খোজার হাট: যশোরের এক আদর্শ গ্রাম

জীবনের প্রথম ১৮টি বছর আমার গ্রাম খোজার হাটে কাটিয়েছি। তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য চলে এলাম রাজধানী ঢাকায়। সে বেশ কয়েক বছর আগের কথা। তারপর আর স্থায়ীভাবে গ্রামে ফিরে যাযইনি। এখন আমি নিজের জন্মভিটায় কালেভদ্রে অতিথি হই। বছরের দুই ঈদে নিয়ম করে যাওয়া হয় গ্রামে। এর বাইরে বিশেষ কোনো প্রয়োজন হলে মাঝেমধ্যে হয়ে যায় কোনো ঝটিকা সফর।

বুড়ি ভৈরব নদীর একাংশ। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

গ্রাম মানেই আমার কাছে মা ও মাটির গন্ধ। দাদাভাইয়ের শুভ্র দাড়ি, শৈশবের মাঠ, খেজুর গাছ, বুড়ি ভৈরব নদী, বটতলার আড্ডা আর শৈশবের স্মৃতি। বাড়ি ফেরার জন্য শ্যামলী, কল্যাণপুর অথবা গাবতলী থেকে যশোর – খুলনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া কোনো দূরপাল্লার বাসে চেপে বসলে শুরু হয় আমার সোনালী শৈশব ভ্রমণ। তারপর বাস যখন একটু একটু করে এগিয়ে চলে ক্রমশ আমার শৈশবের স্মৃতিগুলো ভিড় করে মনে। পদ্মা নদী পার হয়ে দু’পাড়ের সবুজ কেটে কেটে বাসটা যখন যশোর গিয়ে পৌঁছায় আমি যেন স্মৃতিময় কৈশোরে পৌঁছে যাই। এরপর বাড়ির সিংহ দরজা খুলে যখন মায়ের বুকে আছড়ে পড়ি আমি যেন শৈশবেই ফিরে যাই।
বিশেষ প্রয়োজনে এমন কোনো সফরে যখন গ্রামে যাই তখনই কেবল গ্রামের মানুষের সাথে দেখা হয়, কথা হয়, চায়ের দোকানে আড্ডা হয়। আজ আপনাদের বলবো আমার গ্রামের কথা।
খোজার হাটের নদী ভৈরবের উত্তরাংশ। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

আমার গ্রামের নাম খোজার হাট। যশোর শহর থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার উত্তরে কাশিমপুর ইউনিয়নে আমার গ্রাম অবস্থিত। যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়কের চুরামনকাঠি বাজার থেকে পূর্ব দিকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার পথ এগোলেই বুড়ি ভৈরব নদীর পাড়ে দেখা মিলবে খোজার হাট গ্রামের। এই গ্রামের নাম এবং উৎপত্তি নিয়ে সঠিক কোনো ইতিহাস জানা যায় না। তবে কিংবদন্তী আছে বেশ।
খোজার হাট ও ঘোনা গ্রামের সংযোগ সেতু। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

বুড়ি ভৈরব নামে যে মরা শুকনো নদীর পাড়ে খোজার হাট গ্রামের অবস্থান এই নদীতে একসময় বড় বড় জাহাজ চলত। দূরের বণিকেরা ব্যবসার মালামাল নিয়ে যাবার সময় এখানে নোঙর করে কিছু সময় জিরিয়ে নিত। জনশ্রুতি আছে, বণিকদের কাছে বিক্রির জন্য চা-পান-বিড়ির দোকান দিয়েছিল স্থানীয় কয়েকজন মানুষ। চা-পান-বিড়ির দোকান দেখে জাহাজ ও নৌকার আনাগোনা আরো বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে একসময় কাঁচা সবজি ও মাছের হাট বসে।
হাটখোলা; খোজার হাটের বাজার। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

তারপর কালক্রমে নদী ছোট হতে হতে একসময় বড় নৌকা ও জাহাজ আসা বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু রয়ে যায় এই চা-পান-বিড়ি আর কাঁচা সবজির হাট। বহুযুগের ব্যবধানে নদী জায়গা বদল করলেও এখনো টিকে আছে সেই হাটখোলা। আবার অন্য আরেকটি গল্প প্রচলিত আছে। খোজার হাটের হাট যেখানে বসে এই জায়গাটি একসময় ঝোপঝাড় আর বন-জঙ্গলে পূর্ণ ছিল। তারপর স্থানীয় কয়েকজন চাষী ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে এখানে কাঁচা সবজি আর মাছের হাট বসায়। তারপর আশপাশের গ্রামের লোকজন এই হাটে আসতে শুরু করে। এভাবে কালক্রমে জমজমাট হয়ে ওঠে খোজার হাটের হাটখোলা। এখনো প্রতি শনি ও বুধবার এখনও হাট বসে।
খোজার হাটের উৎপত্তি, হাটখোলার সবজি হাট আর দাদা ভাইয়ের সাথে আমার মধুর সব স্মৃতি নিয়ে ‘হাটখোলা’ নামে আমি একটি গল্পও লিখেছি। আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ দ্বন্দ্ব ও পথের খেলায় এই গল্পটি আছে।
সন্ধ্যার হাটখোলা। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

খোজার হাটে কখনো বেড়াতে এলে গ্রামে ঢোকার শুরুতেই বুড়ি ভৈরবের অপার সৌন্দর্য আপনার হৃদয় হরণ করে নেবে। কয়েক বছর আগেও এই নদীর উপর একটি ছোট্ট পুল ছিল। সাম্প্রতিককালে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় নদীর উপর একটি বড় ব্রিজ তৈরি করেছে। এই ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে দু’ধারের সবুজের দিকে তাকালে আপনি আর চোখ সরাতে পারবেন না।
ভৈরব নদীর যে সবুজ সৌন্দর্য আপনার অবুজ আবেগ জাগিয়ে তুলবে। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

