সোনাইমুড়ীর বাঘপাঁচড়া গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমীনের স্মৃতিচিহ্ন

ঈদের পর ঘোরার ভূত চাপলো মাথায়। ইদানীং ছুটিতে চাঁদপুর ফিরলেই ভাবি চাঁদপুরের আশেপাশের জেলাগুলো ঘুরে নেবো। এতকাল চাঁদপুরের স্থায়ী বাসিন্দা হয়েও কেন যে প্রতিবেশী জেলাগুলো ঘুরে বেড়াইনি, সেটা ভেবেই আফসোস লাগে।
কুমিল্লা, লক্ষ্মীপুর তো ঘোরা হলো। নোয়াখালী আগে একবার এলেও, ঘুরে দেখা হয়নি কিছুই। তাই ঠিক হলো, নোয়াখালীই হবে আমার এবারের ঈদ উৎসব। যদিও নোয়াখালী যাবো শুনেই বন্ধুবান্ধব নাক সিঁটকাতে শুরু করলো এই বলে যে, নিঝুম দ্বীপ ছাড়া আর কীই বা আছে এই জেলায়? আমি মনে মনে হাসলাম। আমার কাজই হলো, অখ্যাত জমিদারবাড়ি, প্রাচীনতা আর স্মৃতিচিহ্ন খুঁজে বেড়ানো। দেখা যাক, এবারে আমি কী উদঘাটন করতে পারি।

জাদুঘরের বারান্দা। সোর্স: লেখিকা

ভোর সকালে চাঁদপুর থেকে রওনা করলেও, চাঁদপুর টু নোয়াখালীর একমাত্র বাস আনন্দের ছ্যাঁচড়ামোরর জন্য পৌঁছাতে পৌঁছাতে সাড়ে এগারোটা বেজে গেল। চৌরাস্তায় বেচারা সুজানা প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। ওকে খুঁজে নিয়ে একদফা উচ্ছ্বাস পর্ব চলল। তারপর নোয়াখালীর চৌরাস্তা থেকে আমরা জননী বাসে চেপে বসলাম সোনাইমুড়ী যাওয়ার উদ্দেশ্যে। সোনাইমুড়ীর বাঘপাচড়া গ্রামে সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন মোহাম্মদ রুহুল আমীনের স্মৃতিচিহ্ন অপেক্ষা করছে।
সোনাইমুড়ী নেমে লোকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাঘপাঁচড়ায় কী করে যাব?’
নোয়াখালীর ভাষায় উত্তর এলো, কলেজ রোড গেলেই ‘বাগহাঁচড়া’ যাওয়ার সিএনজি পেয়ে যাবো। সিএনজি চেপে চলে এলাম নোয়াখালীবাসীর ‘বাগহাঁচড়া’য়। সিএনজিচালককে বলতেই রুহুল আমিনের স্মৃতিজাদুঘরের রাস্তার মুখে নামিয়ে দিলো।
স্মৃতিচিহ্ন। সোর্স: লেখিকা

বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের জন্ম ১৯৩৫ সালের জুন মাসের কোনো এক বর্ষণমুখর রাতে নোয়াখালীর বাঘপাঁচড়া গ্রামে। পিতা মোহাম্মদ আজহার পাটোয়ারি ছিলেন মোটামুটি সচ্ছল গৃহস্থ এবং মাতা জোলেখা খাতুন ছিলেন গৃহিণী।
ছোটবেলায় তার পড়াশোনা শুরু হয় পাড়ার মক্তবে ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে, পরে ভর্তি হন বাঘপাঁচড়া প্রাইমারি স্কুলে। স্কুল পাস করার পর পড়াশোনা চলে আমিষাপাড়া হাইস্কুলে। এসময় তার পিতার আর্থিক স্বচ্ছলতা কমতে থাকে। রুহুল আমিনকে এবার জীবিকা নিয়ে ভাবতে হয়।
হাইস্কুল পাশ করে ১৯৫৩ সালে তিনি নৌ বাহিনীতে জুনিয়ার মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন এবং প্রাথমিক প্রশিক্ষণের জন্য গমন করেন করাচীর অদূরে মানোরা দ্বীপে পি. এন. এস. কারসাজ-এ (নৌ বাহিনীর কারিগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান)। ১৯৫৮ সালে তিনি সফলভাবে পেশাগত প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন এবং ১৯৬৫ সালে নির্বাচিত হন মেকানিশিয়ান কোর্সের জন্য। সফলভাবে কোর্স শেষ করে ইঞ্জিন রুম আর্টিফিশার পদে দায়িত্ব পান। ১৯৬৮ সালে রুহুল আমিন চট্টগ্রামের পি. এন. এস. বখতিয়ার নৌ-ঘাঁটিতে বদলি হন।
সম্মাননা। সোর্স: লেখিকা

