একদিনে ঘুরে আসুন চট্টগ্রামের মিনি বাংলাদেশ থেকে

বর্তমান সময়ে ভ্রমণের প্রবণতা বেশ বেড়েছে। সকলেই চায় একটু সুযোগ পেলেই ঘুরে আসতে কোনো একটি দর্শনীয় স্থান থেকে। চায় নিজের অভিজ্ঞার ঝুলিতে নতুন কিছু যুক্ত করতে। আর দেশের ৬৪ জেলা বা পুরো বাংলাদেশ ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছা রয়েছে এমন লোকের সংখ্যাও কম না। তবে তা বেশ সহজ কাজ না। তার জন্য প্রয়োজন প্রচুর সময়, অর্থ ও ইচ্ছাশক্তির। প্রত্যেকেই চায় নিজের দেশকে নিয়ে খুঁটিনাটি জানতে।

রিভলভিং রেস্টুরেন্ট। ছবি :লেখক

আমরা কল্পনার জগতে অনেক কিছুই তো ভেবে থাকি। তাহলে আরেকটি কল্পনা করে দেখুন তো, যেখানে চোখ মেললেই পুরো বাংলাদেশ আপনার সামনে ভেসে উঠবে । লেক সহ সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে জাতীয় সংসদ ভবন, তার কিছুটা সামনে জাতীয় স্মৃতিসৌধ আর এর পাশ ঘেঁষে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কার্জন হল।

ছবি : লেখক

এসবের সাথে আরও আছে নবাবী আমলের হাল-হকিকতে বহাল তবিয়তে দাঁড়িয়ে থাকা আহসান মঞ্জিল, দরবার হল, সোনা মসজিদ, কান্তজীর মন্দির, সেন্ট নিকোলাস চার্চ, বড় কুটি, ছোট কুটি, লালবাগ কেল্লা আর জাতীয় শহীদ মিনার ও জাতীয় স্মৃতিসৌধ।

আবার এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সাথেই দাঁড়িয়ে আছে একেবারে গ্রামের মাটির ঘর আর পুকুর। তখন কেমন লাগবে আপনার! নিশ্চয় এমন সুযোগ কেউ পেলে ভুলেও মিস করবে না।

কিডস জোন। ছবি : লেখক

বলছিলাম চট্টগ্রামের বদ্দারহাট বাস টার্মিনাল এলাকায় অবস্থিত মিনি বাংলাদেশ (স্বাধীনতা পার্ক) এর কথা। দেশের গুরুত্বপূর্ণ বর্ণিল ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আবহমান বাংলার চালচলন, স্থাপনা, নান্দনিক স্মারক নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে মিনি বাংলাদেশ (স্বাধীনতা পার্ক)।

যেমন বলছিলাম, সমগ্র বাংলাদেশকে উপস্থাপন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা এখানে করা হয়েছে। চলুন তাহলে আর দেরি না করে এক পলকে দেখে আসি আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে।

বাম্পার কার। ছবি : লেখক

১৫০ টাকা টিকেটের বিনিময়ে মূল পার্কে প্রবেশের সাথে সাথেই খুঁজে পাবেন “মিনি বাংলাদেশ” নামের সার্থকতা। প্রথমেই চোখে পড়বে জাতীয় সংসদ ভবন দাঁড়িয়ে আছে আপনার সামনে। আর তার নীচে রয়েছে জলরাশি।

আবার ভবনের ভেতরে দর্শনার্থীদের যাওয়ার জন্য রয়েছে রাস্তা। এ রাস্তা দিয়ে সকলেই ঘুরেফিরে দেখছে সংসদ ভবন এলাকা। যদিও ভেতরে ফাঁকা তারপরও দেখতে যাওয়ার আগ্রহের শেষ নেই কারও।

গ্রামের পুকুর ও পুকুরপাড়। ছবি : লেখক

আর যে লেকের উপর সংসদ ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে, সে লেকে বসানো হয়েছে পাঁচটি পানির ফোয়ারা যা চালু রয়েছে সবসময়। আবার লেকে প্যাডেল বোটেরও ব্যবস্থা রয়েছে। নির্দিষ্ট মূল্যের বিনিময়ে অনেকেই চড়ছে এ প্যাডেল বোটে। একটু বামে গেলেই পাবেন আধুনিক স্থাপত্য শিল্পের আদলে তৈরী প্রায় ২৫০ ফুট উচ্চতায় ঘুর্ণায়মান “রিভলভিং রেস্টুরেন্ট।

ঘুর্ণায়মান এ রেস্টুরেন্টে উঠলে পাখির চোখে এক পলকে দেখা যাবে পুরো চট্টগ্রামকে। এখানে এসে আপনি খেতে পারেন আপনার পছন্দের সব খাবার-দাবার। আর তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সেন্ট নিকোলাস চার্চ।