চুড়ামনকাঠি বাজার থেকে রওনা হয়ে ঘোনা গ্রাম পার হলেই বুড়ি ভৈরবের ওপারে খোজার হাট গ্রাম। গ্রামে ঢুকে শুরুতেই আপনার চোখে পড়বে একটি সার্বজনিন মন্দির। মন্দিরের পাশে সগৌরবে দাড়িয়ে আছে প্রায় ২০০ বছর পুরনো একটি বটগাছ। শৈশবে স্কুলে পড়াকালীন আমি দেখেছি, এই বটগাছে পঞ্চাশের অধিক মৌমাছির চাক ছিল। গাছটা এত বড় আর বিশাল ছিল যে ভরদুপুর বেলাও গাছের নিচে সূর্যের দেখা মিলত না। গত ২০ বছরে শুধু গ্রামের চেহারাই পাল্টে যায়নি, ভেঙে গেছে এই বিশাল বটগাছের সবকটি বড় ডাল!
খোজার হাটের ২০০ বছরের অধিক বয়সী বটগাছ। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

মন্দিরের সামনে থেকে বাঁ দিকে একটি রাস্তা চলে গেছে খোজার হাট বাজারে তথা হাটখোলায়। অন্য একটি রাস্তা ডান দিক দিয়ে চলে গেছে কাশিমপুর গ্রামে। ডানদিকের এই রাস্তা ধরে পাঁচ মিনিট হাঁটলেই আমার বাড়ি।
খোজার হাটের শনি বুধবারের হাটখোলা তার জৌলুস হারালেও স্থানীয় বাজারটা এখনো টিকে আছে। যদিও মহাসড়কের পাশের চুড়ামনকাঠি ও বারীনগর বাজার ক্রমশ বিস্তৃত হওয়ায় খোজার হাটের বাজার ততটা বিস্তৃত হওয়ার অবকাশ পায়নি। তাছাড়া যশোর শহর খুব কাছে হওয়ায় গ্রামের হাট এখন আর স্থানীয়দের কাছে ততটা গুরুত্ব পায় না।
খোজার হাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়, যশোর। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

শিক্ষা-দীক্ষায় খোজার হাট অনেক আগে থেকেই এগিয়ে। ছোট্ট এই গ্রামটিতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসা এবং খুব সাম্প্রতিককালে একটি কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বলার অবকাশ রাখে না এখানকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয় দিয়েই আমার শিক্ষা জীবন শুরু।
গ্রামের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা যদি বলতে হয় তবে অত্র অঞ্চলের মধ্যে খোজার হাট একটি মডেল গ্রাম। ১৯৯২ সালে ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙার পর সারা দেশে সাম্প্রদায়িক উস্কানি ছড়িয়ে পড়লেও তার ছিটেফোঁটাও এই গ্রামকে স্পর্শ করতে পারেনি। দূরের লাঠিয়ালরা মন্দির ভাঙতে এলে স্থানীয় মুসলমানরা বুক পেতে তা রক্ষা করেছিল। খোজার হাটে চারটি মসজিদ, তিনটি মন্দির ও একটি ঈদগাহ রয়েছে। রয়েছে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক ও একটি শহীদ মিনার।
খোজার হাট মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শহীদ মিনার। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

শুধু শিক্ষা-দীক্ষা এবং ঐতিহ্যে নয়, খোজার হাটের মানুষ এখন আটলান্টিকের ওপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামের স্কুল মাঠে রোজ বিকেলে নিয়ম করে ছেলেরা ফুটবল খেলে। মনে পড়ছে, একসময় বিবাহিত আর অবিবাহিতদের মধ্যে চলত প্রীতি ফুটবল ম্যাচ। এখনও মাঝে মধ্যে চলে এমন আয়োজন।
খোজার হাটের খেলোয়াড় ছেলেরা। ছবি: খোজার হাট ক্লাব (ফেসবুক গ্রুপ)

বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে যখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং পরস্পরের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে তখন খোজার হাটের মানুষ পার্শ্ববর্তী মিরাপুর গ্রামের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একসাথে ঈদের নামাজ আদায় করে। প্রায় ৫০ বছরের অধিক সময় ধরে খোজার হাটে আয়োজন করা হয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শ্রীকৃষ্ণের নাম কীর্তন অনুষ্ঠান ‘নামযজ্ঞ’। দেশ-বিদেশের বহু দর্শনার্থী এবং কৃষ্ণভক্তরা এই অনুষ্ঠানে শামিল হয়।
খোজার হাটের ৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী নামযজ্ঞ। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

খোজার হাটের একটি বাড়িও পাবেন না যে বাড়িতে কোনো ফলের গাছ নেই। ফলের মৌসুম এলে আপনি যেকোনো বাড়ি থেকে সুস্বাদু সব ফল খেয়ে আপ্যায়িত হতে পারবেন। নিজের গ্রামের কথা লিখতে থাকলে এই নিবন্ধ কেবল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হবে। সুতরাং আজ এ পর্যন্তই।
ঐদের জামাত শেষে খোজার হাট ও মিরাপুরবাসী। ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

আসবেন আমার গ্রামে? খোঁজার হাটে চলে আসুন একদিন। অপার সৌন্দর্য দর্শন আর ফল খাওয়ার আমন্ত্রণ রইল।
ফিচার ইমেজ- মোস্তাফিজুর রহমান

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিশ্বের আকর্ষণীয় কয়েকটি সড়ক

অযোধ্যা মঠ: ইটে গাঁথা এক প্রাচীন শৈল্পিক স্থাপত্য