মহীশূর প্যালেস দর্শন

শিবসমুদ্র জলপ্রপাত দেখে আমরা যখন আবার মহীশূরের রাস্তায় উঠে আসলাম তখন পাহাড়ের উপর দিয়ে চলা ছোট্ট একটি রাস্তা দিয়ে হাইওয়েতে ফিরে আসতে হয়েছে। আমাদের এবারের গন্তব্য মহীশূর প্যালেস।

ছোটবেলায় দেখা দ্য সোর্ড অব টিপু সুলতান ড্রামা সিরিয়ালের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল খুব। আজ যাচ্ছি টিপু সুলতানের দেশে, ভাবতেই অন্যরকম লাগছিল।

প্রবেশপথ থেকে মহীশূর প্যালেস

শোনা যায় মূল প্রাসাদের গোড়াপত্তন হয়েছিল চতুর্দশ শতাব্দীতে ওয়েদার রাজবংশের হাত ধরে। কিন্তু টিপু সুলতান ক্ষমতায় আসার পর তিনি এই প্রাসাদ ধ্বংস করে দেন। সেই সাথে মহীশূর থেকে রাজধানী সরিয়ে নেন নজরাবাদে।

ইংরেজদের বিরুদ্ধে মোট চারটি যুদ্ধ হয় টিপু সুলতানের ও হায়দার আলীর। যার শেষ যুদ্ধে শের ই মহীশূর খ্যাত টিপু সুলতানের মৃত্যু হয় সেনাপতি মীর সাদিকের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে।

মহীশূর প্যালেসের মূল ফটক ছবি লেখক

এরপর ইংরেজদের ছত্রছায়ায় ক্ষমতায় আসেন রাজা কৃষ্ণরাজেন্দ্র ওয়েদার। ১৭৯৯ সালে তিনি মহীশূরকে রাজধানীতে উন্নীত করেন আর সে সময় প্রাসাদটি আবার তৈরি করা হয়। তবে বর্তমান প্রাসাদটি পুনর্নির্মিত হয়েছে ১৯১২ সালে। কয়েকবার পুড়ে যাওয়ায় ও ধ্বংস হবার কারণেই এটি বার বার নির্মাণ করা হয়েছিল। ব্রিটিশ একজন স্থপতি বর্তমান নকশাটি করে দেন।

প্রাসাদের রয়েছে মোঘল স্থাপত্যের ছাপ ছবি লেখক

মহীশূর শহরে প্রবেশ করেই আমরা একটি সাউথ ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁয় ঢুকে ভালোমতো নাস্তা করে নিলাম। চাপাতি (পরোটা) আর চিকেন ঝাল ফ্রাই দিয়ে বেশ ভালো নাস্তাই হলো। শহরের ঠিক কেন্দ্রস্থলেই মহীশূর প্যালেস।

প্রাসাদের অনেকগুলো গেটের একটার কাছে আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। টিকেটের মূল্য ৫০ রুপি। ভালো দিক হচ্ছে সবার, অর্থাৎ ভারতীয় হোক বা বিদেশি হোক প্রবেশ মূল্যটা সবার জন্য একই।

কামানগুলো যেন কালের স্বাক্ষী ছবি লেখক

মনে পড়লো তাজমহলের প্রবেশমূল্যের কথা। ভারতীয় নাগরিকদের জন্য তাজমহলের প্রবেশমূল্য ৫০ রুপি হলেও বিদেশির জন্য ৭৫০ রুপি। এখানে এ ধরনের কিছু নয়। মহীশূর প্যালেসও কিন্তু পর্যটকদের কাছে কম জনপ্রিয় নয়।

তাজমহলের পরে সবচেয়ে বেশি দর্শক আসে মহীশূর প্যালেস দেখতে। টিকেট কেটে ভেতরে প্রবেশ করেই বুঝতে পারলাম এটা একটা পার্শ্ব প্রবেশদ্বার। মূল প্রবেশদ্বারটাও দেখতে পেলাম, বেশ সুন্দর আর অনেক বড়। আগের যুগের মতোই রয়েছে হস্তিশালা। অনেকগুলো হাতিও দেখা যাচ্ছে।

ভেতরে ঢুকে নির্ধারিত জায়গায় প্রতি জোড়া ২ রুপিতে আমাদের জুতা জামা দিয়ে খালি পায়ে প্রাসাদে ঢুকে পড়লাম। প্রথমেই চোখে পড়লো হাতিকে সাজানোর বিভিন্ন উপকরণ। দক্ষিণ ভারতে হাতির সাজসজ্জাই অন্যরকম। হাতির শূড়ও সাজিয়ে দেয়া হয় সুন্দর করে।

মনে পড়লো কেরালা ভ্রমণের সময় চোখে পড়েছিল এরকম সাজানো হাতির, সেটা ২০১০ সালের কথা। প্রাসাদের মধ্যেে একটি বারান্দা দিয়ে হেঁটে আমরা যাচ্ছিলাম মূল প্রাসাদের দিকে। টাইলসগুলো দেখে অবাক না হয়ে পারা যায় না, এত সুন্দর।

টাইলস ও ভেতরের নকশা দেখার মতো ছবি লেখক

প্রাসাদের মূল দরবার কক্ষে ওঠার সিঁড়িতে এসে দেখলাম নিচে সারিবদ্ধভাবে রয়েছে কামানগুলো। ড্রামা সিরিয়ালে এগুলোর গর্জন দিয়েই শুরু হতো প্রতিটি পর্বের। এক সারিতে অনেকগুলো কামান, সেগুলো পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতে চোখে পড়লো একটি খোলা উঠোন।

