শ্রীকৃষ্ণ আচার্যের ১৬ হিস্যার জমিদারি 'মুক্তাগাছার জমিদারবাড়ি'

জমিদারবাড়ি আর প্রসিদ্ধ খাবার, দুটো জিনিসের প্রতিই আমার দুর্বার টান। দুটো যখন একসাথে জোট বাঁধে, তখন তো সে জায়গাটিকে কিছুতেই অপেক্ষা করিয়ে রাখা যায় না। তাই আবারোও ছুটে এলাম ধান-নদী-মহিষের সিং এই তিন মিলে গড়া ময়মনসিংহে। সেই সাথে মুক্তাগাছায়। আগেরবার ময়মনসিংহ এসেও মুক্তাগাছা মিস করে খুব আফসোস হয়েছিল, তাই এবারে ভ্রমণ পরিকল্পনা করার সময়ে সবার আগে ছিল মুক্তাগাছার নাম।
জয়নুল আবেদিন পার্ক ঘুরে, চত্বর থেকে হাঁটতে হাঁটতেই কাঁচিঝুলির মোড় চলে এলাম। ভুল বলেছি, এর মধ্যে দৌড়ও দিয়েছিলাম এই বলে যে, কে আগে যেতে পারে। কাঁচির মোড়ে বেশ কয়েকটা খাবারের হোটেল ছিল। একটায় দেখলাম, গরমাগরম সমুচা ভেজে তোলা হচ্ছে। সেই সকালে খেয়ে বেরিয়েছি, এতক্ষণে কিছু হালকা খাবার পেটে না পড়লে চলে? হোটেলে ঢুকে, হাতমুখ ধুয়ে সমুচার অর্ডার করলাম। বেশ মজার সমুচা। একেকজন তিনটা করে সমুচা খেয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য এবারে মুক্তাগাছা।

প্রধান ফটকের একপাশ। সোর্স: লেখিকা

রিজার্ভ সিএনজিতে করে কাঁচির মোড় থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে মুক্তাগাছার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। কাঁচিঝুলির মোড় থেকে মুক্তাগাছায় যাওয়ার রাস্তাটি বেশ সুন্দর। মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ির প্রশংসা শুনেছি অনেক আগে থেকেই। এটি খুব বড় জায়গা নিয়ে স্থাপিত। প্রায় ১০০ একর জায়গার ওপর নির্মিত বাড়িটি প্রাচীন স্থাপনাশৈলীর অনন্য নিদর্শন।
প্রধান ফটক। সোর্স: লেখিকা

বাংলাদেশের প্রাচীন জমিদারবাড়িগুলোর একটি হলো মুক্তাগাছার জমিদারবাড়ি। শ্রীকৃষ্ণ আচার্যের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন বগুড়ার অধিবাসী। ১৭২৭ সালে শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরী আলাপসিং পরগনার বন্দোবস্ত লাভ করেন নবাব আলীবর্দী খাঁর কাছ থেকে। তখন তিনি এখানে বসবাসের জন্য মনস্থির করেন। আলাপসিং পরগনার বিভিন্ন জায়গা ঘুরে ঘুরে দেখেন। পরে মুক্তাগাছার জায়গাটি পছন্দ করেন। উল্লেখ্য, আজকের মুক্তাগাছা তৎকালীন সময়ে আলাপসিং পরগনার অধীনে ছিল।
তিনি তার জমিদার বাড়ির নাম রাখেন মুক্তাগাছা। এই নামকরণের পিছনেও একটি গল্প আছে। বগুড়া থেকে নৌকায় করে শ্রীকৃষ্ণ আচার্য চৌধুরী যখন মুক্তাগাছা আসেন, তখন হঠাৎ বড় নৌকার আগমন দেখে এলাকার লোকজন আশ্চর্য হয়ে যান। পরে জমিদারদের কথা শুনে গ্রামবাসী বিভিন্ন উপঢৌকন নিয়ে আসেন। সে সময়ে প্রজাসাধারণ গরিব থাকায় তাদের বহুমূল্য উপঢৌকন দিয়ে বরণ করার সামর্থ্য ছিল না। তাদের মধ্যে মুক্তারাম কর্মকার নামে এক প্রজা সুবৃহৎ পিতলের গাছা উপহার দেন।
ফটকের ডান পাশে। সোর্স: লেখিকা

