জলাবদ্ধ যশোরে মেডিকেল ক্যাম্প ২০১৬: মানবতার সেবায় এক অসাধারণ অভিযাত্রা

হিমু পরিবহনের নিয়মিত সাপ্তাহিক মিটিংয়ের দিন, আমরা বসে আছি সোনাডাঙ্গা আবাসিক লেকের চিরপরিচিত সবুজ ঘাসের গালিচার উপর। বিষণ্ণ মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, গুমোট প্রকৃতি আর ভেজা বাতাসের হিম পরশ ছাপিয়ে ক্রমশ উষ্ণতাময় আবেশ জড়িয়ে ধরছে আমাদের।
বর্ষাকাল চলছে, অবধারিতভাবে আমাদের কথাবার্তার একটি অংশ বৃষ্টিকেন্দ্রিক থাকল। বর্ষার কথায় যশোরের প্রসঙ্গ আসলো। অবিরাম বৃষ্টি, উজান থেকে আসা ভদ্রা, বুড়িভদ্রা আর হরিহর নদীর উপচে পড়া পানিতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। খবরে আসছে, কেশবপুর মনিরামপুর এবং অভয়নগরের দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে আমানবিক জীবন যাপন করছে। তার উপর পানিবাহিত নানাবিধ রোগে অবস্থা মানবেতর করে তুলেছে।
সবকিছু শুনতে শুনতে আমরা স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আমাদের পার্শ্ববর্তী জেলায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী হয়ে বসবাস করছে, গলা-বুক সমান পানির মধ্যে ভাসছে শত শত গ্রাম; ভাবতেই কাঁটা দিয়ে উঠলো গায়ে।

জলাবদ্ধতার দেড়মাস পরের অবস্থা; ছবি: লেখক

সম্বিত ফিরল গগন ভাইয়ের কথায়। ‘আমরা হিমু পরিবহন এই বিপদে বসে থাকতে পারি না। আমাদের কিছু করা উচিত। হিমু পরিবহনের কিছু করা উচিত। তাই নয় কি?’ আমাদের লিডারের উদ্দীপ্ত কণ্ঠ সঞ্চারিত হলো সবার মাঝে। আমরা গলা মেলালাম। ‘অবশ্যই, আমাদের কিছু করা উচিত।’
এবং এভাবেই একটি মহৎ উদ্যোগের সূচনাপাত হলো।
কোনো কিছু বলা সহজ কিন্তু করা কঠিন। আমরা যখন ভাবছি, কীভাবে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ ফেলব তখন সামনে অনেকগুলো ‘কিন্তু’ অপেক্ষা করছে। প্রথমত, সামনে ধেয়ে আসছে ঈদ। অনেকেই বাসায় চলে যাব। দ্বিতীয়ত, যশোরের তিনটি উপজেলায় কমপক্ষে চব্বিশটি ইউনিয়নের শতাধিক গ্রাম পানিবন্দী। আমাদের সীমিত ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার কীভাবে করা যায়, সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এমন সময় আচমকা একটি ফোন কল এলো গগন ভাইয়ের কাছে। ভাই ফোন ওঠাতেই ওপাশ থেকে ভেসে এল একটি মিষ্টি ব্যক্তিত্বপূর্ণ কণ্ঠ, ‘আমি যশোর থেকে বলছি, আপনি হিমু পরিবহন, খুলনা থেকে বলছেন?’
এবং আমাদের কাজ তার গন্ত্যব্যের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে দ্বিতীয় ধাপে পদার্পণ করল।
মেয়েটি ছিল তহুরা মীর। যিনি তার অসাধারণ কর্মতৎপরতায় হিমু পরিবহনের ইতিহাসে অনন্য একটি দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছেন।
ভেসে গেছে সব;ছবি: লেখক

আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, ঈদের অব্যবহিত পরেই আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করব। তখন জল অপেক্ষাকৃত কমে যাবে। বন্যা-পরবর্তী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাই হবে আমাদের লক্ষ্য। সুতরাং, প্রান্তিক বন্যাকবলিত জনগনের ভেতর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারলে সেটা নিঃসন্দেহে দারুণ কিছুই হবে। প্রথমে পরিকল্পনা ছিল, হিমু পরিবহন খুলনাই এই কার্য সম্পাদন করবে। পরবর্তীতে আমাদের কেন্দ্রীয় হিমু পরিবহন তাদের অভিজ্ঞতা আমাদের সাথে শেয়ার করতে চাইল।
এর আগে কুড়িগ্রামে বন্যাক্রান্তদের মাঝে একটি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় হিমু পরিবহনের কর্মনিষ্ঠ হেল্পারদের আন্তরিক চেষ্টায় হিমু পরিবহনের অগ্রযাত্রার একটি মাইলফলক স্থাপিত হয়। তাদের সে অভিজ্ঞতা যদি আমাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের সাথে যুক্ত হয়, তবে আমাদের উদ্যোগ অধিকতর সাফল্য লাভ করবে, তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না। তাদের প্রস্তাব আমরা সানন্দে মেনে নিলাম। আমাদের তোড়জোড় শুরু হলো।
যাত্রাপথ; ছবি: লেখক

ক্যাম্প করার আগে প্রকৃত অবস্থা চাক্ষুষ করার জন্য আমাদের টিম লিডারের নেতৃত্বে রিয়াদ চৌধুরী, লিমা আক্তার সহ কয়েকজন হুমায়ুন ভক্ত তাদের ঈদের ছুটি উপেক্ষা করে যশোরের পানিবন্দী মানুষের মাঝে ঘুরে এলেন। আমার যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু কপাল মন্দ। অস্থিরতার জন্য ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দশ দিন আগে আমি বাসায় চলে আসতে বাধ্য হয়েছি।
গগন ভাইয়ের ধারণ করে আনা ভিডিওচিত্র দেখে আমরা স্তব্ধ হয়ে গেলাম। গ্রামের পর গ্রাম পানিবন্দী। দ্বিতল স্কুল ভবনের নিচতলা পানির নিচে। কয়েকদিন আগে শুকনো যেসব জমিনের উপর দিয়ে মানুষ চলাচল করতো, যে রাস্তায় ট্রাক-লরির মিছিল চলেছে নিরন্তর; আজ সেখানে হাসের পাল গুগলি শামুক ধরার মচ্ছব করে বেড়াচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে মানুষ চলাচল করছে কলাগাছের ভেলা বা ডিঙি নৌকায়।
ত্রাণের কাজ তীরবেগে চলছে। ফেসবুক-ফোন মারফত আপডেট নিচ্ছি আর নিজের ভাগ্যকে দুষছি। ক্যাম্পাস বন্ধ না হলে আমারও এখন খুলনা থাকার কথা ছিল। এর মধ্যে ঢাকা থেকে প্রয়োজনীয় ওষুধ এসে পৌঁছেছে, বাকিটা খুলনা কাউন্টার সংগ্রহ করেছে। ষোল তারিখ সবাই রওয়ানা হব, দিন ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে। গগন ভাই, রিয়াদ ভাই, আশরাফুল ভাই, বর্ষাপু, লিমাপুসহ কয়েকজন নিজেদের ব্যক্তিগত কাজ ফেলে দিনরাত খেটে চলেছে ড্রাগ স্যাম্পলিং সহ অন্যান্য কাজে।
মানবতার বিজয় নিশান যখন নীল আকাশে সমুন্নত, ব্যক্তিস্বার্থ কি সেখানে ঠাঁই পায়?
শুকনো জায়গায় নৌকা চলে; ছবি: লেখক

