ঝটিকা সফরে নড়াইলের পথে ঘাটে

দুপুরের খাবারের পর আয়েশ করে ঘুমিয়ে নিয়েছি কিছুক্ষণ। বিকেলে পিটব’দার সাথে নড়াইল শহর ঘুরে দেখতে বের হই। যেহেতু হাতে খুব বেশি সময় নেই তাই বাড়ির আশেপাশে যা আছে তাই ঘুরে দেখি। পড়ন্ত বিকেলে বাড়ির পাশের পিচ ঢালা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে বেশ লাগছিল।

তার উপর রাস্তার দু’ধারে যত দূর চোখ যায় মাঠের পর মাঠ ফসলী জমি। সবুজের চাদরে ঢাকা মাঠ। ক্ষেতের আইলের কোথাও কোথাও বৃষ্টির পানি জমে তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতার। আর সেখানেই চারু, রাবানি পেতে ছোট মাছ ধরা হয়। পুঁটি, খৈলসা, টাকি মাছ সহ বেশ কিছু মাছ ধরা পড়ে।

নড়াইলের নামকরা মিষ্টির দোকানের একটি; ছবি- কামরুন নাহার ইতি 

সন্ধ্যায় রূপগঞ্জ বাজারে নিয়ে গেল দাদা। পরিতোষের বিখ্যাত মিষ্টি খেতে। নড়াইলের মিষ্টির খ্যাতি দেশ পেরিয়ে বিদেশেও সুনাম আছে। বিশেষ করে দই, রসগোল্লা, ক্ষীরের সন্দেশ, প্যাড়া সন্দেশ, গুড়ের সন্দেশ ও ছানার জিলাপি খুব বিখ্যাত। এর লোভনীয় স্বাদ মিষ্টি প্রিয় মানুষকে আরও বেশি কাছে টেনেছে।

মিষ্টি প্রিয় লোক; ছবি- কামরুন নাহার ইতি 

যদিও আমি ভোজন-রসিক না, তারপর কয়েকরকম মিষ্টির স্বাদ আমিও নেই। দূরদূরান্ত থেকে লোক মিষ্টি কিনতে আসেন এখানে। পূজা পার্বণ সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এখান থেকে মিষ্টি নেওয়া হয়।


“কোথা আছ, প্রভু, এসেছি দীনহীন,
আলয় নাহি মোর অসীম সংসারে!”
ছবি- সাইমুন ইসলাম 

নানা পদের মিষ্টির স্বাদ আস্বাদন করে যাই কালী মন্দির দেখতে। মা কালী সবরকম অমঙ্গল থেকে রক্ষা করতে সর্বদা জাগরত থাকেন। এই কালী বাড়িটিও বহু পুরাতন। মন্দিরে নিত্য পূজা সহ বাৎসরিক অনুষ্ঠান হয় মহাসমারোহের মধ্য দিয়ে।

শেখ রাসেল সেতু; ছবি- সাইমুন ইসলাম 

যেহেতু সময় খুব অল্প তাই নড়াইলের সবটা ঘুরে দেখা সম্ভব হয়নি। রূপগঞ্জ বাজার থেকে অটো করে যাই শেখ রাসেল সেতুতে। চিত্রা নদীর উপর দিয়ে তৈরি হয়েছে এই সেতুটি। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা গল্পগুজব করে বাসায় ফিরি। ফিরে দেখি চাচী মা সে এক এলাহি কান্ড করছে। চুই-ঝাল দিয়ে হাঁসের মাংস, ভাত, ডাল, সুপ্ত কয়েক পদের পিঠাসহ নানাবিধ আয়োজনের বহর। কোনোমতে খাবার খেয়ে ঘুমাতে যাই। সারাদিনের ক্লান্তি ততক্ষণে জেঁকে বসেছে শরীরে। এবার শরীর একটু বিশ্রাম চায়।

সকাল সকাল বেরিয়ে পড়ি ঢাকার উদ্দেশ্যে। সবুজের চাদরে মোড়ানো ছোট্ট এই শহর দেখতে পারিনি ভালো করে। চিত্র শিল্পী এস এম সুলতানের বাড়ি দেখা হয়নি, দেখা হয়নি নড়াইল এক্সপ্রেসের মাসরাফীর চরাচরের জায়গা। এক কথায় বলা যায়, নড়াইল জেলায় যে সকল দর্শনীয় স্থান আছে তার কিছুই দেখতেই পারিনি সময়ের কারণে।

