এক নো-ম্যান্স ল্যান্ডের গল্প

অরণ্যরা কয়েক বন্ধু মিলে ভার্সিটির গ্রীষ্মকালীন ছুটিতে বেড়াতে গেল পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া। ঘোরাঘুরিটা ওদের কয়েক বন্ধুকে এক সুতোয় বেঁধেছে অনেক অমিল থাকা সত্ত্বেও। সময়-সুযোগ আর অর্থের সম্মিলন ঘটলেই ওরা বেরিয়ে পড়ে দেশের আনাচে-কানাচে দেশটাকে দেখতে, দু’চোখ ভোরে উপভোগ করতে আর হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে।

তবে ওদের এত এত বেড়ানোর মধ্যে কখনো তেমন কোনো ইট-পাথরের স্থাপনা তেমন একটা স্থান পায় না। পাহাড়-জঙ্গল-সবুজে ছাওয়া প্রকৃতি, সাগর-নদী আর খাল-বিল ওদেরকে সব থেকে বেশী টানে। কখনো কখনো এই বেড়ানোর ও প্রকৃতি উপভোগের নেশা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও নিয়ে গেছে ওদের। বিদেশ বলতে এই ভারত-নেপাল আর ভুটান। এই তিন দেশই ওদেরকে ভ্রমণের পূর্ণতা দিয়েছিল সব রকমভাবে।

দেশের সব না হলেও প্রায় অনেক অনেক কিছুই ওদের দেখা হয়ে গেছে এরই মধ্যে। তাই এই তিন দেশের মধ্যে ভারত ওদেরকে সব থেকে বেশী তাড়িত করে, আকুল করে আর করে ভীষণ ভীষণ অবাধ্য। কারণ অন্য দুই দেশে স্বাভাবিক ও সহজভাবে যেতে হলে বিমানে যেতে হয়। যে কারণে প্রচুর টাকা লাগে শুধু বিমান ভাড়ার জন্যই। যে বিমান ভাড়ার টাকা দিয়েই অন্তত দুইবার ভারতে ভ্রমণ সম্ভব! পাশাপাশি কম খরচে অনেক অনেক বেশী জায়গা দেখা সম্ভব। তাই ওদের ভ্রমণের প্রথম ও প্রধান পছন্দ ভারত।

সবুজের সমুদ্র! পঞ্চগড়। ছবিঃ লেখক 

কিন্তু আজকাল ভারতের ভিসা পাওয়া অনেকটা আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো দুর্লভ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে আর দেশের সকল উল্লেখযোগ্য স্পটেই ওদের যাওয়া হয়েছে বিধায় এবার ওরা একটি ভিন্ন লোকেশন আর স্বাভাবিকভাবে ভ্রমণের জন্য তেমন একটা জনপ্রিয় নয় এমন জায়গা বেছে নিল। পঞ্চগড়ের তেতুলিয়াতে গড়ে ওঠা সমতলের চা বাগান।

সবাই মিলে পঞ্চগড় থেকে একটি মাইক্রো ভাড়া করলো আগামী কয়েকদিনের জন্য সব সময় ওদের সাথে থাকবে আর যখন যেখানে খুশি যেতে পারবে এই ভাবনায়। এশিয়ান হাইওয়ের মসৃণ পথ ধরে ছুটে চলেছে অরণ্যদের গাড়ি। হুহু বাতাসে গরম তখন দূরে পালিয়েছে। রাস্তার দুই পাশের অবারিত প্রান্তর জুড়ে সবুজ গাছে সোনালি ধান, কোথাও তিলের ক্ষেত, কোথাও তরমুজের আবাদ আর সবচেয়ে বিস্তৃত ব্যবসা মাটির তলা থেকে পাথর তুলে তার বিকিকিনি।

সেসব ছাড়িয়ে ওরা পৌঁছে গেল ওদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের প্রায় কাছাকাছি। তেতুলিয়ার প্রবেশদ্বার। আর কয়েক মিনিট গাড়ি ছুটে যেতে না যেতেই চোখে পড়ল রাস্তার পাশ ঘেঁষে সাদা সাদা পিলারে ভারত আর বাংলাদেশের সীমানা নির্ধারণের লেখা। এক অদ্ভুত সুখের শিহরণ ছুঁয়ে গেল অরণ্যকে! কী যেন হয় অরণ্যর ভ্রমণে বেরোলেই, ভুলে যায় নাওয়া-খাওয়া সহ অন্য সকল পার্থিব অনুভূতিগুলো। অদ্ভুত আর অজানা এক আচ্ছন্নতায় ডুবে যায় সে।

চা বাগান। ছবিঃ লেখক 

সেই আচ্ছন্নতায় ডুবে থাকতে না থাকতে ওকে কেড়ে নিল ওর কাছ থেকে আরও পাগল করা সবুজ প্রকৃতি। রাস্তার দুই ধারে শুরু হয়েছে অমোঘ মুগ্ধতার সবুজ চা বাগান, বাতাসের খেয়াল যেন ঢেউ উঠেছে সেই চা বাগান জুড়ে! এক সীমাহীন সবুজের ঢেউ যেন! অবাধ্য আর পাগুলে অরণ্যকে বেঁধে রাখবে সাধ্য কার? এক রকম জোর করেই গাড়ি থামাল সে। নেমে নয় লাফিয়ে পড়লো গাড়ি ঠিকঠাক থামার আগেই। দিগন্ত জোড়া সবুজ চা বাগানের অদ্ভুত আকর্ষণে।

নেমেই দে ছুট, দে ছুট ওই সবুজ সমুদ্রে, সুখের অসুখে! আহা কী দারুণ কচি সবুজ চা পাতায় সূর্যের আলো পড়ে হলুদ রঙ ধারণ করেছে! চা বাগানের ফাঁকে ফাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা আমলকী গাছের ছোট ছোট ডাল ও পাতার ফাঁক গলে ঝরে পড়ছে সোনা রোদ্দুর। সদ্য সেচ দেয়া চা পাতার ডগায় জমে থাকা জলের কণায় রোদের ঝিলিক পড়ে জ্বলজ্বল করছে মুক্ত দানার মতো! সাথে মাতাল করা বাতাস, সে এক অদ্ভুত মায়াময় পরিবেশ। এই মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে অরণ্য যেন উন্মাদ প্রায়। ছবি তুলছে, ছুটছে-দৌড় আর ঝাঁপে মত্ত। আর এইসব উন্মাদনার মাঝে সে পেরিয়ে যেতে থাকল বাংলাদেশ আর ভারতের “নো ম্যান্স ল্যান্ড” এর নিরাপদ এরিয়াটুকুও।

রাস্তার ওপর থেকে অরণ্যর বন্ধুরা আর রিক্সায় ছুটে চলা পথযাত্রীরা অরণ্যকে নিষেধ করতে লাগলো আর সামনে না এগোতে, কারণ ওপারে বিএসএফ যে কোনো সময়ে গুলি করে দিতে পারে, কাটা তাঁরের ওপরে দাড়িয়ে থাকা নিরাপত্তা চৌকি থেকে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। অরণ্যকে নেশায় পেয়েছে আজ সবুজের অবগাহনের আর সেলফি তোলার। সবুজ সমুদ্রে সাঁতারের সাথে সাথে চলছে অরণ্যর সেলফি তোলা অবিরাম।

চা বাগানের মুগ্ধতায়। 

কাটা তাঁরের বেড়ার কাছাকাছি গিয়ে থমকে গেল অরণ্য, যেতে বাধ্য হলো আসলে। কাটা তাঁরের ওপারে রঙ বেরঙের তাবু ফেলা হয়েছে চা বাগানের ভেতরের কিছুটা ফাঁকা জায়গায়। অনেক ছাত্র-ছাত্রীদের সমাগম সেথায় বর্ণিল এক আয়োজন। ওপারের কোনো এক কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা সফরে এসেছে ওরা, আমলকী গাছে ঝোলানো ব্যানার দেখে বুঝলো অরণ্য। ব্যস আরও কিছু ছবি তুলল অরণ্য চা বাগানের স্বর্ণালি সবুজের, আমলকী গাছের, কচি সবুজ পাতায় জমে থাকা শিশির কণার, আর নিজের সাথে সবুজের মানে সেলফি!

শেষমেশ চলে যেতেই হলো বন্ধুদের হাঁকডাক, অস্থিরতা আর অনিরাপদ পথের বিপদে পড়া থেকে রেহাই পেতে। চলে গেল সবাই গাড়িতে করে। বাকি দিন ঘুরে ঘুরে বাংলোতে এলো ওরা শেষ সন্ধ্যায়। সারাদিন ঘোরাঘুরি আর ছবি তোলার শেষে যেটা সাধারণত হয়ে থাকে সবাই ছবি দেখার জন্য বেশ অস্থির থাকে, কিন্তু মোবাইল বা ক্যামেরাতে স্বভাবতই চার্জ থাকে না। যে কারণে সবাই সব কিছুতে চার্জ দেবার জন্য প্রতিযোগিতায় নেমে গেল। এবং কোনোমতে সব কিছু চার্জে দিয়ে ফ্রেশ ও খাওয়া-দাওয়া শেষ করে স্বচ্ছ টাইলসের ঝকঝকে ও খোলা বারান্দায় গা এলিয়ে দিল। ক্লান্তি সবাইকে এতটাই ঘিরে ধরেছিল যে বাধ্য হয়ে যে যার বিছানায় চলে গেল। আর অরণ্য বসেছিল নির্মল প্রকৃতির সবটুকু সাধ উপভোগের লোভে।

কাটাতার। ছবিঃ লেখক 

প্রায় ঘণ্টাকাল কেটে যাবার পরে অরণ্য মোবাইল অন করলো। ছবিগুলো দেখছে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। শুরু থেকে দেখতে দেখতে চা বাগানের ছবির কাছে আসতেই অরণ্যর চোখ আটকে গেল ছবিগুলোর দিকে! অরণ্যর সেলফির সাথে পেছনে তার কাঁটার সাথে দাঁড়িয়ে ছিল কোনো মানবী! নীল স্কাট, সর্ষে হলুদ জামা, লাল ওড়না আর কমলা ক্যাপ পরে! সে তো এটা খেয়ালই করেনি সেলফি তোলার সময়! আবছা ছবিতেও বোঝা যাচ্ছে দেখতে মন্দ হবে না আদৌ! আর “নো ম্যান্স ল্যান্ড” এবং তার পরের কাটা তাঁরের ওপাশে আছে বেশ কিছু রঙ-বেরঙের তাবু খাটানো। তার মানে ক্যাম্পিংয়ে এসেছে ওপারের কোনো জায়গা থেকে। তবে তো দেখতে হয় আর একবার গিয়ে, কাল সকালে।

(চলবে)

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জিয়া স্মৃতি জাদুঘর

নো ম্যান্স ল্যান্ডের সবুজের সমুদ্রে বর্ণিল আকর্ষণ!