নিঝুম দ্বীপে ঘোরাঘুরি ও কিছু দিক নির্দেশনা

নিঝুম দ্বীপ নোয়াখালির হাতিয়া উপজেলায় অবস্থিত। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে হাতিয়া উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমে জেগে উঠেছে ছোট্ট দ্বীপ। এটি নিঝুম দ্বীপ হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় জেলেরা ১৯৫০ সালের দিকে নিঝুম দ্বীপকে আবিষ্কার করে। তবে ১৯৭০ সালের পূর্বে এখানে জনবসতি ছিল না। নিঝুম দ্বীপের মোট আয়তন ১৪,০৫০ একর। নিঝুম দ্বীপে অনেক চিংড়ি মাছ (স্থানীয় ভাষায় ইছা) পাওয়া যায় বলে এই দ্বীপটিকে স্থানীয়রা ইছামতীর দ্বীপ বলে ডাকে।

ছবিসূত্রঃ ভ্রমণ গাইড

এছাড়া এই দ্বীপের কিছু অংশে টিলা ও বালির ঢিবি দেখা যেত বলে একে বাইল্যার চরও ডাকে কেউ কেউ। বাইল্যার চর বা বালুয়ার চর পরবর্তীতে বল্লার চর হিসেবে সবার কাছে পরিচিতি পায়। নিঝুম দ্বীপে অনেকগুলো ছোট ও বড় চর রয়েছে। এই চরগুলোর সমন্বয়েই নিঝুম দ্বীপ গঠিত। চরগুলো হলো বল্লার চর, কমলার চর, চর ওসমান, চর মুরি ইত্যাদি। নিঝুম দ্বীপ মূলত নীরব ও নিস্তব্ধ। তাই এই দ্বীপের নামকরণ করা হয়েছে নিঝুম দ্বীপ।

ছবিসূত্রঃ google plus

নিঝুম দ্বীপের যে অংশে জনবসতি গড়ে উঠেছে তার নাম হলো নামা বাজার। এই দ্বীপের প্রধান সড়ক একটি হলেও এখানে বাজার আছে তিনটি। নিঝুম দ্বীপে বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই যার কারণে পুরো দ্বীপ নিস্তব্ধ থাকে রাত হলে। তবে নামা বাজারে রাত ১০/১১ টা পর্যন্ত জেনারেটর চলে। অন্যান্য স্থানে জেনারেটরের ব্যবস্থা নেই। বিদ্যুৎ নেই বলে সন্ধ্যা হলেই মনে হয় মানুষের ঘরে ঘরে রাত নেমে আসে। পুরো পাড়া নিস্তব্ধতায় ছেয়ে যায়।

নিঝুম দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

ছবিসূত্রঃ বাহান্ন ডট নেট

নিঝুম দ্বীপে মানুষের হৈচৈ কোলাহল না থাকায় সারাক্ষণ স্নিগ্ধতা ও নীরবতা বজায় থাকে। এই দ্বীপে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ে হরিণের দল। কেউ কেউ নিঝুম দ্বীপকে হরিণের অভয়ারণ্যও বলে থাকেন। নিঝুম দ্বীপে প্রায় ৪০,০০০ হরিণ আছে। এখানে চিত্রা হরিণ দেখা যায় সবচেয়ে বেশি। হরিণ ছাড়াও নিঝুম দ্বীপে মহিষ, শেয়াল, সাপ, মোরগ, বন মোরগ, বিড়াল, বন বিড়াল, ইঁদুর, বন্য শূকর, বানর ইত্যাদি দেখা যায়। শীতকালে নিঝুম দ্বীপে উত্তরের দেশ থেকে উড়ে আসে নানা প্রজাতির পাখি।

ছবিসূত্রঃ Noakhali PAGE

পুরো শীতের মৌসুমে হাজারো পাখি দেখে নয়ন জুড়ায় পর্যটকদের। গাংচিল, ভূতিহাঁস, রাজহাঁস, পাতিহাঁস, সারালি, রাঙ্গামুড়ি, লেঞ্জা, পিয়ং, চখাচখি, কাদাখোঁচা, জিরিয়া, গুলিন্দা, বাটান, সামুদ্রিক ঈগল, শঙ্খচিল, বক সহ নানা ধরনের পাখি দেখা যায় এই দ্বীপে। মোট ৩৫ প্রজাতির পাখির দেখা পাওয়া যায় শান্ত ও নীরব এই দ্বীপে।

ছবিসূত্রঃjourney bangladesh

নিঝুম দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয় আগত দর্শনার্থীরা। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে গড়ে উঠেছে বলে সমুদ্রের ঢেউয়ের আছড়ে পড়া, সাগরের গর্জন সত্যিই চমৎকার। সমুদ্রের বুকে নৌকা কিংবা ট্রলার নিয়ে ঘুরলে দারুণ উপভোগ করা যায়। সকালে সূর্য ওঠার সাথে সাথে চারদিকের অন্ধকার দূর হয়ে যায়। নিঝুম দ্বীপের সূর্যাস্তের দৃশ্য চমৎকার। মন মাতানো সূর্যাস্তের দৃশ্য উপভোগ করা যায় এই দ্বীপ থেকে। এছাড়া বর্ষা ও শীতকালে নিঝুম দ্বীপ অপরুপ সাজে সজ্জিত হয়। নিঝুম দ্বীপে বিভিন্ন প্রকারের গাছপালা দেখা যায়। বেশি দেখা যায় কেওড়া গাছ।

