নড়াইল নলামারা পদ্মবিল ভ্রমণ: প্রথম পর্ব

ছয়টা বাজতে না বাজতে লাফ দিয়ে উঠে বিছানা ছাড়লাম। আমাদের আজ পদ্ম বাগানে যাওয়ার কথা। আমরা বলতে আমি আর আসিফই দলের হোতা। আমরা দুজনই গ্রামের ছেলে কিন্তু পড়াশোনার তাগিদে শহরের ইট-কাঠের জঙ্গলে মুখ বুজে পড়ে রয়েছি। কিন্তু দুজনের মাথায় রয়েছে ঘোরাঘুরির পোকা।
আশেপাশে যত ঘোরার জায়গা আছে চষে ফেলেছি। অথচ বাড়ির কাছে যে একটি জলজ্যান্ত পদ্ম বিল রয়েছে, আর সেখানে পদ্মফুলের মাথায় হয়তো সাপ আর ভ্রমর খেলা করছে- তা চাক্ষুষ করা হয়নি। তাই এবার দুজনেই পরিকল্পনা করলাম, এই অপবাদ এবার ঘোচাতে হবে। সুতরাং শুরু হলো প্রজেক্ট পদ্ম বিল।

বিলের একাংশ; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

আমাদের হাতে দুইটা প্ল্যান। প্রথমত মির্জাপুর বিল থেকে অপেক্ষাকৃত কম দূরত্ব পাড়ি দিয়ে সেখানে যাওয়া যাবে। কিন্তু এই পথটি কচুরিপানা পুরু স্তরে পরিপূর্ণ। সেই কচুরিপানার দঙ্গল ভেদ করে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। তাই আমাদের যেতে হবে আরেকটি গ্রাম- রুখালী ঘুরে।
অচিন্ত্য আসিফদের বাড়ি ওদিকেই। তাই এবার তার ঘাড়েই পড়লো নৌকা ম্যানেজ করার দায়িত্ব। যাত্রা শুরু করতে করতে ঘড়ির কাটা নয়টা পেরিয়ে দশটা ছুঁয়েছে। রোদও বেশ তেতে উঠেছে। গতকাল বেশ ছায়া ছায়া ভাব ছিল। আজ কড়া রোদ। আমরা যাচ্ছি পাঁচ জন। আমি, অচিন্ত্য আসিফ, ইমু আর সজীব। আমরা নৌকায় গিয়ে বসলাম। আমার হাতে ক্যামেরা। আসিফ নৌকা বাইতে পারে না। অন্য তিনজনের দায়িত্ব বাইবার।
যাত্রাপথে; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

নৌকা যাবে রুখালি হয়ে খলিশাখালি গ্রামের ভেতর দিয়ে। নৌকার পাটাতনের উপর তিনখানা তক্তা দেওয়া। আমি তক্তার উপর গিয়ে বসলাম। সবাই নবিশ অথবা অনভ্যাসে বিদ্যা হ্রাস তত্ত্বের শিকার। তাই নৌকা চলতে লাগলো আস্তে। আর ক্যামেরা চলল মুহুর্মুহু। উপরে সূর্য আগুন ঢালছে, নিচে জেলেরা খালের ভেতর ভেসাল পেতে বসে আছে। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি জলের উপর।
জলের ভেতর একটা মাচার উপর থেকে লম্বা দুইখান বাঁশ কোনাকুনি করে নেমে গেছে জলের গভীরে। তার সাথে জাল লাগানো। মাছ তার ভেতর যাবে, জেলে আস্তে সেগুলো টেনে ডাঙ্গায় তুলবে। রুপালি মাছের রক্তিম তড়পানি জেলের মুখে সোনালি হাসি ফোটাবে। মূল গ্রামের বাইরে চলে এসেছি আমরা। রাস্তার দুপাশে বিচ্ছিন্ন বাড়ি। উদ্বাস্তু মানুষেরা এখানে গুচ্ছ গুচ্ছ ঘর তুলেছে। আমার হাতে ক্যামেরা দেখে অনেকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। আমি হাসিমুখে জিজ্ঞেস করলাম, “চাচা, মাছ কেমন পড়ছে?”
ভেসাল দিয়ে মাছ ধরছে জেলে; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

