সোনালী প্যাগোডার দেশ মিয়ানমার ভ্রমণ: বাগানের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত

মাউন্ট পপা থেকে ফিরে এসে দুপুরে খেয়ে ঘণ্টাখানেক বিশ্রাম নিয়ে হোটেল থেকে বের হলাম আমরা। প্রায় প্রতিটি হোটেলের নিচেই শোভা পাচ্ছে অনেকগুলো ইলেকট্রিক বাইক। পর্যটকদের ভাড়া দেয়ার জন্য রাখা হয়েছে। এরকম একটা দোকানে ঢুকে ভালোমতো দেখে শুনে অর্ধেক দিনের জন্য বাংলাদেশি টাকায় ৩০০ টাকা দিয়ে ভাড়া করে ফেললাম একটা বাইক। এরপর দুজন মিলে রওনা দিলাম মন্দির দেখার উদ্দেশ্যে।

মন্দিরের মাঝে লেখক ছবি তারিক হাসান

মাত্র ৪৯ কিমি এলাকা বাগানের। এর মধ্যেই আছে অন্তত ২,২০০ মন্দির। এর বেশির ভাগই নির্মিত হয়েছে নবম থেকে ত্রয়োদশ শতকের মধ্যে। বাগানের পূর্বনাম ছিল পাগান, নবম শতকের মাঝামাঝি গড়ে ওঠে এ শহরটি। সে সময় অন্তত ১০,০০০ মন্দির স্থাপন করা হয়েছিল এ নগরীতে, যার বেশিরভাগই কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে। বিশেষ করে ১৯৭৫ সালের ভূমিকম্পে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এ অঞ্চলে। পর্যটকদের পছন্দের তালিকার শীর্ষে থাকার কারণে মিয়ানমার সরকার টিকে থাকা মন্দিরগুলো সংস্কার করার কাজ শুরু করে। শুধু ইউরোপ বা আমেরিকা না, বৌদ্ধ ধর্মের পবিত্র জায়গা হবার কারণে চীন, থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো থেকেও অনেক পর্যটক আসে বাগানে।
বড় মন্দিরগুলোর একটাতে ঢুকি আমরা ছবি লেখক

আমরা যখন রওনা দেই তখন বিকেল হয়ে গেছে। মূল বাগানের রাস্তায় কিছুদুর যেতেই দৃশ্যমান হতে শুরু করে মন্দিরগুলো। প্রাচীন অধিকাংশ এ মন্দিরগুলোর সাথে আমাদের দেশের মোঘল স্থাপনার কিছুটা মিল আছে। অধিকাংশই লাল রংয়ের, তবে সাদা রংয়ের কয়েকটি মন্দিরও দেখা যাচ্ছে মাঝে মাঝে। আমরা মূল রাস্তা ছেড়ে মাটির রাস্তায় নেমে পড়লাম। মন্দিরের কোনো অভাব নেই, এমনও জায়গা পেলাম এক সাথে ৮-১০টি মন্দিরও আছে।
গুগল ম্যাপ আমাদেরকে উল্লেখযোগ্য মন্দিরগুলো দেখাচ্ছিল। বেশ বড় সড় একটাতে ঢুকে বুদ্ধদেবের মূর্তি দেখে আসলাম। তবে আসল ইচ্ছেটা পূরণ হয়নি, ইউটিউব ভিডিওতে দেখেছিলাম একটা মন্দিরের ছাদে উঠে বসে আছে পর্যটকরা। এরকম একটা মন্দির কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। অবশেষে বেশ ভেতরে ছাদে ওঠা সম্ভব এরকম একটা মন্দির পেলাম। তবে আমাদের বাইক রেখে যেতে হয়েছে খানিকটা দূরে, ভয়ের কিছু নেই, কারণ চুরি নেই বললেই চলে এ এলাকায়।
ছাদে উঠার মজাই আলাদা-ছবি লেখক

মন্দিরের ভেতরে ঢুকে উপরে ওঠার পথ খুঁজে বের করলাম, মনে করে খালি পায়েই উঠলাম উপরে। চারদিকে অনেকগুলো মন্দিরের মাথা দেখা যাচ্ছে, আমরা দুজন ব্যস্ত হয়ে পড়লাম ফটোসেশনে। এর মধ্যে দূর থেকে দুই মেয়েকে আসতে দেখলাম, কাছাকাছি এসে চিৎকার করে জানতে চাইলো কোন দিক দিয়ে উঠলাম। দেখিয়ে দেবার পর ওরা দুজনও উপরে উঠে আসলো।
দুজনই আমেরিকার পর্যটক, অনেক্ষণ ধরে উপরে ওঠার মতো মন্দির খুঁজে বেড়াচ্ছিল, দূর থেকে আমাদের দেখে এদিকে এসেছে। কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে বিদায় নিলাম আমরা।  সন্ধ্যা হয়ে আসছে, আমাদেরকে সূর্যাস্ত দেখা যায় এরকম একটি মন্দির খুঁজে বের করতে হবে। বুদ্ধি করে গুগল ম্যাচে সার্চ দিতেই দুই কিলোমিটার দূরের সবচেয়ে জনপ্রিয় সূর্যাস্ত দেখার মন্দির দেখিয়ে দিল।
এরকম ছায়া দেখলে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম ছবি লেখক