ভোরে ট্রেন ছিল, আমি আরো ভোরে এলার্ম দিয়ে রেখেছিলাম অথচ কিনা আমার ঘুম ভাঙল গগন ভাইয়ের ফোনে। তড়িঘড়ি স্টেশনে গিয়ে দেখি তিনটা বাক্সভর্তি ঔষধ নিয়ে প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ইতিউতি তাকাচ্ছেন গগন ভাই। পাশে হিমু পরিবহন খুলনার কাউন্টারের আরেক নিবেদিতপ্রাণ খালিদ ভাই। অনেক গুণে গুণান্বিত এই ব্যক্তিটিকে দেখে মন ভাল হতে বাধ্য। আমি হাসিমুখে এগিয়ে গেলাম তাদের দিকে। একটু পর সবাই এসে হাজির হলো। ওষুধের বাক্সগুলো ধরাধরি করে ট্রেনে উঠতেই ভেঁপু বাজলো।
ভেতরে যেতেই কয়েকটা নতুন মুখ চোখে পড়লো। গগন ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং এভাবেই অসাধারণ কয়েকজন মানুষের নাম আমার পরিচিত’র তালিকায় যুক্ত হলো। তারা ছিলেন ঢাকা থেকে আসা মৌটুসি আপু, হাসান ইমাম ভাই, নাওমি আপু, বেবি আপু। পরিচয় হল পিজি হাসপাতালে কর্মরত মেধাবী তরুণ ডাক্তার মারুফ ভাইয়ার সাথে এবং খুলনা থেকে যাওয়া ডাক্তার ওবায়েদ এবং ডাক্তার বাবুলের সাথে; যাদের পরবর্তী সেবা মানসিকতা তাদের জন্য আমার মনে চিরস্থায়ী আসন কেড়ে নিয়েছে।
মনিরামপুরে মেডিকেল ক্যাম্প করা হবে অথচ আমাদের থাকার জায়গা নির্ধারিত হলো ঝিকরগাছার গদখালিতে; পানিসারা গ্রামের মীর বাড়িতে।
যশোরের রূপ; ছবি: লেখক

আমাদের ক্যাম্প মনিরাম্পুরে করার পেছনে যার ভূমিকা সর্বাধিক সেই তহুরা মীরের বাড়ি এটি। অতীত জমিদার পরিবারের উত্তরপুরুষ মীর বাড়ির মেয়ে তহুরা মীরই ফোন করেছিল গগন ভাইকে। আমরা যখন ভাবছি কীভাবে কোথায় কখন কী করা যায়, তখন তার ফোন আমাদের অনেকখানি হেল্প করে ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ঠিক করতে।
সহযোগিতা বললে তাদের অবদান খর্ব করা হবে, তার চেয়ে বেশি কিছু করেছিল তারা। পঞ্চাশোর্ধ মানুষের থাকা খাওয়ার দায়িত্ব হাসিমুখে নিজ হাতে তুলে নিয়েছিলেন অসীম মমতাময়ী আন্টি (তহুরার মা) এবং তার সে আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি ছিল এ কথা হলফ করে কেউ বলতে পারবে না।
গদখালি ফুলের দেশ, প্রেমের দেশ। সুপ্রাচীন তার ঐতিহ্য। দেবী কালী’র ভক্ত মদলসার প্রেমে পড়ে পর্তুগীজ দস্যু রদ্রিগেজ তার পাপের পথ ত্যাগ করে হয়েছিল সন্ন্যাসী। ভক্তিময় শক্তিসাধনায় গড়ে তুলেছিলেন গডকালী’র (দেবি মা কালী ঈশ্বরার্থে গড অভিহিত) মন্দির। অপভ্রংশ হয়ে যে স্মৃতি আজও বয়ে চলেছে বর্তমানের গদখালী। অপরদিকে আজকের আধুনিক যুগে এসে ফুল চাষে দেশের প্রথম স্থান অধিকার করেছে সে।
গদখালী; ছবি: লেখক