কয়েকটি ছেলেমেয়ে খালের জল দাপাদাপিতে অস্থির করে তুলেছে। খালের দুধার থেকে শিরিষ আর হিজল গাছের মেলা। সেগুলো হেলে পড়েছে খালের জলে। সেখানে ডালের পরে অলসভাবে বসে আছে সবুজরঙা মাছরাঙ্গা। মাঝে মাঝে তাদের লেজ সমেত সমস্ত শরীরটি চকিতের জন্য নাচের তালে নেচে উঠছে। আমি জানি, ওদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রয়েছে জলের তলায়। কখন পলকের জন্য সেখানে ঝলসে উঠবে রুপালী মাছের শরীর, আর অমনি সে ঝাঁপিয়ে পড়ে তীক্ষ্ণ ঠোঁট বিঁধিয়ে দেবে তার শরীরে।
আমরা এগিয়ে চললাম আস্তে আস্তে। খানিকপর সবাই একটা ব্রিজের নিচে থামলাম। জলখাবার সেরে আবার নৌকা চলল। গুচ্ছ গ্রামও শেষ। চারিদিকে শুধু জল আর জল। সেই জলের ভেতর থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে শাপলার দল। কয়েকজন তালগাছের ডিঙ্গিতে করে শাপলা তুলছে। সেগুলো বিকেলে হাটে বিক্রি করে দু পয়সা পকেটে পুরবে।
শামুক ধরার দৃশ্য; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

আরো কিছু মানুষ ছড়িয়ে রয়েছে বিলময়, হাতে লম্বা সরু হাত পাঁচেক লম্বা লাঠির মাথায় লোহার তার দিয়ে বোনা একটি ফাঁদ। ওরা শামুক ধরছে। এদিকের চাষিরা এখন চিংড়ি চাষে ঝুঁকেছে। এই শামুকগুলো সেই ঘের মালিকদের কাছে চলে যাবে- তারপর চিংড়ির উদরপূর্তির কাজে লাগবে। অপরিকল্পিত শামুক নিধনে পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। কিন্তু কে বোঝাবে এই প্রান্তিক ছিন্নমূল মানুষদের?
বিল জুড়ে শ্যাওলা, কচুরি পানা, বড়নখার ঝোপ। সেই ঝোপ থেকে উঁকি দিচ্ছে গাঢ় নীল রঙের ফুল। এই জংলি ফুলগুলো যে কোনো নার্সারিতে সাজিয়ে রাখা বিদেশী ফুলের থেকেও মনোলোভা। আর রয়েছে শোলা গাছ। গুচ্ছ গুচ্ছ শোলা গাছ তার মাথা ভর্তি হলদে ফুলের বাহার নিয়ে শুধু জলের উপর ভাসছে । আর উদর ভর্তি ডিম নিয়ে গর্ভবতী পুঁটি মাছগুলো সাঁতার কাটছে নৌকার আশেপাশে।
এটিই শোলাফুল; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

দিগন্ত দূরে দিক চক্রবালে বিলীন। এর ভেতর আমরা কয়েকজন সৌন্দর্য পিয়াসু যুবক অ্যাডভেঞ্চারের উদ্দেশ্যে ছুটছি। ছুটছে ছুটতে আমরা শেষে পৌঁছলাম পদ্ম বিলে। মাঝে আসিফ কয়েকবার সুর তুলল তার প্রিয় গিটারে, সজীব তার গলায় ভাটিয়ালীর ঢেউ উঠাল রুক্ষ অথচ দরদী সুরে।
উল্টোদিক থেকে একজন কৃষক নৌকা বোঝাই করে ঘাস নিয়ে বাড়ির দিকে ফিরছে। এই কড়া রোদে আমাদের পদ্ম বিলের দিকে যেতে দেখে অবাকই হলো। অবাক হওয়ারই কথা- রোদে গায়ের চামড়া পুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু না, সকল জ্বালা-যন্ত্রণা নিমেষেই নিভে গেল কিছুক্ষণ পরেই। সামনে অসংখ্য পদ্মফুল বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সে এক নৈসর্গিক দৃশ্য। কিছুক্ষণের জন্য সমস্ত পরিশ্রম হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
পদ্মফুল; সোর্সঃ অমিতাভ অরণ্য

