নবাবগঞ্জের বনেদিয়ানায় উত্তপ্ত দুপুরে ভ্রমসি

সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জের বর্তমান নামটি সাম্প্রতিককালের। এই এলাকা আগে ‘নবাবগঞ্জ’ নামে পরিচিত ছিল। ব্রিটিশ আমলের আগে, যখন উপমহাদেশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ ছিল, এ অঞ্চল ছিল মুর্শিদাবাদের নবাবদের বিহারভূমি। তাই তখন এই স্থানের নাম হয় নবাবগঞ্জ। নবাবগঞ্জ নামের পূর্বে চাঁপাই যুক্ত হবার পেছনে কিছু উপকথা আছে। এ অঞ্চলে রাজা লখিন্দরের বাসভূমি ছিল। লখিন্দরের রাজধানীর নাম ছিল চম্পক। চম্পক নাম থেকেই এসেছে চাঁপাই।

আবার অনেকের মতে, নবাব আমলে মহেশপুর গ্রামে চম্পাবতী বা চম্পাবাঈ নামক এক সুন্দরী বাঈজী বাস করতেন। তাঁর নৃত্যের খ্যাতি আশেপাশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। স্বভাবতই তিনি নবাবের প্রিয়পাত্রী হয়ে ওঠেন। তাঁর নামানুসারে এই জায়গার নাম ‘চাঁপাই”। সেই চম্পাবতীর ভিটা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর থেকে অল্প দূরেই অবস্থিত। আমাদের চম্পাবতীর ভিটা দেখা না হলেও চাঁপাইয়ের বিখ্যাত কিছু জায়গা ঘুরেছি।

মহানন্দার পাড়ে কাশবন। Source : ইভা

দারসবাড়ি মসজিদ

দারসবাড়ী মাদ্রাসা ঘুরে ফিরে যাব, এমন একটা পদক্ষেপ নিচ্ছিলাম। ভাইয়ার সাথে মাদ্রাসার সীমানা পেরিয়ে মেঠোপথে নেমেছি, তখন দেখলাম, হাতের ডানপাশে কিছু হৈচৈ শোনা যাচ্ছে। ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ওখানে কী?
ভাইয়া বললো, ‘এরা সম্ভবত দারসবাড়ি মসজিদ দেখে ফিরছে।’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘মসজিদও আছে?’
ভাইয়া মাথা ঝাঁকালেন।

হেঁটে মসজিদ পর্যন্ত গেলাম। একটা উঁচুভূমির উপর মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে। এই এলাকার সব মসজিদের দেয়ালই সম্ভবত পোড়ামাটির ফলক তথা টেরাকোটা দিয়ে তৈরি। এই মসজিদটিও তার থেকে আলাদা নয়। তবে এর বাইরের দেয়ালের টেরাকোটাগুলো তেমন নান্দনিক নয়। বাইরের দেয়াল কেন বলছি? কারণ খুবই বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই মসজিদের ভিতরের দেয়ালেও টেরাকোটা আছে! শুধু তাই নয়, ভেতরের টেরাকোটাগুলো আরোও অনেক বেশি কারুকার্যময় আর নিখুঁত।

দারসবাড়ি মসজিদের ভিতরে। Source : লেখিকা

সাধারণত কারুকার্যময় পোড়ামাটির ফলকগুলো বসানো হতো মসজিদের বাইরের দেয়ালেই। আমার দেখা টেরাকোটা সমৃদ্ধ মসজিদগুলোর মধ্যে কেবল এই মসজিদেই ভেতরের দেয়ালেও টেরাকোটা দেখতে পেয়েছি। এছাড়াও এই মসজিদের বিশেষত্ব হলো, এটায় আজান দেওয়ার জায়গা কিংবা খিলান কেবল মাত্র একটা নয়। পশ্চিম দিকের দেয়ালে নিয়মিত বিরতিতে আটটার মতো খিলান আছে। খিলানগুলোকে ঘিরে চারপাশেই রয়েছে টেরাকোটা।

আয়তাকার মসজিদটির মাথার উপর ছাদ নেই। কালের পরিক্রমায় ধ্বসে পড়েছে। ধ্বসে গেছে অনেক পিলারও। মেঝেতে জন্মেছে সবুজ ঘাস। তাই এখন আর দারাসবাড়ী মসজিদে সালাত আদায় করা যায় না। মসজিদের ভেতরে তিনটি কক্ষমতোন অবয়ব। এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে যাওয়ার জন্য মাঝের দেয়ালগুলোতে চমৎকার মিনারাকৃতির প্রবেশদ্বার। চাঁপাইনবাবগঞ্জে যত মসজিদ দেখেছি, তার মধ্যে এটিই সবচেয়ে সুন্দর।

এক সারিতে সবগুলো দরজা। Source : লেখিকা

তাহখানা

তাহখানা শব্দটি বাংলা, ফারসি কিংবা আরবী নয়। এটি পার্সি ভাষার শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ ঠাণ্ডা ভবন বা প্রাসাদ। মোঘল আমলের গৌড়-লখনৌতির ফিরোজপুর এলাকায় একটি বড় পুকুরের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত এই ভবনটি। শাহ সুজা এই ইমারতটি তৈরি করেছিলেন রাত্রিযাপনের জন্য।

এর ভেতরে ঢুকলে প্রথমেই একটা চৌবাচ্চা চোখে পড়বে। চৌবাচ্চাটি বর্তমানে খালি এবং শুকনো। একসময় এটিই হয়তো পানিতে টইটম্বুর থাকতো। তাহাখানার ভেতরের খিড়কি দিয়ে দাফিউল বালা নামের জলাশয়টি দেখা যায়। ভেতরের কক্ষে একটা শোকেসে এখানে প্রাপ্ত দ্রব্যাদি সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

এই ইমারতের দোতলায় যাওয়ার ব্যবস্থা আছে, তবে আমরা যেতে পারিনি। নামাজের সময় হয়ে আসায় তাহাখানার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা লোকজন পর্যটকদের বেরিয়ে যেতে বলছিলো বার বার। বেরুনোর সময় দান করার আহবান জানাচ্ছিল।

তাহাখানার প্রবেশদ্বার।  Source : ইভা

তিন গম্বুজ মসজিদ

তাহাখানার পাশেই তিন গম্বুজ মসজিদটি দাঁড়িয়ে আছে। এর তিনটি গম্বুজ মোঘল যুগে বানানো সব মসজিদের বৈশিষ্ট্য বহন করে। আমার কাছে তো মনে হলো, ঢাবির দোয়েল চত্বরের কাছের শাহাবাজ খানের মসজিদ আর মুসা খানের মসজিদ ঠিক এই রকম দেখতে। মসজিদটির ভেতর ও বাইরে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য কারুকাজ নেই। তবে বাইরের বেষ্টনী দেয়ালটি মোঘলদের আভিজাত্য বহন করছে। স্থানীয় জনসাধারণ এই মসজিদে নিয়মিতভাবে নামাজ আদায় করেন। শুক্রবার এবং নামাজের সময় হয়ে যাওয়ায় তখন প্রচুর লোকসমাগম বেড়েছিল।

তিন গম্বুজ মসজিদ। Source : তাসমি

দাফেউল বালা

দাফেউল বালা দীঘির পাড়েই শাহ্ নেয়ামতউল্লাহ (রহ.) সমাধি, মাজার, তাহাখানা ও তিন গম্বুজ মসজিদ অবস্থিত। একটা সাইনবোর্ডে দীঘিটির ইতিহাস লেখা আছে। মুঘল সম্রাট শাহ সুজার শাসন আমলে এটি বানানো হয়। কথিত আছে, শাহ নেয়ামতউল্লাহর সময়ে কোনো বিশেষ কারণে এ পুকুরের পানি বিষাক্ত হয়ে যায়। মানুষ কিংবা অন্য কোনো জীব-জন্তু এর পানি পান করলেই মারা যেত। শাহ সাহেব কয়েকজন মুরীদসহ এখানে উপস্থিত হবার পর সকলে মিলে পুকুরের পানি পান করেন। সঙ্গে সঙ্গে পানি ভালো হয়ে যায়।

এলাকার মানুষজন বিশ্বাস করেন, খাসমনে এর পানি পান করলে যেকোনো প্রাচীন রোগ সেরে যায়। এজন্য এ পুকুরের পানি জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবার নিকট পবিত্র। রোগ-ব্যাধি মুক্ত হওয়ার জন্য ধর্মপ্রাণ মুসলমান এই পানি ব্যবহার করেন। আমরাও দীঘির পাড়ে প্রচুর মহিলাদের দেখলাম, যারা কাপড় শুকাতে দিয়েছেন দীঘির পাশের সবুজ ঘাসে।

দাফেউল বালা দীঘি। Source : ইভা

ছোট সোনা মসজিদ ও বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের সমাধি

বিখ্যাত ছোট সোনা মসজিদে গেলাম দুপুরের খাবার খেয়ে। অন্যান্য মসজিদের মতো এটি লালচে ইটের তৈরি নয়। বরং কালচে ধূসর রঙের পাথরে বানানো হয়েছে মসজিদটি। মসজিদের অলংকরণের ক্ষেত্রে ইটের বিন্যাস, পোড়ামাটির ফলকের গিল্টি ও চকচকে টালি ব্যবহৃত হলেও এগুলোর ভেতর প্রাধান্য পেয়েছে খোদাইকৃত পাথর। জুম্মা নামাজের পর ভেতরে ঢুকে দেখলাম, ছাদে গম্বুজের খাঁজ। এত সুন্দর নকশা ভিতরেও। মসজিদের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা তখন একপাশে খাবার খেতে বসেছেন।

মসজিদের সামনে তখনকার রীতিতে বাঁধাই করা দুটি সমাধি দেখতে পেলাম। ওখানে সরু পিপাকৃতির পাথরের সমাধিফলকে কুরআনের আয়াত ও আল্লাহর কতিপয় নাম লেখা আছে। এখানে কারা সমাহিত আছেন তা সঠিক জানা যায়নি।

পুরাতন কবর দুটির পাশে আরোও দুটি আধুনিক কবর রয়েছে। এই কবর দুটি বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর নাজমুল হকের।

ছোট সোনা মসজিদ। Source : ইভা

কানসাটের জমিদার বাড়ি

জমিদারবাড়িটি আমাদের গাড়ি চালক চিনতেন না। রাস্তার ধারের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে করে গিয়েছি। যেকোনো এলাকার জমিদারবাড়ি সম্পর্কে আমার খুব আগ্রহ। এখানে আসার আগে জানতে পারলাম, এই কানসাটের জমিদারদের বানানো নিদর্শন আমি আগেও দেখেছি। কীভাবে? আসলে এখানকার জমিদারদের আদিপুরুষ প্রথমত বগুড়া জেলার কড়ইঝাকৈর নামক গ্রামে জমিদারি করছিলেন। কিন্তু দস্যু সরদারপন্ডিতের অত্যাচারে তারা ওখান থেকে ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছাতে স্থানান্তরিত হন।

পরে আবার মুক্তাগাছা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে এসে স্থায়ী হন। শশীলজের নির্মাতা সূর্য্যকান্ত এবং তার পুত্র শশীকান্ত ও শীতাংশুকান্ত এই বংশের সর্বশেষ বংশক্রম। জমিদার কার্য ছাড়াও এরা হাতির বেচাকেনা করতেন। আসামে এদের একটি ‘খেদা’ ছিল। এই জমিদার পরিবারে মুসলিম বিদ্বেষী ছিলেন। এর বহু দৃষ্টান্ত এই অঞ্চলে এখনো রয়ে গেছে। এমনকি হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে এক দাঙ্গার সুত্রপাত হয় এদের মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাবের জন্য।

কিন্তু মুসলিম বিদ্বেষী জমিদার শিতাংশু বাবুর জমিদার বাড়ি দেখতে পেয়ে আমরা পুরোপুরি হতাশ হয়েছি। এতটাই যে গাড়ি থেকেও নামিনি। এককালে বিশাল এলাকা জুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দোতলা বাড়ি ভেঙে একাকার হয়ে গেছে। কিছু অংশ দখলদাররা নিয়ে দোকান পাট বসিয়েছে, কিছু অংশ ময়লা ফেলার ভাগাড়। কোনো সিঁড়িঘর খুঁজে পাইনি যে ছাদে যাব। তবে বাড়িটি যে অনেক জায়গা জুড়ে ছিল, তার প্রমাণ পেয়েছি।

