পাহাড়ের কোলে অনন্য রিসোর্ট “মিলনছড়ি হিলসাইড রিসোর্ট”

প্রথমবার যখন মিলছড়ি হিলসাইড রিসোর্টে যাই উদ্দেশ্য ছিল দুপুরে খাওয়া। বান্দরবানে তখন ভালো মানের দুপুরে খাবার জায়গার অনেক অভাব ছিল। চিম্বুক যাওয়ার পথে মিলনছড়িতে খাবারের ফরমায়েশ দিয়ে আমরা চিম্বুক আর শৈলপ্রপাত ঘুরে এসে দুপুরে খিচুড়ি আর মুরগী দিয়ে খুব ভালো করে খাই। সেসময় রিসোর্টটা খুব মনে ধরেছিল কিন্তু রাতে থাকা হয়নি।

অনেকদিন পরে সুযোগটা পেয়ে যাই। অফিসের কাজে আমাকে থাকতে হবে বান্দরবান। সর্বোচ্চ তিন হাজার টাকার হোটেলে আমি চাইলে থাকতে পারি। এ বাজেটে চমৎকারভাবেই থাকা যায় হিলসাইড রিসোর্টে। গুলশান ২ এ আমার তখনকার অফিসের থেকে হাঁটা দূরত্বেই এই রিসোর্টের অফিস গাইড ট্যুরস। বাংলাদেশের পর্যটনে তাদেরকে পথপ্রদর্শকই বলা যায়।

এরকম ছোট ছোট পাহাড়ের কোলে তৈরী করা কটেজের রিসোর্ট মিলনছড়ি ছবি hillsideresort.info 

অফিসে গিয়ে রুম বুকিং দিয়ে আসলাম। নির্ধারিত দিনে আমরা চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। প্রথম রাত চট্টগ্রামেই কাটিয়ে পরের দিনে সকালে রওনা দিলাম কাপ্তাইয়ের উদ্দেশ্যে। সারাদিন কাপ্তাইয়ে কাজ শেষ করে লিচুবাগান ফেরীঘাট পার হয়ে রাঙামাটি-বান্দরবান লিংক সড়কে উঠলাম। এ রাস্তাটা আমার খুব প্রিয় একটা রাস্তা। চড়াই-উৎরাইগুলো ছাড়াও পাহাড়ের মধ্য দিয়ে বান্দরবান যাওয়াটা আমি খুব উপভোগ করি।

হিলসাইড রিসোর্ট বান্দরবান শহর থেকে ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। সন্ধ্যা হবার আগেই আমরা বান্দরবান শহর পার হয়ে মিলনছড়িতে অবস্থিত রিসোর্টের প্রবেশমুখে এসে পৌঁছালাম। ছোট্ট একটি পাহাড়ের উপর রিসোর্টটি। প্রবেশ মুখ থেকে মাটির পথ চলে গেছে রিসিপশনের দিকে। কিছুদূর ওঠার পর রিসিপশন কাম রেস্তোরাঁয় পৌঁছালাম। রয়েলের সাথে আগেই কথা হয়েছিল, স্বাগত জানাল সে আমাদের।

ছিমছাম সুন্দর কটেজের ভিতরের অংশ ছবি hillsideresort.info 

রাতে কী খাবো সেটা তাকে বলে দিয়ে আমার জন্য নির্ধারিত কটেজের দিকে রওনা দিলাম। পাহাড়ের ঢালে নির্মাণ করা হয়েছে কটেজগুলো। নামগুলোও খুব সুন্দর সুন্দর। কোনোটা পাখির নামে, কোনোটা আদিবাসীদের নামে। আমার কটেজের নাম ছিল মারমা। রিসিপশন থেকে কিছুদূর হেঁটে নিচে নেমে যেতে হয় কটেজে। রিসোর্টের একজন কর্মী আমাদেরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল কটেজে।

