নো ম্যান্স ল্যান্ডের সবুজের সমুদ্রে বর্ণিল আকর্ষণ!

পরদিন ভোর হতে না হতেই অরণ্য ফিরে এলো সেই চা বাগানের কাছে। দেখছিল সবুজ চা পাতার উপরে জমে থাকা মুক্ত দানার মতো শিশিরের কণা, তখনো সূর্য তার আলো ছড়ানো শুরু করেনি। চারদিক তখনো অনেকটা অন্ধকার। চুপচাপ শিশিরের ঝরে পড়ার টুপটাপ শব্দ শুনছিল সে, পাখিদের হেয়ালি গুঞ্জন, পাশের বাঙালি পাড়া থেকে ভেসে আসছিল শুকনো পাতা পোড়ার তাজা ঘ্রাণ! কোনো কৃষক বা মজুরের সাইকেল চালিয়ে যেতে যেতে আপন মনে বেজে ওঠা বেলের টুংটাং শব্দ। চা গাছের পাতায় জমে থাকা জলের কণায় ভিজে যাচ্ছিল অরণ্য। হঠাৎ অরণ্য থেমে গেল, এই নির্জনতার মাঝে পেয়ে নূপুরের শব্দ!

শব্দ শুনে চোখ ফেরাতেই দেখে ওপাশে কাটা তাঁরের গায়ে গায়ে হেটে বেড়াচ্ছে এক রূপসী। নীল জামা, লাল ওড়না, মাথায় হলুদ ক্যাপ আর পায়ে নূপুরের ছন্দ তোলা কোনো মানবী। সব কিছু যেন থেমে গেল অরণ্যের এক নিমেষেই। স্থবির হয়ে গেল অরণ্য দেখে সেই রঙিন আর বর্ণিল রূপসীকে। এখন শুধু চেয়ে থাকা আর নূপুরের শব্দ শোনা। এখনো তেমন রোদ ওঠেনি, আঁধার কমেছে কিছুটা মাত্র। শুধু তার কাঁটার ওপাশে এক মানবীর বর্ণিল বিচরণ স্পষ্ট! স্পষ্ট তার নূপুরের শব্দ, তার ঘুম ভাঙা সকালের অগোছালো এলো চুল আর আকর্ষণীয় অবয়ব!

চা বাগানের পথে…। ছবিঃ লেখক 

অরণ্য এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওপারে, দাঁড়িয়ে “নো ম্যান্স ল্যান্ডে” ধীরে ধীরে আলো ফুটছে পূবের রক্তিম আকাশকে রঙিন করে। চা বাগানের অন্ধকার মুছে গিয়ে আলোকিত হলো মুহূর্তেই। অরণ্য আরও অবাক হলো দেখে সেই মানবীকে! আসলেই দারুণ আকর্ষণীয় আর অদ্ভুত সুন্দর লাগছে মেয়েটিকে দেখতে এই দূর থেকেই! তবে মেয়েটি বেশ কাছাকাছি আছে ওপারের কাঁটাতারের। একা একা হাঁটছে আর হয়তো গুনগুন করে গাইছে কোনো রবীন্দ্র বা নজরুল, ভাবছে অরণ্য তেমন। হারিয়েছিল কোনো এক স্বপ্নিল মায়াজালে।

আচমকা অরণ্যর খেয়াল ভাঙলো কোনো স্বপ্নময়ীর রিনিঝিনি ডাকে। কে ডাকে অরণ্যকে? নাহ কেউ না, ওটা খেয়াল ওর। কে ডাকবে এখানে? আবার ডাক, না কারো নাম ধরে নয় “হ্যালো, এই যে শুনছেন!” এভাবে! অরণ্য পাশ ফিরে তাকাতেই বিস্ময়ে বিমুঢ় হয়ে গেল! ওপারের সেই মানবী তারকাঁটার একদম কাছে এসে ডাকছে ওকে। মানবীর পাশেই হেঁটে যাচ্ছে সতর্ক পাহারার বিএসএফ জওয়ান। তাই অরণ্য কথা বলতেও ভয় পাচ্ছে, পাছে গুলি করে দেয়!