চারদিকে কারুকাজ করা দেয়াল দিয়ে ঘেরা প্রাসাদের মধ্যেই এর অবস্থান। অল্প অল্প বৃষ্টি হচ্ছিল তখন, তবুও আমার খুব ইচ্ছে হলো ওই উঠোনে একবার যাওয়ার। দেখা গেল কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না সেখানে।

আসলে পুরো প্রাসাদের কোথায় কোথায় দর্শনার্থীরা যেতে পারবে সেটা নির্দেশিত আছে। এর বাইরে কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রাসাদের বেশ কয়েকটা গেট দেখলাম পিতলের তৈরি। সেগুলো বিভিন্ন কারুকার্যে ভরা।

এই প্রাসাদটি নির্মাণ করার সময় ভারতের বিভিন্ন আমলের বিভিন্ন সংস্কৃতির এক ধরনের সংমিশ্রণের মতো করে করা হয়েছে। আরেকটু আগাতেই চোখে পড়ল খাস দরবার। সাধারণত বিশেষ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সভাগুলো এখানে করা হতো। রাজাদের খুব কাছের লোকেরই শুধু প্রবেশাধিকার ছিল এই খাস দরবারে।

খাস দরবারের ছাদ ছবি লেখক

খাস দরবারের খুঁটিগুলো মোঘল আমলের ঐতিহ্য বহন করে। ছাদের আয়নাগুলো আবার ভিন্ন ধরনের কারুকার্য খচিত। মনে পড়লো এ ধরনের কারুকার্য আমি প্যারিসের নটরডেম গির্জায় দেখেছিলাম। খাস দরবারের পাশ দিয়ে ঘুরে আবার মূল দরবার হলে প্রবেশ করতে হয়।

বিভিন্ন সময়ে রাজাদের ব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিসও রাখা আছে। সেগুলো দেখে আমরা আবার মূল দরবার হলে ফিরে এলাম। প্রাসাদের এই অংশটা ছাড়াও পেছনে আবাসিক একটি অংশ রয়েছে, যেটা এখনও রানীর বংশধরদের মালিকানাধীন। সেখানে ঢুকতে আলাদা টিকেটও লাগে।

ভেতরের উঠান ছবি লেখক

দরবার হলটি বেশ বড়। এর মধ্যের খুঁটিগুলো অসম্ভব সুন্দর কারুকার্য করা। আর পুরো মেঝে সুন্দর সুন্দর টাইলস দিয়ে নির্মাণ করা। দরবার হলটি মূল ফটক বরাবর করা। অর্থাৎ রাজ সিংহাসনে বসেই পুরো দরবার হল সহ ফটক পর্যন্ত দেখতে পেতেন। আর দরবার হলের দু’পাশে গ্যালারির মতো করা আছে।

পদমর্যাদা অনুসারে গণ্যমাণ্য ব্যক্তিরা এই গ্যালারীতে বসতেন। কল্পনায় একবার দেখার চেষ্টা করলাম কেমন ছিল দরবারের কর্মপদ্ধতি। রাজা বসে আছেন সিংহাসনে, সেনাপতি ও অন্যান্য বিশেষ ব্যক্তিবর্গরা তার সামনে দু’পাশের সারিবদ্ধ চেয়ারে, সভাসদরা বসেছেন গ্যালারীতে। নিচে ফটক পর্যন্ত সারিবদ্ধ সৈন্যরা।

অসম্ভব সুন্দর প্রাসাদের ভেতরের অংশ ছবি লেখক

বাস্তবে ফিরে এসে এগিয়ে গেলাম। মূল দরবার হল থেকে বের হয়ে পেছনের আবাসিক অংশের জন্য ৪৫ রুপিতে টিকেট কেটে ভেতরে ঢুকে দেখলাম সে আমলে ব্যবহৃত কিছু জিনিসপত্র ছাড়া আসলে তেমন কিছু নেই। জায়গাটাও খুব ছোট। তার উপর ছবিও তুলতে দেয় না। মনে হলো না আসলেই পারতাম এখানে।

তার চেয়ে বাইরে বেরিয়ে বিশাল প্রাসাদটাকে একটু দূর থেকে ভালো করে দেখলেই পারতাম। সন্ধ্যার পরে এ প্রাসাদের লাইট এন্ড সাউন্ড শো হয়, যেটা খুবই বিখ্যাত। কিন্তু ভারতের স্বাধীনতা দিবসকে সামনে রেখে নিরাপত্তাজনিত কারণে বন্ধ রাখা হয়েছিল তখন। এর মধ্যেই আমার স্ত্রীর শরীর খারাপ হতে শুরু করলে মহীশূরে আর ঘোরাঘুরি না করে বেঙ্গালোর ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে হলো।

দরবার হল থেকে দেখা যাচ্ছে মূল ফটক ছবি লেখক

মহীশূর প্যালেস ছাড়াও সেখানে অনেকগুলো দেখার জায়গা ছিল যেগুলোতে আমরা আর যেতে পারিনি। এগুলো হচ্ছে বৃন্দাবন গার্ডেন, গীর্জা, বাঁধ, অন্য আরও ৬টি প্রাসাদ সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। ট্যাক্সির সাথে সেভাবেই সব ঘোরার জন্য ৩,৩০০ রুপিতে চুক্তি হয়েছিলো, কিন্তু কী আর করা ফিরে চললাম বেঙ্গালোরে। সকাল ৬:৩০টায় রওনা দিয়ে সন্ধ্যা ৭টায় ফিরে আসলাম বেঙ্গালোরে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ঈদ ভ্রমণ: লাল তাজ নয়, একটি মসজিদের সৌন্দর্যের টানে দিক পরিবর্তন

বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি রেল স্টেশনের গল্প