ছবিসূত্রঃ Noakhali PAGE

বিদ্যুৎ নেই বলে নিঝুম দ্বীপের রাতের দৃশ্য অসাধারণ। বিশেষ করে পূর্ণিমা রাতের মধুময় চাঁদ দেখা যায় মন ভরে। তাছাড়া রাতের আকাশের হাজারো তারার হাতছানি দেখা যায় এই দ্বীপে। দ্বীপের অভ্যন্তরে চলাফেরার জন্য সাইকেল ও রিকশা ব্যবহার করা হয়। মোটরসাইকেলও চলে দ্বীপের ভেতরে। নিঝুম দ্বীপ ঘুরে দেখার জন্য একজন গাইড সাথে রাখা ভালো। গাইড ছাড়া ঘুরলে ঠিকভাবে কোনো কিছু দেখা যাবে না।

নিঝুম দ্বীপের আরো কিছু দর্শনীয় স্থান

কমলার দ্বীপ

নিঝুম দ্বীপে কমলার দ্বীপ নামে একটি দ্বীপ রয়েছে। এই দ্বীপে অনেক ইলিশ পাওয়া যায়। স্থানীয় জেলেদের কাছ থেকে কম দামে ইলিশ কেনা যায়।

চৌধুরী খাল

চৌধুরী খালে ট্রলার ভাড়া করে ঘোরা যায়। স্থানীয় গাইডের সহযোগিতা নিয়ে ঘুরলে হরিণের দেখা পাওয়া যায়।

কবিরাজের চর

কবিরাজের চরের সূর্যাস্ত সত্যিই চমৎকার। নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণে গেলে অবশ্যই কবিরাজের চর দেখে আসবেন।

ম্যানগ্রোভ বন

নিঝুম দ্বীপে বনায়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। গাইডের সাহায্য নিয়ে বনের ভেতরে ঢুকলে হরিণ দেখা যাবে।

নামা বাজার ও কুমারী সি বীচ

ছবিসূত্রঃ Noakhali PAGE

নামা বাজার সি বীচ ও কুমারি সি বীচের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ। নামা বাজার সি বীচের জলের ঢেউ দেখলে মনে হবে মিনি কক্সবাজার। কুমারী সি বীচ ভার্জিন আইল্যান্ড নামে পরিচিত।

ঘোরাঘুরির জন্য উপযুক্ত সময়

বছরের অক্টোবর থেকে মার্চ কিংবা এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত নিঝুম দ্বীপ ঘোরাঘুরির জন্য উত্তম। বৈশাখ কিংবা অন্য সময়ে যখন মেঘনা নদী উত্তাল থাকে তখন ঘোরাঘুরি করা বিপদজনক।

যাওয়ার উপায়

নৌযানে করে নিঝুম দ্বীপ

ঢাকা থেকে নোয়াখালির নিঝুম দ্বীপে যেতে হলে সবচেয়ে উপযুক্ত ও সুবিধাজনক পথ হলো নৌযানে করে নিঝুম দ্বীপে যাওয়া। ঢাকার সদরঘাট থেকে নোয়াখালি হাতিয়ার তমরুদির উদ্দেশ্যে লঞ্চ ছাড়ে বিকেল পাঁচটায়। তমরুদি থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে লঞ্চ ছাড়ে দুপুর সাড়ে বারোটায়। প্রতিদিন ঢাকার সদরঘাট থেকে নোয়াখালির হাতিয়ার উদ্দেশ্যে অনেক লঞ্চ ছেড়ে যায়। ডেকের ভাড়া ২৫০-৩০০ হলেও কেবিনের ভাড়া একটু বেশি। কেবিনে একজনের খরচ হবে ১,২০০ টাকা, দুইজনের খরচ হবে ২,২০০ টাকা। তরমুদ্দি নেমে স্কুটার, বাস কিংবা রিকশায় বন্দরটিলায় যেতে হবে। বন্দরটিলা থেকে নিঝুম দ্বীপ শুরু হলেও নামা বাজারে যেতে হবে। নামা বাজারই মূল নিঝুম দ্বীপ বলে পরিচিত।

বাসে করে নিঝুম দ্বীপ

ঢাকার মহাখালি, এয়ারপোর্ট, সায়েদাবাদ থেকে নোয়াখালির সোনাপুরের উদ্দেশ্যে বাস যায়। ভাড়া লাগবে ৪০০/৪৫০ টাকা। সোনাপুর নেমে সিএনজি করে যেতে হবে চেয়ারম্যান ঘাট, সেখান থেকে ট্রলারে করে নলচিরা ঘাট, নলাচিরা ঘাট থেকে বাসে করে জাহাজমারা বাজার, সেখান থেকে মোটরসাইকেলে যেতে হবে মুকতারা ঘাট। মুকতারা ঘাট থেকে ইঞ্জিনের নৌকায় করে যেতে হবে নিঝুম দ্বীপ।

থাকার ব্যবস্থা

নিঝুম দ্বীপে থাকার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান নিঝুম রিসোর্ট। এখানে সিঙ্গেল, ডাবল, ফ্যামিলি মিলে থাকা যায়। ভাড়া খরচ হবে ১,৮০০-৩,৫০০ টাকা।
ফিচার ইমেজ- sixseason71blog

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কলকাতার আলুসেদ্ধ গরম ও এক পশলা বৃস্টি

হিমালয় ও স্বপ্নের গল্প: মাউন্ট কানামো অভিযান