ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের স্মৃতি রক্ষার্থে নির্মিত যুদ্ধ সমাধি

ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি বাংলাদেশের কুমিল্লাতে অবস্থিত একটি কমনওয়েলথ যুদ্ধ সমাধি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বার্মায় সংঘটিত যুদ্ধে যে ৪৫,০০০ কমনওয়েলথ সৈনিক নিহত হন, তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে মায়ানমার (তৎকালীন বার্মা), আসাম, এবং বাংলাদেশে ৯টি রণ সমাধিক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে। এখানে গাছের নির্মল ছায়ায় ঘুমিয়ে আছেন শত্রু-মিত্র, তারা আবার একেকজন একেক ধর্মে বিশ্বাসী। বাংলাদেশে দুটি কমনওয়েলথ রণ সমাধিক্ষেত্র আছে, যার একটি কুমিল্লায় এবং অপরটি চট্টগ্রামে অবস্থিত। প্রতিবছর প্রচুর দেশী-বিদেশী দর্শনার্থী যুদ্ধে নিহত সৈন্যদের প্রতি সম্মান জানাতে এ সমাধিক্ষেত্রে আসেন।

কৃষ্ণচূড়া তার ডালপালা লাল করে দাঁড়িয়ে আছে। সোর্স: ইভা

ময়নামতি রণ সমাধিক্ষেত্র মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-১৯৪৫) নিহত ভারতীয় (তৎকালীন) ও বৃটিশ সৈন্যদের কবরস্থান। এটি ১৯৪৬ সালে তৈরি হয়েছে। কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দূরে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের খুব কাছেই এই যুদ্ধ সমাধির অবস্থান। এই সমাধিক্ষেত্রটি Commonwealth War Graves Commission (CWGC) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তারাই এ সমাধিক্ষেত্র পরিচালনা করেন। প্রতি বছর নভেম্বর মাসে সকল ধর্মের ধর্মগুরুদের সমন্বয়ে এখানে একটি বার্ষিক প্রার্থনাসভা অনুষ্ঠিত হয়।
সমাধিক্ষেত্রটিতে ৭৩৬টি কবর আছে। বাহিনী অনুযায়ী এখানে রয়েছেন ৩ জন নাবিক, ৫৬৭ জন সৈনিক এবং ১৬৬ জন বৈমানিক। সর্বমোট ৭২৩ জন নিহতের পরিচয় জানা সম্ভব হয়েছিল। ময়নামতি ওয়ার সিমেট্রি, কুমিল্লাতে সমাহিত ব্যক্তিগণ যেসকল দেশের বাহিনীতে কর্মরত ছিলেন, সেগুলো হলো:
যুক্তরাজ্য (৩৫৭), কানাডা (১২), অস্ট্রেলিয়া (১২), নিউজিল্যান্ড (০৪), দক্ষিণ আফ্রিকা (০১), অবিভক্ত ভারত (১৭৮), রোডেশিয়া (০৩), পূর্ব আফ্রিকা (৫৬), পশ্চিম আফ্রিকা (৮৬), বার্মা তথা বর্তমান মিয়ানমার (০১), বেলজিয়াম (০১), পোল্যান্ড (০১), জাপান (২৪)।
প্রশস্ত পথ ধরে সোজা সামনে রয়েছে সিঁড়ি দেওয়া বেদি, তার ওপরে শোভা পাচ্ছে খ্রিস্টধর্মীয় প্রতীক ক্রুশ। সোর্স: ইভা

