সোনাগাজীতে বাংলাদেশের প্রথম বায়ুকল: মুহুরি প্রজেক্ট

ফেনী ভ্রমণের জন্য যে পরিকল্পনা করেছিলাম, তা ছিল ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলা কেন্দ্রিক। তাই ছাগলনাইয়া থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরের ফেনীর অন্য একটি উপজেলা সোনাগাজীর মুহুরি প্রজেক্টে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই ছিলো না। কিন্তু ছাগলনাইয়ায় আমাদের সকালটা খুব চমৎকার কাটলেও, সেসব মিস করেছিলো তাসনু আর সৌরভ। তাই ঠিক করলাম, ছাগলনাইয়ায় পুরাতন স্থাপত্য খুঁজে না বেড়িয়ে, মুহুরি প্রজেক্টেই চলে যাই। অবশ্য আমরা গুগল করে যে রাস্তায় ছাগলনাইয়া থেকে মুহুরি যাওয়ার যে উপায় পেয়েছিলাম, সেই অনুযায়ী গেলে প্রচুর সময় লাগতো।

মুহুরি প্রজেক্ট; source: মাদিহা মৌ

মুহুরি প্রজেক্ট যাওয়ার রাস্তা দুটি। একটা মিরসরাই হয়ে, অন্যটি সোনাগাজী উপজেলা হয়ে। নিলয় ছাগলনাইয়া থেকে আসার সময় মিরসরাই হয়ে হাইওয়ে ছেড়ে ভিতর দিক দিয়ে সিএনজি করে এসেছে। আমরাও ঠিক করলাম, ওখান দিয়েই যাবো। এলাম।

একবার বাস বদলে, দুইবারে সিএনজি বদলে মুহুরি নদীর ধারে আসতে আমাদের সময় লাগলো ঠিক এক ঘণ্টা। মিরসরাই হাইওয়ে পেরিয়ে এপাশে এসে সিএনজিতে যে রাস্তাটুকু গিয়েছি, এখানকার রাস্তাটা দারুণ সুন্দর। আবার রাস্তার ধারে খুব পুরনো কিছু মঠ আর মন্দিরও চোখে পড়লো।

পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো; source: মাদিহা মৌ

মুহুরী প্রকল্পটি আসলে বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সেচ প্রকল্প। ফেনী নদী, মুহুরী নদী এবং কালিদাস পাহালিয়া নদী, এই ত্রয়ের মিলিত স্রোতে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে ৪০ ফোক্ট বিশিষ্ট একটি বৃহদাকার পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করা হয়েছে, যাতে ফেনী জেলার ফেনী সদর, ছাগলনাইয়া, পরশুরাম, ফুলগাজী, সোনাগাজী এবং চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলায় বর্ষা মৌসুমে বন্যার প্রকোপ কমানো যায়। সেই সাথে আমন ধানে অতিরিক্ত সেচ সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল মুহুরী সেচ প্রকল্প। সেচ প্রকল্পের যন্ত্রাংশগুলো দেখছিলাম ব্রিজ থেকে ঝুঁকে।

ব্রিজের এক পাশে অথৈ নদীজল, অথচ অন্যধার ঠিক কাদালেপটা হয়ে আছে। নদীগর্ভের পানি শোষণ করা মেঘরঙা কাদার উপরে একটুখানি পানি গড়াগড়ি করছে। ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত। নদীর পাড়ে বসবাস, সেই সাথে ঘুরে বেড়ানোর সুবাদে কত আকারের কত রকমের ব্রিজ দেখেছি, এরকমটি আর কখনোই দেখিনি। এমনকি রাঙামাটির কাপ্তাইয়েও এরকম কিছু দেখা হয়নি। এরকটা এখানেই দেখলাম। ফেনী নদী এখান থেকে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। দক্ষিণ দিকে দূরে ঝাউবন আর বন বিভাগের সবুজ বেষ্টনী চোখে পড়ছিলো। তা দেখেই নিশ্চিত হয়েছিলাম ওখানেই সমুদ্র।

বায়ুকলের কাছে যাওয়ার রাস্তা; source: মাদিহা মৌ

আগেই বলেছি, মুহুরী প্রকল্পের কিছু অংশ চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার মধ্যেও পড়েছে। মুহুরির সেচ প্রকল্পের ব্রিজে দাঁড়িয়েই চোখে পড়ছে চারটি বড় বড় সফেদ রঙের বায়ুকল। দেশের প্রথম বায়ু বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি এটি। ব্রিজ থেকে প্রায় ৫০০ গজ দূরের খোয়াজের লামছি গ্রামে বায়ুকলগুলো। আমরা হাঁটতে হাঁটতে ওখানে গেলাম। তখনো বায়ুকলের পাখাগুলো স্থির ছিল। হঠাৎ একদম সামনেরটির পাখা ঘুরতে শুরু করায় আমি চমকে উঠলাম।

ভাবছিলাম, বাতাস তো খুব বেশি একটা নেই। তাহলে পাখা ঘুরছে কেমন করে? তার উপর ঘুরছেই যখন, একটা কেন ঘুরছে? কাছে গিয়ে দেখলাম, এটা জেনারেটরের সাহায্যে ঘুরছে। বায়ুকল চালানোর জন্য যে জেনারেটর ব্যবহার করা হয়, জানতাম না। আমি ভেবেছিলাম, প্রাকৃতিক হাওয়াতেই এই কলগুলো চলে। লামছি গ্রাম থেকে ফেরার সময় মহিষের পালকে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে দেখলাম। এখানে নাকি খাঁটি মহিষের দুধের দই পাওয়া যায়।