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি পরিবারের মায়া ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবার সিদ্ধান্ত নেন এবং এপ্রিল মাসে ত্রিপুরা সীমান্ত অতিক্রম করে যোগদান করেন ২নং সেক্টরে। সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত তিনি বহু সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। সেপ্টেম্বর ১৯৭১ এ বাংলাদেশ নৌ-বাহিনী গঠনের উদ্দেশ্যে সকল সেক্টর থেকে প্রাক্তন নৌ সেনাদের আগরতলায় সংগঠিত করে নৌ বাহিনীর প্রাথমিক কাঠামো গঠন করা হয়। পরে তাদের সাথে কোলকাতায় আসেন রুহুল আমিন।
মুক্তিযুদ্ধের সময়কে ভারত সরকার বাংলাদেশ নৌ বাহিনীকে দুটি টাগবোট উপহার দেয়। এগুলোকে কোলকাতার গার্ডেনরীচ নৌ ওয়ার্কশপে দুটি বাফার গান ও মাইন পড লাগিয়ে গানবোটে রূপান্তরিত করা হয়। গানবোট দুটির নামকরণ করা হয় ‘পদ্মা’ ও ‘পলাশ’। রুহুল আমিন নিয়োগ পান ‘পলাশের’ ইঞ্জিন রুম আর্টিফিশার হিসেবে।
বইভর্তি আলমারি। সোর্স: লেখিকা

৬ই ডিসেম্বর মংলা বন্দরে পাকিস্তানী নৌ ঘাঁটি পি. এন. এস. তিতুমীর দখলের উদ্দেশ্যে ‘পদ্মা’, ‘পলাশ’ ও মিত্র বাহিনীর গানবোট ‘পানভেল’ ভারতের হলদিয়া নৌ ঘাঁটি থেকে রওনা হয়। ৮ই ডিসেম্বর সুন্দরবনের আড়াই বানকিতে বিএসএফের পেট্রোল ক্রাফট ‘চিত্রাঙ্গদা’ তাদের বহরে যোগ দেয়। ৯ই ডিসেম্বর কোনো বাধা ছাড়াই তারা হিরণ পয়েন্টে প্রবেশ করে। পরদিন ১০ই ডিসেম্বর ভোর ৪টায় তারা মংলা বন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। সকাল ৭টায় কোনো বাধা ছাড়াই তারা মংলায় পৌঁছান।
পেট্রোল ক্রাফট চিত্রাঙ্গদা মংলাতেই অবস্থান নেয় এবং পানভেল, পদ্মা ও পলাশ সামনে অগ্রসর হওয়া আরম্ভ করে। দুপুর ১২টায় তারা খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছাকাছি পৌঁছান। এমন সময় তাদের অনেক উপরে তিনটি জঙ্গি বিমান দেখা যায়। পদ্মা-পলাশ থেকে বিমানের উপর গুলিবর্ষণ করার অনুমতি চাইলে বহরের কমান্ডার বিমানগুলো ভারতীয় বলে জানান। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে বিমানগুলো পদ্মা ও পলাশের উপর গুলি ও বোমাবর্ষণ শুরু করে। পলাশের কমান্ডার সবাইকে গানবোট ত্যাগ করার নির্দেশ দেন।
কিন্তু রুহুল আমিন পলাশেই অবস্থান নেন এবং আপ্রাণ চেষ্টা চালান গানবোটকে সচল রাখতে। হঠাৎ একটি গোলা পলাশের ইঞ্জিন রুমে আঘাত করে এবং তা ধ্বংস হয়ে যায়। শেষ মুহূর্তে রুহুল আমিন নদীতে লাফিয়ে পড়েন এবং আহত অবস্থায় কোনোক্রমে পাড়ে উঠতে সক্ষম হন। দুর্ভাগ্যক্রমে পাড়ে অবস্থানরত পাকিস্তানী সেনা ও রাজাকাররা তাকে নির্মমভাবে অত্যাচার করে হত্যা করে। পরে তার লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
তবে পারিবারিক ও অন্যান্য সূত্রমতে- বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের লাশ তিন দিন নদীর পাড়ে পড়ে ছিল। তারপর খুলনা জেলার রূপসা থানার বাঘমারা গ্রামের হৃদয়বান ব্যক্তি জনাব আবদুল গাফ্ফার গ্রামবাসীর সহযোগিতায় পূর্ব রূপসার চরে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনকে কবরস্থ করেন। দীর্ঘ ২৪ বৎসর পর ১৯৯৪ সালে “রূপসা রিপোর্টাস ক্লাবের” পক্ষ থেকে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের কবরকে সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। প্রতি বছর রূপসা রিপোর্টাস ক্লাব এই বীরশ্রেষ্ঠকে সম্মান প্রদর্শনের জন্য তাঁর মৃত্যু বার্ষিকী পালন করে থাকেন।
বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের গ্রামের বাড়িতে নির্মিত স্মৃতি জাদুঘর ও পাঠাগার। সোর্স: লেখিকা