শ্রীকৃষ্ণ আচার্য্য চৌধুরীর ছিল চার ছেলে। হররাম, শিবরাম, বিষ্ণুরাম, রাম রাম। বড় ছেলে রাম রাম খুশি হয়ে কর্মকারের নামের মুক্তা ও তারই তৈরি পিতলের গাছা দুই শব্দ যোগ করে এক সময়কার বিনোদবাড়ির নামকরণ করেন মুক্তাগাছা। সে সময়টিতে মুক্তাগাছা শহরসহ আশপাশে এলাকা জলাভূমি ও অরণ্য ঘেরা ছিল। মূলত জমিদার আচার্য্য চৌধুরীর বংশের মাধ্যমেই মুক্তাগাছা শহরের গোড়াপত্তন।
ঢুকেই এটা চোখে পড়বে। সোর্স: লেখিকা

বর্তমান জমিদার বাড়িটি নির্মাণ করেন হরিরাম। হরিরামের দুই ছেলে রমাকান্ত ও কৃষ্ণকান্ত অপুত্রক অবস্থায় মারা যান। কৃষ্ণকান্তের কাকা বিষ্ণুরামের নাতি ছিলেন গৌরি কিশোর। গৌরি কিশোরের ছিল দুই ছেলে, ভবানী কিশোর ও রাম কিশোর। তৎকালীন সময়ে ময়মনসিংহ অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন এই বাড়ির জমিদার বাবুরা। তারাই ১৬ হিস্যার জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। খ্রিস্টীয় উনিশ শতক থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এ জমিদারির উত্তরাধিকারীরা অনন্য স্থাপত্যশৈলিতে বিভিন্ন স্থাপনাগুলো নির্মাণ করেছেন।
ছাদ। সোর্স: লেখিকা

জমিদার বাড়ির সামনে যখন গেলাম, তখন বাজে বেলা একটা। জমিদার বাড়িটির প্রবেশ মুখে রয়েছে বিশাল ফটক। ফটকে দাঁড়ানো গার্ড বললেন, ‘কোত্থেকে এসেছেন আপনারা?’ বললাম, ‘ঢাকা থেকে।’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘বন্ধ হবার সময় হয়ে গিয়েছে। আপনারা ২০ মিনিটে ঘুরে আসুন।’
বুঝলাম না, জমিদার বাড়ি তো সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত বলেই জানতাম। তাহলে এই কথা বললো কেন? নামাজের সময় হয়ে গিয়েছিল বলে?
চুন সুরকির স্থাপনাগুলোর মধ্যে এই বাড়িটি এখনো মজবুত। সোর্স: লেখিকা

ভিতরে ঢুকে অবাক হয়ে গেলাম। খুব বেশি বড় তো নয়! তাছাড়া যেরকম নামডাক শুনেছি, সেরকম আহামরি বাড়িও নয়। হ্যাঁ, খুব সুন্দর একটা সাদা বাড়ি আছে। আর আছে একটা টিনের দোতলা বাড়ি। বাকি সব স্থাপনার অবস্থাই একদম নাজুক। কর্তৃপক্ষ ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেছে। চুনসুরকি উঠে গিয়ে দেয়ালের কঙ্কাল বেরিয়ে পড়েছে। এই তো। তাহলে যে এত নামডাক শুনেছি, তার রহস্য কী?
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। সোর্স: লেখিকা