সমাধিক্ষেত্রটির প্রবেশমুখে একটি তোরণ ঘর, যার ভিতরের দেয়ালে এই সমাধিক্ষেত্রে ইতিহাস ও বিবরণ ইংরেজি ও বাংলায় লিপিবদ্ধ করে একখানা দেয়াল ফলক লাগানো রয়েছে। ভিতরে সরাসরি সামনে প্রশস্ত পথ, যার দুপাশে সারি সারি কবর ফলক। সৈন্যদের ধর্ম অনুযায়ী তাদের কবর ফলকে নাম, মৃত্যু তারিখ, পদবির পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতীক লক্ষ করা যায়- খ্রিস্টানদের কবর ফলকে ক্রুশ, মুসলমানদের কবর ফলকে আরবি লেখা (যেমন: হুয়াল গাফুর) উল্লেখযোগ্য। প্রশস্ত পথ ধরে সোজা সম্মুখে রয়েছে সিঁড়ি দেয়া বেদি, তার উপরে শোভা পাচ্ছে খ্রিস্টধর্মীয় পবিত্র প্রতীক ক্রুশ।
বেদির দুপাশে রয়েছে আরো দুটি তোরণ ঘর। এসকল তোরণ ঘর দিয়ে সমাধিক্ষেত্রের পেছন দিকের অংশে যাওয়া যায়। সেখানেও রয়েছে আরো বহু কবর ফলক। প্রতি দুটি কবর ফলকের মাঝখানে একটি করে ফুলগাছ শোভা পাচ্ছে। এছাড়া পুরো সমাধিক্ষেত্রেই রয়েছে প্রচুর গাছ। সমাধিক্ষেত্রের সম্মুখ অংশের প্রশস্ত পথের পাশেই ব্যতিক্রমী একটি কবর রয়েছে, যেখানে একসাথে ২৩টি কবর ফলক দিয়ে একটা স্থানকে ঘিরে রাখা হয়েছে।
রক্তলাল কৃষ্ণ চূড়া যেন সৈনিকদের সম্মান জানাচ্ছে। সোর্স: ইভা

প্রতি বছর নভেম্বর মাসে সব ধর্মের ধর্মগুরুদের সমন্বয়ে এখানে একটি বার্ষিক প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। সূত্রমতে, তৎকালীন সময়ই কুমিল্লার ময়নামতিতে একটি বড় হাসপাতাল ছিল। এছাড়া কুমিল্লায় ছিল যুদ্ধ-সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্র, বিমান ঘাঁটি আর সেনানিবাস। এর মধ্যে অধিকাংশ হলেন সে সময়কার হাসপাতালের মৃত সৈনিকরা। তাছাড়াও যুদ্ধের পর বিভিন্ন স্থান থেকে কিছু লাশ স্থানান্তর করেও এখানে সমাহিত করা হয়।
যুদ্ধে নিহতদের মধ্যে যুক্তরাজ্যের ৩৫৭ জন, কানাডার ১২ জন, অস্ট্রেলিয়ার ১২ জন, নিউজিল্যান্ডের চারজন, দক্ষিণ আফ্রিকার একজন, অবিভক্ত ভারতের ১৭৮, জিম্বাবুয়ের তিনজন, পূর্ব আফ্রিকার ৫৬, পশ্চিম আফ্রিকার ৮৬ জন, মিয়ানমারের একজন, বেলজিয়ামের একজন, পোল্যান্ডের একজন ও জাপানের ২৪ জন। সমাধিক্ষেত্রটির প্রবেশমুখে একটি তোরণ ঘর আছে। যখন কৃষ্ণচূড়া তার ডালপালা লাল করে দাঁড়িয়ে থাকে তখন চোখ ফেরানো যায় না। ঝিরঝিরে হাওয়ায় লাল ফুল পড়তে থাকে সমাধির গায়ে, এ এক অন্যরকম দৃশ্য। মনে হয় গাছগুলোও ফুল ছড়িয়ে যোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। এটি সমাধিক্ষেত্র, এখানে অনেকে আড্ডা দিতে আসেন যা ঠিক নয়। এর পবিত্রতা রক্ষায় সবার সচেতন থাকা প্রয়োজন।
সমাধির পথ ধরে আমাদের ক’জন। সোর্স: ইভা

