নৈসর্গিক শান্তিবাড়ি অনৈসর্গিক সৌন্দর্যের রূপমা

পোল্যান্ডের স্থান ও খাবারের চিত্র; Source;@flickr

ভূমি প্রকাশের সাথে আমাদের এই বছরের আনন্দ ভ্রমণের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল চায়ের নগরী শ্রীমঙ্গলে। আমাদের থাকা এবং অন্যান্য সব আয়োজন টি হ্যাভেন রিসোর্টে করা হলেও, শেষ দিনের দুপুরের খাবার আর বিকেলটা কাটানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় শ্রীমঙ্গলেরই আরেকটি রিসোর্ট শান্তিবাড়ি রিসোর্টে।

শ্রীমঙ্গলের রাস্তাগুলো অপূর্ব সুন্দর। সেসব রাস্তায় একটুখানি মেঘলা আবহাওয়ায় দিবাকরদা’র গানের তালে তালে আমরা যাচ্ছি শান্তিবাড়ির দিকে। মূল সড়ক থেকে রিসোর্টটি খানিকটা ভিতরে। তা হওয়ায় উচিত। নগরের যান্ত্রিকতা যদি এড়ানোই না যায়, তাহলে শান্তিবাড়ি নামটাই বিফলে যাবে। তাছাড়া, আমার মতে এই ধরনের ইকো রিসোর্টগুলো শহর ছেড়ে একটু ভিতরের দিকে হলেই প্রকৃতির সাহচর্য উপভোগ করা যাবে।

টিলার সারি; Image source : মাদিহা মৌ

আমাদের রিজার্ভ গাড়ি থামলো। এরপর সরু একটা মেঠোপথে হাঁটতে শুরু করলাম। প্রথমেই পেলাম কাঠ আর লোহার তৈরি একটা ব্রিজ। নিচে পাহাড়ি সরু খাল। এরপর কিছু সাধারণ মানুষের আবাসস্থল। এমনকি তাদের সেসব বাড়ির আঙিনাতেও রয়েছে বিভিন্ন বিদেশি ফুলের গাছ। ফুলে ফুলে ভরে আছে উঠোনগুলো। তারপর পেলাম কিছু টিলা। টিলাগুলো পেরোতে পেরোতেই শান্তিবাড়ির সীমানা চোখে পড়লো।

মাচার উপর ছন, টিন, বাঁশ বেড়া দিয়ে সাজানো একটা কটেজ আমাদের দিকেই মুখ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার পাশের রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের সাদরে বরণ করে নিচ্ছে হরেকরঙা চন্দ্রমল্লিকা, কলাবতী, সূর্যমুখী, কুঞ্জলতা, কাঠমালতি আর লিলির বিভিন্ন প্রজাতির অপূর্ব সুন্দর ফুলগুলো। এখানেও বেশ কিছু কটেজ রয়েছে। আর আছে একটা কাঠের দোতলা বাড়ি। ঠিক উল্টোপাশেই পুকুর। পুকুরের অপর পাড়ে পুকুরের উপরেই হেলান দিয়ে আধশোয়া হওয়ার জন্য রয়েছে কাঠের খাটিয়া। সেই সাথে একটা বড় কাঠের দোলনা। ঠিক যেন একটা স্বপ্নময় পরিবেশ।

পুকুর; Image source : মাদিহা মৌ

আমাদের মধ্যকার কয়েকজন ছেলে তক্ষুনি ঝাপিয়ে পড়লো পুকুরে। অবশ্য শুকনো মৌসুম বলে পানি অনেক কম। ওরা দাপাদাপি করছে পানিতে, কেউ কেউ কাঠের কটেজগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছে, বিছানায় গড়িয়ে নিচ্ছে, কেউ বা ফুলের রাজ্যে ছবি তুলছে, কেউ কেউ পুকুরের অপর পাড়ের খাটিয়ায় গা এলিয়ে দিয়েছে, বড়শিতে মাছ ধরছে, গিটারের টুংটাং শব্দে সুর ভাজছে। আর সব সময়কার মতোই শওকত শাওন ভাইয়া ইজেল, প্যালেট, তুলি নিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করে দিয়েছেন। সব মিলিয়ে ঠিক যেন একটা গল্পের আবহ চলে এসেছে চারধারে।

