নোয়াখালী-সোনাইমুড়ী-সেনবাগ-দাগনভূঁইয়ায় একদিনের ঘোরাঘুরি

ঈদের পর ঘোরার ভূত চাপলো মাথায়। ইদানীং ছুটিতে চাঁদপুর ফিরলেই ভাবি চাঁদপুরের আশেপাশের জেলাগুলো ঘুরে নেব। এতকাল চাঁদপুরের স্থায়ী বাসিন্দা হয়েও কেন যে প্রতিবেশী জেলাগুলো ঘুরে বেড়াইনি, সেটা ভেবেই আফসোস লাগে।

মসজিদের কারুকাজ। সোর্স: লেখিকা

কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর তো ঘোরা হলো। নোয়াখালী আগে একবার এলেও, ঘুরে দেখা হয়নি কিছুই। তাই ঠিক হলো, নোয়াখালীই হবে আমার এবারের ঈদ উৎসব। যদিও নোয়াখালী যাবো শুনেই বন্ধুবান্ধব নাক সিঁটকাতে শুরু করলো এই বলে যে, নিঝুম দ্বীপ ছাড়া আর কী-ই বা আছে এই জেলায়? আমি মনে মনে হাসলাম।
আমার কাজই হলো, অখ্যাত জমিদারবাড়ি, প্রাচীনতা আর স্মৃতিচিহ্ন খুঁজে বেড়ানো। দেখা যাক, এবারে আমি কী উদঘাটন করতে পারি। হাসতে হাসতে উত্তর দিয়েছিলাম, ‘নিঝুম দ্বীপ ছাড়াও কিন্তু নোয়াখালীতে ঘোরার জায়গা আছে। নিঝুম দ্বীপ যাবো, তবে তোদের সাথে। এখন একা ঘুরছি, দ্বীপে গিয়ে মজা পাবো না।’
মসজিদের অভ্যন্তরীণসজ্জা। সোর্স: লেখিকা

ভোর সকালে চাঁদপুর থেকে রওনা করলেও, চাঁদপুর টু নোয়াখালীরর একমাত্র বাস আনন্দের ছ্যাঁচড়ামোর জন্য পৌঁছাতে পৌঁছাতে সাড়ে এগারোটা বেজে গেল। চৌরাস্তায় বেচারা সুজানা প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। ওকে খুঁজে নিয়ে একদফা উচ্ছ্বাস পর্ব চললো। তারপর নোয়াখালীর চৌরাস্তা থেকে আমরা জননী বাসে চেপে বসলাম সোনাইমুড়ী যাওয়ার উদ্দেশ্যে।
দীর্ঘ মিনার। সোর্স: লেখিকা

সোনাইমুড়ীই আমাদের তখনকার গন্তব্য ছিল না। সোনাইমুড়ী নেমে যানবাহন বদলাতে হবে। বাস থেকে নেমে লোকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাঘপাচড়ায় কী করে যাব?’
নোয়াখালী ভাষায় উত্তর এলো, কলেজ রোড গেলেই ‘বাগহাঁচড়া’ যাওয়ার সিএনজি পেয়ে যাবো। কলেজ রোডের উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করেই দেখি অপূর্ব সুন্দর এক মসজিদ দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমেই চোখে পড়লো মসজিদটির দুটি মিনার। আর তারপর বাকি কাঠামো। সোনালী ইট আকৃতির টাইলসের চারধারে খয়েরী রঙের বর্ডার করা। তার মাঝে মাঝেই সাদা রঙের কারুকাজ করা।
বীরশ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল আমীনের স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার। সোর্স: লেখিকা

মসজিদের নাম সোনাইমুড়ী জামে মসজিদ। তখনো নামাজের সময় হয়নি। কিন্তু নামাজের সময় হলেও বা কী ফায়দা হতো? আমি তো আর ভিতরে ঢুকে দেখে আসতে পারতাম না। তাই আমার ভাই আরমানকে পাঠালাম ভিতরটা ঘুরে ঘুরে দেখে আসার জন্য। বাইরের মতো ভিতরটাও খুব সুন্দর।
সোর্স: লেখিকা