পার্কে ট্রেন চলাচলের রাস্তা। ছবি : লেখক

এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ছাড়াও পুরো পার্কে বিনোদনের নানা ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ করে শিশুসহ অন্যান্যদের জন্য করা হয়েছে মিনি ট্রেন, প্যাডেল ট্রেন, ফ্যামিলি কোস্টার, প্যাডেল বোট, বেবি ক্যাসেল, বেলুন হুইল, মনোরেল, বাম্পার কার, মিউজিক সুইং, আরবি ট্রেন ইত্যাদি। সময় কাটানোর জন্য রয়েছে সিঁড়ি, পাথর ও দোলনা সহ বেশ কিছু বসার জায়গা।

আবার দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য বেশির ভাগ জনগন যে ট্রেনের ব্যবহার করে সেই ট্রেনও রয়েছে এখানে। আর আপনি এতে চড়ে ঘুরে বেড়াতে পারবেন পুরো পার্ক। যাদের ট্রেনে চড়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, তাদের এই ট্রেন ভ্রমণটা হবে উপভোগ করার মতো।

কার্জন হল। ছবি :লেখক

বাম্পার কারে চড়া শেষ করে উঁচুনিচু টিলা পার হতেই চোখে পড়বে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা কার্জন হল। আপনার একটু অবাকই লাগবে, হুবুহু কার্জন হলই মনে হবে এটাকে। তার পাশেই রয়েছে বড় কুটি, সোনা মসজিদ, আহসান মঞ্জিল।

আর চারপাশে পানির ফোয়ারাসহ দাঁড়িয়ে আছে জাতীয় শহীদ মিনার। তার অল্প সামনেই জাতীয় স্মৃতিসৌধ। বিনোদন নেওয়ার পাশাপাশি অল্প সময়ের মধ্যে নিজের দেশকে নিয়ে বিস্তারিত জানার সুযোগ এখানে রয়েছে।

গ্রামের মাটির ঘর। ছবি : লেখক

আবার দেশের বড় একটি অংশ গ্রাম। তাহলে আপনার গ্রাম দেখতে হবে না? চলুন তাহলে দেখে আসি, এখানেই রয়েছে টিনের চালের ঘর আর সাথে পুকুর। এসব করেই ক্লান্ত হয়নি, সাথে দিয়েছে পুকুর পাড়। যাদের বসবাস গ্রামে তারা জানে গ্রামের পুকুরপাড়ে আড্ডা, গান আর গল্পে গল্পে সময় কাটানোর মজা। আর আপনার নিঃসঙ্গের সাথীও হতে পারে এই পুকুরপাড়। ক্ষণিকের জন্য আপনি ফিরে যেতে বাধ্য হবেন নিজের ফেলে আসা অতীত ও গ্রামের স্মৃতিচারণে।

জাতীয় শহীদ মিনার। ছবি :লেখক

খাবার নিয়ে প্রবেশ নিষেধ হলেও হাঁটতে হাঁটতে আপনি ক্লান্ত হলে ভেতরে রয়েছে বেশ কিছু খাবারের দোকান। আর একই সাথে আপনার ক্লান্তিও বিদায় নিয়ে নিল এই ফাঁকে।

মিনি ট্রেনে ঘুরে বেড়াচ্ছে দর্শনার্থীরা। ছবি :লেখক

একসময় গ্রামে মাটি দিয়ে ঘর বানানো হতো, যা এখন বিরল অনেকটা। এখানে এসে যে সেই মাটির ঘর দেখতে পাবো তা আমাদের কল্পনায়ও ছিল না, যা বেশ অবাক করেছে আমাদের। আপনি ভাবতে পারেন? বড় কুটি আর কার্জন হলের সাথেই একেবারে গ্রাম-বাংলার মাটির ঘর দাঁড়িয়ে আছে। তা একমাত্র মিনি বাংলাদেশেই সম্ভব।

জাতীয় স্মৃতিসৌধ। ছবি :লেখক

দিনে একরূপে দেখলেও আঁধার নামতেই আলোর ঝলকানিতে বদলে যাবে মিনি বাংলাদেশ। দেখা যাবে নতুন আরেক রূপ। সকাল ১১টা থেকে চালু হয়ে রাতের ৯টা পর্যন্ত খোলা থাকে এ পার্কটি। উভয় রূপকে উপভোগ করতে চাইলে আপনিও যেতে পারেন পড়ন্ত বিকেলে নিজের পরিবার বা বন্ধুবান্ধবকে সাথে নিয়ে।

ফিচার ইমেজ : thedailystar.net

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

রাজধানী এক্সপ্রেসে আমাদের দুঃসহ রাত!

মনসা মন্দিরের খোঁজে শরীয়তপুর