লাটাগুড়ির শিশির ভেজা স্বপ্নের সকাল

আমি ভীষণ ভাগ্যবান একজন মানুষ। মনে-প্রাণে যখন যা চাই, কোনো না কোনো সময়ে, একটু আগে বা একটু পরে ঠিক ঠিক সেই জিনিস পেয়ে যাই! উপরওয়ালা আমার জন্য সেসব জিনিস নিয়ে অপেক্ষা করেন যেন! দেন ঠিকই, একটু আগে বা পরে, কিন্তু মন থেকে চেয়েছি আর পাইনি, এমন কোনো কিছু আজ পর্যন্ত ঘটেনি! এতটাই ভাগ্যবান আমি।

এই যেমন কিছুদিন আগে ঘুরে আসা ডুয়ার্স যাবার আগে ঠিক এমন একটি সকালের স্বপ্নই দেখছিলাম। বিশেষ করে যেদিন থেকে বছরের শেষ মাসের শেষ সপ্তাহে ডুয়ার্স যাবার পরিকল্পনা করতে শুরু করেছিলাম আর সাথে একটুখানি দার্জিলিং। একটি শীতের সকাল হবে ঠিক এমন…

শীতের সকালের প্রথম সূর্য। ছবিঃ লেখক 

কোনো এক সবুজের সমুদ্র, কচি সবুজ চা বাগানে বা কোনো নীরব অরণ্যের মাঝের কোনো কটেজে ঘুম ভাঙবে পাখি ডাকা ভোরে। স্নিগ্ধ সকালে শিশির ভেজা সবুজ ঘাসে পা ছোঁয়াবো, কোনো এক চা বাগানে অথবা নির্জন কোনো অরণ্যের মাঝে। অনুভব করবো কুয়াশা জড়ানো এক ধূসর সকাল, শুনবো অরণ্যের অপরিচিত পাখির প্রথম সকালের ডাক, চোখ মেলে দেখবো উড়ে যাওয়া বক বা পানকৌড়ি, একরাশ মেঘ এসে ছুঁয়ে যাবে, উষ্ণতা মাখবো প্রথম সূর্যের। সব কিছু মিলে সেটা হবে এক অপার্থিব সকাল। যে সকালের অপার প্রকৃতির এতটুকুও যেন দুই চোখের আড়াল রয়ে না যায়। 

সোনার বাংলা কটেজে মধ্য রাতে ঘুমে গিয়েও, ঘুম ভেঙেছিল একদম পাখি ডাকারও আগে। আর দেরি কেন তবে, পুষিয়ে নিতে আগের রাতের মন খুলে আর প্রাণভরে ঘুরে বেড়াতে না পারা, বেরিয়ে পড়েছিলাম সাথে সাথে। রুমের দরজা খুলে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতেই মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হতে হলো, যা যা চেয়েছি ঠিক তাই তাই পেয়ে, চোখের সামনে দেখে আর স্পর্শ করতে পেরে।

নান্দনিক কটেজের পথ। ছবিঃ লেখক

সিঁড়ি দিয়ে নিচে পা রাখতেই গতকাল রাতের অন্ধকারে কালচে মিহি ঘাসের গালিচা সবুজে আমন্ত্রণ জানালো। রাতভর শিশিরে ভিজে টুপটুপ করছিল প্রতিটি সবুজ ঘাসের ডগা। কাছে পিঠের পাতা বাহার আর নানা রকম গাছের পাতায় পাতায় ঝুলে আছে শেষ শিশির বিন্দু, অপেক্ষায় আছে কখন সে সূর্যের উষ্ণ আদরের পরশ পেয়ে লাজে রাঙা হয়ে ঝরে পরবে, সবুজ বিছানায়! ধীর পায়ে কুয়াশার ঝরে পড়ার অপেক্ষা দেখে আর অজস্র শিশির বিন্দুদের অপেক্ষায় রেখে সামনের পথ ধরলাম।

সামনের কটেজগুলো এক একটি দোতালা ছোট্ট পাখির বাসার মতো যেন! অফ হোয়াইট কটেজের দিকে দুই ভাগ হয়ে আলাদা হয়ে গেছে দুটি রঙিন রাস্তা, যার একটি সামনের নিচ তলার রুমের সাথে লাগোয়া লনে চলে গেছে, আর অন্যটি একটু বেঁকে দোতালার সিঁড়ির কাছের লনে গিয়ে মিশেছে। কী যে অদ্ভুত লেগেছে দোতালা কটেজের দুটো বাংলোর জন্য দুটো সরু রাস্তার ভাবনা দেখে বলে বোঝানোর নয়। অথচ আমরা হলে ঠিক একটি রাস্তা দিয়ে, নিচ তলার রুমের সিঁড়ি দিয়েই দোতালায় যাবার সিঁড়ির ব্যবস্থা করতাম।

