নো ম্যান্স ল্যান্ডে অরণ্য-অধরা

dav

সকালে অরণ্যর ঘুম ভাঙলো প্রবল ঝড়-বৃষ্টি আর বজ্রপাতের বিকট শব্দে। ঘুম থেকে জেগে বাইরের এই রূপ দেখে দুঃখ পাবার পরিবর্তে বেশ খুশিই হলো অরণ্য! কারণ গত পরশু সারা রাতের বাস জার্নি, তারপর গতকাল সারাদিন পাহাড়ে পাহাড়ে হেঁটে বেড়ানো আর শেষ বিকেলে মিরিকের আঁকাবাঁকা, ঝুঁকিপূর্ণ পথের অনবরত ঝাঁকুনি খেয়ে রুমে এসে একটু ফ্রেশ হয়ে খেয়ে, অধরার সাথে মেসেঞ্জারে কথা বলতে বলতে ক্লান্তিতে কখন বিছানায় ঢলে পড়েছে নিজেই জানে না।

আর সেই ক্লান্তি এই কয়েক ঘণ্টার ঘুমে কিছুতেই কাটছে না, যে কারণে ঝড়-বৃষ্টির অজুহাতে আর একটা মিহি ঘুম না দিলেই নয়। অধরাকে একটি মেসেজ দিয়ে আবার ঘুমের দেশে হারিয়ে গেল অরণ্য।

ঘুম ভাঙলো, রুমের দরজায় বেয়ারার বারবার ডাকে আর ধাক্কার শব্দে। ঘুম জড়ানো চোখে, কোনো রকমে রুমের দরজা খুলতেই চমকে গেল অরণ্য!

ভোরের আলোয়। ছবিঃ সংগ্রহ 

আরে! এ যে অধরা দাঁড়িয়ে দরজার সামনে! পরনে নীল-হলুদ জামদানী, উঁচু করে বাঁধা খোঁপায় মন মাতাল করা তাজা বেলি ফুলের মালা! পুরো রুমটা যেন ভরে গেছে পাগল করা কোনো ঘ্রাণে! কপালের মাঝে ছোট্ট একটা লাল টিপ, চিকন করে কাজল দিয়ে আঁকা চোখ, নাকে একটি জ্বলজ্বলে নাকফুল, কানে রঙিন ঝুমকা, ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক, এক হাতে পরেছে রঙ-বেরঙের রেশমি চুড়ি, আরেক হাতে ঘড়ি, হাতের সাথে ঝোলানো একটি লাল টকটকে ব্যাগ।

স্বপ্ন দেখছে না তো অরণ্য? ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে অধরার দিকে।

এই কী হলো, ঘুমের ঘোর কাটেনি তোমার এখনো? অরণ্যকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো অধরা।

বুঝছি না, আমি জেগে আছি নাকি ঘুমিয়ে? ঠিক দেখছি কিনা, তুমি কি সত্যিই এসেছ নাকি স্বপ্নে দেখছি আমি? তাও তোমাকে এমন রূপে! ঠিক আমার স্বপ্নে তোমাকে যেভাবে দেখবো বলে সাজিয়েছিলাম, ঠিক ঠিক তেমনি করেই যে দেখছি! তাই বুঝতে পারছি না, স্বপ্ন না সত্যি? 

সুখের জানালায়। ছবিঃ সংগ্রহ 

হ্যাঁ, হ্যাঁ আমি, আমিই, অধরা, তোমার মতো করে, ঠিক ঠিক তুমি যেমনটি করে বলেছ, বহু বহুবার! গতকাল এক আচমকা ঝামেলায় তোমাকে সময় দিতে পারিনি। জানো তবুও আমার একটুও মন খারাপ হয়নি, কারণ আমিও চেয়েছিলাম, তোমার সাথে যেদিন প্রথম দেখা হবে, সেদিন তোমার মতো করেই সাজবো আর সাজাবো নিজেকে!

কাল সেই সুযোগ ছিল না, তাই আজকে তোমাকে চমকে দেব বলে, তোমাকে না জানিয়েই চলে এলাম তোমার হোটেলে! আর ভাগ্যিস তোমার হোটেলটাও আমার বাসার কাছাকাছি নিয়েছিলে বলে রক্ষে। তাই তোমার জন্য আমার এত সাধের সাজ এতটুকুও নষ্ট হয়নি!

খোঁপার সাজ। ছবিঃ সংগ্রহ 

এখন ওঠো, মুখ ধুয়ে এসো, ক্ষুধা পায়নি?

ও হ্যাঁ, ক্ষুধা পেয়েছে যে ভুলেই গেছি তোমাকে দেখে, তোমাকে পেয়ে আর তোমাকে এমন মনের মতো সাজে দেখতে পেয়ে।

ওয়াশরুম থেকে বের হতেই অরণ্য আরও অবাক হয়ে গেছে, দেখে বিছানায় বিছানো হয়েছে পেপার আর সেখানে রুমের টেবিলে রাখা প্লেটে বিরিয়ানি, লেবু, শসা, পিঁয়াজ, কাঁচা মরিচ সাজিয়ে বসে আছে অধরা!

