মুন্নারের কফি, মসলা ও আয়ুর্বেদিক বাগানের গল্প

এত অল্প সময় নিয়ে অন্য কোথাও যাওয়া গেলেও, কেরালা অন্তত যাওয়া উচিৎ নয় কারো। কিন্তু আমরা এটাই করেছিলাম, মাত্র দুই দিনের জন্য কেরালা গিয়েছিলাম। ওই আর কী, জীবনে প্রথমবার কোনো পাঁচ তারকা হোটেলের রিসেপসনে গিয়ে না বসেই আবার ফিরে আসার মতো! পিছনে ফিরে ফিরে বারে বারে ভিতরে ঢুকতে না পারার আক্ষেপে পোড়ার মতো। আমাদের মুন্নারের গল্পটা ঠিক এমনই বারবার পিছন ফিরে তাকিয়ে আফসোস করার মতো করে ছবি দেখে দেখে মন খারাপ করে দেয়ার মতো।

মসলা শ্রমিক। ছবিঃ qph.fs.quoracdn.net

হোটেল রিসেপশন থেকে পথে ফিরে যেতে যেতে হুট করেই যেমন চোখে পড়ে দুর্লভ কোনো সাজানো বাগান, সবুজ ঘাসের মখমলে মোড়ানো কোনো মন মাতানো লন বা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকা কোনো উন্মুক্ত অ্যাকুরিয়ামের মতন একটু ঢুঁ দিয়ে আসি, ঠিক তেমনি করেই মুন্নার থেকে ইরনাকুলাম (কোচিন) ফেরার পথে ঢুঁ মেরে ছিলাম দুর্লভ এই মসলা বাগানে। মুন্নারের বিখ্যাত একটা মসলার অরণ্য!

মসলা বাগানে। ছবিঃ steemitimages.com

আমাদের সিএনজি চালক বিটটু যখন এই মসলা বাগান ঘুরে দেখার প্রস্তাব দিল, আমি তখন গায়েই মাখিনি কথাটা। শুনেও না শোনার ভান করে ছিলাম কিছুক্ষণ। ভেবেছিলাম এইটা ব্যাটার কোনো একটা অতিরিক্ত টাকা কামানোর ধান্দা বোধহয়! একটা বাগান দেখতে জনপ্রতি ১০০ রুপীর টিকেট শুনে তেমন মনে হওয়াই স্বাভাবিক। তবুও, যেহেতু ফিরে যাচ্ছি নাহয় একটু ঢুঁ মেরেই দেখি আর কাঞ্জিভরমের দোকানও আছে সাথে! ছেলের মা তার সুপ্ত ইচ্ছার কথা জানালো। তাই সে আর ফেলি কী করে!

তাই অটো থামিয়ে ১০০ রুপী করে দুই জনের টিকেট কেটে ফেললাম। টিকেটের সাথে একজন গাইড দিল যে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পুরো মসলার অন্য রকম এক অরণ্য দেখাবে আর কোনটা কোন মসলা, কীভাবে সেই মসলা পাওয়া যায় গাছ থেকে সেটা বুঝিয়ে দেবে। বেশ ভালো। মনের মতো কাঞ্জিভরম না পেয়ে গাইড নিয়ে মসলার অরণ্যে ঢুকে পড়লাম।

বাগানের ভিতরের কটেজ। ছবিঃ res.cloudinary.com

ঢুকতে না ঢুকতে, শুরুতেই চমকে দিল গাইড লবঙ্গর গাছ দেখিয়ে! কী দারুণ জীবনেও দেখিনি বা দেখের কথাই ভাবিনি এমন দুর্লভ কিছু দেখলে প্রথমে কেমন যেন একটা হতভম্ব অবস্থা হয়, ঠিক তেমনই হয়েছিল। কী দারুণ ছোট্ট গাছের সাথে গায়ে গায়ে লবঙ্গ ধরে আছে। এরপর চিনামন গাছের সবুজ আর একটা মাদকতাময় গন্ধ চারদিকে।

গোল মরিচ, দারুচিনি, নানা রকম নাম না জানা মসলার গাছ একে একে গভীর অরণ্যের মাঝে আপন খেয়ালে বেড়ে উঠছে, গাছের তলায় ঝরে পড়ে আছে, শুকিয়ে গেছে দুই একটা। কোথাও আবার নতুন গাছ গজিয়েছে গাছের বীজ পড়ে গিয়ে।

সবচেয়ে মজা লেগেছে কফি গাছ, কফির ঝুলে থাকা, সবুজ, হলুদ আর টকটকে লাল কফির ফল দেখে, যা এক সময় পরিপক্ক হয়ে প্রায় কালচে হয়ে যায়। কফি ফল হাতে নিয়ে ভেঙে দেখলাম, কী দারুণ গন্ধ তার। গাছের ডালে ডালে কফি ফল ঝুলে আছে থোকা থোকা। এই বাগানে সবচেয়ে বেশী আছে সাদা এলাচির গাছ। অনেকটা বড় বড় ঘাসের মতো গাছ।

