ঘুরে আসুন মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র থেকে

টিলার গা বেয়ে এঁকেবেঁকে তেল চকচকে একটি সড়ক পৌঁছে গেছে মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্সে। বান্দরবন শহরের প্রবেশদ্বার বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের পাশে এটি অবস্থিত। বান্দরবান জেলা শহরে প্রবেশের পাঁচ কিলোমিটার আগে চোখে পড়বে মেঘলা পর্যটন এলাকাটি।

মেঘলায় চিত্তবিনোদনের বিভিন্ন উপকরণের মধ্যে রয়েছে- চিড়িয়াখানা, শিশুপার্ক, সাফারি পার্ক, প্যাডেল বোট, ক্যাবল কার, উন্মুক্ত মঞ্চ ও চা বাগান। পানিতে যেমন রয়েছে হাঁসের প্যাডেল বোট, তেমনি ডাঙ্গায় রয়েছে মিনি চিড়িয়াখানা। এখানে সবুজ প্রকৃতি, লেকের স্বচ্ছ পানি আর পাহাড়ের চূড়ায় চড়ে দেখতে পাবেন ঢেউ খেলানো বান্দরবানের নয়নাভিরাম দৃশ্য।

বেশ কিছু উঁচু-নিচু পাহাড় দ্বারা ঘেরা একটি লেককে ঘিরে গড়ে উঠেছে মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র। ঘন সবুজ গাছ আর লেকের স্বচ্ছ পানি পর্যটকদের প্রকৃতির কাছাকাছি টেনে নিচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রধান ফটক থেকেই চোখে পড়বে বিশাল লেক। সেই লেকের স্বচ্ছ পানিতে রয়েছে নানান ডিজাইনের নৌকা। যেখানে খুবই স্বল্প খরচে মনের আয়েশে পানিতে ভেসে বেড়ানো যায়।

অনেক লেকেই নৌকার ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে দেখা যায় ইঞ্জিন চালিত নৌকা। ইঞ্জিনের বিকট শব্দ নৌ ভ্রমণের আনন্দ বিষাদে পরিণত করে। নৌ ভ্রমণের যে অনুভূতি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় তা পাওয়া যায় না। কিন্তু মেঘলায় পানির শব্দ ছাড়া আর কিছুই আপনার কানে আসবে না। বর্ণিল সব নৌকা চলে ব্যাটারীতে। এ কারণে পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ আপনাকে হিরন্ময় নীরবতার অনুভূতি যোগাবে।

টিলার গা বেয়ে এঁকেবেঁকে তেল চিকচিকে একটি সড়ক। সোর্স: Mapio.net

বিশাল আকৃতির লেকের পরে তিন’শ ফুট উঁচু পাহাড়। যে কারণে বাইরে চলাচলকারি যানবাহনের শব্দ আপনার শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের প্রশান্তিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না। দূষনমুক্ত এই লেকে চলার সময় দেখতে পাবেন নানান জাতের জলজ পাখির খেলা। মাথার উপর গাছের ডাল পানি ছুঁই ছুঁই করছে। সে সব গাছে কাঠবিড়ালীর তিড়িং বিড়িং খেলা ও বিভিন্ন পাখির কলতান সব মিলিয়ে মনমুগ্ধকর পরিবেশ।

যখন নৌকায় ঘুরছেন তখন মাথার উপর সাঁই সাঁই করে চলছে ক্যাবল কার। যাতায়াত মিলিয়ে ১,৬০০ ফুট দৈর্ঘ্যের এ কেবল কার এক পাহাড় থেকে লেকের উপর দিয়ে অন্য পাহাড় ছুঁয়ে আসা ভ্রমণকারীদের মনে রোমাঞ্চকর অনূভূতির সঞ্চার করতে সক্ষম।

পানির দু’শ ফুট উপরে দিয়ে ক্যাবল কারে যাতায়াতের সময় শূন্যে ভেসে থাকার দারুণ এক অনুভূতির সৃষ্টি করবে। কারো কারো মনে কিঞ্চিত ভীতিও সঞ্চার করতে সক্ষম ক্যাবল কার।

ক্যাবল কার। সোর্স: VromonPriyo.com

নাম মেঘলা হলেও মেঘের সাথে মেঘলা পর্যটন স্পটের কোনো সম্পর্ক নেই। মেঘলা পর্যটন স্পটের পাশেই রয়েছে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের বান্দরবান পর্যটন হোটেলটি। সাময়িক অবস্থানের জন্য একটি রেস্ট হাউস। এছাড়া আকর্ষণীয় একটি চিড়িয়াখানা এ কমপ্লেক্সের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে বহুগুণ। মেঘলায় ২টি ঝুলন্ত ব্রিজ রয়েছে।

বান্দরবান জেলা প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এটি পরিচালিত হয়। প্রতি বছর শীতের মৌসুমে সারা দেশ থেকে অসংখ্য পর্যটক বেড়াতে আসেন। গোল্ডেন টেম্পল ঘুরে মেঘলায় এলাম। বর্ণনা শুনে পার্ক টাইপের মনে হলো। বাইরে থেকে দেখে আমাদের দলের বেশিরভাগই তেমন আগ্রহ পেল না ভিতরে যাওয়ার জন্য। তাই আর ভিতরে না গিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আচার আর কাঠবাদাম খেলাম।

