আভিজাত্য হারানো ধ্বংসপ্রায় লক্ষ্মণ সাহা জমিদার বাড়ি

জমিদার বাড়ির প্রতি আমাদের আগ্রহ বরাবরই তুঙ্গস্পর্শী। ইতিহাস ধারণকারী এসব জমিদার বাড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে দেশের মূল শহরগুলো থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত। ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যবাহী এসব জমিদার বাড়ির কয়েকটি সরকারের নজরদারির মাঝে থাকলেও বেশিরভাগই পড়ে আছে অরক্ষিত আর অবহেলায়।

খিল দেয়া দরজা; সোর্সঃ লেখক

ঢাকার অদূরে নরসিংদী জেলায় রয়েছে এরকমই বেশ কিছু জমিদার বাড়ি। এখানে যেমন রয়েছে মনু মিয়ার বাড়ির মতো পরম যত্নে রক্ষণাবেক্ষণ করা ঘোড়াশাল জমিদার বাড়ি, তেমনি রয়েছে অবহেলায় ধ্বংসপ্রায় জমিদার বাড়িও।

প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার ক্ষেত্রে অমূল্য এই স্থাপনাগুলোর দিকে সরকারের নজরদারি খুব প্রয়োজন। নাহলে অদূর ভবিষ্যতে এসব জমিদার বাড়ির সাথে হারিয়ে যাবে অনেক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গল্পগাথা। এই পর্বে এরকমই একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত জমিদার বাড়ি সম্পর্কে জানানোর চেষ্টা করবো।

জমিদার বাড়ির একাংশ; সোর্সঃ লেখক

লক্ষ্মণ সাহা জমিদার বাড়ি

নরসিংদী জেলার পলাশ উপজেলার অধীনস্থ ডাংগা ইউনিয়নের বাজার সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত লক্ষ্মণ সাহা জমিদার বাড়ি। প্রাচীন পোড়ামাটির কারুকার্যের শৈল্পিকতার এক অনন্য নিদর্শন এই জমিদার বাড়িটি। পূর্বের আভিজাত্যপূর্ণ গৌরব হারিয়ে সাদামাটাভাবে এখনো ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে এই জমিদার বাড়িটি।

মূল বাড়িটির পেছনে রয়েছে বিশাল প্রাচীরে ঘেরা বাগান, আর সামনের অংশে একটি পুকুরও রয়েছে। পূর্বের লক্ষ্মণ সাহা জমিদার বাড়িটি বর্তমানে উকিলবাড়ি নামেই এলাকায় পরিচিত।

পরিত্যাক্ত ঘর; সোর্সঃ লেখক

সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে এই জমিদার বাড়িটি জমিদার লক্ষ্মণ সাহা নির্মাণ করেন। মূলত তিনি ছিলেন প্রধান জমিদারের অধীনস্থ সাব-জমিদার। তার তিন ছেলে নিকুঞ্জ সাহা, পেরিমোহন সাহা ও বঙ্কু সাহা। সাতচল্লিশে দেশ ভাগের সময় বঙ্কু সাহা এবং একাত্তরে বাংলাদেশ পাকিস্তান আলাদা হবার কিছুদিন আগে নিকুঞ্জ সাহা দেশ ত্যাগ করে ভারত চলে যান।

আর পেরিমোহন সাহার একমাত্র ছেলে বৌদ্ধ নারায়ণ সাহার কাছ থেকে বাড়িটি কিনে নেন আহম্মদ আলী। তিনি পেশায় ছিলেন একজন উকিল, তাই পরবর্তীতে বাড়িটি উকিলবাড়ি নামে পরিচিত হতে থাকে।

জৌলুষ হারানো ভঙ্গুর জমিদার বাড়ি; সোর্সঃ লেখক

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বেশ কয়েকভাবে যাওয়া যায় এই জমিদার বাড়িটিতে। ঢাকার গুলিস্তান থেকে মেঘালয় কিংবা বিআরটিসি বাসে করে নরসিংদীর পাঁচদোনা মোড়ে নেমে যেতে হবে। ভাড়া ৭০-৮০ টাকা।

অথবা মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে PPL, KTL, চলনবিল, বাদশাহ, উত্তরাসহ বেশ কয়েকটি বাস নরসিংদীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।

তবে কম খরচে সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ট্রেন। সারাদিনে বেশ কয়েকটি ট্রেন ঢাকা-নরসিংদী রুটে চলাচল করে। ভাড়া ২০-২৫ টাকা। নরসিংদী স্টেশনে নেমে সিএনজি কিংবা ইজিবাইক দিয়ে পাঁচদোনা মোড়ে যেতে হবে।

লক্ষ্মণ সাহা জমিদার বাড়ি; সোর্সঃ লেখক

সেখান থেকে লোকাল সিএনজি করে ডাংগা বাজার যেতে হবে। ভাড়া ৪০ টাকা প্রতিজন। ডাংগা বাজার থেকে ১ কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত জমিদার বাড়িটিতে হেঁটে কিংবা রিকশায় করে চলে যেতে পারেন। রিকশা ভাড়া ২০-২৫ টাকা।

এত ঝামেলা করতে না ভাইলে পাঁচদোনা মোড় থেকে রিজার্ভ সিএনজি করে একেবারে উকিলবাড়িতে পৌঁছে যেতে পারবেন। রিজার্ভ সিএনজি ৩০০ টাকা ভাড়া।