আমরা মূলত দুপুরের খাবার খেতে এসেছি এখানে। দুপুরের খাবার তৈরি হতেই ডাক পড়লো সবার। ব্যুফে সিস্টেমে খাবারের পসরা সাজিয়ে রেখেছে পুকুরের ধারে এক টেবিলে। তার সামনেই খোলা আকাশের নিচে টেবিল চেয়ার পেতে খাবারের ব্যবস্থা। অবশ্য একটা ছাউনি আছে খাবার ঘর হিসেবে। আমাদের লোকজন বেশি বলে ওতে সবার জায়গা হলো না। তাই অনেকেই ইচ্ছে করেই বসলেন বাইরের টেবিলগুলোতে।

কটেজ; Image source : মাদিহা মৌ

খাবারের মেন্যুতে আছে আলুভর্তা, মাছ ভর্তা, লাল শাক, সালাদ, বিশাল আকৃতির কালবাউশের ঝোল আর দেশি মুরগি। ব্যুফে প্যাকেজে ভাত ডাল আলুভর্তা, মাছ ভর্তা, লাল শাকের সাথে হয় মাছ নিতে পারবে, নয়তো মুরগি। আমরা বেশিরভাগই মাছ দিয়ে খেয়েছি। কারণ আমরা সকালেই শুনেছিলাম, পুকুর থেকে তাজা কালবাউশ তোলা হয়েছে। বড় আর তাজা মাছের স্বাদই আলাদা। তাই মাছের লোভ কেউ সামলাতে পারেনি। দুপুরের এই প্যাকেজের দাম সাড়ে তিনশ টাকা। খাবারের দাম একটু বেশি মনে হলেও সবকিছুর বিচারে এই দাম মেনে নেওয়া যায়। এদের রান্না খুবই দারুণ। সবাই খুব তৃপ্তি নিয়েই খেয়েছে।

খাওয়াদাওয়ার পর আরেকদফা সঙ্গীতচর্চা হলো। দিবাকরদার নেতৃত্বে আমরা সবাই গলা ছেড়ে গাইলাম।

আমাদের গল্পের রূপায়ণ; Image source : সজল

যাওয়ার আগে মালিকের সাথে কথা বলতে গেলাম। তিনি জানালেন, এখান থেকে পাহাড়ে ট্রেকিং করে লাউয়াছড়া আর মাধবপুর লেক যাওয়া যায়। তাদের একটা প্যাকেজ আছে ৫,৫০০ টাকার, যেখানে দুই দিনের ভ্রমণে থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা তো থাকবেই। সেই সাথে লাউয়াছড়া, মাধবপুর লেক, মণিপুরি পাড়া, সাত লেয়ারের চায়ের দোকান ঘুরিয়ে আনা হবে। প্যাকেজ অনুসারে প্রথমে এলেই তাজা লেবুর শরবত দিয়ে আতিথেয়তা শুরু করা হবে। প্রত্যেক বেলার খাবার, বিকেলের চায়ের সাথে সাথে দ্বিতীয় রাতে থাকবে বার্বিকিউ ডিনার।

কথা বলতে বলতেই শান্তিবাড়ির মালিক আমাদের নিয়ে চললেন তার পাহাড়ের ঢালে ঝুলে থাকা মাচান কটেজগুলোর কাছে। কটেজগুলো দেখে এত ভালো লাগলো যে, আমরা ঠিক করলাম, পূর্ণিমা তিথিতে এখানে একবার আসতেই হবে। কর্তৃপক্ষ আরও জানালেন, শান্তিবাড়ির ওই বিশেষ প্যাকেজটি না নিয়েও এখানে থাকা যাবে। সেক্ষেত্রে খরচের হিসেব আলাদা। তখন চাইলে নিজেরাই রাতে বারবিকিউ করা যাবে।

