূরের সায়কের তীরেও ঘুরে আসতে পারেন আরাম করে উটের পিঠে চড়ে। বাতাসে ঢেউ খেলে খেলে, দারুণ একটা অনুভূতি পাবেন এই সংক্ষিপ্ত সাফারিতে।

স্বপ্নের আর দুর্লভ নুব্রাভ্যালী। ছবিঃ সংগৃহীত

আর একটা বিশেষ ব্যাপার হল এই দুই কুজওয়ালা উট খুব সম্ভবত আর কোথাও তেমন একটা দেখা যায়না, শুধু এই নুব্রাভ্যালীতেই যা আছে। সেখানকার স্থানীয় মানুষের তথ্য মতে। তাই মরুভূমিতে দুই কুঁজওয়ালা উটের পিঠে এমন দুর্লভ একটা সাফারির স্বাদ নিতে ভুল করবেন না, যদি কোন কারনে লেহ বা নুব্রাভ্যালীতে যাওয়া হয়, বেড়াতে বা অন্য কোন কারনে।

নুব্রাভ্যালীতে যেতে হলেঃ ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে দিল্লী বা লেহ প্লেন বা ট্রেনে। লেহ থেকে জীপে নুব্রাভ্যালী, লেহ থেকে নুব্রাভ্যালী যেতে রিজার্ভ জীপ বা ট্যাক্সি ভাড়া পরবে ৩০০০ রুপী। আছে থাকার মত পর্যাপ্ত হোটেল, মোটেল বা হোমসটে। ৫০০ থেকে ২৫০০ রুপীর ভাড়াতে। আর খাওয়া পাবেন সাধ্যের মধ্যেী ১২০-১৫০ রুপীতে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হিমালয়ে লুকানো অনন্য গ্রাম: তোশের গল্প

ব্যাকপ্যাকিংয়ে ব্যাকপ্যাক বাছাই