সবুজের মাঝে বর্ণীল আয়োজন। ছবিঃ লেখক

সেখানে দুই কটেজে যাবার দৃষ্টি সুখের দুই রাস্তার ছবি তুলে সামনের দিকে এগোলাম। যেখানে দূরে রিসোর্টের প্রাচীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি সুপারি গাছের বন। দুই একটি করে পাখি উড়ে এসে বসেছে, কুয়াশা ঘেরা লাটাগুড়ির ধূসর অরণ্যের গাছে গাছে। ঘন কুয়াশার মাঝে ওদের ধূসর ছবি তুলে পিছনের পথে পা রাখলাম। ছোট্ট টিলার মতো একটু উঁচু জায়গায় এসে থমকে গেলাম। আর এখানে যে আছে ফুল আকৃতির জলাশয়, রয়েছে গ্রুপ করে বসে সময় কাটানোর জন্য দারুণ বসার আয়োজন, রোদ বা বৃষ্টি থেকে বাঁচবার জন্য রয়েছে উপরে ছাতার মতো ছাদ। বাহ দারুণ আয়োজন, মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না।

শিশির ভেজা সবুজ ঘাস, শিশিরে জড়ানো গাছের পাতা, ভেজা মাটির মেঠো পথ পেরিয়ে রিসোর্টের সামনের দিকে এগোতেই চোখে পড়ল এক গোলাপি পদ্মপুকুর। যেখানে ফুটে আছে গোলাপি রঙের অসংখ্য পদ্ম ফুল। জলাশয়ের উপরের ঝুলন্ত ব্রিজে উঠে গোলাপি পদ্ম আর এপাশের গোলাপি কটেজের ছবি তুলে রাস্তার দিকে যেতেই চোখে পড়ল কল্পনার রঙে এঁকে রাখা, সবুজ গালিচার মাঝে ছোট্ট দোলনা। ভীষণ অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম, এই মনে করে যে কল্পনার সবটুকুই দেখছি সত্য হয়ে ধরা দিচ্ছে একে একে। এওকি সম্ভব? ঠিক যা, যেভাবে ভেবেছি বা চেয়েছি, তাই তাই হুবহু সেভাবেই যে ধরা দিচ্ছে!

স্বপ্নিল সকালে, বর্ণীল স্বাগতম। ছবিঃ লেখক 

শীতের স্নিগ্ধ সকাল, শিশিরে ভিজে থাকা সবুজ ঘাস,পাতায়-পাতায় শিশিরের ঝুলে থাকা শেষ বিন্দু, পাখিদের কলরব, ছোট্ট জলাশয়, ফুটে থাকা গোলাপি পদ্ম, নির্জন অরণ্যের মাঝে এক অপূর্ব আর নান্দনিক রিসোর্ট বা কটেজ। এসব দেখে দেখে অভিভূত হয়ে ফিরে আসতে আসতেই দিনের প্রথম সূর্য চোখ মেলে তাকালো, লাটাগুড়ির অরণ্য জুড়ে। হিম শীতে একটা মিষ্টি রোদ এসে আলিঙ্গনে বেঁধে ফেলল, পরম উষ্ণ আর আদুরে ছোঁয়া দিয়ে।সুখে শিহরিত হয়ে উঠেছিলাম, পার্থিব সকালের সকালের এমন অপার্থিব আশীর্বাদের পরশ পেয়ে।

আহ, কীভাবে বিধাতাকে কৃতজ্ঞতা জানালে সেটা ঠিক মনের মতো হবে বুঝতে পারছিলাম না কিছুতেই। এভাবেও কী কারো মনে মনে কোনো কিছু চাওয়া, হুবহু পাওয়ায় পরিণত হয়, হতে পারে, হওয়া সম্ভব! ভাবতেই পারছিলাম না। মনে মনে সৃষ্টিকর্তার কাছে অসীম কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রুমে ফিরেছিলাম সবাইকে জাগিয়ে ২০ রুপীর অনন্য উপহার নিতে।

সবুজ ঘাসে শিশিরের সুখ! ছবিঃ লেখক

আর আমার কাছে এই ভ্রমণের বিশেষ পাওয়া হয়ে রয়ে গেল, এমন একটা স্বপ্নের মতো, স্বপ্ন পুরণের পূর্ণতার…

শিশির ভেজা স্বপ্নের সকাল।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভ্রমণে জীপ রিজার্ভ, শেয়ার নাকি পাবলিক বাস?

সিলেটের মাধবপুর চা বাগান ও লেক ভ্রমণের আদ্যোপান্ত