মিনি সুইজারল্যান্ডের সবুজ কার্পেটে!

মিনি সুইজারল্যান্ড বা বাইসরন। পেহেলগামের একটি অন্যতম আকর্ষণ, সাধারণ ভ্রমণকারীদের জন্য। কিন্তু কেন জানি খুব সাজানো গোছানো জায়গার প্রতি আমার কখনো তেমন একটা আকর্ষণ জাগে না কখনো! এরচেয়ে ঘোড়ার পিঠে করে পাইনের বনে বনে ঘুরে বেড়ানোটা আমার কাছে হাজার গুণ বেশী উপভোগ্য আর অনেক বেশী আনন্দের। তবুও ঘুরতে ঘুরতে চলে গেলাম ঘোড়ার পিঠে চড়েই। ভাগ্যিস গিয়েছিলাম, নইলে ভীষণ আফসোসে পুড়তে হতো শেষে।

সম্ভবত ১০ বা ২০ রুপীর টিকেট কেটে ঢুকেই পড়লাম। এসেছি যেহেতু একটু দেখেই যাই। ভিতরে ঢুকে তো আমি থ হয়ে গেলাম। সবুজের এমন চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য আর অদ্ভুত সম্মোহন দেখে। পুরো ভ্যালী জুড়ে মিহি সবুজের কার্পেট বিছানো যেন! কোথাও এতটুকু মাটি বেরিয়ে নেই। চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। আর সেই সবুজেরও নানা রকম প্রকার। কোথাযও ঘন সবুজ, কোথাও হালকা সবুজ আর কোথাযও সদ্য জেগে ওঠা সবুজের আহ্বান।

সবুজ কার্পেট! ছবিঃ লেখক

ভ্যালীতে ঢুকে প্রথমে মনে করেছিলাম ধুর এত ছোট একটা জায়গায় ঢুকতে আবার টিকেট কীসের লাগবে? কিন্তু ঢুকে যেহেতু পড়েছি একটু হেঁটে দেখে বেরিয়ে যাই। এই ভেবে আমি আর তুষার ভাই ছবি তুলতে তুলতে হাঁটতে শুরু করলাম পুরো ভ্যালিটা ঘুরে আসার জন্য। হাঁটছি আর ছবি তুলছি সবুজ ভ্যালীর, তুষার ভাইয়ের, মেঘে ঢাকা পাহাড়ের আর তুষার ভাই আমার। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে প্রায় ২০ মিনিট কেটে যাবার পরে খেয়াল করলাম আমার পুরো ভ্যালীর অর্ধেকও আসতে পারিনি এখনো! তখনই প্রথমবারের মতো বুঝতে পারলাম এটা খালি চোখে দেখতে যত ছোট আর অল্প জায়গায় মনে হচ্ছে, আসলে ততটা ছোট নয়।

এরপর আরও প্রায় ৫ মিনিট হাঁটার পরে মিনি সুইজারল্যান্ডের মাঝখানে এলাম। ঘন সবুজ আর মিহি কার্পেটের মাঝখানে পৌঁছালাম মাত্র। সবুজ ভ্যালীর মাঝখানে গিয়ে প্রথমবারের মতো সবুজে কার্পেট থেকে চারদিকে তাকালাম। হায় হায় এ কী দেখছি! পুরো ভ্যালীর চারদিক যে পাইনে গাছে জড়ানো আর পাহাড়ে মোড়ানো। ডানে, বামে, সামনে বা পেছনে যেদিকে তাকাই না কেন সবদিকেই পাহাড়ে পাহাড়ে জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে পাইনের সাথে মিলেমিশে। যেন এই মিনি সবুজ মিনি সুইজারল্যান্ডকে পাহারা দিচ্ছে। সেদিন পেহেলগাম জুড়ে মেঘেদের অবাধ মেলামেশা চলছিল পাহাড় আর অরণ্যের সাথে! এত বেশী মাখামাখি যে ঠিকমতো দূরের পাহাড়গুলোকে দেখা যাচ্ছিল না সাধ মিটিয়ে।

পাহাড়, পাইন আর সবুজের আস্তরণ। ছবিঃ লেখক

তবুও বেশ ভালভাবে বুঝতে পারছিলাম যে উপরের পাহাড় চূড়াগুলো তুষারে আবৃত। কারণ মাঝে মাঝেই রোদের এক আধ টুকরো ঝিলিক পড়ে হেসে উঠছিল ক্ষণে ক্ষণে। আর ধোঁয়া উড়ছিল এখানে সেখানে, পাহাড়ের চূড়ায় চূড়ায়। যেদিকে তাকাই সেদিকেই বরফ মোড়ানো পাহাড় চূড়া। কিন্তু অসভ্য আর অবাধ্য মেঘেদের জন্য ঠিক দেখা যাচ্ছিল না। যে কারণে দেখা হয়নি ঝকঝকে নীল আকাশ, সবুজ অরণ্য আর সাদায় মোড়ানো পাহাড়ের একত্রে অপার্থিব সেই রূপ।

