গোমুখ অভিযান: নন্দাদেবী এক্সপ্রেস, যে ট্রেনে সবাই ট্রেকার!

dav

গোমুখ অভিযানে ঢাকা থেকে যখন কলকাতা-দিল্লী হয়ে দেরাদুন যাওয়া আর আসার টিকেট করছিলাম, কয়েকটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হয়েছিল আমাকে। যার মধ্যে অন্যতম হলো আমার যেহেতু সময় কম তাই ঢাকা-কলকাতা ট্রেন বা বাসে করলেও সময় বাঁচাতে কলকাতা থেকে দিল্লী আর দিল্লী থেকে কলকাতা এয়ার টিকেট করেছিলাম। আর বিশেষ সৌভাগ্যের কারণে কিনা কে জানি না রিটার্ন টিকেট পেয়ে গিয়েছিলাম বেশ কম দামে।

কলকাতা-দিল্লী-কলকাতা ৫,২০০ রুপীতেই, যা টাকায় রূপান্তরিত করলে ৬,৫০০ টাকা লেগেছিল! আর দিল্লী থেকে দেরাদুন যাওয়া-আসার ট্রেন টিকেট করতে চেয়েছিলাম এমনভাবে যেন জার্নির কষ্ট না থাকে আবার ট্রানজিট নিয়েই অনেক লম্বা সময় অপেক্ষার বিরক্তি বা একদম সংক্ষিপ্ত সময়ের একটা থেকে আর একটা বাহন ধরার তাড়াহুড়ো, টেনশন আর ঝুঁকি না থাকে।

স্টেশনের প্রবেশ দ্বারে। ছবিঃ লেখক

এই কম্বিনেশন ঠিক রাখতে গিয়ে আর সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত পুরনো দিল্লী ঘুরে বেড়ানোর পরিকল্পনা থেকে ওয়েটিং লিস্ট হয়ে যাওয়ার পরেও নন্দাদেবী এক্সপ্রেসের টিকেট করেছিলাম এসি থ্রি টায়ারের। উল্লেখ্য যে, এই ট্রেনে কোনো নন এসি কামরা নেই আর এটাই একমাত্র সুপার ফার্স্ট ট্রেন যেটা দিল্লী থেকে প্রায় মধ্যে রাতে ছেড়ে একদম ভোরে দেরাদুন পৌঁছে যায়। আর এই ট্রেনের লেট হবার তেমন কোনো রেকর্ডও নেই।

তার মানে ঘুমিয়ে যদি যেতে নাও পারি খুব ভোরে তো পৌঁছে যাবো এটাই আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার। পরে দেরাদুন পৌঁছে নিজের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে উত্তর কাশীর দিকে যত দ্রুত সম্ভব রওনা হওয়া যাবে। আর বিশেষ করে এই ট্রেনের নামটাও ভীষণ ভালো লেগেছিল নিঃসন্দেহে। নন্দাদেবী এক্সপ্রেস।

কিন্তু ভাগ্য আমার শুধু সুপ্রসন্নই নয়, ভীষণই সুপ্রসন্ন যে কারণে এই ট্রেনে আমার যাত্রা শুরুর একদিন আগেই ট্রেন ম্যানের কাছ থেকে জানতে পেরেছিলাম আমার সিট শতভাগ কনফার্ম হয়ে গেছে! ওয়েটিং লিস্ট থেকে সিট র‍্যাকে না থেকে কনফার্ম হয়ে যাওয়া একটা বিরল ঘটনা। তো পুরনো দিল্লীর স্বনামে খ্যাত করিম’সে ডিনার শেষ করে একটা প্যাডেল রিক্সা ৩০ রুপী দিয়ে ভাড়া করে হেলে-দুলে পৌঁছে গেলাম নিউ দিল্লী স্টেশনে। বাইরের বাথরুম কাম ওয়াশরুমে গোসল সেরে লকার থেকে ব্যাগ নিয়ে নির্ধারিত প্লাটফর্মে চলে গেলাম, নিজের ট্রেন আর কামরার খোঁজ নিতে।

স্টেশনে কামরা খুঁজে ফেরা। ছবিঃ লেখক

প্লাটফর্মে গিয়ে দেখি ট্রেন নির্ধারিত জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কোথাও কোনো চার্ট নেই, যেটা সাধারণত অন্যান্য ট্রেনের ক্ষেত্রে প্লাটফর্মে লাগানো থাকে। কিন্তু এখানে সেটা নেই। অনেক খুঁজেও কোনো চার্ট না পেয়ে ভাবনায় পড়ে গেলাম সিট কোন কামরায় হবে আমার। একজন আমাকে গুগলে কীভাবে কোন কামরায় সিট সেটা খুঁজে পাবার উপায় দেখিয়ে দিলেন। ব্যস আমিও পেয়ে গেলাম আমার নির্ধারিত কামরা আর সেই কামরার কোন সিট সেই নাম্বার। ততক্ষণে পুরো ট্রেনের অন্যান্য যাত্রীরা এসে প্লাটফর্মে পৌঁছে গেছে। আর এদের মধ্যে যাদেরকে চোখে পড়ছে তাদের কাউকেই সাধারণ যাত্রী বলে মনে হলো না। সবাই কেমন যেন কমন যাত্রী, ঠিক যেমন আমি নিজের ব্যাকপ্যাক নিয়ে আছি, সবাই তেমন করেই আছে।

