শান্ত, শীতল মেজাজের গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের মোহমায়া রূপ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

এখানে ভোরের আলোয় উবে যায় সকল আঁধার। হাসনাহেনা, কামিনী, কাঠগোলাপ, শিউলি, রাধাচূড়া ও কৃষ্ণচূড়ার মোহনীয় আবেশে সকাল শুরু হয়। পাখির কিচিরমিচিরে মত্ত থাকে পুরো ক্যাম্পাস। প্রভাতবেলায় পায়ে হাঁটার পথে চাদর বিছিয়ে দেয় কাঠগোলাপ কিংবা শিউলি ফুলের সারি।

ছবিসূত্রঃ সংগ্রহ।

এক মূহুর্তে মনে হতে পারে এক ফুলেল সকাল। যেখানে প্রভাতের সূর্য নব আলোর পরশ নিয়ে হাজির হয়, সেখানে কখনো কখনো বর্ষার বৃষ্টি কিশোরির মতো ভিজিয়ে দেয় পুরো ক্যাম্পাসকে। আর পুরো ক্যাম্পাস মোহনীয় মায়ার পরশে আরো রূপবতী হয়ে ওঠে। বলছি শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শান্ত, শীতল ও মায়াবতী ক্যাম্পাস অর্থাৎ ‘গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ’ এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা।
ছবিসূত্রঃ ঐশী।

শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর মধ্যে আজিমপুর অন্যতম। আর আজিমপুরেই গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের অবস্থান। ১৯৬১ সালে আমেরিকার ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহামা স্টেট ইউনিভার্সিটির সহায়তায় এটি ঢাকার আজিমপুরে স্থাপিত হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত গৌরবের সাথে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাম্পাসটি। পাঁচটি বিভাগ ও মানসম্মত পড়াশোনার জন্য কলেজটি সুপরিচিত।
ছবিসূত্রঃ সংগ্রহ।

পাঁচটি বিভাগ হলো খাদ্য ও পুষ্টি বিজ্ঞান, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্ট্রাপ্রেনারশিপ, শিশু বিকাশ ও সামাজিক সম্পর্ক, শিল্পকলা ও সৃজনশীল শিক্ষা, বস্ত্র পরিচ্ছদ ও বয়ন শিল্প। প্রতিটি বিভাগে ছাত্রীদের জীবনমুখী শিক্ষা দেয়া হয়, সেই সাথে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে তাল মিলিয়ে চলার কলাকৌশল শিখিয়ে দেয়া হয়। বলতে দ্বিধা নেই, শুধুমাত্র হোম ইকোনোমিকস কলেজেই সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও এন্ট্রাপ্রেনারশিপ বিষয় রয়েছে যেখান থেকে অসংখ্য তরুণ উদ্যোক্তার জন্মলাভ হয়।
উদ্যোক্তাদের জন্য স্বতন্ত্র এই বিভাগ নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। শুধু তাই নয়, প্রতিটি বিভাগে নিজের দক্ষতা ও মেধাকে প্রমাণ করার মতো অনেক সুযোগ রয়েছে। এখানকার ছাত্রীরা পড়াশোনা, সৃজনশীলতা, খেলাধুলায় অনন্য। বর্তমানে কলেজটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত।
ছবিসূত্রঃ সংগ্রহ।

গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের মূল গেট দিয়ে ঢুকতেই সামনে পড়ে একটি ফুলের বাগান। এখানে অসংখ্য রঙবেরঙের ফুল দেখা যায় বিভিন্ন ঋতুতে। ঋতুভেদে ফুলের ভিন্নতাও দেখা যায়। ডালিয়া, সূর্যমূখী, গোলাপ, গাঁদা সহ অনেক নাম না জানা ফুলও ফোটে এখানে। বিশেষ করে বসন্তকালে যেন ফুলের মেলা বসে। কী যে আশ্চর্য শোভা দেখা যায় পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে, তা নিজ চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না। বাগানের ঠিক বাঁ পাশে রয়েছে এক চাচীর ভ্যান। এখানে বিভিন্ন ধরনের আচার, কাঁচা আম ইত্যাদি পাওয়া যায়। তবে তার আচার খেতে দারুণ মজা। বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে বেড়াতে এলে বা ঘুরতে এলে তার আচার খেয়ে মুগ্ধ না হয়ে পারে না।
ছবিসূত্রঃ সংগ্রহ।

আরেকটু সামনে যেতেই চোখে পড়বে প্রশাসনিক ভবন। তারপর পর্যায়ক্রমে আরো কয়েকটি ভবন রয়েছে। এখানে রয়েছে সুবিশাল খেলার মাঠ, পুকুর, লাইব্রেরি প্রাঙ্গণ, লাইব্রেরি, পুকুর, ক্যান্টিন, রেসিডেন্স হাউজ, অডিটোরিয়াম ইত্যাদি।
ছবিসূত্রঃ নুসরাত জাহান নিপা।

ক্যাম্পাসের আনাচে কানাচে রয়েছে অনেক গাছগাছালি। রয়েছে ফুলগাছও। ক্লাস করার ফাঁকে ফাঁকে কোকিলের সুমধুর গান কিংবা অন্যান্য পাখিদের কিচির মিচিরে মুগ্ধ হতে হয়। রাধাচূড়ার হলুদাভ সৌন্দর্য যেন চোখে আগুন লাগায়। সেই সাথে কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম আভা সকাল, দুপুর ও বিকেলকে রাঙিয়ে দেয়। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহেও এখানে শান্তির পরশ মেলে। দক্ষিণের হাওয়া যেন শীতল পরশ বুলিয়ে দিয়ে যায়।
ছবিসূত্রঃ সালসাবিল।