বড়সড় এক রুমের কটেজ। পাহাড়ের গায়ে কংক্রিটের খুঁটি দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে এর ভিত্তি। ছোট সিঁড়ি বেয়ে কটেজের দরজা খুলেই মন ভালো হয়ে গেল আমার। বেশ বড়  একটি রুম। মেঝে এবং ঘরের বেড়ার উপরে পাটি দিয়ে মনোরম করে সাজানো রুম। দুটো খাট আছে ভেতরে, এসিও আছে। এটাচ বাথরুম পুরোপুরি আধুনিক, হাই কমোড রয়েছে ভেতরে। বারান্দাটা দেখে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে।

বারান্দাগুলো বেশি সুন্দর ছবি hillsideresort.info 

বারান্দায় চেয়ার পাতা। আর পোকামাকড় ও মশা থেকে বাঁচার জন্য নেট দিয়ে দেয়া আছে। বারান্দা থেকে সামনে যতদূর চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। অনেক দূরের পাহাড়গুলোও দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ের এ চমৎকার দৃশ্যের মধ্যেই সাঙ্গু নদী লুকিয়ে আছে, তবে দেখা যাচ্ছে না। রাতে খাবারের কথা বলা আছে ৮টায়, খেতে যেতে হবে উপরের রেস্তোরাঁয়।

নির্ধারিত সময়ে কটেজ থেকে বের হয়ে উপরে যাওয়ার জন্য বের হবার পরই ভয়াবহ একটা ডাক শুনে চমকে উঠলাম। ডাক চলছেই কোনো থামাথামি নেই। অবাক হয়ে দেখলাম ছোট্ট একটি টিকটিকির চেয়ে বড় একটি প্রাণী ডেকে চলেছে এভাবে। এক নজর দেখেই চিনতে পারলাম তক্ষক এটি। এতদিন নাম শুনেছি তক্ষকের, এবারই প্রথম দেখলাম। গলার প্রশংসা করতে হয়, পুরো রিসোর্ট কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

এই সেই তক্ষক ছবি লেখক

যাই হোক আলোকিত ট্রেইল ধরে উপরে এসে খেতে বসলাম। আগে থেকেই জানতাম এখানে এক বাটি মুরগী/গরুর মাংস যেটায় অর্ডার দেয়া হোক অন্তত দুজন খেতে পারবে। সেভাবেই আমরা অর্ডার দিয়েছিলাম। ভাগযোগ করে খেতে কোনো অসুবিধা হয়নি। খাবার খুবই সুস্বাদু, পেট ভরে খেয়ে চা নিয়ে বসলাম রিসোর্টের বারান্দায়। চা খেতে খেতে গল্প করছিলাম ম্যানেজার রয়েলের সাথে।

সে জানালো দেশের লোকজন আসলে এই রিসোর্টটা খুুব একটা পছন্দ করে না। বেশ কয়েকটা কারণ বললো সে। আমি যে তক্ষকের ডাক শুনে চমকে উঠেছি, এরকম ঘটনায় একজন গেস্ট রুম ছেড়ে শহরে চলে গিয়েছিলেন। আবার অনেকের কাছেই এই ঢাল বেয়ে ওঠানামা সহ্য হয় না। অনেকে আবার বলে এত ভয়ংকর নীরব এলাকা ভালো লাগে না। তবে বিদেশি পর্যটকরা খুব পছন্দ করে রিসোর্টটি।

বারান্দা থেকে ভোরের দৃশ্য ছবি লেখক

প্রতি বছর অনেক বিদেশি পর্যটক অবস্থান করেন রিসোর্টটিতে। অন্যদের কথা জানি না, তবে আমার খুব ভালো লেগেছে রিসোর্টটি। আলাপ আলোচনায় আরেকটি মজার তথ্য পেলাম। গাইড ট্যুরের মালিক নিজেই অবসর নেয়ার পর এখন এই রিসোর্টে থাকেন। রিসোর্ট দেখাশোনার পাশাপাশি এখানে নিজের অবসর সময়টা কাটাচ্ছেন তিনি।

শুনে সেদিন রাতে আমিও স্বপ্ন দেখতে থাকলাম এরকম চমৎকার একটি রিসোর্ট নির্মাণ করার। বানাতে পারলে বুড়ো বয়সে দুই বুড়ো-বুড়ি এখানে এসেই অনাবিল প্রকৃতির মাঝে নিজেদের শেষ সময়টা শান্তিতে কাটাতে পারতাম। যাই হোক, কটেজে ফেরার সময় আরেকবার তক্ষকের দেখা মিললো। সারা রাতই মনে হয় ডাকবে এভাবে।

