নো ম্যান্স ল্যান্ডে সুখে ছুঁয়ে যাওয়া দুঃস্বপ্ন

কালিম্পং থেকে জীপে যেতে যেতে, সারাদিনের ক্লান্তিতে একটু ঝিমুনি এসেছিল অরণ্যর। কখন যেন তন্দ্রা ঘিরে ধরেছিল ওকে। তাই না চাইতেও একটু বেশ ঝিমুনি এসে গিয়েছিল। একটা সুখ সুখ অনুভূতি, পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে ঘুমো চোখে ঢুলতে থাকার এই অনুভূতিটা। আধো ঘুমে আধো জাগরণে অরণ্য অনুভব করছিল, খুব সূক্ষ্ম কিছু একটা ছুঁয়ে দিচ্ছিল অরণ্যকে আলতো করে। যে স্পর্শে একটা অদ্ভুত শিহরণ হচ্ছিল!

চোখ না মেলেই অরণ্য বুঝতে পারলো, পাহাড়ি বাতাসে গাড়ির খোলা জানালা দিয়ে মাধবীর কপাল থেকে একটি চুল ছুটে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে, এদিক-ওদিক, যেটা মাঝে মাঝে ছুঁয়ে দিচ্ছিল অরণ্যকে। যা কিছুটা ভালো লাগা আর কিছুটা অস্বস্তি মিলেমিশে একটা নিদারুণ অস্থিরতার মাঝে ফেলে দিয়েছিল অরণ্যকে। তবে এটা ওর ভুলও হতে পারে ভেবে চুপ করেই ছিল। কারণ চোখ খুলে ফেললে ওর আর মাধবীর দুজনেরই বেশ অস্বস্তি হবে বা হতে পারে। আর যদি মাধবীর চুল না হয়, তবে নিজের কাছে নিজেই লজ্জায় মরে যাবে। মাধবীকে নিয়ে এমন অদ্ভুত আর অসম্ভব ভাবনার অপরাধে।   

কালিম্পং এর পথে। ছবিঃ লেখক 

অরণ্য চুপ করেই চোখ বুজে ছিল। ও কিছু বলছে না দেখে, মাধবী ইচ্ছে করেই, ওর কানের পাশ থেকে আরও দুই-তিনটি চুল নিয়ে বাতাসে ছেড়ে দিল, অরণ্যর সাথে দুষ্টুমি করার জন্য। এবার অরণ্য আর ঘুমোতে পারলো না, আবার জেগে যে মাধবীকে বলবে ওর চুল সরাতে সেটাও বলতে পারছে না। একটা অদ্ভুত অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে বেচারা। না পারছে কইতে, না উপভোগ করতে আর না পারছে সইতে বা ওকে বারণ করতে। কারণ কিছু বলতে গেলেই যদি দেখা যায় যে না মাধবী নিজেই জানে না যে ওর কিছু চুল, বাতাসে উড়ে উড়ে অরণ্যর অস্বস্তির কারণ হচ্ছে। তখন? সেই মুখ অরণ্য কোথায় লুকাবে? তাই চুপ করেই ছিল।  

পাহাড়ি বাতাসে মাধবীর কয়েকটি নরম-কোমল আর মায়াবী চুল ছুঁয়ে দিচ্ছিল অরণ্যর চোখ, কপাল, নাক, গলা আর কখনো কখনো অরণ্যর চেতনাকেও। এবং বেশ অনেকটা সময় পরে অরণ্য ভেবে দেখলো, এটা যে মাধবী ইচ্ছে করে করছে এবং ওকে বিরক্ত করার জন্য করছে সেটা অরণ্য বেশ বুঝতে পারছে। মাধবী অরণ্যর এই অবস্থা দেখে ওর পাশে আর একটু ঘেঁষে এলো! তাই শেষে চোখ খুলে অরণ্য বলতে বাধ্য হলো-

পাহাড়ি পথে… ছবিঃ লেখক 

আর কাছে এসো না, মাধবী।

মাধবীঃ কেন?

অরণ্যঃ পুড়ে যাবে।

মাধবীঃ কেন, পুড়ে কেন যাবো?

অরণ্যঃ আমি হলাম আগুন, বুঝলে, আর কাছে এলে পুড়ে যাবে! আর আমার এই আগুনে পুড়ে গেলে না পারবে বলতে আর না পারবে সেই পোড়ায় কোনো প্রলেপ লাগাতে। শুধু জ্বলবে, পুড়বে, অযথা কষ্ট পাবে, মন খারাপ হবে।

মাধবীঃ আচ্ছা, তাই বুঝি? আমি কিন্তু পুড়বো না, কেন জানো?

অরণ্যঃ কেন?

মাধবীঃ তুমি যদি আগুন হও, তো আমি হলাম মোম!

অরণ্যঃ তো? মোম কি পোড়ে না?

স্বপ্নিল সময়। ছবিঃ মুনতাছির 

মাধবীঃ না মোম কখনো পোড়ে না, ওটা তোমরা যেটা মোমের পুড়ে যাওয়া দেখ আসলে সেটা পোড়া নয়। ওটা হল গলে যাওয়া, আগুনের উত্তাপে, সুখে, শিহরণে, আবেগে, আবেশে! বুঝলে? আর তাই তুমি যদি আগুন হও, আমি হলাম মোম! আমি গলে যেতে চাই, তোমার আগুনের উত্তাপে, উষ্ণতায় টুপটাপ করে খসে পড়তে চাই গলে গলে! যেখানে যখন আর যেভাবে ছুঁয়ে দেবে তুমি, তোমার আগুনের ঝলকানি দিয়ে, সেখানে-সেখানে! সুখের আবেগে, শিহরিত হয়ে, আগুনের পরশে সুখের আবেশে।  

আবার যখন নিভে যাবে তোমার আগুন, তুমি শান্ত হবে, আর আমি আবার জমাট বাঁধবো ধীরে ধীরে। আবার আমি মোম হব, গলে গলে পড়তে টুপটাপ করে তোমার আগুনের উষ্ণতায়, তোমার স্পর্শে, তোমার ছুঁয়ে দেয়া প্রতিটি মুহূর্তে!

তাই আমি মোম হতে চাই, যে মোম তোমার আগুনে ইচ্ছেমতো গলে পড়তে চায়!

আহ থামবে তুমি, কেন এসব অবান্তর কথা বলছ, কেন পাগলামি করছ? কেন এসব অবাস্তব আর অসম্ভব কিছু ভাবছ, বলত? তুমি তো সবই জানো, সেই শুরু থেকেই। যতটা না আমি জানি, তার চেয়ে অনেক বেশী, অনেক কাছ থেকে, অনেক গভীরভাবে তুমি জানো অধরাকে আর আমাকেও। আমাদের সব কিছুকেই। তারপরেও কেন এসব করছ, বলছ আর ভাবছ বুঝতে পারছি না। আর যদি এমন কর, এভাবে বলো, তাহলে আমি সোজা গাড়ি থেকে নেমে হাঁটা শুরু করবো বলে দিলাম।

সুখের শয্যা। ছবিঃ সংগ্রহ 

নাহ, যা বলছি সত্যি বলছি। তুমি আগুন হলে, আমি হবো মোম!

আমি মোম আর তুমি আগুন! বলেই নিজের মনেই, নিজের সাথেই যেন হেসে উঠলো মাধবী। আর সেই হাসির সাথে ওর মধুর, সুখের, আবেগের আর আবেশের ঘুমটাও ভেঙে গেল!   

ধড়ফড় করে উঠে পড়লো মাধবী।

আর বারবার করে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করতে লাগলো-

কেন দেখলো সে এই স্বপ্ন? এমন স্বপ্ন? এটা তো কোনো স্বপ্ন নয়, এটা অন্যায়, এটা অপরাধ, এটা বিশ্বাসঘাতকতা, এটা বন্ধুর সাথে শত্রুতার মতো একটা স্বপ্ন!

আর নিজের কাছেই নিজে অপরাধবোধে ভুগতে থাকলো, যদিও এটা স্বপ্ন, তবুও কেন দেখবে এমন স্বপ্ন, কেন দেখলো?এমন স্বপ্ন ও কিছুতেই দেখতে চায় না, ভুল করেও না। কিছুতেই ওর প্রাণপ্রিয় বন্ধু অধরা আর অধরার প্রাণের চেয়েও প্রিয় অরণ্যর মাঝে এমন দুঃস্বপ্ন হতে চায় না। কিছুতেই না।

Loading...

One Ping

  1. Pingback:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ইউরোপের চারটি বাজেট ট্যুর

লিডার নদীর প্রেমে!