মুখরোচক রসোমালাই 

তাই সান্ত্বনা স্বরূপ পুরষ্কার পেলাম ফেরার পথে। মাওয়া গিয়ে পদ্মাতে গোসল আর
ইচ্ছেমত ইলিশ খাওয়া। সান্ত্বনা পুরষ্কার হিসেবে নেহাত খারাপ না। কাঁঠালবাড়ি ঘাট থেকে স্পীড বোটে করে নদী পার হই। যদিও রাকিব ভাই আর পিটব’দা কোনোভাবেই স্পীড বোটে পার হতে রাজি না। কিন্তু আমরাও গো ধরলাম যে গেলে স্পীড বোটে যাবো। ভয়ে তাদের মুখ চোখ শুকিয়ে গেছে। এই অবস্থায় স্পীড বোটে উঠি। ২০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাই মাওয়ায়।

এদিকে ক্ষুধায় আমার পেটে ছুঁচো দৌড়চ্ছে। আমি তাদেরকে বলি আগে খেয়ে নেই তারপর নদীতে নামবো। কে শোনে কার কথা। মৃদু বাতাসে পদ্মার ছোট ছোট ঢেউ আছড়ে পরে তীরে। লাল টকটকে সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে একটু একটু করে। এর মাঝে নদীতে নেমে গোসল সেরে তারপর খেতে গেল।

গরম ভাতের সাথে মচমচে ইলিশ ভাজা 

যুগ যুগ ধরে মাওয়া ঘাটের ইলিশের সুনাম এবং চাহিদা সর্বত্র। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে মাওয়ার তাজা ইলিশ খেতে। আর এই বিশাল চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে গড়ে উঠেছে ছোট, বড় মাঝারি মানের হোটেল। ভাত, ভর্তা এবং মাছের জন্য মূলত বিখ্যাত এই হোটেলগুলো। এছাড়াও রয়েছে ছোট বড় মাছের দোকান। যেখানে পদ্মার ইলিশ থেকে শুরু করে চিংড়ি সহ ছোট বড় অনেক রকম মাছ পাওয়া যায়। বেচাকেনাও বেশ রমরমা।

তা যাই হোক, ক্ষুধায় আমার মাথা নষ্ট অবস্থা। এরই মধ্যে গরম ভাত, মচমচে ইলিশ ভাজা, বেগুন ভাজা আর ইলিশের ডিম ভর্তা চলে এসেছে। আমি বাদে বাকিরা ছবি তোলায় ব্যতিব্যস্ত। একরকম জোর করে খাবার আটকে ছবি তুলছে। তাদের ছবি তোলা শেষ হলে তবেই খাওয়া শুরু। আমি আর অন্য কোনো দিকে না তাকিয়ে একরকম চোখ কান বন্ধ করে খেয়ে যাচ্ছি।

খেতে খেতে মনে হচ্ছিল পেটে যেন রাক্ষস ঢুকেছে। সারাদিন পর খেয়ে শরীর ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে আমাদের। তড়িঘড়ি করে চা-পানি খেয়ে টিকিট কেটে বাসে উঠে পড়ি। এবার নিজের বিছানায় গা এলিয়ে দিতে পারলেই শান্তি।

মুখে জল আনার মত ভর্তা 

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সরাসরি নড়াইলের বাসে উঠতে পারেন। ভাড়া নন এসি ৪৮০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে হবে। চাইলে ভেঙে ভেঙে যেতে পারেন। গুলিস্থান থেকে মাওয়ার বাসে উঠবেন। লঞ্চ, ফেরি এবং স্পীড বোটে নদী পার হতে পারেন। আর স্পীড বোটে ভাড়া ১৫০ টাকা। তবে সাঁতার জানা না থাকলে স্পীড বোটে না ওঠাই ভালো। এরপর নদী পার হয়ে বাসে বা মাইক্রোতে যাওয়া যায়। ভাড়া ১৫০ টাকা।

থাকা-খাওয়া

পথিমধ্যে প্রচুর খাবারের দোকান পড়বে সেখান থেকে খেয়ে নেওয়া উত্তম। সরকারী- বেসরকারিসহ বেশ কিছু রেস্ট হাউস আছে সেখানে থাকার সুব্যবস্থা আছে।

যা করবেন না

• যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না।
• আপনার দ্বারা যেন প্রকৃতি ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেই দিকে খেয়াল রাখবেন।

ফিচার ইমেজ সাইমুন ইসলাম

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বৃষ্টি ভেজা বন্ধুর পথে চন্দ্রনাথ পাহাড় জয়ের কথকতা

প্রাচীন শহর মোহাম্মাদাবাদ বা বারোবাজারের আদ্যন্ত