আসিফ তো মনের আনন্দে তার গিটারে দুবার টুংটাং আওয়াজ তুলতে গেলো। কিন্তু অতি উত্তেজনায় তার হাত কাঁপছে। গান তেমন জমল না। আর জমবেই বা কীভাবে? গানে কি আর ছাই মন আছে! এমন স্বর্গীয় দৃশ্য দেখে মন আমাদের কল্পনায় ভেসে বেড়াচ্ছে! মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো। বাড়ির পুকুরে পদ্মের চাষ করতে হবে। কিন্তু সঙ্গীরা জানালো, এখল এই ফুলশুদ্ধু গাছ লাগালে নাকি বাঁচবে না। বর্ষার শুরুতে যখন নতুন গাছ গজাবে তখন সেই চারা তুলে নিয়ে যেতে হবে। আমি মনে মনে ভাবলাম, নেক্সট বর্ষায় আবার আসছি।
একপাশে হোগলার বন। এক মানুষ জলের তলা থেকে উঠে এসে জলের উপরে আরো সাত-আট হাত উঁচু হয়ে ঘন জঙ্গলের রূপ নিয়েছে। এই হোগলার ফুল (নাকি ফল) অদ্ভুত দেখতে হয়। একটা সরু কাঠির মতো লম্বা বৃন্তের মাথায় ব্রাশের মতো পুরু হয়ে আবির্ভূত হয় এগুলো।
বিরান বিলে গানের ভেলায়; সোর্সঃ অচিন্ত্য আসিফ

কিছুক্ষণের মধ্যে সেই নিরালা বিলে আগুনঢালা সূর্যের নিচে শুরু হলো আকুলকরা গানের আসর! সব ভূলে আমরা মেতে উঠলাম সুরের খেলায়। আর জাদুকরী কন্ঠ দিয়ে সেই তপ্ত রোদের মধ্যে আমাদের নাচালো বন্ধু অচিন্ত্য আসিফ। তারপর? তারপর যা হয়। কিছুক্ষণ ক্যামেরায় ক্লিকক্লিক শুরু হলো।
এমন সময় ইমু হঠাৎ আঁতকে উঠে হৈ চৈ করে উঠল। একটু হলেই নৌকা থেকে পড়ে যায় আরকি। অতি কষ্টে রেহাই পেলো সে যাত্রা। কিন্তু কাহিনী কি? উঁকি মেরে দেখতে গিয়ে আমাদেরই থরহরি কম্পমান। একটি বড়সড় সাপ ঠিক আমরা যেখানে নৌকা থামিয়ে রেখেছিলাম, তার পাশেই পদ্মপাতার উপর গুটিসুটি মেরে আমাদের দিকেই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রয়েছে।
কিন্তু ভালো করে দেখতেই বুঝলাম, ওটা একটি জলঢোড়া ছাড়া আর কিছুই নয়। বেচারি একটু মনের আনন্দে রৌদ্র বিলাস করছিলো, কিন্তু আমাদের হাহাকারেই বোধহয় কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে জলের তলায় ডুব দিলো।
পদ্মবিলে পদ্মহাতে; সোর্সঃ অচিন্ত্য আসিফ

কীভাবে যাবেন:

নড়াইলের নলামারা বিলের পদ্মবিলটি বেশ ছোট । তবে আশেপাশের অনবদ্য প্রাকৃতিক দৃশ্য আপনার সেই ঘাটতি পুষিয়ে দেবে। ঢাকা থেকে আপনি বাসে করে নড়াইল শহরে আসতে পারবেন সহজেই। সেখান থেকে মটরসাইকেল ভাড়া পাওয়া যায়। ভাড়ার মটরসাইকেলে করে আপনি মির্জাপুর, আড়পাড়া, বড়কুলো কিংবা রুখালী গ্রামে চলে আসবেন। খরচ পড়বে দেড়শো টাকার ভেতরে।
ভাড়ায় নৌকা খুব বেশি সহজলভ্য নয়- সবাই নিজেদের দৈনন্দিন কাজের জন্যই বিলে যায়। আপনাকে তাদের কাউকে সারাদিনের জন্য রাজী করাতে হবে।
ঢাকা থেকে রেলে নড়াইলের সাথে যোগাযোগ নেই।
Feature Image: chitnge.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

জায়ারমেকভেসাট : শিশুরাই চালায় যে রেলস্টেশন

টেকেরঘাটে স্বর্গবিলাসের ইতিবৃত্ত