আচারগুলো বেশ মজার ছিল, বাদামও। বেশি করে কিনে নেওয়া উচিৎ ছিল। একটা ট্রাকে বেশ কিছু ছেলে ডিজে মিউজিক বাজিয়ে নাচানাচি করছিল, আমরাও তাল মেলালাম।

ঝুলন্ত সেতু। সোর্স: bbarta24.net

সজল আর ইমরান বলল, গেট পর্যন্ত যেহেতু এসেছি, ভিতরে না ঢুকে ফিরব না।  ক্যাবল কার আছে ভিতরে, ওটায় না উঠলে নাকি চলবেই না! ওদের সাথে তাল মেলালো আরোও কয়েকজন। ওরা গিয়ে ক্যাবল কারে চড়ে, মেঘলা ঘুরে এল। ভেতরে নাকি রাঙামাটির ঝুলন্ত ব্রিজের মতো ছোটখাটো আরেকটা ব্রিজ আছে।

তবে ওরা এসে বললো, ‘একটা কথা না বলে পারছি না। ক্যাবল কার খুবই আস্তে চলে। মজা পাইনি ওতে চড়ে। আর বান্দরবানের মতো প্রকৃতির রূপসীকন্যায় এই ধরনের কৃত্রিম মনোরঞ্জিকা দরকার আছে বলে মনে হয় না। তবে নিরিবিলিতে স্বপরিবারে বেড়ানোর জন্য একটি আদর্শ জায়গা বটে।’
আয়তনের দিক থেকে খুব বেশি বড় নয়, আবার ছোটও বলা যাবে মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স। তবে বেশ পরিপাটি। বেশ কয়েকটি ছোট বড় পাহাড় বেষ্টিত এই পর্যটন কেন্দ্রে নানামুখী বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে।

ব্যাটারিচালিত নৌকায় নৌভ্রমণ। সোর্স: বান্দরবান নিউজ

প্রধান ফটক থেকে কংক্রিটের ঢালু ওয়ার্কওয়ে দিয়ে নেমে গেলেই সামনে পড়বে পিকনিক স্পট। সেখানে রয়েছে উন্মুক্ত মঞ্চ। শব্দ দূষণ না করে চালিয়ে নিতে পারবেন শিক্ষা সফর অথবা পিকনিকের অনুষ্ঠানাদি।

পিকনিক স্পটের পাশেই রয়েছে শিশু পার্ক। যেখানে শিশুদের মাতিয়ে রাখার জন্য রয়েছে নানাবিধ বন্দোবস্ত। শিশু পার্ক সংলগ্ন লেকের উপর ঝুঁকে রয়েছে রেস্ট হাউস, যার বারান্দায় বসে চুটিয়ে উপভোগ করতে পারবেন চাঁদনী অথবা অমাবশ্যার রাত।

পিকনিক স্পটের দু’দিকে রয়েছে দু’টি ঝুলন্ত বীজ। একটি দিয়ে পার হয়ে ওই পারের টিলায় অবস্থিত মিনি সাফারী পার্ক, চিড়িয়াখানা ঘুরে আরেকটি সেতু দিয়ে পার হয়ে আসা যায়।

একটি দিয়ে পার হয়ে ওই পারের টিলায় অবস্থিত মিনি সাফারী পার্ক, চিড়িয়াখানা ঘুরে আরেকটি সেতু দিয়ে পার হয়ে আসা যায়। সোর্স: বান্দরবান নিউজ

নান্দনিক এসব ঝুলন্ত ব্রীজ খুবই উপভোগ্য। দোলনার মতো দুলুনি আপনার মনকেও দোলা দিয়ে যাবে। ঠিক মাঝামাঝি পৌঁছে গেলে মনে হবে এই বুঝি টুপ করে খসে পড়বে পানিতে। কিন্তু না, কিছুটা ভয় ধরিয়ে দিলেও দুই দিকের শক্ত বাঁধন ঠিকই আগলে রাখবে আপনাকে।

টিলাগুলো বাহারী বৃক্ষে আচ্ছাদিত। জেলা প্রশাসন নতুন করে আরও বৃক্ষ লাগিয়েছে। পর্যটন কেন্দ্রটির আরেকটি উপভোগ্য বিষয় রয়েছে তা হচ্ছে তাজা ফলের দোকান। যেখানে পেঁপে, কলা, জাম্বুরা, পেয়ারা, আনারস, মাল্টা পাবেন একেবারে টাটকা। সামনে বেঞ্চ পাতা তাতে বসে স্বল্পমূল্যে পাহাড়ী সতেজ ফলে উদরপূর্তি করতে পারেন।

