দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গের গৌরব মোজাফফর গার্ডেন এন্ড রিসোর্ট

কর্মসূত্রে আমাকে প্রায়শই খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জায়গায় থাকতে হয়। বেশিরভাগ সময় হোটেলেই থাকা পড়ে। আসলে এ অঞ্চলে খুব কম রিসোর্টই আছে। নড়াইলে দুটো রিসোর্ট আছে, সে দুটো আবার আমার কর্মক্ষেত্রের বাইরে। সাতক্ষীরা জেলায় আমার বেশিরভাগ কাজ থাকতো শ্যামনগর উপজেলায়, তাই সেখানেই বেশি থাকা হয়েছে।

বড় সম্মেলন কক্ষও রয়েছে; ছবি- লেখক

মোজাফফর গার্ডেন এন্ড রিসোর্ট বললে মনে হয় খুব কম লোকই চিনবে। সবাই এটাকে চেনে মন্টু মিয়ার বাগানবাড়ী হিসেবে। এর কারণ হচ্ছে এর স্বত্তাধিকারীর নাম জনাব কে, এম, খায়রুল মোজাফফর (মন্টু)। সাতক্ষীরা শহরের জিরো পয়েন্ট থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে খড়িবিলা নামক জায়গায় এ রিসোর্ট।

দোতলা সারিবদ্ধ কটেজগুলোর একটাতে ছিলাম আমরা; ছবি- লেখক

আমি অফিসের কাজে এসেছি সাতক্ষীরা, এর মধ্যে একদিন শুক্রবার পড়ে যাওয়ায় রীতিমতো আটকা পড়েছি এ রিসোর্টে। মোট তিনদিন থাকতে হবে এখানে। তবে ভালো লাগছে এই ভেবে যে এরকম একটা জায়গায় তিনদিন থাকা লাগবে। আগে এই রিসোর্টে যাওয়ার রাস্তাটা খুব খারাপ ছিল, কিন্তু এখন নতুন বাইপাস সড়ক নির্মিত হবার কারণে এখানে আসা অনেক সুবিধা হয়েছে।

শান বাধানো এ পুকুর ঘাটে বসে চমৎকার সময় কাটে; ছবি- লেখক

সড়কের কাজ অবশ্য শেষ হয়নি এখনও, কিন্তু গাড়ী চলাচল করছে। বাইপাস দিয়ে খড়িবিল এলাকায় ঢুকে রিসোর্টে পৌঁছালাম আমরা। অবাক না হয়ে পারলাম না, এত বড় এলাকা নিয়ে করা এই রিসোর্ট। মোট ১২০ বিঘা বা ৪০ একর জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে মোজাফফর গার্ডেন এন্ড রিসোর্ট। শুধু থাকার জায়গাই না, রয়েছে অনেকগুলো বড় বড় পুকুর, ছোট একটি চিড়িয়াখানা, আর বাচ্চাদের খেলার জায়গা।

রয়েছে একটি সুন্দর চিড়িয়াখানাও; ছবি- লেখক

প্রতিদিন প্রচুর দর্শনার্থী আসেন এখানে। তারা মূলত পিকনিক স্পট ব্যবহার করে থাকেন। অনেকে চিড়িয়াখানাও দেখতে আসেন। পরিবার পরিজন নিয়ে সময় কাটাতে আসেন অনেকে। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ মূল্য রাখা হয়েছে ৫০ টাকা করে। আর যারা আবাসিক অতিথি তাদের জন্য আলাদা কোনো প্রবেশ মূল্য নেই।

রুম বুক দেয়া আছে বলতেই গেইট খুলে দিলো, আমরা গাড়ী নিয়ে চলে আসলাম বড় একটা পুকুরের পাশে থাকা অফিস কক্ষে। ভেতরে ঢুকে ফ্রন্ট ডেস্কে গিয়ে আমার প্রতিষ্ঠানের নাম বলার সাথে সাথেই বুকিং বের করে আমাদের জন্য নির্ধারিত রুমের চাবি দিয়ে দিলো। চেক ইনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমরা চললাম রুমের দিকে।

চিড়িয়াখানায় রাখা কুমির; ছবি- লেখক

দোতলা বেশ কয়েকটা কটেজ দেখা যাচ্ছে সামনে এক সারিতে। তার একটি বরাদ্দ করা হয়েছে আমাদের জন্য। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে দেখলাম বেশ সাজানো গোছানো সুন্দর একটি কক্ষ। আরামদায়ক বিছানা, এয়ার কন্ডিশন, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র রয়েছে রুমে। এছাড়া সামনের বিশাল একটি জানালা, যেটা খুলে দেখলে বিছানায় শুয়েই পুরো আকাশ দেখা যাচ্ছে।

বাথরুমটাও পছন্দ হলো, আধুনিক ফিটিংস রয়েছে ভেতরে, আছে গিজারও। রুমে ব্যাগ রেখে বের হয়ে পড়লাম রিসোর্টটা পায়ে হেঁটে দেখার জন্য। আমাদের ছোট ছোট কটেজগুলো যেদিকে, সেখানে দুটো ভিআইপি কক্ষও আছে। যার একটা আবার পানির উপরে নির্মাণ করা হয়েছে। আমার রুমের জানালা দিয়ে সরাসরি সেটা দেখা যাচ্ছিলো। রুম থেকে নেমে প্রথমে সেদিকেই গেলাম।