নোয়াখালী শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে সোনাইমুড়ী উপজেলা। সেখান থেকে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে বাগপাঁচড়া গ্রামকে লোকজন আমিননগর নামেই চেনে। ২০ জুলাই ২০০৮ সালে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোঃ রুহুল আমিনের পরিবারের সদস্য কর্তৃক দানকৃত ০.২০ একর ভূমিতে ৬২.৯০ (বাষট্টি লক্ষ নব্বই হাজার টাকা) ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর।
এ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে একটি সুপরিসর এবং সু-সজ্জিত পাঠ-কক্ষ ছাড়াও অভ্যর্থনা কক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক ও লাইব্রেরিয়ানের জন্য আলাদা কক্ষ রয়েছে। আমরা গিয়ে গ্রন্থাগারটি বন্ধ অবস্থায় পেয়েছি। আশেপাশের কাউকে জিজ্ঞেস করে জানা যায়নি, গ্রন্থাগারটি বন্ধ কেন। দরজা বন্ধ হলেও জানালাগুলো খোলা ছিল। স্মৃতি জাদুঘরের আলোকচিত্রগুলো জানালা দিয়েই ধারণ করা হয়েছে।
পাঠাগারে বসে পড়ার জন্য সাজানো চেয়ার টেবিল। সোর্স: লেখিকা

এই জাদুঘরের পাশেই একটি মাজার দেখতে পেলাম। মাজারের উপরে মাটি রাখা হয়েছে কেন, বোঝা গেল না। মাজার প্রথা, লালসালু এদেশের কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। বীরশ্রেষ্ঠ বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমীনের গ্রামও তা থেকে মুক্তি পায়নি। এই পীরের নামটা বেশ মজার। মাজারের দেয়ালেই লেখা ছিল এভাবে, “শাহ সূফি হাফেজ আবুল বারেক শাহ তেলুয়া হাফেজ বাবার মাজার শরীফ।” পাশে ছোট করে ওফাত দিবস ও ওরস-দোয়ার তারিখ লেখা আছে।
মাজার। সোর্স: লেখিকা

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে চৌমুহনির বাসে করে চৌমুহনী। চাঁদপুর থেকে যেতে হলে লক্কর ঝক্কর মার্কা আনন্দ বাসে করেই চৌমুহনী যেতে হবে। ওখান থেকে জননী বাসে সোনাইমুড়ী। ভাড়া ২০ টাকা করে। সোনাইমুড়ীর কলেজ রোড গেলেই বাঘপাঁচড়ায় যাওয়ার সিএনজি পাওয়া যাবে। সিএনজি ভাড়া ২৫ টাকা করে। মাইজদি বা চৌরাস্তা থেকে সরাসরি সিএনজি নিয়ে যাওয়া যাবে সোনাইমুড়ি। সোনাইমুড়ি থেকে রিক্সা করেও যাওয়া যায় বাঘপাঁচড়া গ্রামে।
ফিচার ইমেজ: লেখিকা

Loading...

One Comment

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কুয়েট: রুপসৌন্দর্যে অনন্য এক বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প

নেওরা ভ্যালির গহীন অরণ্যের রোমাঞ্চ