মহামায়া লেকের মায়ায় কাটিয়ে দেয়া একদিন

ভ্রমণপিপাসুদের জন্য চট্টগ্রামের মীরসরাই যেমন আকর্ষণীয় তেমনি অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়দের পছন্দের তালিকায় শীর্ষস্থানীয় একটি স্থান। পাহাড়, সমুদ্র, বীচ, মন্দির, ঝর্ণা, ট্রেইল, ট্রেকিং ঝিরিপথ, কৃত্রিম লেক- কী নেই এখানে! আর মজার ব্যাপার হলো আপনি চাইলে এর প্রতিটি ট্যুরিস্ট স্পটেই ঢাকা কিংবা চট্টগ্রাম থেকে একদিনে ঘুরে আসতে পারবেন এবং খুব কম খরচে। সীতাকুণ্ড ভ্রমণের তৃতীয় পর্বে আমরা গিয়েছিলাম মীরসরাইয়ের মহামায়া লেকে। আজ সেই ট্যুর সম্পর্কেই শুরু থেকে শেষ অবধি লিখতে চেষ্টা করব।

সবুজ পাহাড়ে ঘেরা মহামায়া লেক; Source: লেখক

মহামায়া লেক:

চট্টগ্রাম জেলা সদর থেকে ৬০ কিলোমিটার উত্তরে মীরসরাই উপজেলার অবস্থান। মুহুরি নদী ফেনী জেলা এবং নোয়াখালী জেলা থেকে এটিকে আলাদা করেছে। একে চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বারও বলা যায়। এই এলাকার জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ি ঢল নিরসন এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষিখাতে সেচ সুবিধার লক্ষ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড মহামায়া সেচ প্রকল্পের অংশ হিসেবে ১৯৯৯ সালে উক্ত মহামায়া খালের ওপর স্লুইস গেট স্থাপন করে। এভাবেই সৃষ্টি হয় দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম লেক মহামায়া।

মিরসরাই উপজেলার ৮ নম্বর দুর্গাপুর ইউনিয়নের ঠাকুরদিঘীর বাজার থেকে দুই কিলোমিটার পূর্বে পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে তোলা ১১ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে গঠিত মহামায়া লেক। মূলত এটি একটি সেচ প্রকল্প। রাঙামাটির কাপ্তাই লেকের পরে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ লেক এটি। এই মহামায়া প্রকল্পে রয়েছে লেক, পাহাড়, ঝর্ণা ও রাবার ডেম। 

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম কৃত্রিম লেক মহামায়া; Source: লেখক

যেভাবে যাবেনঃ:

ঢাকার সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে রাতের বাসে করে ফেনী যাবেন। ভাড়া ২৮০ টাকা (নন এসি)। ফেনী থেকে চট্টগ্রামগামী যেকোনো লোকাল বাসে করে মীরসরাইয়ের ঠাকুরদিঘীর পাড়ে নামতে হবে। ভাড়া ৩০-৪০ টাকা। 

এত ঝামেলা করতে না চাইলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যেকোনো বাসে করে মীরসরাইয়ের ঠাকুরদিঘির পাড় নামতে হবে। ভাড়া ৪৮০ টাকা (নন এসি)। বাসের সুপারভাইজারকে বলে রাখবেন, মহামায়া ইকো পার্কের সামনে নামিয়ে দিতে। 

চট্টগ্রাম থেকে যেতে চাইলে শহরের এ কে খান মোড় থেকে ঢাকাগামী কিংবা ফেনীগামী যেকোনো বাসে উঠে মীরসরাই ঠাকুরদিঘীর পাড়ে নামতে হবে।

লেকের পাড়ে কাশফুল; Source: লেখক

ঠাকুরদিঘির পাড়ের ঠিক উল্টো পাশের রাস্তাটাকেই রাবার ডেম বলে। সেখান থেকে সিএনজি করে চলে যাবেন মহামায়া ইকো পার্কের গেটে। ভাটা জনপ্রতি ১৫ টাকা। অথবা হেঁটে হেঁটেও যেতে পারেন, এতে আশেপাশের এলাকা দেখতে দেখতে যেতে পারবেন। হেঁটে যেতে ১৫ মিনিট সময় লাগবে। গেট থেকে ইকো পার্কে প্রবেশের জন্য টিকেট কাটুন। টিকেট দশ টাকা প্রতিজন।

ইকো পার্কে প্রবেশ করতেই চারদিকের সবুজের নিপোবনে নিজেকে আবিষ্কার করে এক স্বর্গীয় অনুভূতি অনুভব করবেন। আশেপাশে মাঝারি উচ্চতার পাহাড়, মাঝখান দিয়ে চলে গেছে মহামায়া লেকে যাবার রাস্তাটি। রাস্তা ধরে দশ মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যাবেন কাঙ্ক্ষিত মহামায়া লেকে।

বিস্তৃত জলাধার মহামায়া লেক; Source: লেখক

মহামায়া লেকের রূপবৈচিত্র‍্য সম্পর্কে যতই বলি না কেন, নিজ চোখে না দেখলে সেটা আসলে বোঝা সম্ভব না। যেন কোনো শিল্পীর সুনিপুণ হাতের রং-তুলি দিয়ে আঁকা ছবি। এতটাই সুন্দর চারদিকে। হালকা সবুজাভ স্বচ্ছ পানি, পানির উপর চারদিকের সবুজ পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি, অসাধারণ প্রতিটি দৃশ্য, বর্ণনাতীত সেই অনুভূতি। লেকের পাড়ের নির্মল আর বিশুদ্ধ বাতাস আপনার শরীর ও মনকে মুহূর্তেই সতেজ করে তুলবে।

