অপরূপ নির্মাণশৈলী আর নান্দনিকতায় পরিপূর্ণ যশোরের মণিহার সিনেমা হল

এইবারে যশোরে যাওয়ার পরিকল্পনা হয় আকস্মিকভাবেই। ব্যক্তিগত কাজেই মূলত যশোরের দিকে যাওয়া। সন্ধ্যা ৭টার চিত্রার ট্রেনের টিকিট কেটে যশোরের উদ্দেশ্যে রওনা হই। বেশিরভাগ সময় ট্রেন লেট থাকে কিন্তু ঐদিন ভাগ্যক্রমে ট্রেন ঠিক সময় ছেড়ে গিয়েছিল।

আলো আধারির মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ট্রেন; ছবি- লেখক

ঝকঝকাঝক শব্দ করতে করতে ট্রেন এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। কখন ঘন অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আবার কখনো বা আলোর ছটা এসে পড়ছে ট্রেনের গায়ে। আমার দৃষ্টি সীমানা পেরিয়ে ছুটে চলেছে দু’ পাশের পৃথিবী। আর তখনই মনে পড়ে গেল শামসুর রাহমানের কবিতার লাইনগুলো…

ঝক ঝক ঝক ট্রেন চলেছে
রাত দুপুরে অই।
ট্রেন চলেছে, ট্রেন চলেছে
ট্রেনের বাড়ি কই?

ছুটন্ত ট্রেন, আলোআঁধারির খেলার মাঝে হুট করেই বোধ করলাম পেট কিছু চাইছে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে পেটে কিছু পড়েনি। বেশ রাতও হয়ে গেছে। তৎক্ষণাৎ সাথে করে আনা নুডুলস মুখে পুরে দেই। আয়েস করে খাবার খেয়ে আহমেদ ছফার প্রবন্ধ সমগ্র খুলে বসলাম।

যশোর রেলওয়ে স্টেশন; ছবি- লেখক

পড়তে পড়তে চোখটা কখন যেন লেগে এসেছে। ট্রেনের ভেতর থেকে ভেসে আসা শব্দে হুড়মুড় করে জেগে উঠি। ট্রেন ততক্ষণে যশোর জংশনের খুব কাছেই চলে এসেছে। সবাইকে নামার প্রস্তুতি নেওয়ার কথা বলা হয়।

আলো ফোটার অপেক্ষায়; ছবি- লেখক

স্টেশনে যখন নামলাম তখন রাত ৩টা বাজে। এত রাতে কোথাও যেতে দিচ্ছে না আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। তাই অগত্যা অপেক্ষা করতে হয় স্টেশনে। স্টেশনে আগে থেকে ভাগ্নে রিফাত অপেক্ষা করছিল। তাই রক্ষা। বাকি রাতটুকু ওর সাথে গল্প করে কাটিয়ে দেই।
ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে বের হই রিফাতের বাসার দিকে। স্টেশন থেকে রিকশা নিয়ে সোজা চলে যাই ওদের বাসায়। হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে খাবার খেয়ে এক ঘুম দেই। ঘুম থেকে উঠে দেখি বিকাল হয়ে গেছে। তাই সেইদিন দূরে কোথাও যাওয়া হয়নি। বিকেলের দিকে বের হই যশোর শহর ঘুরে দেখতে। প্রথমেই যাই মণিহার সিনেমা হল দেখতে।

মণিহার সিনেমা হল; ছবি- রিফাত রাব্বি

যশোর শহরের জিরো পয়েন্ট দড়াটানা হতে মাত্র দেড় কিলোমিটার পূর্বে এই সিনেমা হলটি অবস্থিত। বৈচিত্র্যময় আর নান্দনিক নির্মাণশৈলীর কারণে এর পরিচিতি দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও।

দোতলার করিডর জুড়ে চলচিত্র সংশ্লিষ্টদের ছবি; ছবি- লেখক

এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সিনেমা হল যশোরের মণিহার। আর এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সবথেকে বড় সিনেমা হল যশোরের মণিহার সিনেমা হল। সিনেমা হলটির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম সিরাজুল ইসলাম। ১৯৮৩ সালের ৮ ডিসেম্বর ৪ তলা বিশিষ্ট দেশের বৃহত্তম সিনেমা হল চালু হয়। আর ৪ তলায় আছে শীততাপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা। তৎকালীন সময় আধুনিক নির্মাণ কৌশলের কারণে ব্যাপক জনপ্রিয় হয় এটি।

৪ বিঘা জমির উপর ১ হাজার ৪০০ আসন বিশিষ্ট এই সিনেমা হল গড়ে ওঠে। এই সিনেমা হলের স্থপতি ছিলেন কাজি মোহাম্মাদ হানিফ। তৎকালীন সময় পরিচালক দেওয়ান নজরুলের ছবি ‘জনি’ প্রথম প্রদর্শিত হয়। এই ছবিতে শ্রেষ্ঠাংশে নায়ক ছিলেন সোহেল রানা এবং নায়িকার চরিত্রে ববিতা।

র‍্যাম সিঁড়ি; ছবি- রিফাত রাব্বি

পুরো সিনেমা হল জুড়ে আছে নান্দনিকতার ছোঁয়া। আছে কাঠের তৈরি র‍্যাম সিঁড়ি, বিশাল বিশাল ঝাড়বাতি আর কৃত্রিম ফোয়ারা। সন্ধ্যার দিকে ঝাড়বাতির আলোয় আলোকিত হয় পুরো সিনেমা হল। কৃত্রিম ফোয়ারার পানির রিনঝিন শব্দে মুখরিত হয় সিনেমা হলের চারিধার। দু’তলার সিঁড়ির চারপাশের দেয়াল জুড়ে আছে নায়ক-নায়িকা, পরিচালক ও প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের ছবি। আছে ফুড কর্নার।

চিত্রশিল্পী এসএম সুলতানের তত্ত্বাবধানে বিমানেষ নামে এক শিল্পী মণিহারে পাথর দিয়ে ষড়ঋতুর প্রস্তর নির্মাণ করেন। খিড়কিতে রঙিন কাঁচের মধ্যে দিয়ে প্রতিফলিত আলো মণিহার সিনেমা হলকে দিয়েছে অন্যরকম সৌন্দর্য।

জানালায় রঙিন কাঁচ; ছবি- লেখক

এই সিনেমা হলটি তৈরির পর কী নাম রাখা যায় এই ভেবে সেই সময় পত্রিকায় একটি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। সারাদেশ থেকে প্রায় লাখ খানেক নাম এসেছিল এই হলটির জন্য। তার মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া হয় ‘মণিহার’। ভালো ভালো ছবি চালানোর জন্য এই সিনেমা হলের সুনাম ছিল দেশ জুড়েই। তাছাড়া বাংলাদেশের খুব কম সংখ্যক চলচিত্র শিল্পী আছেন যারা মণিহারে সিনেমা দেখেননি।

এসএম সুলতানের চিত্রকর্ম ষড়ঋতুর প্রস্তর ; ছবি- লেখক

মণিহার সিনেমা হলের নান্দনিকতা উপভোগ করতে করতে মনে পড়ে যায় ছোটবেলার কথা। খুব ছোট বয়সে মায়ের সাথে একবার গিয়েছিলাম ছবি দেখতে। এত বড় সিনেমা হল দেখে তখন খুব পুলকিত হয়েছিলাম। মায়ের মুখে শুনেছি তখন নাকি দূর দূরান্ত থেকে মানুষ গাড়ি নিয়ে আসত এখানে সিনেমা দেখতে। ছবি শুরু হওয়ার আগে আশেপাশের এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে যেত। কী নাম ডাক ছিল তখন! অতীতের সেই জৌলুস এখনও তেমন না থাকলেও এখনও ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে মণিহার সিনেমা হল।

নান্দনিক ঝাড়বাতি; ছবি- রিফাত রাব্বি

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। ঘরে ফেরার তাড়া অনুভব করতে করতে বেরিয়ে পড়ি হল থেকে। সেই ছোটবেলার স্মৃতি তাড়া করে ফিরছে আমায়। সিনেমা ব্যবসায় মন্দাভাবের কারণে এভাবেই কত ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে পথ চলছে। হয়তো এভাবেই একদিন কালের গহ্বরে হারিয়ে যাবে অতীতের সেই জৌলুস ছড়ানো অপরূপ নির্মাণশৈলীর যশোরের মণিহার সিনেমা হল।

মণিহার হলের প্রবেশ মুখে; ছবি- লেখক

যেভাবে যাবেন

সারাদিনই ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে যশোরের উদ্দেশ্যে বাস ছেড়ে যায়। জনপ্রতি ৮০০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে এসি বাসের ভাড়া। আর জনপ্রতি নন-এসি বাস ভাড়া ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। তাছাড়া ট্রেনে যেতে পারেন। সন্ধ্যা সাতটায় চিত্রা ছাড়ে কমলাপুর থেকে। তবে রাতের ট্রেনে গেলে বেশ কয়েক ঘণ্টা স্টেশনে অপেক্ষা করতে হবে। স্টেশন থেকে রিকশা বা অটো নিয়ে মণিহার সিনেমা হল ঘুরে আসতে পারবেন।

থাকা-খাওয়া

যশোর শহরে ভালো মানের থাকা খাওয়ার হোটেল পাওয়া যাবে।
অবশ্যই মনে রাখবেন-
*যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা থেকে দূরে থাকবেন।
*সঙ্গে নেওয়া পলি প্যাকেটগুলো সঙ্গে নিয়ে ফিরুন।

*** ফিচার ইমেজ – লেখক

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

১০টি স্থান যা এখনও অনেক ভ্রমণপ্রিয়র কাছেই অচেনা

অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের জাদুঘর ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কথকতা