কী অদ্ভুত, কোথায় পেলে এসব? কী পাগলামি করেছ?

কোনো পাগলামি নয়, তোমার জন্য নিজের হাতে তৈরি করেছি, সেই ভোরে ঘুম থেকে উঠে!

সুখের সকাল। ছবিঃ সংগ্রহ 

কার কথা বলে আনলে এসব?

মাধবীর কথা বলে এনেছি, ওর জন্য আমি প্রায়ই নিয়ে আসি, মাও দেয়। ও হোস্টেলে কি না কি খায়, তাই আমাদের বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলেই মা মাধবীর জন্য তুলে রাখে, সব সময়।

আচ্ছা? তো মাধবীর জন্য এনে আমাকে খাওয়াচ্ছো, তো তোমার মাধবী, সে কোথায়?

ওহ, মাধবী? ওর হঠাৎ বাড়িতে কী যেন কাজ পড়েছে, তাই সকালেই চলে যাবে বলেছে। তোমাকে অনেক অনেক শুভ কামনা জানিয়েছে। ও জানে যে ওর কথা বলে তোমার জন্য খাবার এনেছি। নাও, এবার আর কথা না বাড়িয়ে খেয়ে নাও ঝটপট। বাইরে যাবো, তোমার সাথে রিক্সায় করে ঘুরবো, তোমার প্রিয় সবুজ সমুদ্রের ঢেউয়ে, মহানন্দার পাড়ের চা বাগানে। চল চল তাড়াতাড়ি চল। আর দেরি করো না।

এই বেলাটাই তো আছো শুধু মাত্র, তারপর তো তোমাকে কেড়ে নেবে আবার, আবার সেই তারকাটা ঘেরা “নো ম্যান্স ল্যান্ড”। তুমি আবার চলে যাবে, অনেক অনেক দূরে, হৃদয়ের এত-এত পাশে থেকেও দূরে, কত দূরে! চাইলেই তোমাকে ছোঁয়া যাবে না, তোমাকে সত্যি করে স্পর্শ করা যাবে না, তোমার হাতে হাত রাখা যাবে না, তোমার সাথে ইচ্ছে হলেই রিক্সায় করে সবুজ সমুদ্রে ভাসা যাবে না! বাধা শুধু এই দুই ভূখণ্ডের তারকাটা ঘেরা “নো ম্যান্স ল্যান্ড!”

সবুজের সমুদ্র। ছবিঃ সংগ্রহ 

দুজন বেরিয়ে পড়লো হোটেল রুমে তালা লাগিয়ে, ব্যাগ-পত্র বাইরে বের করে, হোটেল ক্লিয়ার করে দিয়ে, ব্যাগ অরণ্য হোটেলেই রেখে দিল, বেড়িয়ে, অধরাকে রাখতে এসে নিয়ে যাবে। হোটেল থেকে বেরিয়ে একটা রিক্সায় করে উঠে পড়লো ওরা। কী যে একটা অদ্ভুত আবেশে জড়িয়ে গেছে অরণ্যর মন-প্রাণ বোঝানো মুশকিল, আর আজকের আবহাওয়াটাও কী যে দারুণ!

রোদ নেই এতটুকু, নেই কোনো ধুলো-বালি বা নোংরা কোথাও, সারা রাতের অঝোর ধারায় ঝরা বৃষ্টিতে ধুয়ে-মুছে গেছে সবকিছু। চারপাশ সেজেছে দারুণ সাজে। মেঘলা আকাশ, ঝিরঝিরে বাতাস, রিক্সার টুং টাং শব্দ, মিহি পীচ ঢালা পথ, দুইপাশে বড় বড় দেবদারুর অভিবাদন, দূর দূরান্ত পর্যন্ত সবুজের ছড়াছড়ি। সবকিছু মিলে একটা অদ্ভুত মায়াময় আর ছায়া ঘেরা পরিবেশ। সুখের আবেশ না ছুঁয়ে পারেই না ওদেরকে।

সকালের ঝলমলে পথ। ছবিঃ লেখক 

কিছু সময় পরেই ওরা চলে এলো একেবারে মহানন্দার পাড় ঘেঁষে সেজে থাকা সবুজ চা বাগানের ভেতরে। ওহ এই সেই চা বাগান, যা আমরা আমাদের তেতুলিয়া থেকে দেখতে পাই? হ্যাঁ এই সেই চা বাগান, আর ঐ যে দেখ তোমাদের সেই তেতুলিয়ার বাংলো! যেখানে তুমি ছিলে সেবার, আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল যে বার!

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফিরে দেখা ময়মনসিংহ শহর

সুন্দরবনে এক বিকেল: কটকা সী বীচ ও শুঁটকি পল্লীতে