ধ্বংসের অপেক্ষায় নকিপুর জমিদার বাড়ি

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় পৌঁছাতে খুলনা থেকে প্রায় চার ঘণ্টা লেগে গেল। এর মধ্যে মাত্র একবারই থেমেছিলাম আমরা, সেটাও চা খাওয়ার জন্য। সাতক্ষীরা শহরের প্রাণীসম্পদ অফিসের সামনে বেশ কয়েকটা চায়ের দোকান আছে। যখনই এ রাস্তায় যাই এখানে চা খেতে ভুলি না আমি। খুলনা থেকে রাস্তা পুরোপুরি ভালো ছিল না, বিশেষ করে সাতক্ষীরা পার হবার পর আমাদেরকে বেশ বুঝে শুনে চালাতে হয়েছে।

শ্যামনগর উপজেলা থেকে নওয়াবেঁকির দিকে যে রাস্তাটা গেছে সেটা ধরে মাত্র দুই কি.মি. এগুলেই পাওয়া যায় নকিপুর জমিদার বাড়ি। এ রাস্তাটা আবার একেবারে চকচকে নতুন। মোড়ের কাছে আসতেই চোখে পড়লো দোতলা ধ্বংসপ্রায় নকিপুরের জমিদার বাড়িটি। জমিদার হরিচরণ রায়চৌধুরীর বাড়ি এটি।

মূল ভবনের একাংশ ছবি লেখক

১৮৮৮ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল এ বাড়িটি। প্রচলিত আছে হরিচরণ রায়চৌধুরীর মাতা ছিলেন নিস্তারিণী, যিনি স্বপ্নযোগে ধন-সম্পদ পেতেন। এভাবেই গড়ে উঠেছিল প্রায় ২,০০,০০০ একর সম্পত্তির এই জমিদারি। বিশাল এ জমিদারি দেখাশোনার জন্য ভারতের হিঙ্গল থানা, সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ ও শ্যামনগর থানায় মোট সাতশ কাছারি ঘর (সরাইখানার মতো) স্থাপন করা হয়েছিল যেখানে থাকতো তার নায়েব আর গোমস্তরা।

কারুকার্য খচিত দেয়ালের অংশ ছবি লেখক

১৯১৫ সালে নিস্তারিণী মারা গেলে তার দুই ছেলে জামিদারি দেখাশোনা শুরু করেন। ইংরেজ শাসন আমলের শেষ দিকে ১৯৩৭ ও ১৯৪৯ সালে দুই ছেলেও মারা যায়। তারই এক বছর পরে ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথারও অবসান ঘটে। অবশ্য জমিদারের বংশধরেরা ১৯৭১ পর্যন্ত এখানে ছিলেন। যুদ্ধের সময় তারা সপরিবারে দেশত্যাগ করে আর কখনো ফিরে আসেনি। তখন থেকেই এ বাড়িটি পরিত্যক্ত।

দোতলায় উঠার কোন উপায় নেই ছবি লেখক

জমিদার বাড়ি দেখে রীতিমতো মুগ্ধ হয়ে গেলাম। বেশ বড় দুই তলা একটা বাড়ি। শোনা যায় মোট এক চল্লিশটা কক্ষ ছিল এ বাড়িতে। মূল ভবনটি ইংরেজি “এল” আকৃতির। এখন অবশ্য জীর্ণ-শীর্ণ অবস্থা। মূল ভবনটির দোতলার ছাদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বেশ কয়েকটা পরজীবি গাছ জন্ম নিয়েছে ভবটির উপরে, সে গাছগুলোর ডালপালা বেড়ে অক্টোপাশের মতো আঁকড়ে ধরেছে পুরনো দেয়ালগুলোকে। যেন ভবনের প্রাণবায়ু বের না হওয়া পর্যন্ত ছাড়বে না আর। কতদিন টিকে থাকতে পারে এ দেয়াল এখন সেটাই দেখার বিষয়। মূল আটটি পিলার এখনও ধরে রেখেছে ভবনের পূর্বের গৌরব।

আশ্রয় নিয়েছে ভাসমান মানুষেরাও ছবি লেখক

জমিদার বাড়ির বিশার মাঠে খেলাধূলা করছে স্থানীয় ছেলেপেলেরা। এগিয়ে এসে ভবনের দিকে গেলাম। কিছু কক্ষে আশ্রয় নিয়েছে ভাসমান কয়েকটি পরিবার। গরু পালনও হচ্ছে কয়েকটি কক্ষে। পুরো বিল্ডিংয়ের নিচের অংশটা মোটামুটি জঙ্গলে পরিণত হয়েছে। কয়েকটা কচু গাছ তো আমার চেয়ে লম্বা হয়ে উঠেছে। উপরে যাওয়ার সিঁড়িটা অবশ্য আছে। কিন্তু উপরে উঠে কোনোদিকে যাওয়ার উপায় নেই।