খাবারের মেনুটা আমাদের নির্ধারণ করে দেওয়া; Image source : মাদিহা মৌ

এখানে কিন্তু খুব হাইফাই এসি রুম, অত্যাধুনিক সুযোগ সুবিধাসম্পন্ন টয়লেট ইত্যাদি পাওয়া যাবে না। যান্ত্রিক কোলাহল থেকে মুক্তি পেতে চাইলে চমৎকার একটি গন্তব্য হতে পারে এই শান্তিবাড়ি। মাচার ঘর, ছন, টিন, বাঁশ বেড়া দিয়ে সাজানো কটেজগুলো আপনাকে প্রকৃতির সাথে মিশিয়ে নেবে। সদ্য বিবাহিত দম্পতিরা চলে যেতে পারেন নিজেদের বোঝাপড়াকে মজবুত করে নিতে, কিংবা বন্ধুবৃত্ত নিয়ে চুটিয়ে আড্ডা দিয়ে আসতে পারেন। শান্তিবাড়িতে যাবার আগে চান্দ্রমাসের হিসেব গুনে গেলে ভালো হয়। পূর্ণিমা রাতে শান্তিবাড়ি অনৈসর্গিক সৌন্দর্যে মোহনিয়া হয়ে ওঠে।

শান্তিবাড়ির স্টাফ এবং কর্মচারীরা খুবই অমায়িক। এখানে পাহাড়ের ঢালে আলগোছে অসতর্কভাবে শুয়ে বসে থাকলে সমস্যা নেই, নিরাপত্তা আছে শতভাগ। মাচার ঘরগুলোতে দরজা লক করার কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে সব খোলা রেখে ঘুরতে গেলেও কোনো সমস্যা নেই, কেউ কিচ্ছু ধরবে না।

মাচান ঘর; Image source : মাদিহা মৌ

খরচ

কাঠের বাড়িতে প্রতি কক্ষের ভাড়া তিন হাজার এবং বাঁশের কটেজের রুম ভাড়া দুই হাজার টাকা।

যোগাযোগ করতে পারেন এই নাম্বারে- ০১৭১৬-১৮৯২৮৮.

কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাসে অথবা ট্রেনে যাওয়া যায় শ্রীমঙ্গল। তবে বাসে যদি যান, রাস্তা ফাঁকা থাকলে ট্রেনের আগেই পৌঁছাবেন। হানিফ, ইউনিক, রূপসী বাংলাসহ বিভিন্ন বাস রয়েছে আরামবাগ, মহাখালী এবং সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে। সিলেট মেইল অথবা উপবনে করেও যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে শ্রীমঙ্গলে। ট্রেনে ভাড়া ৩০০-৩৫০ (স্নিগ্ধা), ২৭০ (শোভন চেয়ার), ২০০ (সুলভ)। বাসের ভাড়া ৪০০-৪৫০ টাকা।

শাওন ভাইয়ার তুলির আঁচড়ে শান্তিবাড়ি; Image source : সজল

শান্তিবাড়ি যাওয়ার জন্য শ্রীমঙ্গল এসে সিএনজি রিজার্ভ করে শান্তিবাড়ি রিসোর্ট যাওয়া যাবে। তবে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে বললে তারা শ্রীমঙ্গল থেকে নেওয়ার ব্যবস্থা করবে। এমনকি কেউ প্যাকেজে যেতে চাইলে তারা ঢাকা থেকে ট্রেনে বাসে নেওয়ার ব্যবস্থা করে দেবে কর্তৃপক্ষ।

Feature Image : মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঈদ ভ্রমণ: পাহাড়ের স্বর্গ রিশপে

নতুন বছরের প্রথম দিনে, দিল্লীর মিষ্টির অথৈ সাগরে