সাংগু নদীর দৃশ্য ছবি লেখক

সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা না করে বারান্দায় গিয়ে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। শেষ রাতে ভালোই বৃষ্টি হয়েছিল। বৃষ্টি থামার পর প্রকৃতি যেন নবরূপ পেয়েছে। এখানে ওখানে সাদা মেঘ ভেসে যাচ্ছে। পাখির কলতানে মুখরিত পুরো এলাকা। দূরে দেখা যাচ্ছে জাদি মন্দিরের সোনালী চূড়া। আমার জীবনের অন্যতম সুন্দর ভোর হতে দেখলাম।

রিসোর্ট থেকে বের হয়ে শৈলপ্রপাতের দিকে একটু হাঁটতেই দেখা পেলাম সাঙ্গুর। পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে সাপের মতো একেঁবেঁকে গেছে অপরূপ সাঙ্গু নদী। পাহাড়ের উপর থেকে প্রাণভরে মেঘ, পাহাড় আর নদীর সৌন্দর্য দেখতে থাকলাম। একসময় উঠতে হলো, ব্রেকফাস্টের সময় হয়ে গেছে। আর আজ অনেক কাজও আছে, সকাল সকাল বের হতে হবে।

সকালে নাস্তার টেবিলে আটার রুটি, সব্জি আর ডিম ভাজি দিয়ে চমৎকার নাস্তা সেরে চেক আউটের প্রস্তুতি নিলাম। মন চাচ্ছিল এখানে কিছুদিন থেকেই যাই। কিন্তু কিছু করার নেই। ম্যানেজার রয়েল উপহার স্বরূপ আমাদেরকে রিসোর্টের গাছের একটি করে কাঠালও দিয়ে দিল। সবসময় মুখে হাসি লেগে থাকা এই আদিবাসী যুবককে বিদায় দিয়ে আমরা রওনা দিলাম চট্টগ্রামের পথে।

মিলনছড়ি হিলসাইড রিসোর্টে যেতে ঢাকা থেকে আপনাকে যেতে হবে বান্দরবান। শহরের বাস স্ট্যান্ড থেকে সিএনজিতে রিসোর্টে আসতে ১০০ টাকা ভাড়া নিতে পারে। আর চাঁদের গাড়ী ভাড়া করে শহরের আশেপাশের দর্শনীয় জায়গাগুলো দেখে আসতে পারেন। এগুলো হচ্ছে নীলাচল, স্বর্ণমন্দির, শৈলপ্রপাত, নীলগিরি, চিম্বুক। গাড়ী ভাড়া নেবে ৪,০০০-৫,০০০ টাকা।

রিসোর্টে যোগাযোগের ঠিকানা:

মিলনছড়ির ওয়েবাসাইটেই যাবতীয় তথ্য পাবেন। ওয়েবসাইটের ঠিকানা: https://www.hillsideresort.info/

ঢাকা অফিসের ঠিকানা: 
Flat No B1 (1st Floor) House No: 2E, Road No: 29 Gulshan Lake Palace (Prasad Nirman) Gulshan 1, Dhaka-1212  Phone: +8801730045054

ফেইসবুক পেইজ: https://www.facebook.com/milonchhori/

কটেজের ভাড়া:

কটেজ ভেদে ১,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকা। আর খাওয়া জনপ্রতি প্রতি বেলা ৪০০-৫০০ টাকার মধ্যে হয়ে যাবে।

ফিচার  ইমেজ: hillsideresort.info

Loading...

2 Comments

Leave a Reply
  1. Yes. Excellent Cottage with Excellent Scenery.
    If I will visit in next time to Bandorban, so I want to must be booking the Hill Side Resort.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এক ট্রিপে খৈয়াছড়া , গুলিয়াখালি বিচ এবং মহামায়ায় কায়াকিং

ভারতের শীতল মরুভূমির শহর কাজা