মহেশখালীর মগনামা ঘাটের দারুণ এক সূর্যাস্তের গল্প

“কক্সবাজার” নাম শুনলেই সবার প্রথমে মনে পড়ে পর্যটন এলাকা ও পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের কথা। এর বাইরে প্রথমবার শুনলে কেউ অন্য কিছু চিন্তা করতে পারে না। কিন্তু কক্সবাজারেরও কিছু বাসিন্দা আছে যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পড়াশোনা ও চাকরির জন্য বসবাস করছে। যাদের কাছে কক্সবাজার মানে নিজের বড় হওয়া সেই ছোট্ট কুটির, মা, আপন মানুষের সমাহার, চির প্রশান্তির জায়গা,আপন ঠিকানা ইত্যাদি।

আমিও তেমনই একজন কেউ। যে কক্সবাজারের বাসিন্দা হয়ে বর্তমানে বসবাস করছি চট্টগ্রামে। আমারও কক্সবাজারের কথা বললেই মনে পড়ে মায়ের কথা, প্রিয় বাড়িটির কথা, চোখে ভেসে ওঠে আপনজনদের মুখগুলো।

আদিনাথ জেটি থেকে। ছবি : মোমেন উদ্দিন 

আমাদের দেশে যারা ভ্রমণ করেন তারা প্রায় সকলেই বলতে গেলে ভ্রমণের শুভ সূচনা করেন কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত দিয়েই। তারপর আস্তে ধীরে ইনানী বীচ, মহেশখালী, হিমছড়ি, সেন্টমার্টিন, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক এসব জায়গাগুলো পরিদর্শন করে। আগ্রহ হারিয়ে ফেলে তারপর এই জায়গাগুলোতে দ্বিতীয় বার যাওয়ার।

কিন্তু সত্য কথা হলো আমাদের কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের এমন এক অাকর্ষণ শক্তি আছে, যার দ্বারা সে সকলকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসে তার কাছে। এখানেই পর্যটকরা ফিরে পায় ভ্রমণের আসল স্বাদ। প্রতিবারই সমুদ্রকে অনুভব করে নতুনভাবে। কিন্তু সমুদ্র ছাড়া তারা আর নতুন কোনো পর্যটন এলাকা খুঁজে পায় না।

ম্যানগ্রোভ গাছের মাঝখানে আদিনাথ জেটি।  ছবি : মোমেন 

আমি বাড়ি আসলে নতুন কোনো জায়গাতে ভ্রমণের জন্য অস্থির হয়ে থাকি। খুঁজে নিতে চেষ্টা করি বাড়ি আসার স্বাদ ও ভ্রমণের অানন্দ। কিন্তু আমারও তো একই অবস্থা! পর্যটকরা যেসব জায়গায় যায় এসবে তো আমারও যাওয়া হয়ে গেছে।

আমার কক্সবাজারের ভ্রমণ সঙ্গী হলো অমিতাভ ও ইমতিয়াজ। তাদের কথা হলো, “চল বন্ধু আমরা পুরাতন জায়গায় নতুন করে ভ্রমণ করি, কিন্তু অন্যভাবে”। আমি বলি, “তা আবার কেমনে সম্ভব? “

আদিনাথ  মন্দিরের গেইট।  ছবি : মোমেন 

ইমতিয়াজ বলে, “পর্যটকরা মহেশখালী ভ্রমণ করতে যায় কক্সবাজারের ফিশারীঘাট থেকে স্পিডবোটে চড়ে। আর আমরা যাবো চকরিয়া হয়ে বাইকে”।

যেই কথা সেই কাজ, রাতে কথা হলো আর সকালেই বাইকার বন্ধু অমিতাভের বাইক নিয়ে আমরা মহেশখালী যাওয়ার জন্য চকরিয়া হাজির হয়ে গেলাম। কিন্তু চকরিয়া এসে অমিতাভ জুড়িয়ে দিল এক কঠিন শর্ত। সে বলে, “তেলের টাকা দিতে হবে তোর আর ইমতিয়াজের, আর আমি তোদের ড্রাইভার”। কোনো উপায় না দেখে আমাদের অগত্যা রাজি হতে হলো তার প্যাঁচানো শর্তে।