সোনাইমুড়ীর বাঘপাচড়া গ্রামে সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন মোহাম্মদ রুহুল আমীনের স্মৃতিচিহ্ন অপেক্ষা করছে। মসজিদ দেখা শেষ করে, সিএনজি চেপে চলে এলাম নোয়াখালীবাসীর ‘বাগহাঁচড়া’য়। সিএনজি ভাড়া ২৫ টাকা করে। সিএনজিচালককে বলতেই রুহুল আমিনের স্মৃতি জাদুঘরের রাস্তার মুখে নামিয়ে দিলো।
স্মারক। সোর্স: লেখিকা

ঈদের পর পরে যাওয়ার কারণেই হয়তো, আমরা গিয়ে গ্রন্থাগারটি বন্ধ অবস্থায় পেয়েছি। আশেপাশের কাউকে জিজ্ঞেস করে জানা যায়নি, গ্রন্থাগারটি বন্ধ কেন। দরজা বন্ধ হলেও জানালাগুলো খোলা ছিল। স্মৃতি জাদুঘরের আলোকচিত্রগুলো জানালা দিয়েই ধারণ করা হয়েছে।
মাজার। সোর্স: লেখিকা

এই জাদুঘরের পাশেই একটি মাজার দেখতে পেলাম। চারপাশে লাল কাপড় ঝোলানো। টাইলস করা মাজারের উপরে মাটি রাখা হয়েছে কেন, বোঝা গেল না। সেই মাটি আবার রকমারি ঝালর, গাঁদা ফুল দিয়ে সাজানো। মাজার প্রথা, লালসালু এদেশের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমীনের গ্রামও তা থেকে মুক্তি পায়নি। এই পীরের নামটা বেশ মজার। মাজারের দেয়ালেই লেখা ছিল এভাবে, “শাহ সূফি হাফেজ আবুল বারেক শাহ তেলুয়া হাফেজ বাবার মাজার শরীফ।”
পাশে ছোট করে ওফাত দিবস ও ওরস-দোয়ার তারিখ লেখা আছে। সেই সাথে আছে মোমবাতি জ্বালানোর স্ট্যান্ড। কী ভেবে যে এ দেশের মানুষ এত মাজার পূজা করে!
মাজার। সোর্স: লেখিকা

বাঘপাঁচড়ায় বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের সংগ্রহশালা ও পাঠাগার দেখে পা বাড়ালাম জয়াগ গ্রামের দিকে। ওখানে আছে মহাত্মা করমচাঁদ গান্ধীর আশ্রম। গান্ধী আশ্রমটি নোয়াখালী জেলার ৩০ কিলোমিটার দূরের সোনাইমুড়ী উপজেলার জয়াগ গ্রামে অবস্থিত।
জয়াগ গ্রামে যাওয়ার জন্য আমাদের আবার সোনাইমুড়ীর কলেজ রোড আসতে হলো সিএনজিতে করে। কলেজরোড এসেই দেখি একটা জননী বাস দাঁড়িয়ে আছে। জয়াগ যেতে হলে এই বাস ধরেই যেতে হবে। চটপট উঠে পড়লাম। এখান থেকে ভাড়া পড়লো প্রতিজনে ২০ টাকা করে।
জয়াগ গ্রামের মঠ। সোর্স: লেখিকা