সে সাড়া দেবে কি দেবে না ভেবে পাচ্ছে না। অবশেষে ওপারের মানবী-ই বলল, কাছে আসুন আপনার সাথে একটু কথা বলি, আপনাকে কেউ কিছু বলবে না, এখানকার গার্ডরা আমার পরিচিত। আসুন এগিয়ে আসুন।

চা বাগানের শুরু। ছবিঃ লেখক 

সত্যি বলছেন? অরণ্যের জিজ্ঞাসা।

হ্যাঁ কোনো সমস্যা নেই, আপনি তো বাংলাদেশি, তাই না?

হ্যাঁ বাংলাদেশি, আপনি কি জলপাইগুড়ির? কথা বলতে বলতে এগিয়ে গেল অরণ্য।

হ্যাঁ, কলেজের বন্ধুদের সাথে শিক্ষা সফরে এসেছি, আপনি?

আমিও বন্ধুদের সাথে বেড়াতে এসেছি।

আপনার বন্ধুরা কোথায়?

ওরা বাংলোতে।

ওহ আচ্ছা, আপনি একাই এসেছেন এখানে? এই আঁধারে! কেন, চা বাগান খুব ভালোবাসেন বুঝি? জানেন এখানে আসার আগে মানে এই সীমান্তে মনে মনে ভেবেছিলাম কোনো বাংলাদেশির সাথে যেন দেখা হয়, কথা হয় আর সম্ভব হলে যেন একটুখানি বন্ধুত্ব হয়! ইশ এভাবে, এই ভোর বেলাতে যে কারো সাথে দেখা বা কথা হবে ভাবতেই পারিনি। আপনাকে একটা থ্যাংকস!

আচ্ছা এই সাত সকালে আপনি এখানে কেন এলেন? কীসের টানে, পরেও তো আসতে পারতেন বন্ধুদের সাথে? উহু আমি একা একাই বক বক করে যাচ্ছি, আপনাকে তো বলার কোনো সুযোগই দিচ্ছি না! বলুন, এবার আপনি বলুন।

আলো আধারির চা বাগান। ছবিঃ সংগ্রহ 

অরণ্য স্তম্ভিত, কী করবে আর কী বলবে সেটা বুঝতেই পারছে না। অরণ্য চেয়েছিল একটি মেঘ, মেঘের ফাঁক গলে একটু আলো, আর সেই আলো কালো মেঘে ঢেকে গিয়ে সামান্য বৃষ্টি! কিন্তু এ কী হলো? এ যে প্রথমে ঝকঝকে রোদ আর তারপর মুহূর্তেই মুষলধারে বৃষ্টি! এতটা তো অরণ্য ওর সুদূরতম কল্পনাতেও ভাবেনি। কী বলবে অরণ্য, সত্য বলবে নাকি মিথ্যে? কেন এসেছে এখানে অরণ্য।

অরণ্য এবার বলতে লাগলো, ওরা বেড়াতে এসেছে শুধুমাত্র। পুরো দেশ মোটামুটি দেখেছে তাই এবার এই অন্যরকম জায়গাটাতে এসেছে সমতলের চা বাগান দেখবে বলে। আর কাল এখানে নেমেছিল, ছবি তুলেছিল। রাতে সেই ছবি দেখতে গিয়ে চোখে পড়লো রঙিন কিছু তাবু ও ক্যাম্প সাইট! তাই ওর খেয়াল চাপলো এখানে এসে যদি কারো সাথে দেখা হয়, একটু কথা হয় আর সেই সুযোগে যদি একটু ভারতে যাওয়া যায় সেই রোমাঞ্চে ও এখানে এসেছে।

বাহ বেশ তো, তবে আপনার এপারে আসার আশা পূরণ হবে বলে মনে হয় না। তবে আমরা যে কদিন এখানে আছি, আপনি “নো ম্যান্স ল্যান্ড” পেরিয়ে এই তারকাঁটা পর্যন্ত আসতে পারবেন সেই ব্যবস্থা আমি করতে পারি, অবশ্য যদি আপনি চান?

হ্যাঁ হ্যাঁ অবশ্যই, আমি চাই, আসতে চাই, এই স্বর্গময় চা বাগানকে ভীষণ ভীষণভাবে উপভোগ করতে চাই। আর সাথে বা কাছাকাছি যদি আপনার মতো কেউ থাকে তো কথাই নেই আর। আমাদের অনেকদিনের ছুটি, যে কদিন ভালো লাগবে এখানে সেই কদিন থাকবো, এমন প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি এখানে। আপনারা কদিন থাকবেন?