ধীর পায়ে এগিয়ে যাওয়া।  ছবি : মোমেন 

যেতে যেতে আশেপাশে উপভোগ করছিলাম ভালোই। যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি তেমন কোনো ভারী যানবাহনও নেই। বেশ কিছু গ্রামের রাস্তা দিয়েই আমরা যাচ্ছিলাম। প্রথমে আমরা দেখলাম এক বাড়িতে বিয়ে হচ্ছে। তাদের বিরাট এক বিয়ের গেইট। বিয়ে হলে গেইট দিতেই পারে, এতে অস্বাভাবিকতার কিছুই নেই। কিন্তু পরপর অল্প দূরত্বের মধ্যে দেখতে পেলাম আরও ৪/৫টা বিয়ের গেইট। আমরা একটু অবাকই হলাম। সোমবারে এত বিয়ে এখানে! শুক্রবার হলেও মানা যেতে ব্যাপারটা ।

চলে আসলাম আসল গন্তব্যে।  ছবি : ইমতিয়াজ 

যাই হোক সব দুষ্ট বুদ্ধি জমে থাকে ইমতিয়াজের মাথায়। সময় আসলে অল্প কথায় তা বের করে। এখন তার কথা হলো, “চল দুপুরবেলা কোনো এক বিয়ে বাড়িতে গিয়ে খেয়ে ফেলি, পরিচয় দিব আমরা নাছিরের বন্ধু”। যা ভাবছেন তা হয়নি। না, আমরা কোথাও খাইনি। এভাবে আমরা ১৪টা বিয়ে বাড়ি দেখেছি।

আমরা পৌঁছাতে পৌঁছাতে ততক্ষণে জমে উঠেছে মহেশখালীর ছোট ছোট পানের বাজারগুলো। যেখানে পাইকারিভাবে পান ক্রয়-বিক্রয় হয়। মহেশখালীর মিষ্টি পানের যে খ্যাতি তা আর নতুন করে বলতে চাইছি না। সবচেয়ে বড় হাটবাজার দেখলাম বড় মহেশখালী ইউনিয়ন পরিষদের সামনে বড় মহেশখালী মাঠে। আমরাও যেতে যেতে অসংখ্য পানের বরজ দেখতে পেলাম । পান ক্ষেতকে বরজ বলা হয়।

ঐতিহাসিক পটভূমি।  ছবি : মোমেন 

চকরিয়া থেকে মহেশখালী ৪৫ কিলোমিটারের রাস্তা আমরা শেষ করেছি আধা ঘণ্টায়। অমিতাভ আসলেই আমাদের ভালো ড্রাইভার বটে। পৌঁছেই আমরা সরাসরি চলে গেলাম আদিনাথ জেটিতে। দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এ জেটিতে বাইক চালিয়ে পাওয়া যায় এক অন্য রকম প্রশান্তি। অমিতাভ নিয়ে নিলো সেই স্বাদ। আমি বাইক চালাতে পারি না তাই সে স্বাদও নিতে পারলাম না। তার দুইপাশে রয়েছে ম্যানগ্রোভ গাছ। এই জেটি থেকে মহেশখালী চ্যানেল উপভোগ করে পর্যটকরা বেশ আনন্দ পায়। সব মিলিয়ে অপরূপ বলা যায় জায়গাটাকে।

আদিনাথ জেটির সাথেই রয়েছে আদিনাথ মন্দির। ঠাকুরতলা গ্রামে অবস্থিত এই শিব মন্দিরটি মহেশখালীর প্রতিনিধিত্ব করে দেশব্যাপী এবং মহেশখালীর প্রধান অাকর্ষণও বলা যায়। এটি ৮৫.৩ মিটার উঁচু মৈনাক পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। চূড়াতে এসে তীব্র বাতাস পেয়ে তিনজনই বসে পড়লাম মাটিতে। মন্দির দর্শনের পাশাপাশি আমরা এখান থেকেই দেখতে পাচ্ছি আদিনাথ জেটি। একটু অন্যরকমই লাগছে। মন্দিরের গোড়াপত্তনের কাহিনীও সেঁটে দেওয়া হয়েছে দেওয়ালে।