জয়াগ নেমে লোকজনকে যাওয়ার উপায় জিজ্ঞেস করে নিলাম। জয়াগ বাজার থেকে রিক্সায় বা পায়ে হেঁটে আধা কিলোমিটার পুর্বে গেলে গান্ধী আশ্রমে পৌঁছানো যাবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, রিকশায় যাওয়ার চেয়ে হেঁটে যাওয়াই ভালো হবে। আসলেই তাই হলো।
গান্ধী আশ্রমের প্রবেশদ্বারের দুইপাশে দাঁড়িয়ে আছে কিছু মঠ। নামহীন এসব মঠগুলোতে ঘুরে ফিরে দেখলাম। একদম যাচ্ছেতাই অবস্থা। খড় গাদা করে ফেলে রেখেছে মঠগুলোর মধ্যে। পুরাতন এই স্থাপনাগুলোর গায়ে অনেক নাম লেখা। অমুক প্লাস তমুক টাইপের নাম লেখা। অথচ এগুলো যে কারোর সমাধিস্থল, লোকে হয়তো জানেই না। মঠগুলোর পাশে একটা জায়গা জুড়ে কেবল সমাধিই রয়েছে। হিন্দুদের সমাধি। এগুলো কাদের সমাধি তা আর জানা হলো না।
সমাধি। সোর্স: লেখিকা

কিন্তু আশ্রমের গেট ধরে সামনে গিয়ে ডানপাশে যে দুটো সমাধি চোখে পড়বে, সেখানে মৃতদের নাম ঠিকানা দেওয়া আছে। একটা সমাধিতে লেখা আছে দুইজনের নাম। দেবেন্দ্র নারায়ণ সরকার ও মদনমোহন চট্টোপাধ্যায়। গান্ধী আশ্রমের এই দুইজন পুণ্যাত্মা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালীন ৪ঠা সেপ্টেম্বর কর্তব্যরত অবস্থায় হানাদার সৈন্যদের হাতে একই দিনে বীরের মৃত্যু গ্রহণ করেন। সকলের মঙ্গল করাই ছিল তাদের ব্রত। সাধারণ জনগণের কাছে এরা ছিলেন দেবতা পুরুষ।
অন্য সমাধিটি চারু চৌধুরীর। চারু চৌধুরী ১৯৪৬ সালের ৭ই নভেম্বর এখানে শান্তির খোঁজে এসেছিলেন গান্ধীজীর সাথে। নোয়াখালী ছেড়ে যাওয়ার সময় গান্ধীজী বললেন, ‘চারু তুমি থাকো। আমি তো আবার আসব।’
রয়ে গেলেন তিনি। এই অপেক্ষায় যে গান্ধীজী আসবেন। তাঁর এই অপেক্ষার অবসান হলো মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। ১৯৯০ সালের ১৩ই জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
গান্ধীজির সঙ্গীদের সমাধি। সোর্স: লেখিকা

আশ্রমের ঠিক সামনেই লাঠি হাতে মহাত্মা গান্ধীর একটি প্রতিকৃতি তৈরি করা হচ্ছে। নির্মাণাধীন এই প্রতিকৃতির চারপাশে এখনো বাঁশ দিয়ে ঘেরা। কাজ শেষ হলে এটি চমৎকার একটি ভাস্কর্যে পরিণত হবে।
আশ্রম ঘুরতে ঘুরতে দুপুর হয়ে গেল। সুজানা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লো। তাই আমাদের আর এখানকার বিখ্যাত মসজিদটি দেখতে যাওয়া হলো না। পরে কোনো এক সময় এসে দেখে যাব, এরকম কিছু একটা বলে নিজেকে বুঝ দিয়ে ফিরে চললাম চৌমুহনীর দিকে।
গান্ধীজির ভাস্কর্য। সোর্স: লেখিকা

আসার আগে সুজানা বলছিলো, ‘আসো, তোমায় প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি ঘোরাবো। আমার বাসার কাছেই।’
নোয়াখালীতে জমিদার বাড়ি আছে, সেটাই জানতাম না! খুশিতে ডিগবাজি খেয়ে ফেললাম। পরে অবশ্য জানতে পেরেছি, জমিদারবাড়িটি নোয়াখালীতে পড়েনি। ফেনীর দাগনভূঁইয়ায় পড়েছে। তবে ফেনীবাসি জাকির ভাইয়া বললো, ওটা যতটা না ফেনীর, তারচেয়েও বেশি নোয়াখালীর। নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলা থেকে ফেনীর দাগনভূঁইয়া উপজেলা পাশাপাশি।
জমিদার বাড়ির মঠ। সোর্স: লেখিকা