মহামায়া লেকের রূপ সৌন্দর্য্য বাদেও আরেকটি মূল আকর্ষণ হলো কায়াকিং। পাহাড়ে ঘেরা লেকে কায়াকিং করার মজাটা থেকে একদম মিস করবেন না। ৩০০ টাকা প্রতি ঘণ্টা, একটি বোটের জন্য। একটি বোটে সর্বোচ্চ দুইজন বসতে পারবেন। চাইলে আধা ঘণ্টাও নিতে পারবেন ২০০ টাকা দিয়ে। 

তবে স্টুডেন্ট আইডি দেখালে প্রতি ঘণ্টা কায়াকিংয়ের জন্য আপনাকে ২০০ টাকা দিতে হবে। এক্ষেত্রে বলে রাখি, ছুটির দিন কিংবা বিশেষ দিনে ছাত্রদের জন্য এই ছাড় প্রযোজ্য নয়।

চাইলে এই লেকে করতে পারেন কায়াকিং; Source: লেখক

এখানে কায়াক বোট মাত্র ৮টি রয়েছে। তাই মহামায়া লেকে পৌঁছানোর সাথে সাথেই সিরিয়াল দিয়ে দেবেন। সিরিয়াল আসলে তারাই আপনাকে ফোন দিয়ে জানাবে। সিরিয়াল দেয়ার পর মাঝের সময়টা লেকের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে আর স্মৃতি সংরক্ষণের কাজে লাগাতে পারেন।

এখানে কায়াকিং বাদেও ইঞ্জিন চালিত নৌকায় কিংবা প্যাডেলচালিত নৌকা দিয়ে ঘুরতে পারেন। বোট ভাড়া ৪০০-৫০০, পুরো লেক ঘুরাবে। চাইলে বোট নিয়ে চলে যেতে পারেন ঝর্ণায়। সেখানে গোসল করতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে একটু সাবধানতা অবলম্বন করা আবশ্যক। কারণ ঝর্ণার নিচের পাথর পিচ্ছিল।

কায়াক বোর্ডে সবার জন্য লাইফ জ্যাকেটের ব্যবস্থা আছে। আর লেকের পানি একদম স্থির থাকায় সেফলি কায়াকিং করতে পারবেন। তাই সাঁতার না জানা মানুষজনদের জন্য একদম চিন্তার কারণ নেই। তবে বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। আর নদীমাতৃক দেশ হিসেবে সাঁতার শেখাটা আমাদের জন্য আবশ্যক। নইলে যেকোনো সময় ঘটে যেতে পারে বিপদ।

মহামায়া লেকের বুকে কায়াকিং; Source: লেখক

কায়াকিং করার সময় লেকের ঠিক মাঝে গিয়ে চোখ বন্ধ করে দু’হাত পাখির মতো মেলে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যান, আমি নিশ্চিত বলে দিতে পারি, সময়টা থেমে যাবে, মস্তিষ্ক হয়ে যাবে ভারশূন্য। প্রকৃতির ভয়ানক স্নিগ্ধতা আপনাকে গ্রাস করবে। প্রকৃতি আসলে যে কতটা রহস্যময়, সেটা আমাদের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয় কখনো।

বলে রাখা ভালো, আপনি চাইলে লেকের পাড়ে গাছগাছালির মাঝখানে তাঁবু টানিয়ে ক্যাম্পফায়ার করে থাকতে পারেন। রাতে এখানটায় মেলে লক্ষ তারার মেলা। হাত বাড়ালেই যেন ছুঁয়ে দেয়া যাবে তারাদের। ক্যাম্পাফায়ার করতে চাইলে অবশ্যই দলবল নিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। পাহাড়ি গ্রাম্য এলাকা, তাই অনেক ধরনের মানু্ষজনের বাস আশেপাশে।

মহামায়া লেকের ঝর্ণা; bangladeshtravelroad.blogspot.com

তবে এবার ফেরার পালা। ফিরতে মন চাইবে না একটুও, তবুও আমাদের ফিরতে হয়। লেক থেকে হেঁটে ইকো পার্কের গেটে চলে আসুন। গেট থেকে সিএনজি করে ঠাকুরদিঘীর বাজারে নেমে যান। সেখানে সাধারণ মানের অনেক হোটেল পাবেন। চাইলে হালকা খাবার খেয়ে নিতে পারেন। বিকাল বা সন্ধ্যার বাসে করে নিজের গন্তব্যে চলে আসুন।

বিঃদ্রঃ “পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ”। তাই নির্দিষ্ট জায়গা ছাড়া কোনো ধরনের ময়লা আবর্জনা লেকে কিংবা আশেপাশে ফেলবেন না। প্রকৃতি আমাদের, তাকে রক্ষা করার দায়িত্বও আমাদের।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভ্রমণ আজ জনাকীর্ণ! সচেতন হন

চন্দ্রনাথ মন্দির ও তার পাতালপুরীর অজানা রহস্য