আমি কি ভুল বুঝছি নাকি চোখে ভ্রম দেখছি? সেই কৌতূহল মেটাতে প্লাটফর্মের অন্যান্য দিকে এগিয়ে চোখ বোলাতে লাগলাম আর ভীষণ অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম যে আসলেই এই ট্রেনে একদম সাধারণ যাত্রী একজনও নেই। সবাই ব্যাকপ্যাক যাত্রী, সবাই শর্ট প্যান্ট, টি শার্ট আর বুট বা কেডস পরে আছে আর হাতে বা ব্যাগের সাথে সবারই একটি বা দুটি ট্রেকিং পুল বা স্টিক। কেউ বন্ধু-বান্ধব নিয়ে, কেউ অফিসের সহকর্মীরা মিলে, কেউ পরিবার বা ভাইবোন মিলে ট্রেকিংয়ে যাচ্ছে। খুব আর খুব মজা পেলাম এদের সবাইকে দেখে।

ট্রেকারদের ব্যাকপ্যাক। ছবিঃ লেখক

এদের দেখে দেখে নিজের নির্ধারিত কামরার কাছে চলে এলাম। সেখানেও সবাই যার যার ব্যাকপ্যাক কাঁধে বা নিচে রেখে পুল নিয়ে, হাতে পানির বোতল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরে নিজের কৌতূহল মেটাতে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম কে কোথায় যাচ্ছেন? জানলাম কেউ রূপকুণ্ড ট্রেক, কেউ হেমকুণ্ড, কেউ রুপিন পাস, কেউ স্টক কাংরি, কেউ উত্তর কাশী, কেউ যমুনাত্রি, কেউ হৃষীকেশ, কেউ হরিদুয়ার, কেউ রুদ্র প্রয়াগ আর কেউ কর্ণ প্রয়াগ। মোট কথা যতগুলো টিমের সাথে এখন পর্যন্ত কথা বলেছি সবাই কোনো না কোনো ট্রেকিং রুটে যাচ্ছে ধর্মীয় বা আত্মতৃপ্তির জন্য।

এদের সবাইকে দেখে এত ভালো লাগলো যেটা বলে বোঝানোর নয়। এমনটা আগে কখনোই দেখিনি যে একটি ট্রেনের সকল যাত্রীই ট্রেকিংয়ে যাচ্ছে যে যার মতো করে আলাদা আলাদা গন্তব্যে। ট্রেন ছাড়ার ঠিক ১৫ মিনিট আগে দরজা খুলে দেয়াতে সবাই যে যার মতো উঠে পড়ে যার যার সিটে গিয়ে ব্যাগপ্যাক রাখলাম। মোবাইলটা অনেক ঝামেলা করে চার্জে দিতে দিতেই দেখলাম সবাই যার যার মতো করে বিছানা করে শুয়ে পড়ার আয়োজন শেষ করে ফেলেছে। সবার দেখাদেখি আমিও নিজের সিটে রাখা কম্বলের প্যাকেট খুলে, চাদর বিছিয়ে, বালিশে মাথা রেখেছি মনে পড়ে। এরপর আর কিছু মনে নেই, কিছুই না। আহা হিম ঠাণ্ডায়, ওম কম্বলের ভেতরে, সারাদিনের ক্লান্তি শেষে এমন ঘুম হলো যে ঘুম ভাঙলো একদম দেরাদুন পৌঁছে যাওয়ার পরে অন্যান্য যাত্রীদের নেমে যাবার কলকাকলিতে।

রেডি টু রাইড। ছবিঃ লেখক

ঝটপট নিজের ব্যাগ গুছিয়ে, মোবাইলের চার্জার খুলে, ব্যাগ কাঁধে করে ট্রেন থেকে নেমে একদমই নতুন একটি প্রদেশের নতুন একটি রাজধানী দেরাদুনে। আহা অনেক দিনের স্বপ্ন দেখা দেরাদুনে। দ্রুত বাস স্ট্যান্ডের পথ ধরলাম, আজকের মধ্যে আমাকে গাংগোত্রী বা উত্তর কাশী পৌঁছে যেতে হবে। তবে মনে গেঁথে গেছে নন্দাদেবী এক্সপ্রেসের অনন্যতা আর দারুণ রাতের আর স্টেশনের অভিজ্ঞতা।

দেরাদুন রেলওয়ে স্টেশন। ছবিঃ লেখক

আহ কী দারুণ নন্দাদেবী এক্সপ্রেস, যে ট্রেনের সবাই ট্রেকার।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নো ম্যান্স ল্যান্ডে কী হবার? আর কী হলো!

ইদ্রাকপুর দুর্গ: ত্রিভুজ জলদুর্গের তৃতীয় স্থাপনা