জমিদার বাড়ির ছাদের একাংশ; সোর্সঃ লেখক

আব্দুল্লাহপুর কিংবা টঙ্গী থেকে যারা যাবেন তাদের জন্য কালিগঞ্জ হয়ে যাওয়াটাই সহজতর। লেগুনা করে কালিগঞ্জ, সেখানে ঘাটে গিয়ে নৌকা দিয়ে নদী পার হলেই সিএনজি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখবেন ডাংগা পর্যন্ত। ভাড়া ১৫ টাকা। কালিগঞ্জ ঘাট থেকে ডাংগা মাত্র ৪-৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

তবে এখানে বলে রাখা ভালো, পাঁচদোনা থেকে ডাংগা বাজার পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই বাজে রকমের ভাঙ্গাচোরা। বৃষ্টির দিনে রাস্তার গর্তগুলোতে পানি জমে রাস্তাটাকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। মাঝে মাঝে রাস্তার গর্তগুলো এতই বড় যে মনে হবে সিএনজি না উল্টে যায়। এই রাস্তায় সিএনজি চলাচল করে কীভাবে সেটাই আরেক বিস্ময়।

সবুজের অভয়ারণ্য; সোর্সঃ লেখক

লক্ষ্মণ সাহা জমিদার বাড়িটিকে অনেকে ডাংগা জমিদার বাড়ি নামেও চেনে। আশেপাশে আরও দুইটি পুরনো জমিদার বাড়ি থাকলেও এটিই সবচেয়ে বড় ও সুন্দর বলা যায়। বাড়িতে ঢোকার আগেই দেখতে পাবেন একটি কারুকার্যমন্ডিত পুরনো মন্দির। যদিও পূজার সময় ছাড়া মন্দিরের দরজা সবসময় বন্ধই থাকে।

দ্বিতল বিশিষ্ট বাড়িটিতে বর্তমানে একটি পরিবার বসবাস করে। আমরা তাদের থেকে অনুমতি নিয়েই মূল বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করি। বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকে পেছনের এই উঠোনটা এক সময় বিভিন্ন ফুলের গাছে ভরপুর ছিল। তবে এখন সেগুলোর কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। আগাছার জঙ্গলে ভরে গেছে চারদিক। সেখান থেকে উপরের তলায় ওঠার সিঁড়ি পেয়ে যাই। ভাঙা সিঁড়িপথ বেয়ে উপরে উঠেই মন ভালো হয়ে যাওয়া দৃশ্য দেখতে পাই।

বাড়ির পাশে পুরনো মন্দির; সোর্সঃ লেখক

সেকালের এই নিপুণ কারিগরি দক্ষতা দেখে মনের অজান্তেই সেসব কারিগরদের প্রতি শ্রদ্ধা এসে যায়। আজকের দিনের এত উন্নত প্রযুক্তি ছাড়াই তারা এত নিখুঁতভাবে এত বিশাল বিশাল স্থাপনা কীভাবে বানিয়েছে তা ভেবে সত্যিই খুব অবাক লাগে। বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় উঠে সম্মুখভাগে এসে দাঁড়ালে নিজেকে একমুহূর্ত জমিদার বলেই মনে হবে।

কারুকাজ মণ্ডিত জমিদার বাড়ি; সোর্সঃ লেখক

উপরতলায় কেউ বসবাস করে না বলে বেশ পরিত্যক্ত ও ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করে বলা যায়। আশেপাশে কোনো বাড়িঘর না থাকায় সন্ধ্যা নামার পর বাড়িটিকে ভূতের বাড়ি বলেও চালিয়ে দেয়া যাবে অনায়াসে।

বাড়িটির সামনেই রয়েছে সে আমলে তৈরি করা শান বাঁধানো পুকুর ঘাট। পুকুরের ঠিক পাশেই ছোট মঠ সদৃশ স্থাপনা চোখে পড়ে। শোনা যায় এরকম নাকি আরও কিছু মঠ ছিল। কালের অতলে সেসব আজ বিলীন হয়ে গেছে।

লক্ষ্মণ সাহা জমিদার বাড়ির উপরের তলা; সোর্সঃ লেখক

বিকেলের স্নিগ্ধ আলোয় ঘাটে বসে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে আমরা রওনা দেই। ডাংগা বাজারের হোটেলেই দুপুরের খাবার খেয়ে চলে আসি পাঁচদোনা। সেখান থেকে বাসে করে সোজা ঢাকা। আর স্মৃতিপটে নিয়ে আসি সুন্দর, ছিমছাম আর নিরব দাঁড়িয়ে থাকা লক্ষ্মণ সাহা জমিদার বাড়িটির সৌন্দর্যকে।

সময় থাকলে শীতলক্ষ্যা নদীর বুকে নৌকা ভ্রমণ আর পাঁচদোনাতে ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের বাড়ি দেখে আসতে ভুলবেন না অবশ্যই।

অবহেলায় ধ্বংসপ্রায় লক্ষ্মণ সাহা জমিদার বাড়ি; সোর্সঃ লেখক

বিঃদ্রঃ প্রকৃতির ক্ষতিসাধন হয় এমন কোনো কাজ আমাদের কাছ থেকে কাম্য নয়। তাই যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকুন। অযথা হইহুল্লোড় করে বাড়িতে বসবাসরত মানুষদের বিরক্ত করবেন না।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ব্যাংককের পাতায়া শহরে রাত্রিযাপন ও ব্যক্তিগত উপলব্ধি

দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার পাঁচটি আন্ডাররেটেড শহর