হ্যাঁ, বাড়ির ভেতর আস্তাবল, মন্দির, রংমহল, সিন্দুক ঘর, নাট্য মঞ্চ ও বসতঘর সহ আরো অনেক কিছুই রয়েছে। যতটুকু অক্ষত রয়েছে তার নির্মাণশৈলী দেখেই বোঝা যায়, বাড়ির ভেতরের স্থাপনাগুলো ছিল বেশ দৃষ্টিনন্দন। তবে কোন ঘরটি কী হিসেবে ব্যবহৃত হতো, তা আজ আর জানার উপায় নেই।
বাইরে বেরিয়ে রহস্য উদঘাটিত হলো। যে স্থাপনাগুলো মজবুত ছিল, ওগুলোতে শহীদ স্মৃতি সরকারি কলেজ, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, নবারুণ বিদ্যা নিকেতনসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। এমনকি মন্দিরের পাশের একটা ছোট ঘর এখন এটিএম বুথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই ছোট ঘরটি কীসের ঘর ছিল? আজ আর জানার উপায় নেই। তাছাড়া আশেপাশের আরো অনেক জায়গা নিয়ে বিভিন্ন মঠ, মন্দির, নাটমন্দির দাঁড়িয়ে আছে। আমরা ঘুরে ঘুরে সব দেখলাম।
ভগ্ন অবস্থায় দোতালা টিনের ঘরটি কোনোমতে টিকে আছে। সোর্স: লেখিকা

জমিদাররা অত্যন্ত শৌখিন ও শিকারি পাগল ছিলেন। তারা বসবাস ও রাজকার্য পরিচালনার জন্য তৈরি করেন সুউচ্চ একতলা ও দ্বিতলবিশিষ্ট ভবন। ছিল বৈদ্যুতিক বাতির ব্যবস্থা। মধুপুর বনে সদলবলে তাঁবু গেড়ে তারা শিকার করতেন বড় বড় বাঘ, হরিণসহ হিংস্র প্রাণী। জমিদার মহলের পুরো আঙিনা ছিল পাকা। হাতি সংগ্রহ ছিল তাদের নেশা। হাতিশালায় মাহুতরা থাকত সদা ব্যস্ত। দুর্গা প্রতিমা বিসর্জনে সাজানো হতো হাতির মিছিল। বছরজুড়ে চলত যাত্রা, নাটক, কবি গানসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান। দেশের বিখ্যাত শিল্পীদের পাশাপাশি ভারত থেকে আনা হতো নামকরা শিল্পীদের। আয়োজন করা হতো প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলা। ভারতের বিখ্যাত ক্লাব মোহনবাগান, ইস্ট বেঙ্গল এতে অংশ নিত।
কুয়ো। সোর্স: লেখিকা

রাম কিশোরের চার ছেলের মধ্যে জিতেন্দ্র কিশোর ও ভুপেন্দ্র কিশোর ছিলেন খুবই নাটক এবং সংগীতপ্রেমী। ভুপেন্দ্র কিশোরের উদ্যোগেই এ বাড়িতে উপমহাদেশের প্রথম ঘূর্ণায়মান নাট্যমঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলা ১৩৫২ সালে। এর নাম দেয়া হয়েছিল রঙ্গপীঠ। রঙ্গপীঠের উত্তর পাশে কারুকার্য খচিত ঘরটি রাজরাজেশ্বরী পূজামণ্ডপ। পেছনে রাজকোষাগার, টিন ও কাঠের সুরম্য দ্বিতল রাজপ্রাসাদ। বর্তমানে ভগ্ন অবস্থায় দোতালা টিনের ঘরটি কোনোমতে টিকে আছে। জানা যায়, গরমের দিনে প্রাকৃতিকভাবেই বাইরে দিয়ে ঘামিয়ে ভেতরে ঘরকে রাখত ঠাণ্ডা। জমিদার জগৎ কিশোর আচার্য চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী টিনের তৈরি দোতলা বাড়িতে বাস করতেন।
ভগ্নদশা। সোর্স: লেখিকা