বর্ষায় ক্যাম্পাসটি ভিন্নরূপ ধারণ করে। বর্ষার টাপুর টুপুর বৃষ্টি যেন ছন্দ তালে ভিজিয়ে দেয় ক্যাম্পাসের মাঠ, ঘাট, ভবন ও পায়ে হাঁটার রাস্তা। বিশেষ করে পুকুরের জলে যেন নাচের ঢেউ বয়ে যায়। ক্যান্টিনের জানালা দিয়ে কিংবা ক্যান্টিনের বেলকনিতে চেয়ারে বসে পুকুরে বৃষ্টি পড়ার এই অভাবনীয় সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এছাড়া ইচ্ছে করলে পুকুরে নেমে জলের গভীরত্ব মাপা যায়, হাঁসের মতো জলে সাঁতার কাটা যায়।
ছবিসূত্রঃ ঐশী।

এখানকার পুকুর গ্রীষ্মের তাপে খানিক শুকিয়ে গেলেও বর্ষায় যৌবন ফিরে পায়। পুরো প্রকৃতি ভরা যৌবন ফিরে পায়। গাছের পাতায় পাতায় যেন নাচন দোলা লাগে, বাতাসে বাতাসে শিহরণ জাগে। কলেজের পুকুর পাড়ে বসার সুন্দর আসন রয়েছে। এই আসনগুলো দেখতে বেশ। মাথার উপরে রয়েছে ছাতাও।
ছবিসূত্রঃ সংগ্রহ।

এখানে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করা যায়। আর পুকুরে হাঁসের জলকেলি খেলা, দলবেঁধে সাঁতার কাটা, মাছেদের ডুব দেয়া, বড়শি দিয়ে মাছ ধরার দৃশ্য উপভোগ করা যায়। উল্লেখ্য যে কলেজে কর্মরত মামাদের বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে দেখা যায়।
ছবিসূত্রঃ সংগ্রহ।

পুকুরের পাশেই রয়েছে অন্নপিনা ক্যান্টিন। এই ক্যান্টিনে সকাল, দুপুর, বিকেল ও রাতের খাবার পাওয়া যায়। খাবারের মান মোটামুটি ভালোই। ক্যান্টিনের ভেতরে রয়েছে বেশ প্রশস্ত জায়গা। ক্যান্টিনে প্রায় সব ধরনের শুকনো খাবার পাওয়া যায়। বিস্কিট, ড্রাই কেক, চিপস, আইসক্রীম, রুটি, সিঙ্গারা, সমুচা সহ আরো অনেক কিছু পাওয়া যায় এখানে। সব ধরনের কোমল পানীয়ও পাওয়া যায়। এছাড়া চা, কফি তো আছেই।
ছবিসূত্রঃ নুসরাত জাহান নিপা।

ক্যাম্পাসে রয়েছে লাইব্রেরী প্রাঙ্গণ। পাশে রয়েছে লাইব্রেরী। লাইব্রেরীতে বসে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বইও পড়া যায়। তবে বহিরাগতদের লাইব্রেরীতে প্রবেশ নিষেধ। লাইব্রেরীর সামনেও বসার স্থান রয়েছে। এখানে শিক্ষার্থীরা এবং আগত দর্শনার্থীরা বসে প্রাণ জুড়াতে পারে।
ছবিসূত্রঃ সংগ্রহ।

লাইব্রেরীর পাশেই রয়েছে শহীদ মিনার। শহীদ মিনারে বসেও আড্ডা দেয়া যায়। এখানকার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে এবং আত্মার মাগফিরাত কামনা করে। শহীদ মিনারটি সত্যিই সুন্দর।
ছবিসূত্রঃ সংগ্রহ।

গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ প্রাঙ্গণে রয়েছে অনেক গাছ, বটবৃক্ষ। কিছু কিছু গাছ বেশ প্রাচীন। বয়সের ভারে একেবারে নুয়ে পড়েছে। তবুও ছায়া দিয়ে যায় কোমলমতী শিক্ষার্থীদের।
ছবিসূত্রঃ ঐশী।

বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও উৎসবে পুরো ক্যাম্পাসকে যেন রঙিন সাজে সজ্জিত করা হয়। প্রতিবছর বিভিন্ন উৎসব পালন করা হয়। পহেলা ফাল্গুন, পহেলা বৈশাখ, সরস্বতী পূজা, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে অনেক প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন প্রোগ্রামে বহিরাগত নারী দর্শনার্থীরা প্রবেশ করতে পারে।
ছবিসূত্রঃ সালসাবিল।

গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজটির পুরো ডিজাইন, গঠন খুব সুন্দর ও গোছালো। অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, স্নিগ্ধতা, মেজাজ সবকিছুই স্বকীয়তার পরিচয় বহন করে।
ফিচার ইমেজ সোর্স- সংগ্রহ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বপ্নপুরী সাজেকের পথে-প্রান্তরে

ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ হয়ে হুমায়ূন স্যারের গৌরীপুর জংশনে