সেনবাগ সুজানার বাসায় যখন পৌঁছালাম, ততক্ষণে তিনটা বেজে গেছে। সুজানার এক মামা আমাদের জমিদার বাড়ি নিয়ে যাবে বলেছিল। তাকে বলা হয়েছিল আমরা দুপুর দুটোর মধ্যেই সেনবাগ থাকব। যেহেতু রাস্তাতেই বেলা দুটো পেরিয়ে গেছে, বেশ কয়েকবার তাড়া জানিয়ে কল এলো। বিকেলে মামার অন্য কাজ আছে।
সেনবাগ সিএনজি থেকে নেমে সুজানার বাড়ির অভিমুখে হাঁটতে শুরু করেছি, তখনই পাশ দিয়ে একটা সাদা রঙের কার পেরিয়ে যাচ্ছে। সুজানা গাড়িটা দেখেই চিৎকার করে উঠলো, ‘হাবিব মামা! তুমি চলে এসেছ!’
বাজারে অপেক্ষা করতে করতে অতিষ্ঠ হয়ে মামাটা বাড়িতে চলে এসেছে। ভালোই হলো। আমরা একটু হাতমুখ ধুয়ে, ফ্রেশ হয়ে তারপর একসাথে বেরুতে পারব।
প্রতাপপুর জমিদার বাড়ি। সোর্স: লেখিকা

যেহেতু সেনবাগ হয়েই জমিদার বাড়ি যেতে হবে, তাই আমাদের প্ল্যান ছিল, সুজানার বাসায় গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়েই বেরিয়ে পড়ব। সারাদিন তো রৌদ্রদগ্ধ হয়েছি, চোখেমুখে পানির ঝাপটা পড়লে ভালো লাগবে। তাছাড়া জোহরের নামাজও পড়া হয়নি। তাই এখানটায় মিনিট বিশেকের একটা বিরতি পড়বে। কিন্তু তখনো কি জানি, এখানে ঢুকলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আর বেরুতে পারব না!
সুজানার বাসায় ঢুকে ওর মা, বাবা আর বোনদের সাথে পরিচিত হলাম। নামাজ পড়ে বেরিয়ে যাওয়ার তোড়জোড় করছি, সুজানার মা ধমকে বললেন, ‘সারাদিন বাইরে ঘুরে এসেছ, এখন না খেয়ে কোথাও যাওয়া চলবে না!’
আন্টিকে জ্বালাতে চাইনি বলে, আগে থেকে জানাইওনি যে আমরা আসবো। সেবারহাট আসার পর সুজানাকে ওর বোন ফেইরি ফোন করে জিজ্ঞেস করেছিল, বাসায় কখন যাবে। ব্যস, তখনই আন্টি রান্নাবান্নার তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছেন।
পোলাও, গরুর মাংস, মাছ ভাজা, রুই মাছ দিয়ে ঝিঙের ঝোল, ডিম সহ অনেক কিছুর আয়োজন করেছেন আন্টি। বেলা পড়ে যাওয়ায় খিদে মরে গিয়েছিল অনেকটাই। আন্টির হাতের রান্না দারুণ হওয়ায় আমি খানিকটা খেতে পেরেছি। সুজানা তো খেলো না বললেই চলে।
মন্দির। সোর্স: লেখিকা