প্রাসাদের পাশেই রাজমাতার অন্দরমহল। রাজরক্ষী ও প্রহরীদের আস্তানা। রাজদরবার ও দ্বিতল কাচারি ঘর রয়েছে। ছিল লাইব্রেরি। করিডোরের দুই পাশে ছিল হাতির ছয়টি মাথার ওপর শিকার করা বাঘের নমুনা। রঙ্গমঞ্চ আর করিডোরের মাঝখানে লক্ষ্মীপূজা-দুর্গাপূজার ঘর। তোরণ পেরিয়ে বড় একটি মাঠের পশ্চিমে পাশাপাশি তিনটি প্রাসাদ। দক্ষিণের ভবনটির নাম শশীকান্ত। বাড়িটি বর্তমানে ব্যবহৃত হচ্ছে শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ের ভবন হিসেবে। মাঝের ভবনটি আটআনি হিস্যা বাড়ি, যা ব্যবহৃত হচ্ছে আর্মড পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার হিসেবে। এখানে জলসাঘর, কালীমন্দির, শিবমন্দির ও দীঘি রয়েছে।
কারুকাজের বহর। সোর্স: লেখিকা

এই বাড়ির জমিদার বাবুরা জ্ঞানচর্চায়ও ছিলেন বেশ আগ্রহী। ময়মনসিংহের অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই তাদের অবদান রয়েছে। মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ির লাইব্রেরির অনেক দুর্লভ বই বর্তমানে বাংলা একাডেমিতে সংরক্ষিত রয়েছে।
রাজবাড়ির মূল ফটকের সামনেই রয়েছে সাত ঘাটের বিশাল পুকুর। প্রতিটি ঘাটই বাঁধানো। পুকুরের পাশেই দুর্লভ প্রজাতির নাগলিঙ্গম/নেগুরা বৃক্ষ রয়েছে। একবার ভূমিকম্পে বাড়িটি ভেঙে পড়লে লন্ডন আর ভারত থেকে সুদক্ষ কারিগর এনে পুনর্নির্মাণ করা হয়।
অপরূপ বাড়িটির বাইরের দিক। সোর্স: লেখিকা

মুক্তাগাছা জমিদার পরিবারের শেষ জমিদার ছিলেন জগৎ কিশোর আচার্যের পৌত্র রাজা জীবেন্দ্র কিশোর আচার্য চৌধুরী। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর তার ১৬ জন বংশধরের সবাই ভারতে চলে যান। পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে তাদের নির্মিত ১৬টি বাড়ি। পরিত্যক্ত ভবনের বিভিন্ন ভাস্কর্য, কাঠ, লোহাসহ মূল্যবান প্রত্ন সম্পদ লুণ্ঠিত হয়েছে।
ভগ্নদশার মধ্যে আরোও একটি প্রায় অক্ষত বাড়ি। সোর্স: লেখিকা

এই ঐতিহ্যবাহী জমিদারবাড়িটি বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত করে এতে সংযুক্ত করা হয়েছে শ্বেত পাথরে লেখা ইতিহাস। বইয়ের পাতার আদলে তৈরি কমলা রঙের বর্ডারের শ্বেত পাথরটি জমিদারবাড়ির সামনে স্থাপন করা হয়েছে।
দৈন্যতা। সোর্স: লেখিকা

কীভাবে যাবেন:

ঢাকা মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে সকাল-রাত পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবহনের বাস ময়মনসিংহ চলাচল করে। সেখান থেকে সিএনজিতে মুক্তাগাছা। কিংবা মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ইসলাম বাসে সরাসরি মুক্তাগাছা যাওয়া যায়।
তথ্যসূত্র:
http://www.alokitobangladesh.com/todays/news_print/175361/2016/03/29
http://m.dailynayadiganta.com/detail/news/191103
ফিচার ইমেজ: মাদিহা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

উত্তরাখণ্ডের অলি: বরফ আর দুঃসাহসিক ক্যাবল কারের স্বপ্নরাজ্য

সোনালী প্যাগোডার দেশ মিয়ানমার ভ্রমণ: বাগানের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত