নির্ঘুম করিডোর থেকে মনপুরার স্নিগ্ধ সকালে

লঞ্চে ওঠার পরে সবাই বেশ উৎফুল্ল, সেটাই স্বাভাবিক। কারণ যেখানে লঞ্চ পাবারই কথা ছিল না সেখানে এখন সবাই এক সাথে। লঞ্চে ওঠার আগে, মাঝ রাস্তায় একবার এও ভেবে রেখেছি, যে যদি হাতিয়ার লঞ্চ না পাই, তবে যারা উঠতে পারবো না তারা অন্য লঞ্চে উঠে পটুয়াখালি চলে যাব। কুয়াকাটা ঘুরে আসব! কিন্তু ট্যুর কোনোভাবেই বাতিল করব না! এটা আমার প্ল্যান বি। আমার সকল পরিকল্পনাতেই সাধারনত প্ল্যান এ এর পাশাপাশি, প্ল্যান বিও থাকে। যেন একটা বাতিল হলেও আর একটা কার্যকর করা যায়।

নিঝুম দ্বীপের লঞ্চে। ছবিঃ জামিল

সে যাই হোক, কেবিনে কোনো রকমে ব্যাগগুলো ছুড়ে ফেলে, করিডোরে চলে এলাম সবাই মিলে। চরম আড্ডায় মশগুল। এই গল্প, সেই গল্প, এর আলোচনা, ওর সমালোচনা, ভালো বসদের প্রসংশা আর বাজে বসদের গুষ্টি উদ্ধার করতে লাগলাম, যে যার মতোন। এবং এতে সবাই শামিল! কারণ চাকুরীজীবী সাথে ভ্রমণকারী মানে সবারই কম-বেশী এই অভিজ্ঞতা আছে!

বুড়িগঙ্গার পানির বিকট গন্ধে নিঃশ্বাস যেন নিঃশেষিত! নাক চেপে ধরলে মুখে ঢুকে যায়। আর মুখ চেপে রাখলে নাকে ঢুকে পড়ে, আর নাক-মুখ দুটোই চেপে রাখলে প্রাণ প্রায় যায় যায়! সে এক বিষম ব্যথা! মনের ব্যথা, সীমাহীন সম্ভাবনার চোখের সামনে অপমৃত্যুর ব্যথা। সে আমি বলব না, আমি পরিবেশবাদী নই, আমি রাজনীতিবিদও নই, নই কোনো উন্নয়নকর্মী, শুধু পারি নিজের ব্যথা সয়ে নিজের সাথে বকতে, ধিক্কার দিতে নিজেই নিজেকে!

জেলেদের যাপিত জীবন। ছবিঃ লেখক

সে সব থাক, আমরা আমাদের কথা বলি। চা-টা, এটা-ওটা এবং বেশ রাতে লঞ্চের বেশ স্বাদযুক্ত (যেহেতু তেলে টুপটুপে) ডিনার শেষ করে আবার সেই করিডোরে ফেরা। এবং আবার সেই গল্পের ঝুড়ি খুলে বসা। মনের মাঝে জমে থাকা, কত শত ক্ষোভের নিশ্চিন্ত উদগীরণ! লঞ্চ এবার বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা ছেড়ে মেঘনায় পতিত। শুরু হলো বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়া। খণ্ডিত চাঁদের মাঝেই রোমান্টিকতার স্বাদ খুঁজে নেয়া। অল্প-বিস্তর মেঘেদের সাথে তারাদের লুকোচুরি। মৃদু বাতাস, হালকা ঢেউয়ের ক্ষণিক দোলা, কাছে-দূরের লঞ্চ-ইস্টিমারের আলোর বিতরণ, গভীর জলে জেলেদের জীবন-যাপন।

চাঁদপুর পার হবার পরে চোখের কাছে ঘুমের আকুতি! বিছানার কাছে শরীরের আকর্ষণ। বালিশের তরে মাথার টান। বিশ্রামের কাছে ক্লান্তির সমর্পণ। তো চল এবার ঘুমোতে যাই? চলে গেলাম যে যার মতোন। বিড়ম্বনার শুরু এখানেই। অধিক উত্তেজনাবসত কেউই খেয়াল করিনি যে আমাদের মাত্র একটা সিঙ্গেল কেবিন নেয়া ছিল। আসে পাশে বা ডেকে কোনো সিটও দখল করা হয়নি! যে কারণে এখন এক কেবিনেই সবার সংকুলান করতে হবে!