মেঘরঙা কাদার উপরে একটুখানি পানি গড়াগড়ি করছে; source: মাদিহা মৌ

এই এলাকায় প্রচুর মাছও চাষ করা হয়। বর্তমানে নাকি মৎস্য চাষে বিপ্লব ঘটিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় মৎস্য জোন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এই মুহুরী প্রকল্প এলাকা। এই প্রকল্পকেই ঘিরে গড়ে উঠেছে ফেনীবাসীর বিনোদনের জায়গা। ফেনী তো বটেই শীতকালে অন্যান্য জায়গা থেকে ভ্রমণকারীরা এই বায়ুকল দেখতে আসে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর মুহুরী নদী, রেগুলেটরের চারদিকে বাঁধ দিয়ে ঘেরা কৃত্রিম জলরাশি, বনায়ন, মাছের অভয়ারণ্য, পাখির কলকাকলি আর নৌ ভ্রমণের আনন্দ নিতে এখানে আসে পর্যটকরা।

বাঁধের দুপাশে নীচে থেকে পাথর দিয়ে বাঁধানো এবং উপরদিকে দুর্বা ঘাসের বিছানা। মুহুরী নদীতে নৌ ভ্রমণ করা যায় জনপ্রতি ৩০ টাকা খরচ করে। আমাদের হাতে সময় ছিল না বলে নৌকায় চড়িনি। শীতকালে এই নদীতে খুব কাছ থেকে বিভিন্ন প্রজাতির হাঁস এবং বিভিন্ন জাতের অতিথি পাখির দেখা পাওয়া যায়।

মুহুরি নদীতে বাঁধ; source: মাদিহা মৌ

ব্রিজের ওপারে গিয়ে রাস্তার পাশের নিচু জমিতে দেখলাম, ওখানে ফুচকা চটপটির আসর বসেছে। ওসব না খেয়ে ভাবলাম, দই খাব। উপরে উঠে একটা দোকানে বড় বড় করে দইয়ের বিজ্ঞাপন লেখা আছে। ওখানেই গেলাম। কাঁচের কাপে করে সাদাটে দই দিয়ে গেল। আহামরি ধরনের কোনো স্বাদ পাইনি। সাধারণ দই মনে হয়েছে।

আমার অবাক লাগলো এই ভেবে যে, দইয়ের রঙ একদম সাদা কেনো হবে। দুধ ঘন করলেই তো হলদে একটা ভাব চলে আসে। তাহলে কি মহিষের দুধ ঘন বলে চুলায় তেমন জ্বাল করা হয় না? কে জানে! একেকটি দইয়ের দাম পড়লো ২৫ টাকা করে। দই খেয়ে, সিএনজি রিজার্ভ করে ফিরে এলাম মুহুরি থেকে, সন্ধ্যের মায়াবী আলো খোঁপায় গুঁজে নিয়ে।

কাদালেপটা নদী; source: মাদিহা মৌ

কীভাবে যাবেন

ফেনী হয়ে মুহুরিতে যেতে হলে, ঢাকা থেকে ট্রেনে ও বাসে ফেনী যাওয়া যায়। ট্রেনে যেতে চাইলে চট্টগ্রামগামী রাতের শেষ ট্রেন তূর্ণা নিশিথায় যেতে পারেন। রাত সাড়ে ১১টায় কমলাপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া তূর্ণা নিশিথায় ফেনী পৌঁছে সাড়ে চারটায়। ভাড়া ২৬৫ টাকা। আবার কম খরচে চট্টগ্রাম মেইলের যেতে পারেন। ভাড়া পড়বে মাত্র ৯০ টাকা।

চট্টগ্রাম মেইল কমলাপুর থেকে ছাড়ে রাত সাড়ে দশটায়। সাত ঘণ্টা লাগবে ফেনী পৌঁছাতে। বাসে যেতে চাইলে, এনা ট্রান্সপোর্টে ও স্টার লাইনে যেতে পারেন। ভাড়া ২৭০ টাকা।

বায়ুকল; source: মাদিহা মৌ

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী কোনো বাসে অথবা চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা/ফেনী/বারৈয়ার হাটগামী বাসে জোরারগঞ্জ নামতে হবে। সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিক্সা রিজার্ভ নিয়ে মুহুরী প্রজেক্ট রোড ধরে মুহুরী প্রজেক্ট বাজারে আসতে হবে। লোকালে ২০ টাকা করে ভাড়া। বাজার থেকে বাঁধ পর্যন্ত আবার সিএনজি বা অটোরিক্সায় যেতে হবে। লোকাল ভাড়া ১৫ টাকা করে। জোরারগঞ্জ থেকে সরাসরি বাঁধ পর্যন্তও রিজার্ভ নেয়া যাবে, ভাড়া পড়বে ১৮০-২০০ টাকা।

Feature Image : মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক সবুজ নদীর গল্প…

পাইন বনের মধ্যে দিয়ে লাভার পথে ঘাটে