নো ম্যান্স ল্যান্ডের চাঁদের আলোয় অধরা, মিহি বাতাসে মাধবী

অরণ্য একটি লজে রুম খুঁজে নিয়ে, একটু ফ্রেশ হয়েই আবার বেরিয়ে পড়লো কিছু খাবারের খোঁজে। ফিরে এলো কিছু সময় পরে। রুমে এসেই বুঁদ হয়ে গেল ফেসবুকের মেসেঞ্জারে। একদিকে অধরা আর অন্যদিকে অরণ্যর বন্ধুরা কথা বলছে। তিন তলার হোটেল রুমের পর্দা সরিয়ে জানালা খুলে দিল। জানালার পর্দা সরাতেই এক মুঠো জ্যোৎস্না এসে পড়লো ভরা চাঁদের বুক থেকে অরণ্যর ধবধবে সাদা বিছানায়। যা দেখে নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল অরণ্য! আর মনে মনে ভাবলো এ যেন জ্যোৎস্না নয় অধরার হাসি, অধরার উপস্থিতি, এ যেন অধরারই আলো, চাঁদের আলো হয়ে এসে পড়েছে অরণ্যর বিছানায়! ভেসে উঠলো অধরার নির্মল আর নিষ্পাপ হাসি মুখখানি!

চাঁদের আলোয় অধরার সাথে এলোমেলো কথা বলছিল অরণ্য, হুট করে জানালা দিয়ে ঢুকে পড়লো এক মুঠো ঝিরঝিরে ঠাণ্ডা মাতাল বাতাস,অরণ্যর গায়ে এসে ছুঁয়ে দিল, দিল এক চেনা আবেশে জড়িয়ে, যেন মাধবীর মায়াবী স্পর্শ! সারাদিন মাধবীর সাথে-সাথে থেকে, পাশে বসে, ছাদে বসে, ছুঁয়ে-ছুঁয়ে দিয়েছে অরণ্যকে! ভাগাভাগি করেছে সাতরঙা সকাল-দুপুর-বিকেল আর সন্ধ্যা! যদিও এসব ভাবনা একেবারেই অবান্তর, কিন্তু এসেই যাচ্ছে নিজের অজান্তেই, অদ্ভুতভাবে। যদিও এর যৌক্তিক কারণ কিছু অবশ্যই আছে। আর তা হলো- 

জ্যোৎস্না রাতে। ছবিঃ সংগ্রহ 

সারাদিন ছিল মাধবীর সাথে, সেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। কিন্তু একটি বারের জন্যও তাকিয়ে দেখেনি মাধবীর মুখের দিকে! কারণ অরণ্য সারাদিন আচ্ছন্ন ছিল ওর অন্যরকম প্রেম নীল-সবুজ পাহাড়ে, রঙিন মেঘে, ঘন জঙ্গলে, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি ঝর্ণায় ভিজে যাওয়া উঁচুনিচু রাস্তায়, চা বাগানের সবুজ সমুদ্রে আর উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া বাতাসে! আর এই সবকিছুর মাঝেই সব জায়গায় উপস্থিত ছিল অধরার হাসি, অধরার মুখ আর অধরার আলতো স্পর্শ। কিন্তু এই নির্জন রাতের ছুটে হুট করে রুমে ঢুকে পড়া শীতল বাতাসের ছুঁয়ে যাওয়াতে মনে পড়লো মাধবীর কথা।

এই প্রথম ভেসে উঠলো মাধবীর মুখ, মাধবীর উড়ে যাওয়া, অরণ্যকে বারে-বারে ছুঁয়ে যাওয়া নরম কোমল চুল! মাধবীর ভীষণ-ভীষণ মিষ্টি আর আদুরে কণ্ঠ! দ্রুত কিন্তু আলতো পথ চলা, কোনো আদেশ নয়, কিন্তু কেমন যেন মায়া জড়ানো কথা বলা! যা ফেলে দেয়া যায় না, এড়িয়ে যাওয়ার কারণ থাকে না,শুনতে হয়, মানতে হয়, মেনে নিতেই হয়! একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে মাধবীর ওর প্রতি শ্রদ্ধা জাগার, মুগ্ধ হবার আর খুব কাছের বন্ধু হবার! যে কারণে না চাইতেও ওর কথা একদম নিষ্পাপভাবেই মনে পড়ছে। যদিও এতে করে কিছুটা অস্বস্তি যে অরণ্যর হচ্ছে না তা একদমই নয়। কিন্তু ওর সবকিছু এমনই যে মনে পড়তে বাধ্য করায়। সত্যিই মাধবী অনেক মায়াবী একটি মেয়ে।