কোমল বাহন লঞ্চ। ছবিঃ লেখক

কিন্তু বাস্তবতা তো তা মেনে নিচ্ছে না! তো ঠিক করলাম বাসের মতো করে সবাই মিলেই আধ-শোয়া আর আধো-বসার ব্যবস্থা করা যায় কিনা? যেহেতু সবার একটা করে চেয়ার আছে, সেহেতু সবগুলো চেয়ার খাটের মুখোমুখি করে, লেপ আর বালিশটাকে বেডের পিছনে দিয়ে, বেডে শরীর আর চেয়ারে পা দিয়ে বাসের সিটের মতো করে থাকার চেষ্টা! কিন্তু তাতেও সমস্যা, এতটুকু নড়া-চড়া করা যায় না! আর দেখবেন, যখনই যে কাজ না করার কারণ থাকবে, তখন সেটাই বেশী করে করার ইচ্ছে জাগে। যেমন আমাদের ক্ষেত্রে নড়াচড়াটা ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে গেছে, নড়াচড়া করা যাবে না বলে!

অথবা জায়গা কম তাই নড়াচড়াটা বেশী বোধ হচ্ছে, যেটা অন্য সময় হয় না। কিন্তু এভাবে হচ্ছে না দেখে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, সবাই মিলে কেবিনের করিডোরেই থাকবো, চাদর বিছিয়ে। যেই কথা, সেই কাজ, চাদর নিতে গিয়ে দেখা গেল মাত্র দুইটা! হোক, ওতেই হবে! সুতরাং এবার একটি চাদর বিছিয়ে আর একটি গায়ে দিয়ে পড়ে থাকা!

একটু পড়েই শুরু হলো নদীর হু-হু বাতাস আর শীতের ছোবল। শীত আর বাতাসের চেয়েও যেটা বেশী অসহনীয় লাগছিল, সেটা হলো একজন একপাশ থেকে চাদর টানলে অন্য পাশ থেকে আরেকজনের গায়ে থাকে না! আবার মাথা ঢাকতে গেলে পা বেরিয়ে যায়! আর পা ঢাকতে গেলে মাথা! আর পিঠের নিচের চাদর আরো বেয়াদব! নড়াচড়ায়, পিঠের নিচ থেকে সরে যায় বারে বারে আর সাথে সাথে জেঁকে ধরে ইস্পাতের শীতলতা দুই পাশ থেকেই।

একান্তে প্রকৃতি উপভোগ। ছবিঃ শাহরিয়ার

একবার একজনকে, তো আরেকবার অন্যজনকে, সুতরাং সবাই-ই অস্বস্তিতে শুধু চাদরের চতুরতায়! আর সাথে রয়েছে দুই পাশ, পা-মাথা আর উপর-নিচের বাতাসের যন্ত্রণা! সেই সবকে সাথে করে, আধো-ঘুমে, আধো জাগরণে ভোরের উঁকিঝুঁকি। নির্ঘুম তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে হঠাৎ আলোর বিরক্তি।

চোখ কচলে সামনে তাকাতেই, দূরে জেগে ওঠা নাম না জানা সবুজ চরের সারি… একটার পর একটা। কাক ডাকা ভোর… নির্মল বাতাস… দূর দিগন্তে আলো ছড়ানো আকাশ… অরুনের কিরণ মালা… মাঝ নদীতে মাঝিদের ঘরে ফেরা… এসব দেখে নির্ঘুম রাতে, মনের মাঝে জমে যাওয়া কুয়াশা বিলীন হয়ে, এক স্বপ্নিল সকালের হাতছানি…

সামনেই দেখা যাচ্ছে অনেক গল্প শোনা মনপুরা দ্বীপ!      