মহানন্দা নদীর ধারের কাশফুলের চর

এরপর গেলাম মহানন্দার ধারে। মহানন্দা বয়ে চলছে আপন গতিতে। তার পাশের বালুকাময় বিশাল চর পুরোটা ছেয়ে আছে সাদা-সবুজে। কাশবন যেন নিজের সবটুকু রূপ ফুটিয়ে তুলেছে এই বেলায়। আহা! এই কাশবনের শোভা দেখে তাসমি-ইভা বাচ্চাদের মতো দৌড়ে নেমে গেল মহাসড়ক থেকে। ব্লক দিয়ে বাঁধানো ওই খাড়াই পথ তাদের আটকাতে পারলো না।

মহানন্দা নদীর ধারের কাশফুলের চর। Source : ইভা

কাশবনে কিছুক্ষণ কাটিয়ে, গায়ে কাশফুলের রোয়া ধারণ করে উঠে এলাম নিচের বেলাভূমি থেকে। প্রচণ্ড রোদ আর গরম না থাকলে যে আরো অনেকটা সময় এখানে থাকতাম, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

নিমগাছি

এরপর আমরা গেলাম নিমগাছি। এটা বিখ্যাত কোনো দেখার জায়গা নয়। কিন্তু রিসাত আগেই বলেছিল এখানে এলে ভালো লাগবে। একটা বিকেলে এখানে কাটাতে সত্যিই ভালো লাগবে। নিমগাছি জায়গাটা দেখে মনে হলো, এরকম জায়গা আমার বহু দিনের চেনা। চারকোণা ব্লক দিয়ে বাঁধাই করা নদীতীর, ভাঙন রোধ করার জন্য এভাবে বাঁধানো।

যেহেতু শরৎকাল, তাই রাস্তা থেকে প্রায় ৩০ ফুট নিচে পানি এসে ব্লকের গায়ে ছোট ছোট ঢেউয়ে আছড়ে পড়ছে। সত্যি সত্যিই ছলাৎ ছলাৎ শব্দে ঢেউগুলো ভাঙছে। এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া নদীটি যেন উচ্ছল কিশোরীর মতো। তার ধার ঘেঁষে চলে যাওয়া আঁকাবাঁকা রাস্তাটিকে উচ্ছল কিশোরীর বান্ধবীর ভূমিকায় অনায়াসে বসানো যায়। তবে বান্ধবীটির উচ্ছলতার বদলে আছে গাম্ভীর্য। তার দুই ধারের গাছের সারি সেই গাম্ভীর্যে এনে দিয়েছে আলাদা মাত্রা। রাস্তার এক ধারে নদী, অন্য ধারে ছোট ছোট গ্রাম আর ফসলী জমি। নদীর অপর পাশে দূরের গ্রাম দেখা যায়। সেই সাথে আছে বিস্তীর্ণ আমবাগান।

কলাই রুটি। Source : লেখিকা

এসব ছাড়াও চাঁপাইয়ে আরোও দেখার মতো কিছু জায়গা আছে। তরতীপুর, চাঁপাই জামে মসজিদ, মহারাজপুর জামে মসজিদ, মাঝপাড়া জামে মসজিদ, হযরত বুলন শাহ (রাঃ) মাজার, মহারাজপুর মঞ্চ, বারঘরিয়া মঞ্চ, জোড়া মঠ। বাইশ দেবী সমৃদ্ধ সর্ববৃহৎ দুর্গাপূজা হয় এই মসজিদের নগরীতে। এছাড়াও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদর হতে ১০ কি.মি. দূরত্বে আছে বাবুডাইং নামের একটি প্রাকৃতিক পিকনিকস্পট।

সব মিলিয়ে এ জেলায় অনেক কিছুই আছে। কিন্তু পর্যটন কেন্দ্র না থাকায় পর্যটকরা তেমনভাবে এখানে আসে না। আমার মতো কিছু পর্যটক আসলেও সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েই গেছে। এসব কিছু বিবেচনা করেই হয়তো মহানন্দা নদীর পাড়ে পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আশা করছি, দেশের বিভিন্ন স্থানের পর্যটকদের সাথে সাথে বিদেশী পর্যটকরা এসে ঘুরে যাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ। দেখে যাবে আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য।

Feature image  : ইভা

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কম খরচে ফিলিপাইন ঘুরে আসার অভিনব উপায়

মন প্রশান্তির হাজাছড়া ঝর্ণা