মহেশখালী জেটি।  ছবি : মোমেন 

যাই হোক মন্দির দর্শন শেষে নিচে নামতেই আপনার চোখে পড়বে ছোটখাটো একটি মার্কেট। যেখানে স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব তৈরিকৃত বিছানার চাদর, ফতুয়া, লুঙ্গী, মাফলার, গামছা ইত্যাদি কাপড় নিয়ে বসে আছে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা পর্যটকরা তাদের জিনিস ও আচার আচরণে বেশ আকর্ষিত হয়। এবং নিয়ে নেয় পছন্দের সব কাপড়।

ইমতিয়াজ আর থাকতে রাজি না। তার খেতে হবে, আমরা চলে গেলাম বড় মহেশখালী বাজারে। স্থানীয় এক হোটেলে দুপুরের খাবার শেষ করে মহেশখালীর পান চিবাতে চিবাতে চিন্তা করলাম নতুন কোনো পথ ধরে ফিরে যাওয়া যায় কিনা! আবার তাড়াও আছে। বিকাল কাটাবো আমরা মগনামা ঘাটে। দেখবো সূর্যাস্ত।

শেষ বিকেলে মগনামা জেটি।  ছবি : মোমেন 

তার কথা মতোই গেলাম আমরা। কিছুদূর গিয়ে দেখলাম এত শাপলাপুর না। শাপলাপুর এমন হতে পারে না! এ যেন স্বর্গীয় রাস্তায় চলে এসেছি আমরা। দু’পাশে গহীন জঙ্গলের সাথে পাহাড় আর মাঝখানে একেবারে পাকা একটি উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তা। মনে হচ্ছিলো লামা-আলিকদম সড়কে আছি আমরা। অল্প কিছু সিএনজি ছাড়া তেমন কোনো গাড়ি চলে না। জনবসতিও কম। তাই ঝুঁকিও রয়েছে কিছুটা। আপনার বাইক না থাকলে এই রোড উপভোগ করতে পারবেন না। আমাদের অমিতাভ তো উড়ছিল ফাঁকা রাস্তা পেয়ে।

বিদায় সূর্য।  ছবি : মোমেন 

যাক পেকুয়ার সুন্দর সুন্দর সব রাস্তা পেরিয়ে শেষ বিকেলে আমরা চলে আসলাম মগনামা ঘাটে। সূর্য তখন একেবারেই বিদায়ের মুহূর্তে চলে এসেছে। ঘাটে বসে আমরা নিরবে বিদায় জানালাম সেদিনের সূর্যকে। বাদাম খেয়ে খেয়ে কাটিয়ে দিলাম আরও কিছুটা সময়। দিনের শেষ সময়টা এভাবে কাটিয়ে পেলাম অসাধারণ এক পূর্ণতা। ধন্যবাদও দিতে হয় আমাদের ড্রাইভার অমিতাভকে।

কীভাবে যাবেন:

তিনভাবে মহেশখালী যাওয়া যায়। যার যেদিক দিয়ে সুবিধা হয়, সেভাবেই যাবেন।
১. কক্সবাজার থেকে ৬ নং ঘাটে এসে স্পীডবোট বা ট্রলারে করে মহেশখালী যেতে পারবেন। স্পীডবোটে ৭৫ টাকা এবং ট্রলার নেবে ৩০ টাকা।

২. কক্সবাজারের চৌফলদন্ডী ইউনিয়ন থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকাতে। জনপ্রতি ভাড়া-৬০ টাকা

৩. চকরিয়া থেকে বাইকে করে (নিজস্ব)।

ফিচার ইমেজ : মোমেন উদ্দিন 

Loading...

One Ping

  1. Pingback:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হাজারিখিল ট্রি এক্টিভিটির আদ্যোপান্ত

নির্ঘুম করিডোর থেকে মনপুরার স্নিগ্ধ সকালে