খেয়ে হাবিব মামার গাড়িতে চেপে বেরিয়ে পড়লাম জমিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে। এবারে আমাদের দলটা বেশ বড় হলো। আমি, আরমান, সুজানা, প্রেয়ার, হাবিব মামা। যেতে যেতেই মামার কাছ থেকে জেনে নিচ্ছিলাম প্রতাপপুর জমিদার বাড়ির গল্পগাথা।
হাবিব মামা জানালেন, ছোটবেলায় এই বাড়ির একটা নির্দিষ্ট অংশকে “আন্ধার মানিক” হিসেবে চিনতেন তারা। আন্ধার মানিকের প্রবেশপথ চুনসুরকি দিয়ে বন্ধ ছিল। একদিন কিছু লোক একটা বিশাল বড় ট্রাক নিয়ে বাড়ির সামনে এলো। তারপর এই বাড়ি থেকে ট্রাক ভর্তি করে কী যেন নিয়ে গেছে। কী ছিল সেই ট্রাকে, কেউ দেখতে পায়নি। লোকের ধারণা ওই ট্রাক ভর্তি ধনরত্ন ছিল। কারণ ট্রাকটি জমিদার বাড়ি ত্যাগ করার পর আন্ধার মানিকের বন্ধ প্রবেশদ্বার ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে।
ধ্বংসপ্রায় কারুকাজ। সোর্স: লেখিকা

জমিদারবাড়ির গল্প শুনতে শুনতেই আমরা পৌঁছে গেলাম। রাস্তা থেকে বাড়িটি দেখা যাচ্ছিল না, তবুও আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে আমরা জমিদার বাড়িতে ঢুকছি। কারণ রাস্তার পাশেই ছিল দুটো মঠ। মঠ দুটো নিশ্চয়ই এই জমিদারদের কারোর শ্মশান। আরোও বুঝতে পারলাম, লোকজনের আনাগোনা দেখে। যদিও দেশের বেশিরভাগ জমিদারবাড়ি গিয়ে শুনশান নিরবতা পেয়েছি। কিন্তু এটি ব্যতিক্রম। তারও অবশ্য কারণ আছে। ঈদের তৃতীয় দিন সবাই তো একটু আশপাশে ঘুরে ফিরে দেখতে চায়। তারই নমুনা পেলাম এখানে এসে।
বাড়ির আঙ্গিনায় ঢুকতেই প্রথমে চোখে পড়বে রঙ করা পুজোর ঘর। পাশেই দুটো ভবন। একটা এক তলা, অন্যটি দোতলা।
দুই বিল্ডিংয়ের মাঝ দিয়ে সরু গলি মতোন জায়গা। বৃষ্টিতে কাদায় সয়লাব। বহু কষ্টে কাদা বাঁচিয়ে ভেতরে গিয়ে দেখি বেশ বড়সড় উঠান। উঠোনের তিন পাশেই দরজা জানালা বিহীন ইমারত। পরগাছা,পরজীবি উদ্ভিদে অনেকটাই ঢাকা ইমারতের বহিরাংশ। দুইটি ভবনের উপরিভাগ ক্ষয়ে গেছে। সবগুলো ভবনের ভেতরেই প্রবেশ করা যায়। ভেতরটা পরিচ্ছন্নই বলা চলে, যদিও মেঝেগুলো স্যাঁতসেঁতে। হবারই তো কথা। বাড়ির সিলিং টিকে আছে লোহার এইচ বীমের উপর।
পলেস্তারা বিহীন প্রায় নগ্ন সিলিংয়ে রেললাইনের পাতের মতো লোহার বীমগুলো দাঁত কেলিয়ে হাসছে। ইট আর চুন দিয়ে স্তম্ভ খিলান দেয়াল সব। দেয়াল, ছাত সব জায়গাতেই পলেস্তরা খসে অবস্থা নাজুক। দুটি ইমারতে সিঁড়ি বেয়ে উপরেও উঠলাম। যেকোনো পুরোনো বাড়ির ছাদ আমার রক্তে খুব অ্যাডভেঞ্চার জাগায়। এখানে লোকজনের আধিক্যে সেটা অনুভব করতে পারলাম না।
তেরোটি বিল্ডিংয়ের বেশ কয়েকটিই ধ্বসে পড়েছে। এমনকি সেগুলোর চারপাশে দেয়াল পর্যন্ত নেই। মেঝেগুলো কেবল নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। বাড়ির পিছনে, পাশে বেশ কয়েকটি পুকুর দেখেছি। তবে কয়টা পুকুর, গোনা হয়নি। সবগুলোই মজা পুকুর। পানি খুব একটা পরিষ্কার নয়। শুনেছি, বাৎসরিক এক লক্ষ ষাট হাজারে বাড়ির পুকুরগুলো লিজ নিয়েছেন জনৈক ব্যক্তি বর্গ। পুকুরগুলোতে মাছের চাষ করেন তারা। তারাই পরিস্কার রাখেন এই সব।
পেছনের দিকটা একদম জংলা জায়গায় পরিণত হয়েছে। ঘুরে ঘুরে দেখতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, সেই জংলার মধ্যে বেমালুম হারিয়ে গেছে একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত দালানের মেঝে।
এ বাড়িটি ঘিরে প্রতি বছর হিন্দু সম্প্রদায় তিন দিনব্যাপী একটি উৎসব পালন করে থাকে। এখনো প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে সনাতন ধর্মালম্বীরা এই উৎসবটি পালন করেন। উৎসবটিতে ফেনী, নোয়াখালী, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটে। তখন বিশ থেকে পঁচিশ হাজার লোক হয়। উৎসবকালীন সময়ে জমিদারের বর্তমান প্রজন্মের বংশধরেরা আসেন। হাবিব মামা হাত তুলে দেখিয়ে দিলেন, কোন জায়গাটিতে পূজোর আয়োজন করা হয়।
পুকুরঘাট। সোর্স: লেখিকা