কুয়াসা জড়ানো চা বাগানে। ছবিঃ সংগ্রহ 

আমরা প্রায় ৫ দিন থাকবো, তার একদিন চলে গেছে গতকাল। আর চারদিন। হ্যাঁ আমরাও আছি তো বেশ কদিন।

ও হ্যাঁ আমি অধরা, অনার্স শেষ বর্ষে আছি, আপনি?

আমি অরণ্য! মাস্টার্স করছি।

বাহ দারুণ মিল তো আপনার আর আমার নামে, অরণ্য আর অধরা! নিন আমরা বন্ধু, অধরা তার কাঁটার ফাঁক দিয়ে সন্তর্পণে বাড়িয়ে দিল তার ডান হাত! অরণ্য ছুঁয়ে দিল ওকে! হাত ছোঁয়াল ওর হাতে! এক অজানা আর অদ্ভুত শিহরণে শিহরিত হলো ওরা দুজন, এক অচেনা সুখ ছুঁয়ে দিল ওদের দুজনকে! এত অল্প পরিচয়েও কি কোনো মায়া জন্মাতে পারে কারো প্রতি? কি জানি, কে জানে?

কিন্তু ওদের মায়া জন্মেছিল এক অদ্ভুত টান আর আকর্ষণের প্রতি। এক সোনা ছড়ানো রোদেলা সকালে সবুজে সবুজে ছেয়ে যাওয়া প্রান্তর আর অপার ভালোবাসার চা বাগান জুড়ে! ওদিকে অধরার ডাক পড়লো! চলে যেতে হলো ওকে তড়িঘড়ি করে। অধরা আবার আসতে বলল অরণ্যকে শেষ বিকেলের আলো-আধারিতে ওরা কথা বলবে, এও বলল ওর খুব ভালো লেগেছে অরণ্যর সাথে কথা বলে, দেখা হয়ে আর সব থেকে ভালো লেগেছে অরণ্য অধরার বন্ধু হওয়াতে!

চা বাগানের প্রথম আলো। ছবিঃ সংগ্রহ 

চলে গেল অধরা চা বাগানের সরু রাস্তা ধরে ওদের ক্যাম্প সাইটের দিকে। আর অরণ্য এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল অপলক ওপারের চা বাগান আর অধরার চলে যাওয়ার দিকে। সবুজ চা গাছের মাথায় ছুঁয়ে যাওয়া অধরার লাল ওড়নার দিকে। যেন কোনো এক ভীষণ সুখের স্বপ্ন দেখছিল অরণ্য এতক্ষণ ধরে! বোধ অরণ্যর লুপ্ত আর চেতনা তখন শূন্য, যেন ভেসে চলেছে অরণ্য কোনো এক অজানা সুখের ঢেউ খেলানো নদীতে!

আবার শেষ বিকেলে এখানে ফিরে আসার আকুল আহ্বানের টানে চলে গেল তখনকার মতো, তবে বারে বারে চাইছিল পিছু ফিরে। ক্ষনিকের সুখ স্বপ্নের পানে, অচেনা সুখ আর অপার আনন্দের পানে, অরণ্য চলে গেল পিচ ঢালা মসৃণ রাস্তা ধরে, শেষ বিকেলের আমন্ত্রনে!     

একটা মোহের মধ্যে বাংলোতে গিয়ে পৌঁছালো অরণ্য। যতটা উচ্ছ্বাস নিয়ে রুমে ঢুকলো ঠিক ততটাই মর্মাহত হলো কয়েক মুহূর্তেই! কারণ, অন্যান্য বন্ধুরা মিলে ঠিক করেছে এখানে আর দেখার তেমন কিছু নেই, তাই আজ রাতের বাসেই ফিরে যাবে! না হলে অন্তত আগামীকাল সকালে তো ফিরে যাবেই যাবে! কিন্তু অরণ্য? অরণ্যও কি যাবে ফিরে ওর বন্ধুদের সাথে? এদিকে অরন্য যে বাঁধা পড়েছে এক অন্য মায়ায়।

(চলবে)

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক নো-ম্যান্স ল্যান্ডের গল্প

অধরা-অরণ্যের ভালোবাসায় পাসপোর্ট ভিসা