রুমের ভেতরটা; ছবি- লেখক

এদিকের পুকুরের ঘাট সুন্দর করে শান বাধানো আছে। গাছ-গাছালির ছায়ায় বেশ কয়েকটা চেয়ার টেবিল পাতা। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে, আলো কমে যাওয়ার সাথে সাথে বেড়ে চলেছে পাখির কলতান। পাখিদের কাছে এ রিসোর্ট মনে হয় একটি অভয়ারণ্য, এজন্যই চারদিকে শত শত পাখি। ভিআইপি কক্ষটা তৈরী করা হয়েছে ঠিক পানির উপর, ছোট একটি ব্রীজ দিয়ে সংযুক্ত।

বাথরুমটা বেশ আধুনিক; ছবি- লেখক

হাঁটতে হাঁটতে রিসোর্টের অন্য দিকে গেলাম। বিশাল পুকুরের এক পাশটায় অনেকগুলো বড় বড় মাছ দেখলাম। গ্রাস কার্প এগুলো, আরেকটু এগিয়ে দেখলাম পুকুরে কেটে আনা ঘাস ফেলা হচ্ছে গ্রাস কার্পকে খাওয়ানোর জন্য। কর্মচারী একজনের সাথে কথা বলে জানলাম আশাশুনি থেকে সংগ্রহ করে আনা হয় এ ঘাস।

দোতলা একটু পুরনো একটা বিল্ডিং খুঁজে পেলাম। এটাই ছিল আগের রিসোর্ট, খাবারের জন্য আমাকে এখানেই আসতে হবে। রাতের খাবারের অর্ডার দিয়ে গেলাম, এই এলাকার বিখ্যাত পারসে মাছ না খেলে তো আর চলছে না, তাই সেটারই অর্ডার দিলাম। আরেকটু সামনে চিড়িয়াখানাটি নজরে পড়লো, সন্ধ্যা প্রায় হয়ে আসাতে এ বেলা আর সেদিকে গেলাম না। ভাবলাম সকালে উঠেই একবার ঘুরে আসবো।

নৌকায় চড়ার ব্যবস্থাও আছে এ কৃত্রিম লেকে;ছবি- লেখক

খুব সুন্দর একটা মসজিদ চোখে পড়লো। আর পানির উপরে একটি তিন তলা সম্মেলন কেন্দ্র। এছাড়া আরও বড় একটা পুকুর চোখে পড়লো, সেখানে নৌকায় চড়ার ব্যবস্থাও রাখা আছে। আরেকটা বিষয় না বললেই নয়, এ রিসোর্টে গাছের সংখ্যা। আম গাছ আছে ৬২০টি, নারিকেল গাছের সংখ্যা ৭২০টি। মূল্যবান মেহগনি গাছ আছে ৭২৮টি, এছাড়াও আছে লিচু, আপেল, কমলা, পাম ট্রি সহ হরেক রকমের গাছে।

হাঁটতে ভালো লাগে এত সুন্দর এলাকা; ছবি- লেখক

ফুল গাছ তো হিসেব করে বলা কঠিন এত বেশি আছে। শান বাঁধানো পুকুর ঘাটে এসে যখন বসলাম তখন বুঝতে পারলাম আজ পূর্ণিমাও, সারা রাত এ ঘাটে বসে জোৎস্না দেখেই কাটিয়ে দেয়া সম্ভব। রিসোর্টে খুব বেশি লোকজন নেই রাতে, আমরা তিনজন ছাড়া অল্প কয়েকজন অতিথিকে দেখলাম। রাতে চমৎকারভাবে রান্না করা খাওয়ার দিয়ে ডিনার সারলাম। জানতে পারলাম এ চমৎকার রাতের খাবারের মূল্যও মাত্র ২৫০ টাকা।

বিকেলে আড্ডা দেবার চমৎকার জায়গা; ছবি- লেখক

অবশ্য রুমে ভাড়া মোটামুটি ৩,০০০ টাকার মতো পড়বে। সকালে ঘুম ভেঙে উঠে কম্প্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট শেষ করে চিড়িয়াখানার দিকে গেলাম। বেশি বড় না চিড়িয়াখানাটি, তারপরও বেসরকারী চিড়িয়াখানার মধ্যে এটিই দেশে বৃহত্তম। ভালুক, সাপ, বিভিন্ন পাখি, বানর সহ বেশি কিছু প্রাণী রয়েছে। কুমিরও আছে বেশ বড়সড় একটা।

সকালে ঘুম থেকে উঠে কিছুক্ষণ সাঁতার কাটতেও ভুলিনি। সব মিলে বেশ চমৎকার সময় কেটেছে এ রিসোর্টে। যোগাযোগের বিস্তারিত ঠিকানা:

মোজাফফর গার্ডেন এন্ড রিসোর্ট, খড়িরিবিল, সাতক্ষীরা সদর, সাতক্ষীরা। ফোন:
01885-928187. ফেইসবুক পেইজ: https://www.facebook.com/mozaffargardenresort

ফিচার ইমেজ: লেখক

Loading...

2 Comments

Leave a Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

দার্জিলিং পাড়া গ্রাম ও সাঙ্গু নদীর গল্প

সিরাজদিখানের সবুজতায় মাথা উঁচিয়ে দণ্ডায়মান বাবুর বাড়ির মঠ