দীর্ঘদিন সংস্কার না করায় এটি ভুতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়েছে। চারদিক লতাপাতায় জরাজীর্ণ হয়ে রয়েছে। বাড়িটি এখনও ব্যক্তি মালিকানায় রয়েছে বলে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে এখানে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু করা যাচ্ছে না। আচ্ছা, মালিকপক্ষ যেহেতু বাড়িটির দেখভাল করছেন না, তাহলে এটিকে প্রশাসনের আওতায় ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন? প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাধীন হলে বাড়িটি অন্তত আরোও কিছুদিন টিকে থাকবে। কিন্তু কে কাকে বোঝাবে?
জমিদার বাড়ি ঘুরতে ঘুরতেই সুজানার মার কল এলো। আন্টি ফোন করেই আমার সাথে কথা বলতে চাইলেন। সোজাসুজি বললেন, আজকে আমরা মানে আমি আর আরমান কোথাও যেতে পারবো না। সুজানাদের বাসাতেই থাকতে হবে। কী আর করা? কিছুক্ষণ আন্টিকে মানানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে উনার কথাই মেনে নিতে হলো।
অগত্যা জমিদার বাড়ি ঘোরা শেষ করে আবার সেনবাগের পথে পা বাড়ালাম। একদম অপরিচিত একটা মেয়ের প্রতি আন্টির আতিথেয়তা কখনো ভুলবো না। দেশ ঘুরতে গিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা জমা হচ্ছে আমার ছোট্ট ঝুলিতে। সেই সাথে জমাচ্ছি ভালোবাসার ফুল। সবগুলো ফুল দিয়ে একদিন মালা গাঁথবো বলে ঠিক করেছি।

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে চৌমুহনির বাসে করে চৌমুহনী। চাঁদপুর থেকে যেতে হলে লক্কর ঝক্কর মার্কা আনন্দ বাসে করেই চৌমুহনী যেতে হবে। চৌমুহনী থেকে সবজায়গাতে যাওয়ার জন্য বাস, সিএনজি, অটো পাওয়া যাবে।
ফিচার ইমেজ: লেখিকা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক নজরে একটি জেলা: ইসলামের প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম

প্রবাল দ্বীপে ক্যাম্পিং ও স্নোরকেলিং