দক্ষিণ বলিভিয়ার সালার ডি ইউনি: বিশাল এক প্রাকৃতিক দর্পণ

বিদ্যানন্দের কর্ণধার কিশোর কুমার দাস দাদা জীবিকার জন্য পেরুতে থাকেন। জীবিকার পাশাপাশি বিদ্যানন্দের মতো একটা মহৎ মানব কল্যাণমূলক সংগঠন চালানোর শখ ছাড়াও তাঁর আরোও একটা শখ হলো ঘুরে বেড়ানো। তারই প্রেক্ষিতে বছর দুয়েক আগে দাদা বেড়াতে গিয়েছিলেন দক্ষিণ বলিভিয়ার সালার ডি ইউনিতে।

ওখানকার একটা ছবি আপ্লোড করলেন। যেটায় দেখা যাচ্ছে, দিগন্তবিস্তৃত খোলা জায়গা আল্লাহর এক অসীম মহিমায় অসংখ্য নিখুঁত টলুইন আকৃতির হয়ে আছে। এরকম ষড়ভুজ ভূমির একটা ষড়ভুজে কিশোরদা বসে আছেন। কী অপরূপ সুন্দর সেই ভূমি!

ষড়ভুজে কিশোরদা বসে আছেন। সোর্স: কিশোর কুমার দাস

দাদাকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, এটা লবণের মরুভূমি। জলের উপর পুরু লবণের স্তর। ঠিকঠাক হিসেব মতে, বছরে এখান থেকে উত্তোলন করা হয় ২৫,০০০ টন লবণ। এই পাথুরে লবণ খাবারে ব্যবহৃত হয়। এখন গরমকাল বলে লবণ ফেটে ষড়ভুজ আকারে শ্রেণিবদ্ধ হয়েছে। বৃষ্টিতে এটা সমান আয়নার মতো হয়ে যায়। একে পৃথিবীর প্রাকৃতিক আয়না বলে, কারণ এখানে নিখুঁত প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।

সালার ডি ইউনি হচ্ছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ লবণ সমভূমি। এটা নিয়ে বিভিন্ন উপকথা আছে, তবে বৈজ্ঞানিক যুক্তি হলো পুরান আমলের লেক শুকিয়ে লবণ থেকে গেছে। প্রতি বর্ষা মৌসুমে এই ষড়ভুজ ভেঙে যায়, সমান হয়, গরমে আবারো এই আকৃতি ধারণ করে।

গরমকালে লবণ ফেটে ষড়ভুজ আকারে শ্রেণিবদ্ধ হয়। সোর্স: ওয়ার্ল্ড ফেমাস

চল্লিশ হাজার বছর আগে একটি প্রি-হিস্টরিক বিশাল লেক ছিল, নাম Lake Minchin। এই লেক যখন শুকিয়ে গেল তখন দুটো ছোট ছোট লেক ও দুটো লবণের মরুভূমি বংশধর হিসেবে রেখে গেল। এর একটা হলো “সালার ডি ইউনি”। এটি এন্ডিসের তীরে, বলিভিয়ার দক্ষিণে পোটোসি অঞ্চলের ড্যানিয়েল ক্যাম্পোস প্রদেশে অবস্থিত।

সালার স্প্যানিশ শব্দ, যার অর্থ লবণ সমতল আর ইউনি আমরার ভাষা থেকে উদ্ভূত। এর অর্থ ঘের বা পরিবেষ্টন করা। একত্রে এর অর্থ দাঁড়ায় আবদ্ধভাবে পরিবেষ্টিত লবণ সমতল। এই লবণ সমতলের আয়তন ৪,০৮৬ বর্গমাইল।

প্রাচীন অনেকগুলো লেকের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে এই সালার ডি ইউনি। লবণের স্ফটিকের উপরে হালকা পানির স্তর। আপনি যদি হাঁটেন, তবে নিচে আপনার প্রতিচ্ছবি দেখবেন। যদি আকাশে মেঘ থাকে! সে এক অপরূপ দৃশ্য। পানির এই পাতলা আস্তরণের কারণে সেখানে আকাশের চমকপ্রদ এক প্রতিবিম্ব তৈরি হয়। ওপরে এক আকাশ, নিচে আরেক।

গোধূলির সময় লাল আভা ছড়িয়ে যায় সর্বত্র আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে। অনেক সময় ওয়েডিং ফটোগ্রাফিও হয় এখানে।

দুইটা আকাশ। সোর্স: ওয়ার্ল্ড ফেমাস

প্রবেশের শুরুতেই রয়েছে একটি প্রাচীন রেল কবরস্থান, একটি লবণের তৈরি হোটেল এবং আপনার কাছে থাকা সকল ডিভাইস চার্জ করার মতো যথেষ্ট পরিমাণ লিথিয়াম। তাছাড়া আপনি চাইলে আপনার জীবনের সমস্ত কাহিনি এই লবণভূমিতে লিখে রাখতে পারেন। জায়গাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২,০০০ ফুট উচ্চতায় বলিভিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে চিলির সীমান্তের সঙ্গে অবস্থিত।