এই নিঃস্তব্ধ বিকেলে সুবর্ণ সময়টুকু সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য আমরা কয়েকজন বেরিয়ে পড়লাম ফুল বাগান দেখতে। প্রায় দশজনের দল। একটু এগোতেই একটা গোলাপের ক্ষেত পড়লো। শীতের এখনও বেশ দেরী, তাই গোলাপের ক্ষেত শ্রীহীন। আমরা পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম। বিষণ্ণ বিকেলে মরা হলুদ আলোয় শেষ আলোছায়ার খেল খেলে বিদায় নিচ্ছে সূর্য। পাখিরা দিনের ক্লান্তি শেষে বাসার দিকে ডানা মেলেছে, তার পাখার নিচে সরসর করে কেটে যাচ্ছে স্নিগ্ধ বাতাস। আমরা ধ্যানমগ্ন হয়ে বসে রইলাম।।
ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। যেই না এসে একটু বসেছি অমনি এক ঝাঁক পায়ের শব্দ। একটু পর তারুণ্যের পতাকা নিয়ে আমাদের সাথে যুক্ত হলো কুষ্টিয়া কাউন্টারের এক ঝাঁক সতেজ প্রাণ। তারপর এলেন, গাজীপুর কাউন্টারের সদাহাস্য ইমাম ভাই। আমাদের টিম লিডার তখনও আমাদের জন্য বিস্ময় বাকি রেখেছিলেন। ‘চান্নিপসর রাইতে’ যখন এতগুলো হুমায়ূন পাগলা জড় হয়, তখন জ্যোৎস্নাবিলাসের অনিবার্যতা রোখে কার এমন সাধ্য।
নিশুতি রাতে (যদিও ঘড়ির কাঁটা তখন নয়টা ছুঁই ছুঁই) খোলা আকাশের নিচে সবাই যখন নিজেদের পরিচয় পর্ব সেরে কুষ্টিয়া হিমু পরিবহনের রম্যরসে সিক্ত হয়ে, অতঃপর খুলনার মুক্তা মন্ডলের কণ্ঠে হুমায়ূন স্যারের গানে আবিষ্ট, তখন গগন ভাই ঘোষণা করলেন, আপনাদের সাথে কয়েকজন লোক দেখা করতে চান। এবং আমাদের বাক্যব্যয়ের সুযোগ না দিয়ে তার পেছন থেকে একে একে বের হয়ে আসলেন মাঝি ভাই, নজরুল ভাই, আসলাম ভাই। সবাই হইহই করে উঠলো।
বলতে গেলে হিমু পরিবহনের স্বপ্নদ্রষ্টাদের যারা বাংলাদেশে আছে, প্রায় সবাই যশোরের এই নিভৃত গ্রামে এক মহৎ কার্যের সাক্ষী হতে হাজির হয়েছে। চান্নিপসর রাতে চাঁদ তখন ক্রমেই যেন আরো আলোকিত হয়ে উঠছে। চাঁদ নয়, আকাশে যেন হুমায়ূন স্যারই হাসছেন তার পাগলা ভক্তদের জন্য।
সবাই হিমু; ছবি: লেখক

পরদিন সকালে আমরা মনিরামপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। দীর্ঘ ক্লান্তিকর এক যাত্রা, খোলা ট্রাকে এক ঝাঁক ছেলে-মেয়ে। মাথার উপরে তপ্ত সূর্য আর নিচে বিশ্রী ধুলো। অথচ কারো মুখে কষ্টের লেশমাত্র নেই। আমরা যেখানে যাচ্ছি, সেখানের মানুষেরা যে মানবেতরভাবে বেঁচে আছে।
পদ্মনাথপুর আর পোড়াডাংগা দুটি গ্রামে আমাদের মেডিকেল ক্যাম্প করার কথা ছিল। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল, কে কোথায় যাবে বা কার কী কাজ। আমরা পূর্বনির্ধারিত স্থানে যেতে দুই দলে বিভক্ত হয়ে গেলাম। আমি পদ্মনাথপুরের দলে ছিলাম। পদ্মনাথপুর একটু ভিতরের দিকে।
আমরা অন্যদের রেখে এগিয়ে চললাম। প্রায় এক মাস হতে গেল, এখনও রাস্তার উপর জল। কোথাও হাঁটুপানি অতিক্রম করেছে। রাস্তা থেকে বাড়ী যেতে এখনও কোমরপানি কোথাও কোথাও। আমাদের এক ঝাঁক তরুণকে হলুদ গেঞ্জি পরে একটা ভ্যানগাড়ি ঠেলতে দেখে কৌতূহলী পুরুষ-মহিলারা জিজ্ঞাসু চোখে এগিয়ে এলো। কয়েকদিন আগে প্রচার করা হয়েছে। তারপরও কোনো না কোনোভাবে এদের কান এড়িয়ে গেছে। তাদের পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে আমরা গন্তব্যে এগিয়ে গেলাম।
অসহায় মানুষ; ছবি: লেখক