আর একটু সামনে এগোতেই চোখে পড়লো নানা রকম রাইডের রোমাঞ্চকর প্রস্তুতি। বিশাল ফাঁপানো বেলুন বা এই রকম কিছু রাইড। গড়িয়ে গড়িয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায় ভেতরে মানুষ ভরে! যদিও আমাদের মতো ধূর্তকে কোনোভাবেই ওসব রাইডে চড়াতে পারেনি ওরা। তবে ভীষণ মন খারাপ হয়েছিল কয়েকটি শিশুর দারুণ অসহায় আর দারিদ্রের করুণ অবস্থা দেখে। কিন্তু সেই গল্প থাক, পরে এক সময় বলবো আলাদাভাবে। আনন্দের গল্পের মাঝে কষ্ট আনতে চাই না আমি।

সবুজ ভ্যালীতে। ছবিঃ লেখক

পুরো ভ্যালীর চারপাশে পাইনের অরণ্য দিয়ে আবৃত, ঘন সবুজের আচ্ছাদন, একটু উপরেই সবুজে সাজানো পাহাড়, তার উপরে পাথরের রুক্ষ পাহাড়ের সারি আর আর একটু উপরে তাকালেই বরফে বরফে মোড়ানো পাহাড়ের হাতছানি। প্রায় ৪৫ মিনিট কাটিয়েও শেষ পর্যন্ত আমরা ভ্যালীর শেষ মাথা পর্যন্ত যেতে পারিনি! এতটাই বিস্তৃত আর বিস্তীর্ণ সেই মিহি সবুজের কার্পেট বিছানো মিনি সুইজারল্যান্ড। যেখানে ইচ্ছা হলেই একটি বেলা কাটিয়ে দেয়া যেতে পারে অনায়াসে, অবহেলায় আর অলসতায়।

আমার তেমন ইচ্ছা হয়েছিল, কিন্তু ঘন মেঘের আলিঙ্গনে, ঝিরঝিরে বৃষ্টির ধারা, হালকা ঝড়ো হাওয়া সেই সুযোগ দেয়নি। রেখে দিতে কিছু আকাঙ্ক্ষা আর অনেকটা আক্ষেপ। যেন আবারো যাই, বসি, হাঁটি, গড়াই আর একটা বেলা ওখানে কাটাই।

তাই সেই আবারো কখনো মিহি সবুজের সেই কার্পেটে মোড়ানো মিনি সুইজারল্যান্ড যেন যাই সেই আকাঙ্ক্ষা পুষে রেখেই, ঘোড়ার পিঠে চেপে বসেছিলাম আর ফিরে এসেছিলাম টগবগিয়ে পাইনের অরণ্য ভেদ করে পরিবার আর প্রিয়জনের কাছে।

বরফ মোড়া পাহাড় আর সবুজ অরণ্য। ছবিঃ indiamike.com

শেষে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলাম, ছবিতে যে সুইজারল্যান্ড আমরা দেখি, পেহেলগামের মিনি সুইজারল্যান্ড আসলেই অমন, হুবহু যেন সুইজারল্যান্ডেরই কোনো একটা খণ্ড এনে সাজিয়ে রেখে দিয়েছে কাশ্মীরে! তাই তো ওটা মিনি সুইজারল্যান্ড।

এই সবুজ কার্পেটে গড়াতে হলে যেতে হবে পেহেলগাম। কাশ্মীরের সত্যিকারের স্বর্গীয় সুখের সবটুকু পসরা সাজিয়ে রাখা হয়েছে যেখানে। শ্রীনগর থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে, ট্যাক্সি বা জীপে করে সময় লাগে ৩ ঘণ্টার মতো। পেহেলগামের মূল পয়েন্ট থেকে এই সবুজ কার্পেটের দূরত্ব পথ ভেদে ৩-৬ কিলোমিটার।

পাহাড়ে পাহাড়ে ট্রেক করে গেলে ৩ কিলোমিটার আর ঘোড়ায় করে গেলে ৩-৪ কিলোমিটার, কিন্তু গাড়িতে করে ঘুরে ঘুরে যেতে হলে প্রায় ৬ কিলোমিটার বা তারচেয়েও কিছুটা বেশী। তবে আমি বলবো গায়ে শক্তি আর মনে জোর থাকলে গাড়িতে না গিয়ে ঘোড়া বা পায়ে হেঁটে হেঁটে যাওয়াই সবচেয়ে উপভোগ্য হবে।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

লিখতে পারেন আপনিও!

একদিনে সীতাকুণ্ডের সুপ্তধারা, সহস্রধারা ও বাঁশবাড়িয়া বীচ ভ্রমণের ইতিবৃত্ত