জানালায় বৃষ্টি। ছবিঃ সংগ্রহ 

কতটা প্রাণবন্ত, কিন্তু কোনো বাড়াবাড়ি নেই, অসাধারণ সাধ্য সব কিছুর সাথে মানিয়ে নেবার, কিন্তু কোনো অভিযোগ নেই। কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই কী পরিমাণ কষ্ট করতে পারে, কিন্তু কোনো ক্লান্তি নেই। কত সহজেই মানুষকে আপন করতে পারে, কিন্তু কোনো স্বার্থ নেই। কতটা বন্ধুপরায়ণ হলে, সারাটা দিন বন্ধুর-বন্ধুর জন্য ব্যয় করতে পারে, কিন্তু কোনো চাওয়া নেই। কী সহজেই নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে, কিন্তু কোনো অভিমান নেই! অদ্ভুত একটা মেয়ে মাধবী!

মিষ্টি, শান্ত, ভদ্র আর ওর নামের সাথে যেন একবারেই মানিয়ে যাওয়া নাম মাধবী! মনে-মনে অনেক-অনেক কৃতজ্ঞ হলো মাধবীর প্রতি। একটা দারুণ ভালো লাগার অনুভূতি হলো অরণ্যর, মাধবীর নিবেদন আর আন্তরিক বন্ধুত্বের প্রতি। অসম্ভব ভালো একটা মেয়ে মাধবী! অরণ্য অধরার জন্য একটা গিফট ভেবে রেখেছিল, ফিরে আসার সময় কিনে দেবে বলে। তেমন বাজেট রেখেছে নিজের কাছে, কিন্তু এখন তো একটা গিফট কিনলে আর হবে না, এবার তো গিফট কিনতে হবে দুটি! একটি তো অধরার জন্য বরাদ্দ করাই আছে, আর একটি অবশ্যই মাধবীর জন্য! এবং একই গিফট হবে অধরা আর মাধবীর!

জানালায় ভোরের আলো। ছবিঃ সংগ্রহ 

নিশ্চয়ই অধরা কিছু মনে করবে না এতে? মনে মনে ভাবলো অরণ্য… নাহ, কিছুই মনে করবে বলে মনে হয় না, ওরা এমন নয়, হতেই পারে না এতটা ছোট আর সংকুচিত মানসিকতার হবে না বলেই অরণ্যর বিশ্বাস। তবুও দ্বিধা কাটাতে আবার মেসেঞ্জারে নক করলো অধরাকে। পেয়েও গেল একটু পরেই। কোনো রকম দ্বিধা না নিয়েই সরাসরি জিজ্ঞাসা করলো অধরাকে, যে মাধবীকে যদি একটি গিফট দিতে চায় অরণ্য, ওর সারাদিনের নিখাদ বন্ধুত্বের জন্য, ওর অমায়িক উপকারের জন্য, ওর একান্ত আন্তরিকতার জন্য, কিছু মনে করবে কিনা অধরা?

প্রশ্নই আসে না। কীসের আপত্তি, কেন আপত্তি, কী যৌক্তিকতা থাকতে পারে কোনোরকম আপত্তির বা কিছু মনে করার? অরণ্য অবশ্যই দিতে পারে মাধবীকে একটা গিফট। যা খুশি তাই! এমনকি, যদি দিতে চাও খুব খুব প্রিয় কিছুও! ও এমনই মায়াবী আর মোহময়ী একটি মেয়ে যে ওকে তুমি যা খুশি দিতে পারো, আমার কখনো কোনো আপত্তি থাকবে না। যাক বেশ প্রসন্ন হলো অরণ্যর মন। তাই ঠিক করে রাখলো কাল সকালে দুজনকে সাথে নিয়েই কিনবে দুটি গিফট, একই রকম, আর দুজনের জন্যই।

শিলিগুড়ির হোটেল বা লজ। ছবিঃ লেখক 

ভালো লাগলো অরণ্যর খুব, অধরার উদারতা, মাধবীর জন্য মায়া-আন্তরিকতা আর অরণ্যর সাথে একাত্মতা দেখে। এরপর, অধরার চাঁদের আলো জড়িয়ে আর মাধবীর মায়া মেখে ঘুমিয়ে গেল অরণ্য। আগামীকাল এই যাত্রার শেষ দিনে, অধরা আর মাধবীর সাথে আরও একটা সকাল-দুপুর কাটানোর অপেক্ষায়!

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

গোমুখ অভিযান: মুশৌরির পথে, পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে

বিদায় ক্ষণে ডুয়ার্স হয়ে শিলিগুড়ির পথে পান্তরে