মায়াদ্বীপ: মেঘনার বুকে সবুজে আচ্ছাদিত এক চরের গল্প

নৌকাটা যতই তীরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বিস্ময়ের অতল গহ্বরে ডুবে যাচ্ছি ততই। দৃষ্টিজুড়ে সবুজের গালিচা আর আকাশে ধূসর মেঘের খেলা। শান্ত মেঘনার সবুজাভ স্নিগ্ধ পানি আছড়ে পড়ছে কূলে। তীরের কাছে জমা হয়ে আছে একরাশ কচুরিপানা। যেন নৌকা থেকে নামা যাত্রীদের সাথে সাথেই অভিবাদন জানাবে তার বেগুনী ফুলগুলো দিয়ে।

মায়াদ্বীপ; ছবিঃ লেখিকা

স্থানীয়ভাবে ‘নলচর’ নামে পরিচিত অনিন্দ্যসুন্দর এই জায়গাটির নাম মায়াদ্বীপ। মজার বিষয় হলো জায়গাটি থেকে ঘুরে আসার পর আমি জানতে পারি এই চরের এত সুন্দর একটি নাম আছে। নারায়ণগঞ্জের পানাম নগর ও লোক জাদুঘর ভ্রমণের উদ্দেশ্যে নিয়ে বাসে চেপে বসেছিলাম। এই দুই স্থান দর্শনের পরেও হাতে ছিল অনেকটা সময়।

মেঘনা নদী ও বৈদ্দ্যার বাজার ঘুরে দেখার ইচ্ছা ছিল। সেই ছোটবেলায় হাটে তাজা মাছ কেনাবেচার দৃশ্যর কথা মনে পড়ে গেল। সেই স্মৃতি রোমন্থনে পানাম থেকে ছুটে গেলাম মেঘনার তীরে। তখন পর্যন্ত আমার জানা ছিল না আর কিছুক্ষণের মাঝেই আবিষ্কার করবো মায়ায় মোড়ানো মায়াদ্বীপকে।

প্রায় মাসখানেক আগে আমার দুই বন্ধুর কথোপকথনের যে চুম্বক অংশ আমার কানে ভেসে এলো তা হলো ঢাকার আশেপাশে একদিনে ঘুরে আসা যায় এমন জায়গাগুলোর তালিকা। কাছে যেতেই পরিষ্কার হয়ে এলো ওরা পানাম নগরে যাবার পরিকল্পনা করছে। ওদের সাথে যাবার জন্য বেশি তোড়জোড় করতে হলো না। শুধু একটা গম্ভীরভাব নিয়ে বললাম, আরে আমি তো আগেও গিয়েছি ওখানে। ব্যস, কাজ হয়ে গেলো। পথনির্দেশক হিসেবে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেয়ে গেলাম। আলাদা করে দিন তারিখ ধার্য করতে হলো না। কারণ একদিন সময় নিয়েই নারায়ণগঞ্জের এ জায়গা দুটি ঘুরে আসার জন্য যথেষ্ট।

এক শুক্রবার সকালে ৩ জন মিলে রওনা হলাম নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে। গুলিস্থান স্টেডিয়ামের সামনে থেকে স্বদেশ বাসের টিকেট কেটে চেপে বসলাম বাসে। ভাড়া জনপ্রতি ৪৫ টাকা। স্বদেশ ছাড়া দোয়েল বাসও চলাচল করে ঐ রুটে। যানজট না থাকায় প্রায় ঘণ্টাখানেকের মাথায় পৌঁছে গেলাম নারায়ণগঞ্জের মোগড়াপাড়া বাজারে। ঘড়িতে তখন সকাল ১০টা। রিক্সা করে রওনা হলাম পানাম নগর ও লোক জাদুঘর দেখার উদ্দেশ্যে। এ দুটি জায়গা নিয়ে আরেকটি নিবন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা থাকবে। আজ শুধু আমরা পরিচিত হবো মায়াদ্বীপের সাথে।

সবুজে ঘেরা মায়াদ্বীপ; ছবিঃ লেখিকা

দুপুর ২টার দিকে জাদুঘর দেখা শেষে অটোতে চড়ে আবার ফিরে এলাম মোগড়াপাড়া বাজারে। কারণ সারা সকাল টইটই করে পেটে তখন ছুঁচো ছুটছিল। একটা রেস্টুরেন্ট থেকে ভুনা খিচুড়ি খেয়ে নিলাম। স্বাদ বেশ ভালো ছিল। ১৫০ টাকা খরচ হলো জনপ্রতি। এবার বেশ আয়েশ করে আবার একটা রিক্সায় চড়ে রওনা হলাম বৈদ্দ্যার বাজারের উদ্দেশ্যে। প্রায় ১৫ মিনিট লাগলো বাজারে পৌঁছাতে। ভাড়া নিল ৩০ টাকা। অটোতে ভাড়া ১০ টাকা করে জনপ্রতি।

দ্বীপে সাজিয়ে রাখা নৌকা; ছবিঃ লেখিকা

বাজারে মাছের বেশ জমজমাট কারবার। নদীর ছোট মাছ দেখে লোভ হচ্ছিল খুব। পড়ালেখার জন্য পরিবার ছেড়ে বাইরে থাকা অভাগা মানুষের মধ্যে আমিও একজন। মায়ের হাতের মাছের তরকারির মতো রাঁধতে পারবো না তাই এই ইচ্ছাকে মাটিচাপা দিয়ে দিলাম। আপনারা যারা এখানে আসতে চাইছেন ইচ্ছা করলে নদীর তাজা মাছ নিয়ে বাড়িতে ফিরতে পারবেন।