মাটির সাথে ধরে থাকে সাদা এলাচি থোকা থোকা আর দেখেছি কারি পাতা, কেরালার যে কোনো রান্নায় যা অনিবার্য। অনেকটা আমাদের পেঁয়াজ মরিচের মতো। আর কিছু থাকুক না থাকুক সকল রান্নায় কারি পাতা থাকবেই। দেখতে দারুণ লাগে, বিশেষ করে মাছ ভাজার সাথে। দেখেছি জয়ত্রী, জয়ফল আর জইন গাছের সমারোহ। আরও কত রকমের যে আয়ুর্বেদিক গাছে গাছে ভরা অরণ্য সেসব নাম শুনেই মুখস্ত রাখা সম্ভব হয়নি।

গাছে ঝুলছে কফি ফল। ছবিঃ bakimliyiz.com

বিশাল বিশাল যেন শত বছরের পুরনো গর্জন আর শাল গাছের মাঝে মাঝে এসব নানা রকম মসলা ও আয়ুর্বেদিক গাছের সম্ভারে সাজানো এক অন্যরকম অরণ্য। আমাদের দুর্ভাগ্য, ভীষণই দুর্ভাগ্য বলতে হবে। কারণ আমাদের সময় ছিল না, একদম ছিল না বলেই সেই মসলা বাগানের গভীর অরণ্য ধরে যাওয়া যায় বেশ কয়েক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত যেখানে শুধু কফির বাগান আছে পাহাড়ের পরে পাহাড় জুড়ে।

আছে হাতে হাতে কফি তৈরির প্রক্রিয়া দেখার উপায়, ছিল সদ্য তোলা কফির ফলকে গুড়ো করে একদম তরতাজা কফির মাদকতার স্বাদ নেবার দুর্লভ উপায়! শুধু ছিল না আমাদের সময়! ছিল কফির প্রক্রিয়াজাতকরণ ফ্যাক্টরি এবং তা নিজ চোখে দেখার সুযোগ, শুধু ছিল না হাতে হতভাগ্য সময়।

যে কারণে ভীষণ মন খারাপ করে ফিরেছিলাম সেই মসলা ও আয়ুর্বেদিক বাগান থেকে, সবুজে ঘেরা ঘন অরণ্য আর মসলার সম্মোহনী গন্ধের বাগান থেকে, মাদকতা ছড়ানো কফির অমোঘ আকর্ষণ থেকে বেরিয়েছিলাম অনেকটা কষ্ট নিয়ে। কিছুই যে করার ছিল না আমাদের।

অবশেষে একটু মন ভোলাতে সেই অরণ্যর গেটের বাইরে থেকে কিনে নিয়েছিলাম সেখানেই সদ্য তৈরি করা আইসক্রিম আর চকলেট। কী যে অপূর্ব তার স্বাদ যেন এখনো জিভে লেগে আছে! সত্যি এত মজার আইসক্রিম আগে কোনোদিন খাইনি। আইসক্রিমের কোমল আর শীতল শরীরে মুখ দিয়ে ভুলে গিয়েছিলাম অরণ্যের আক্ষেপ, মসলা বাগানের কষ্ট আর কফির অরণ্যের হতাশা। আমাদের সিএনজিতে উঠে ধরেছিলাম বাস স্ট্যান্ডের পথ।

অরন্যের পথে ধরে… ছবিঃ nishantravels.com

সবার জন্য বলছি কেরালা আর কেরালা থেকে মুন্নার গেলে অবশ্যই একটি দিন হাতে রাখবেন মুন্নারের এই মসলা আয়ুর্বেদিক বাগান দেখার জন্য। সদ্য বানানো কফি, চকলেট আর আইসক্রিমের অপূর্ব স্বাদ নেবার জন্য, এমন দুর্লভ একটি অরণ্য সময় নিয়ে ঘুরে দেখার জন্য, উপভোগের জন্য আর স্মৃতির এ্যালবামের কয়েকটি দুর্লভ ছবি তুলে রাখার জন্য।

কলকাতা থেকে কেরালা যেতে আছে ট্রেন, সময় লাগে প্রায় ৩৮-৪০ ঘণ্টা। আছে প্লেন কোচিন পর্যন্ত। আর কেরালা থেকে মুন্নার যেতে হয় বাস বা ট্যাক্সিতে করে। দূরত্ব ১২৫-১৩০ কিলোমিটার। সময় লাগে ৪-৫ ঘণ্টা। মুন্নার যেতেই অল্প দূরত্ব আগে এই মসলা আর আয়ুর্বেদিক বাগান। ফেরার পথে দেখাই বেশী ভালো হবে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের বিলাসী বিকেল

পানথুমাই: এক অলস দুপুরের গল্প