জেলা প্রশাসন নতুন করে আরও বৃক্ষ লাগিয়েছে। সোর্স: আদার ব্যাপারী

জনশ্রুতি রয়েছে, এটি হচ্ছে এই সময়ে দেশের সবচেয়ে সুন্দর সড়ক। দেখতে যেমন সুন্দর তেল চিকচিকে তেমনি ভয়ঙ্করও। রাস্তার বিশাল বিশাল বাঁক দশ গজ দূরে কিছু দেখা যায় না। যে কারণে বাঁকগুলোতে বড় বড় লুকিং গ্লাস লাগানো হয়েছে। এই সড়কে বাঁকে বাঁকে যানবাহনের অনুমোদিত গতি মাত্র ৫ কিলোমিটার।

এখানে শুধু দিনের বেলা নয় রাতের বেলা রাত্রি যাপনের জন্যও রয়েছে অনেক সুযোগ-সুবিধা। এখানে জেলা প্রশাসনের রেস্ট হাউজটি দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়া পাওয়া যায়। মেঘলা রেস্ট হাউজে রাত্রিযাপনের জন্য মোট চারটি কক্ষ রয়েছে। প্রতিদিনের জন্য একেকটি কক্ষের ভাড়া পড়বে ২,০০০ টাকা।

বান্দরবানের মেঘলাতে পর্যটন করপোরেশনের একটি হোটেল আছে। এখানে যে কেউ থাকতে পারবেন। যে কেউ বুকিংয়ের জন্য ফোন করতে পারেন- ০৩৬১-৬২৭৪১ ও ০৩৬১-৬২৭৪২ নম্বরে। হোটেল ফোর স্টারে থাকতে গেলে সিঙ্গেল ভাড়া পড়বে ৩০০ টাকা, ডাবল ভাড়া ৬০০ টাকা, এসি ১,২০০ টাকা। আর হোটেল থ্রি স্টারে নন-এসি ফ্ল্যাট ২,৫০০ টাকা, এসি ফ্ল্যাট ৩,০০০ টাকা। হোটেল প্লাজা বান্দরবানে সিঙ্গেল ভাড়া ৪০০ টাকা, ডাবল ৮৫০ টাকা ও এসি ১,২০০ টাকা ভাড়া পড়বে।

ঠিক মাঝামাঝি পৌঁছে গেলে মনে হবে এই বুঝি টুপ করে খসে পড়বে পানিতে। সোর্স: আদার ব্যাপারী

প্রবেশ মূল্য

মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্সে জনপ্রতি প্রবেশ ফি ২০ টাকা এবং গাড়ির পার্কিংয়ের জন্য ১৫০-২০০ টাকা।

কীভাবে যাবেন

যে কেউ ঢাকা থেকে সরাসরি বান্দরবান যেতে পারেন ইউনিক, এস আলমসহ বেশ কয়েকটি বাসে। আর ঢাকা থেকে ট্রেনে বা বাসে প্রথমে চট্টগ্রাম তারপর সোজা বান্দরবানে যেতে পারেন। চট্টগ্রামের বহদ্দারহাট টার্মিনাল থেকে পূরবী ও পূর্বাণী নামক দু’টি ডাইরেক্ট নন-এসি বাস ৩০ মিনিটি পরপর বান্দরবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। বান্দরবান শহর থেকে চাঁদের গাড়ি কিংবা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা করে যাওয়া যায় মেঘলা পর্যটনকেন্দ্রে।

যাতায়াত এবং থাকা-খাওয়া

মেঘলায় বেড়াতে আসা পর্যটকদের খাবার ও রাত্রিযাপনের জন্য বান্দরবান শহরে কিছু মাঝারি মানের হোটেল রয়েছে। এছাড়া পর্যটকদের জন্য খাবার ও রাত্রিযাপনের জন্য পাশেই সু-ব্যবস্থা রয়েছে । মেঘলার পাশেই রয়েছে বান্দরবান পর্যটন মোটেল ও হলিডে ইন নামে দুইটি আধুনিক মানের পর্যটন কমপ্লেক্স। এখানে এসি ও নন এসি রুমসহ রাত্রি যাপন ও উন্নতমানের খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। ফোনঃ ৬২৯১৯।

বান্দরবান বাস স্টেশন থেকে মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স যেতে লোকাল বাসে জনপ্রতি ১০-১২ টাকা এবং টেক্সি রিজার্ভ ১০০-১২০ টাকা, ল্যান্ড ক্রুজার, ল্যান্ড রোভার ও চাঁদের গাড়ী ৪৫০-৫০০/- টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে। বান্দরবনে পর্যটন কর্পোরেশনের একটি হোটেল আছে মেঘলাতে। যার ভাড়া রুম প্রতি ৭৫০ হতে ২,০০০টাকা পর্যন্ত।
হলিডে ইন (মেঘলা): জেনারেল রুম ১,০০০ টাকা, নন এসি ১,৩০০ টাকা, এসি ১,৫০০ টাকা।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বান্দরবান: অপার্থিব আনন্দ আর চাপা বিষণ্ণতা যেখানে হাতে হাত রেখে চলে!

পৃথিবীর সবচেয়ে সৌন্দর্যমণ্ডিত কিছু দ্বীপপুঞ্জ