মায়াদ্বীপে চলাচলের মাধ্যম এই নৌকাগুলো; ছবিঃ লেখিকা

দু তিন পা হাঁটতেই মেঘনার তীরে চলে এলাম। স্নিগ্ধ বাতাসে মন প্রাণ জুড়িয়ে গেলো। স্বচ্ছ পানিতে আকাশের প্রতিচ্ছবি দেখছি তখন। কানে বাজছে রবি ঠাকুরের গান। হঠাৎ চোখ পড়লো ঘাটে বাঁধা নৌকাগুলোর ওপর। আমার ধারণা ছিল, এই নৌকাগুলো শুধু মাছ ধরা বা বাজারের ব্যবসায়ীদের মালামাল পরিবহনের জন্য। কিন্ত লক্ষ্য করলাম সাধারণ মানুষজনও পারাপার করছেন মাঝিরা। আগ্রহ নিয়ে তাদের কাছে প্রশ্ন করতেই উত্তর পেয়ে গেলাম। নদীর ওপারের চরে যাবেন যাত্রীরা। ভাড়া জনপ্রতি ১০ টাকা।

মনটা অনেক খুশি খুশি লাগছে কারণ এখন আমি নৌকায় উঠে বসেছি। ইঞ্জিনচালিত নৌকা আমার তেমন ভালো লাগে না। কিন্তু হস্তচালিত নৌকার ভাড়া বেশি আর পরিস্থিতি বিবেচনায় এই নৌকাগুলোকে বেশি নিরাপদ মনে হলো। শান্ত মেঘনার উপর দিয়ে এগিয়ে চলছে আমাদের নৌকা। পদ্মার পানির সাথে সখ্য থাকলেও মেঘনার পানির সাথে আজ আমার প্রথম পরিচয়। এত স্বচ্ছ সবুজাভ পানি দেখে সাঁতার কাটার লোভ সামলানো খুব মুশকিল ব্যাপার।

নৌকায় বসে নদীর দৃশ্য; ছবিঃ লেখিকা

নদীর চারপাশের গ্রামগুলোকে দেখে মনে হলো শহরের হাওয়া লেগেছে গ্রামগুলোতেও। এসব দেখতে দেখতে কখন যে তীরের কাছাকাছি চলে এসেছি বুঝতেই পারিনি। নৌকায় বসার সময় জুতো খুলে বসতে হয়েছিল। নৌকা থেকে নেমে আমি ছাড়া সবাই জুতো পরে নিলো। ভেজা বালুর স্পর্শ থেকে পা দুটোকে বঞ্চিত করা ঠিক হবে না। তাই জুতো জোড়া হাতে নিয়েই হাঁটতে লাগলাম নদীর তীর ধরে।

শান্ত শীতল ঢেউ আছড়ে পড়ে পায়ে; ছবিঃ লেখিকা

শান্ত ঢেউ পায়ের পাতায় স্নিগ্ধ পরশ বুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে যেন। তীর ধরে অনেকটা হাঁটলাম। দ্বীপটি অনেকটা অর্ধচন্দ্রাকার আকৃতির। পাশেই গড়ে উঠেছে জনপদ। যেটিকে একটা ছোটখাটো গ্রাম বললে ভুল হবে না। সেদিকটাতে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও হাতে সময় ছিল অল্প তাই সেই চিন্তা বাদ দিতে হলো।

চরের মাঝখানটা সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত। আমাদের মতো অনেকেই এখানে ঘুরতে এসেছিল। ছেলেমেয়েরা বিস্তীর্ণ প্রান্তরে খেলায় মত্ত। দেখে বোঝা গেল নদীর ওপার থেকেও নিয়মিত খেলতে আসে ওরা। এভাবে নদীপাড়ের দৃশ্য দেখতে দেখতে বেলা প্রায় পড়ে এলো। এবার ফেরার পালা। মন চাইছিল আরো কিছুক্ষণ থেকে যাই।

বিস্তীর্ণ প্রান্তরে খেলছে শিশুরা; ছবিঃ লেখিকা

বিদায়ের আগে মায়াদ্বীপের রূপ মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখে নিলাম আবার। তীরের পাশে কচুরিপানার কিছু ফুল স্মৃতি হিসেবে নিয়ে নিলাম। আমার চোখের ভাষা কী মায়াদ্বীপ বুঝতে পেরেছে সেদিন! আবার কোনো একদিন তার মায়ার টানে আমাকে আসতে হবে তার কাছে। এমন কথা দিয়েই সে স্থান ত্যাগ করেছি সেদিন।

বাজারের টং দোকান থেকেই দেখা যায় নদীর একাংশ; ছবিঃ লেখিকা

নদী পার হয়ে একইভাবে আবার ফিরে এলাম বৈদ্দ্যার বাজার। চা নাস্তা সেরে নিলাম নদী দেখতে দেখতেই। তারপর রিক্সা করে মোগড়াপাড়া বাস স্ট্যান্ডে ও স্বদেশ বাসে চড়ে সন্ধ্যা ছটা নাগাদ ফিরে এলাম ঢাকায়।

সতর্কতা                                                   

চর এলাকা হওয়াতে সন্ধ্যার আগেই সে স্থান ত্যাগ করা নিরাপদ। নদী পারাপারের সময় বেশি সংখ্যক যাত্রী আছে এমন নৌকা বেছে নিন। ভ্রমণ স্থানের পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা মেনে চলুন।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

অপরূপ ওমান!

প্রাণী রাজ্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে একদিন