সকাল ৬:৩০ লঞ্চ থামার পূর্ব সংকেত। তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখে এক কোমল সকালের হাতছানি মনপুরা দ্বীপে।  অনেক নাম শুনেছি, এই প্রথম চোখে দেখছি। দারুণ অনুভূতি, অদ্ভুত শিহরণ, লঞ্চ থামাতে বেশ বেগ পেতে হলো চরের কারণে। অবশেষে থেমে গেল ইস্পাতের কাঠামোতে, কাঠের সিঁড়ি দিয়ে সংযোগ, লঞ্চ ও ঘাটের সম্মিলন, যাত্রীদের সুবিধার্থে। নেমে পড়লাম সিঁড়ির আগেই। কীসের সিঁড়ি? লাফ আছে না? পড়ে গেলেও ক্ষতি নেই। সাঁতার তো জানিই!

মনপুরা দ্বীপ। ছবিঃ লেখক

এক ছুটে সবুজের মাঝে, নদীর ঘাটে, সে কি সবুজ… প্রান্ত জুড়ে, শিশির জড়ানো ঘাসে-ঘাসে, শুষ্ক পায়ে আলতো পরশ, হাতে মাখাই, গালে ছোঁয়াই, নদীর চরে নেমে একটু কাদা লাগাবো, পা ভেজাবো, তার আগেই ডাক পড়লো সকালের নাস্তার, নাস্তা শেষে আবার ছুট। এবার সবাই মিলে। কেউ মাছ ধরার চাইয়ে ঢুকে যায়, কেউ বিলাসী মনে নারিকেল গাছের তলে, কেউ মাছ ধরার নৌকার মাঝি হতে চায়, কেউ চায় আকাশ ছুঁতে, কেউ ডানা মেলা গাঙচিল।

আমি কী চাই? কিছুই না! চাই একটু একলা হতে! কিছুটা সময় ঘুরে বেড়াতে, সবুজ ঘাসের ছোঁয়া নিয়ে, ঝিরঝিরে বাতাস গায়ে মেখে, নির্মল আর বিশুদ্ধ গ্রামের জীবন ও ছবি দেখতে, জেলেদের কথা শুনতে, বহুদিন না দেখা জীবিত মাছের ছটফটানি উপভোগ করতে, রাজহাঁসের শামুক খাওয়া, গৃহপালিত পশুর অবাধ বিচরণ, গ্রামীণ নারীর কলসি কাঁখে হেঁটে যাওয়া, কিশোরদের কাদা মাখামাখি, মাঝ নদীতে ডিঙ্গি নৌকার লাফালাফি, ভেঙে যাওয়া পাড়ে বসে পা দোলাতে, বেরিয়ে থাকা গাছের শিকড়ে ঝুল খেতে, গাছের সবুজ কচি ডাবের দিকে লোভাতুর দৃষ্টি!

মনপুরার স্নিগ্ধ সকাল। ছবিঃ লেখক

বেশ অনেকটা নির্মল সময় কাটিয়েছিলাম এই নির্জন আর মনকাড়া মনপুরা দ্বীপে, সবুজ মাঠে, ভেজা ঘাসে, কোমল নদীতে, মৃদু ঢেউয়ে আর ঝিরঝিরে বাতাসের মাঝে। অনন্তকাল মনে গেঁথে যাওয়ার মতো ছিল মনপুরার সেই স্নিগ্ধ সকালটা।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মহেশখালীর মগনামা ঘাটের দারুণ এক সূর্যাস্তের গল্প

বোটানিক্যাল গার্ডেন মিরপুর:দেখেছ কি দু'চোখ মেলিয়া?