এই লবণভূমিটি হাজার বছরের প্রাগৈতিহাসিক হ্রদগুলোর বিবর্তনের ফলে সৃষ্টি হয়েছে এবং এটি ১০,৫৮৩ বর্গ কি.মি এলাকাজুড়ে অবস্থিত। বর্ষার সময় আশেপাশের হ্রদগুলো থেকে পানি প্রবাহিত হওয়ার ফলে এই লবণভূমিটি প্লাবিত হয় এবং সেখানে ২০ ইঞ্চির মতো গভীর জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

ভূমিটি ভেজা থাক অথবা শুষ্ক প্রতিনিয়ত প্রচুর ফটোগ্রাফারের ভিড় জমে। এখানে মে থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে সমতল ভূমির ওপর দিয়ে বিভিন্ন যানবাহনে করে ভ্রমণ করা যায়, যা বর্ষার সময় সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক আয়নার বিভিন্ন অলীক খেলা উপভোগ করতে হলে বর্ষা মৌসুমে যেতে হবে।

শুষ্ক মৌসুমে এটি থাকে ধবধবে শুভ্র, কিন্তু বর্ষায় পুরু লবণের এলাকাটি একটা বিশাল আয়নায় পরিণত হয়। কয়েক ইঞ্চি গভীর হয়ে জমে থাকা এই স্বচ্ছ পানিতে ফুটে ওঠে প্রকৃতির সব রূপ, রঙ। তবে বর্ষার দুর্গম আবহাওয়ার ফলে এখানকার যাত্রা প্রায়শই বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং বেশ দীর্ঘসময় ধরে যাতায়াত বন্ধ থাকে।

ওপর থেকে। সোর্স: ওয়ার্ল্ড ফেমাস

লবণ এবং ব্যাটারির প্রাচুর্যে ভর্তি সালার ডি ইউনি শুধু পর্যটকদের লীলাভূমিই নয়। আমেরিকার ভূগোল বিষয়ক জরিপ অনুযায়ী এখানে ৯ মিলিয়ন টন লিথিয়াম ধাতু রয়েছে। তাছাড়া সমগ্র পৃথিবীর মোট লিথিয়াম ধাতুর ৫০-৭০ শতাংশ মজুদ এখানে রয়েছে।

ইউরোপীয় মহাকাশ অধিদপ্তরের এক জরিপ অনুযায়ী সালার ডি ইউনির বিশাল এলাকা, পরিষ্কার আকাশ এবং ভূমি অত্যন্ত সমতল হওয়ার কারণে তা মহাকাশ থেকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ভূমির উচ্চতা মাপার জন্য খুবই উপযোগী। তাছাড়া এখানকার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মহাকাশের মতো অপরূপ স্থান থেকেও অসাধারণ দেখায়।

লবনের স্তুপ। সোর্স: ওয়ার্ল্ড ফেমাস

সালার ডি ইউনি আন্দিজ পর্বতমালার খুব কাছাকাছি হওয়ায় এখান থেকে আকাশকে দেখা যায় চোখজুড়ানো সৌন্দর্যে। মনে হবে আকাশ আর পৃথিবীর বুক যেন এক সাথে মিশে যেতে চাইছে। সালার ডি ইউনিতে শুষ্ক মৌসুম, রাত্রিকালীন শীতল আবহাওয়া, তীব্র মরুভূমির মতো সূর্যতাপ থাকা সত্ত্বেও এখানে জীবনের স্থায়ীত্ব অনেক বেশি।

এখানে অমোঘ সৌন্দর্যের অধিকারী গোলাপী রাজহাঁস এবং বিরল প্রজাতির হামিং বার্ড রয়েছে। এই লবণভূমির পাশেই রয়েছে একটি গাঢ় গোলাপি জলের লেক। লেকটি আবার গোলাপি ফ্ল্যামিংগো পাখির প্রজননের অন্যতম স্থান। এছাড়া পুরো এলাকাকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে সাজিয়েছে রং-বেরংয়ের সারি সারি পাহাড়ও।

সালার ডি ইউনি একসময় ট্রেনে করে লবণ পরিবহনের জন্য বিখ্যাত ছিল এবং খনি কর্মীরা সমতল এই ভূমি থেকে প্রচুর লবণ সরবরাহ করতো। কিন্তু এই এলাকার আদিবাসীদের আক্রমণের কারণে ট্রেনে করে এই লবণ সরবরাহের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ফ্লামিংগো পাখি। সোর্স: ওয়ার্ল্ড ফেমাস

তবে দেখতে যতই সুন্দর হোক না কেন, এখানে বেশীক্ষণ থাকা যায় না। লবণ গায়ের সব পানি চুষে নেয়। তবুও সৌন্দর্যের টানে ছুটে যায় বহু মানুষ।

তথ্যসূত্র :
http://www.agriview24.com

ফিচার ইমেজ: ওয়ার্ল্ড ফেমাস

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি রেল স্টেশনের গল্প

রক্তদহ বিল: এক অদেখা ভালোবাসার গল্প