পদ্মনাথপুরে পৌঁছে আমরা দ্রুত কাজ আরম্ভ করলাম, পদ্মনাথপুর হাটের একপাশে বেঞ্চি ফেলে সেখানে ডাক্তার মারুফ এবং ডাক্তার রাকিব তাদের কাজ আরম্ভ করলেন। দলে দলে নারী পুরুষ ভিড় করছিল। আমার দায়িত্ব পড়েছিল ওষুধ বিতরণ বিভাগে। সহকর্মী ছিলেন হাসান ইমাম। যিনি তার অভিজ্ঞতায় আমার অনভিজ্ঞতাকে পুষিয়ে দিয়েছিলেন। আশরাফুল ভাইসহ আরো দুইজন রোগীকে ওষুধ খাওয়ার নিয়মকানুন বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।
দুইটি ক্যাম্পের পাশাপাশি আমাদের একটি ভ্রাম্যমান দল বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন দিক বুঝিয়ে দেওয়ার কাজ করছিল। ক্রমশ রোগীর চাপ বাড়ছিল। আমাদের প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। এতই যে, মাঝে মাঝে বিশৃঙ্খলাও যে সৃষ্টি হচ্ছিল না তা নয়, কিন্তু আমাদের কর্মঠ হেল্পাররা তাদের শক্তি এবং বুদ্ধিমত্তার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটিয়ে সবাইকে স্বাভাবিক রাখার কাজে নিয়োজিত ছিল।
জলের মধ্য দিয়ে যাত্রা; ছবি: লেখক

আমরা যারা ওষুধ বিতরণ করছিলাম তাদের দম ফেলার ফুসরত ছিল না। আর ডাক্তারদের কথা তো অনুমানসাধ্য। তারা অসীম ধৈর্যের সাথে যেভাবে চিকিৎসা প্রদান করছিলেন, তাতে তাদের ধন্যবাদ দিলে ছোট করা হয়। আমাদের সবার শপথ ছিল, যেই আসুক না কেন আমরা কাউকে খালি হাতে ফেরাব না। গগন ভাই প্রতিনিয়ত দৌড়ের উপর ছিলেন, খালিদ ভাই, বর্ষাপু, লিমাপুও তাই।
দুই ক্যাম্প মিলিয়ে হিমু পরিবহন সহস্রাধিক মানুষকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেছিল। তার ভেতর নবজাতক যেমন ছিল, তেমনি শত বছর বয়সী বৃদ্ধও ছিল। আমাদের রওনা দিতে দিতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। অবসন্ন দেহে আমরা ট্রাকে এসে বসলাম। আবারও দীর্ঘ ক্লান্তিকর এক পথ আমাদের সামনে অপেক্ষা করছিল কিন্তু সেসব কিছুই আর আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারছিল না।
ফেরার সময়; ছবি: লেখক

এক স্বর্গীয় অনুভূতিতে সবার মন আচ্ছন্ন ছিল, প্রাপ্তির খাতায় আজ সবার নামে বড় কিছুই জমা হয়েছে। সকালে যখন এখানে এসেছিলাম, তখন সাথে কিছু ওষুধ ছিল, মহাকালের বিচারে তা মূল্যহীন। কিন্তু যখন ফিরে আসছি, তখন আমাদের উপর বর্ষিত হচ্ছিল অজস্র মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসা। এক ঝাঁক তরুণ তরুণীর জন্য, এক ঝাঁক হুমায়ূন ভক্তদের জন্য সে ভালবাসা।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

মিরিকের লেকে-পাহাড়ে মেঘের সনে মিতালী

বাগেরহাট ভ্রমণ: চন্দ্রমহলের সৌন্দর্যে একদিন