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এই রাজবাড়ি ছবি লেখক

একতলার ছাদ মোটামুটি খসে পড়েছে। দোতলার ছাদের কিছু অংশ অবশ্য অবশিষ্ট আছে। আর ছাদের উপর বেড়ে ওঠা পরগাছার জন্য আরেকটু বেশি আড়াল পাওয়া যাচ্ছে। সামনের এই অংশ ছাড়া এল আকৃতির এই বাড়ির লম্বালম্বি অংশ এখন একটি দেয়াল মাত্র। আর কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই এখানে। বাড়ির মূল্যবান জিনিসপত্র তো যুদ্ধের সময়ই হাওয়া হয়ে গেছে, এখন স্থানীয় গরীব লোকেরা এর ইট-কাঠ খুলে নিয়ে গিয়ে নিজের বাসায় লাগাচ্ছে।

পরগাছাগুলো চেপে বসেছে দেয়ালে ছবি লেখক

ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে কীভাবে এ বিশাল পুরাকীর্তি বিলীন হওয়ার জন্য দিন গুনছে। খুলনা অঞ্চলের নাম মনে আসলেই আমাদের মনে আসে বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ মসজিদের কথা। এরকমই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হবার সব কিছু এ বাড়িতে বিদ্যমান। অথচ অবহেলায় পড়ে থাকা এ জমিদার বাড়িটি নিশ্চিহ্ন হওয়া এখন শুধু সময়ের ব্যপার।

বাড়ির ঠিক সামনেই একটি পুকুর দেখতে পেলাম। সেদিকে হেঁটে এসে দেখলাম সেটার পাশেও পুরনো আমলের একটি নহবতখানা। আগের দিনে জমিদার বাড়িতে নহবতখানা মোটামুটি আবশ্যিক ছিল। এখানে বসে নওবত নামক সানাইয়ের মতো এক ধরনের বাজনা বাজানো হতো। এখনও সেই নওবতখানার দেয়াল রয়ে গেছে, যেটা এ বাড়ির প্রবেশদ্বার ছিল বোঝাই যাচ্ছে।

মাঠের ওপাশে দূর থেকে আরো দুটি স্থাপনা নজরে পড়লো। সেখানে গিয়ে দেখি ওই দুটো হচ্ছে জোড়া শিব মন্দির। পুরো জমিদার বাড়িতে এ দুটোর অবস্থায় সবচেয়ে ভালো বলা যায়। এর কারণ হচ্ছে এখনও পূজো চলে এ দুটি মন্দিরে। মন্দিরের ভিতরে উঁকি দিতেই এর প্রমাণ পেলাম। পূণ্যার্থীদের দেয়া বিভিন্ন উপহার সামগ্রী দেখা যাচ্ছে ভেতরে।

জোড়া শিব মন্দির ছবি লেখক

শান বাঁধানো পুকুরঘাটটাও দেখতে অনেক সুন্দর। কিছুক্ষণ সময় নিরবে ওখানে বসে পার করলাম আমরা। জোড়া শিবের মন্দির, একটি গাছ আর শান বাঁধানো পুকুরঘাট মিলে এ জায়গাটাই আমার কাছে বেশি পছন্দসই মনে হচ্ছিল। কল্পনায় ফিরে যেতে চাইলাম জমিদার হরিচরণ রায়চৌধুরীর আমলে। কেমন শান-শওকত ছিল তখন এ জায়গাটার সে দৃশ্য মনে মনে আঁকার চেষ্টা করলাম।

নহবতখানা ছবি লেখক

মনে মনে ভাবছিলাম এখনও যদি প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর একে রক্ষার কাজ শুরু করতো, এ বাড়িটি হতে পারত দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গের একটি সেরা আকর্ষণ। আরও কিছুক্ষণ ঘুরে ফিরে জমিদার বাড়ি দেখে আমরা ফিরে চললাম আমাদের আজ রাতের গন্তব্য বর্ষা রিসোর্টে। শ্যামনগরেও থাকার মতো হোটেল আছে, কিন্ত আমার কাছে শ্যামনগর থেকে প্রায় ১৫ কিমি দূরে সুন্দরবনের গাঁ ঘেষে তৈরী এই বর্ষা রিসোর্টে থাকতেই বেশি ভালো লাগে।

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা থেকে বেশ কয়েকটি গাড়ি চলে সরাসরি শ্যামনগর পর্যন্ত। এছাড়া সাতক্ষীরা এসে পরে শ্যামনগরের লোকাল বাসে করেও আসতে পারেন। সাতক্ষীরা সদর থেকে শ্যামনগর প্রায় ৭২ কিমি দূরে। রাতের বাস ছাড়ে গাবতলী থেকে, ভাড়া নন এসি বাসে ৫৫০ টাকা আর এসি বাসে ১,২০০ টাকা। বেশ কয়েকটি বাস চলাচল করে এর মধ্যে রয়েছে সোহাগ, এসপি গোল্ডেন লাইন, একে ট্রাভেলস ইত্যাদি।

থাকার জন্য বেছে নিতে পারেন হোটেল ম্যানগ্রোভকে। ভাড়া মোটামুটি ১,০০০-১,৫০০ টাকার মধ্যে। চাইলে শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নে গিয়ে দেখে আসতে পারেন সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্চের অংশ বিশেষ।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নো ম্যান্স ল্যান্ডের মেঘ-পাহাড়ে ভালোবাসা

সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সেরা ১৩টি ক্যাম্পিং সাইট