ডিএসএলআর ক্যামেরা দিয়ে সমাধির ভেতরে ছবি তোলা নিষেধ। আমরা ডিএসএলআর ক্যামেরা নিয়ে গিয়েছিলাম, সমাধির কেয়ারটেকার বকাঝকা করায় ফোন দিয়ে ছবি তুলেছি। স্নিগ্ধ জায়গাটিতে খুব ভালো লাগলেও ওখানে বেশিক্ষণ থাকিনি। কবরের নিস্তব্ধতা নষ্ট করতে ইচ্ছে করেনি। তাই জলদিই বেরিয়ে এসেছি।

কখন খোলা থাকে:

ঈদের দুদিন ছাড়া বছরের প্রতিদিনই সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা এবং দুপুর ১টা হতে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এ যুদ্ধ সমাধিস্থল সর্ব সাধারণের জন্য উম্মুক্ত থাকে। ভিতরে প্রবেশ করতে কোনো টিকেট লাগে না।

পুরো সমাধিক্ষেত্রেই রয়েছে অনেক গাছ। সোর্স: ইভা

কীভাবে যাবেন:

সায়েদাবাদ থেকে তিশা (০১৭৩১২১৭৩২২), উপকূল (০১৯৮১০০২৯৩২, ০১৯৮১০০২৯৪২), কমলাপুর থেকে বিআরটিসি (০১৭৭০৪৯৩৭৭৫) অথবা এশিয়া লাইন পরিবহনে কুমিল্লা। কুমিল্লা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংলগ্ন কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের টিপরা বাজার। টিপরা বাজার ও ময়নামতি সাহেবের বাজারের মাঝামাঝি কুমিল্লা-সিলেট সড়কের বাম পাশে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সাড়ে চার একর পাহাড়ি ভূমি জুড়ে বাংলাদেশে অবস্থিত দ্বিতীয় এ কমনওয়েলথ সমাধি ক্ষেত্র। কুমিল্লা শহর হতে বাস অথবা সিএনজি যোগে যাওয়া যায়।

কোথায় থাকবেন:

কুমিল্লা ক্লাব, কুমিল্লা সিটি ক্লাবসহ বেশকিছু হোটেল ও গেস্ট হাউজ রয়েছে এখানে। এসি কিংবা ননএসি সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। দুজনের কক্ষে প্রতি রাত্রি যাপন খরচ হবে ১ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা। এছাড়া থাকার জন্য আছে হোটেল চন্দ্রিমা, হোটেল সোনালী, হোটেল শালবন, হোটেল নিদ্রাবাগ, আশীক রেস্ট হাউস ইত্যাদি। ভাড়া ২০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে।

গাছগুলোও যেন ফুল ছড়িয়ে যোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছে। সোর্স: ইভা

আশিক রেসিডেনসিয়াল রেস্ট হাউজ – ঠিকানাঃ ১৮৬, নজরুল এভিনিউ কুমিল্লা, যোগাযোগঃ ৬৮৭৮১
হোটেল আবেদিন – ঠিকানাঃ স্টেশন রোড কুমিল্লা, যোগাযোগঃ ৭৬০১৪
হোটেল নুরজাহান – ঠিকানাঃ ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়ক, কুমিল্লা, যোগাযোগঃ ৬৮৭৩৭
হোটেল সোনালি – ঠিকানাঃ কান্দিরপাড় চত্বর, কুমিল্লা, যোগাযোগঃ ৬৩১৮৮
এছাড়া শালবন বৌদ্ধ বিহার এর কাছে বার্ড আছে। বার্ডে যোগাযোগ করলে সেখানেও থাকতে পারেন। বার্ডের চমৎকার পরিবেশ আর খাবার আপনার রাত্রীযাপনকে করবে মোহনিয়া।

সতর্কতা:

আমাদের টুরিস্ট স্পটগুলো পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব আমাদের নিজেদের। আসুন, ঘোরাঘুরির সাথে সাথে সুরুচির পরিচয় দিই।
কারণ, মন সুন্দর যার, সেই তো দেশ পরিষ্কার রাখে।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রূপসী বাংলার খোঁজে প্রকৃতির কোলে

শিমলা: একহাতে সুখ যার অন্য হাতে দুঃখ!