গুগল প্রদর্শিত পথে রওনা দিয়ে বুঝলাম কী বোকামি করেছি, পুরো ফসলের ক্ষেতের মধ্য দিয়ে রওনা দিয়েছি আমরা। এবড়ো থেবড়ো সে পথে ঝাঁকি খেতে খেতে যাচ্ছি মন্দিরের দিকে, হাতে সময়ও নেই যে মূল রাস্তা দিয়ে ঘুরে যাবো। অবশ্য মিনিট দশেকের মধ্যেই সেই মন্দিরের দেখা মিলল। মন্দিরের উপরের অংশে ৩৬০ ডিগ্রী ভিউ দেখা যায়, তাই এ মন্দিরেই ভিড় করেছে অনেক পর্যটক। অন্তত দু’শ বাইক মন্দিরের নিচে পার্কিং করা, গাড়ী ও ঘোড়ার গাড়ীরও অভাব নেই। সূর্য অস্ত যাবে আয়াওয়ার্দী নদীর উপর দিয়ে। আমরা সেদিকের একটা সুবিধামতো জায়গা খুঁজে নিয়ে বসে পড়লাম।
আমাদের পাশে রয়েছে হংকংয়ের একজন পর্যটক, আজ বেশ কয়েকবার তার সাথে দেখা হয়েছিল অন্যান্য মন্দিরে। বসে বসে গল্প করছিলাম আমরা এর মধ্যেই বাগানের গোধূলীলগ্নের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ চলে আসলো। যতদূর দৃষ্টি যায় মন্দির আর মন্দির। বেশির ভাগ লাল রঙের হলেও কিছু কিছু সাদা ও সোনালীও দেখা যাচ্ছে। অস্তাগত সূর্য তার শেষ আভাটা দিয়ে যেন রাঙিয়ে দিয়েছে মন্দিরগুলোকে। নদীর উপর দিয়ে দিগন্তে দেখা যাচ্ছে পর্বতসারি। এর মধ্যে আস্তে আস্তে অস্তমিত হচ্ছে সূর্য, এ দৃশ্য সারাজীবন মনে রাখার মতো, কোনো ক্যামেরার সাধ্য নেই এর সত্যিকারের রূপ তুলে ধরার।
সূর্যাস্ত ছবি লেখক

একসময় অন্ধকার হয়ে এলো, পর্যটকরা সব নেমে পড়ছিল, আমরাও নেমে পড়লাম। ফেরার পথে স্থানীয় এক রেস্তোরাঁয় রাতের খাবার খেয়ে ফিরে এলাম আমাদের হোটেলে। তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়তে হবে, কারণ ভোর হয় ৫:৩০ এ, সূর্যোদয় দেখতে হলে ভোর ৫টায় রুম থেকে বের হতে হবে। ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম আমরা। ঠিক সাড়ে চারটায় ঘুম থেকে উঠে তাড়াতাড়ি হাত মুখ ধুয়ে নিচে নামলাম।
সিকিউরিটি গার্ডকে ঘুম থেকে উঠিয়ে রওনা দিলাম আমাদের আগের বাইকটা নিয়ে। অন্ধকার কাটতে শুরু করেছে, গতি বাড়ালাম আমরা। পথে অনেক পর্যটকদের দেখলাম, সবাই ছুটে চলেছে। প্রথমে ভেবেছিলাম আগের মন্দিরেই যাবো, সময়ের অভাবে আবার গুগলের সাহায্য নিয়ে কাছাকাছি একটি মন্দির খুঁজে বের করলাম।
সূর্যোদয় ছবি লেখক

আগেরটার মতো বড় ও উঁচু না হলেও একেবারে খারাপ না। আশেপাশে অনেক মন্দির দেখা যাচ্ছে, তবে পর্যটকরা এটাতেই উঠছে যার অর্থ এটার ভিউ সবচেয়ে ভালো হবার কথা। উপরে উঠে পড়লাম আমরা। এবারের দৃশ্যপট আলাদা, মন্দিরগুলো আবছা আবছা দেখা যাচ্ছিল, সূর্য ওঠার আগেই মনে হলো কেউ যেন সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিচ্ছে একের পর এক। আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হলো সবগুলো মন্দির।
সেই সাথে ভোরের আলোয় এক অসাধারণ দৃশ্যের অবতারণা করলো। এই একটি দৃশ্য দেখতেই মিয়ানমার আসা। কত শত ছবি আর ভিডিও দেখেছিলাম বাগানের, আজ নিজের চোখে দেখার সৌভাগ্য হলো। একসময় সূর্য পুরোপুরি উঠে গেলে রোদ ছড়িয়ে দিল চারদিকে, সকালের স্নিগ্ধ আবহাওয়া এখন আর নেই, গরমই লাগছে আসলে। মন্দির থেকে নেমে ফিরে চললাম আমরা। বাগানের বিখ্যাত সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয় দেখা শেষ।
ফিচার ছবি: তারিক হাসান

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শ্রীকৃষ্ণ আচার্যের ১৬ হিস্যার জমিদারি 'মুক্তাগাছার জমিদারবাড়ি'

E T B এর ইভেন্ট: মহামায়ায় কায়াকিং এবং বোয়ালিয়া ট্রেইলে ঝর্ণাভিযান