নয়নাভিরাম দ্বীপস্বর্গ মালদ্বীপের দুর্দান্ত সব ভ্রমণস্থানের গল্প

আপনাকে যদি প্রশ্ন করা হয় এক হাজারেরও বেশি দ্বীপ নিয়ে গড়ে ওঠা দেশে পুরো একটা সপ্তাহ ইচ্ছেমতো আরামে কাটাতে ইচ্ছে করে কি? শতকরা একশো জনের মধ্যে আশি ভাগ লোকের উত্তর হ্যাঁতে গড়াবে। কার না ইচ্ছে করে দিগন্ত জুড়ে বিস্তৃত সমুদ্রতটে নোনা পানির বিলাসিতায় গা না ভাসাতে! তবে সেই দ্বীপ স্বর্গের গল্পই বলি আজকের লেখায়। শিরোনাম দেখে বুঝেই গিয়েছেন যে দেশটির কথা বলছি তার নাম মালদ্বীপ।
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বেশি দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশ মালদ্বীপ যার দ্বীপ সংখ্যা এক হাজারের চেয়েও বেশি। ভারত সাগরে অবস্থিত এই স্বাধীন দেশটি বিশ্বের অন্যতম ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন দেশ। এশিয়ার সবচেয়ে ছোট এই দেশের আয়তন মাত্র ২৯৮ বর্গকিলোমিটার। তবে আয়তনের দিক দিয়ে ছোট হলেও সৌন্দর্যের দিক দিয়ে কোনো অংশেই কম নয় দেশটি। চলুন তাহলে দেখে আসা যাক মালদ্বীপের বিখ্যাত সেই ভ্রমণস্থানগুলো যা মালদ্বীপ ঘুরতে গেলে ভ্রমণ লিস্টে রাখা একেবারেই বাধ্যতামূলক।

মালে

মালে, ছবিঃ staticflickr.com

সবার প্রথমে মালদ্বীপে ভ্রমণাকর্ষনের মধ্যে যে নামটি উঠে আসবে সেটি হচ্ছে মালদ্বীপের রাজধানী মালে। সাধারণত পর্যটকরা মালেকে দেখে ছোট ছোট উড়োজাহাজের জানালা দিয়ে এবং পাশ কাটিয়ে সরাসরি তাদের রিসোর্টে গিয়ে নামে। তবে স্কুটার, গাড়ি আর ভারতীয় বাজারে ভরপুর মালে’র রাস্তাগুলো বেশ সুন্দর। প্রধান আকর্ষণ হিসেবে এখানে আছে ইসলামিক সেন্টার, সতেরশো শতাব্দির ফ্রাইডে মস্ক আর মালে বাজার।

হুলহুমালে আইল্যান্ড

হুলহুমালে আইল্যান্ড, ছবিঃ guesthousesofmaldives.com

অসীম জলরাশির একদম তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা হুলহুমালে আইল্যান্ড মালদ্বীপের বেশ নামকরা একটি দ্বীপ। হুলহুমালে দ্বীপের নামটা বেশ কৌতুকময় মনে হলেও বেশ জমজমাটভাবে গড়ে উঠেছে এই দ্বীপখানি। এখানে আছে মালদ্বীপের ভ্যালেনা বিমানবন্দর যা মালদ্বীপের দুর্দান্ত সব দ্বীপের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। পুরো দ্বীপের চারদিকে ঘিরে আছে সাগরের অফুরন্ত জলরাশি। বিশেষ করে পশ্চিম দিকের সমুদ্র সৈকতগুলো, কাঁচে ঘেরা মসজিদ আর ভারত সাগরের পাশ ঘেঁষে হেঁটে চলার রাস্তাগুলো পর্যটকদের পছন্দের শীর্ষে থাকে।

মাফুশি

মাফুশি, ছবিঃ eatandtravelwithus.com

আমার মতো যারা বাজেট ট্রাভেলার আছেন তাদের জন্য মালদ্বীপের সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো এই মাফুশি। এখানে আপনি জমকালো সব উঁচু উঁচু ভবন পাবেন না, পাবেন না পাঁচ তারা কোনো হোটেল। তবে যা পাবেন তা হলো বিশুদ্ধ প্রকৃতি যা প্রকৃতির তাণ্ডব থেকেই সৃষ্টি। ২০০৪ সালে ঘটে যাওয়া ভারত সাগর সুনামির ফলে মাফুশির অধিকাংশ স্থাপত্যেরই দফা রফা হয়ে গিয়েছিল। তবে এখন সেই ক্ষতির পরিমাণ অনেকটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছে স্থানীয়রা। স্থানীয়দের কটেজ বানানোর অধিকার দিয়ে দেয়ায় এখানে যেমন থাকা যাবে কম খরচে তেমনি পাওয়া যাবে প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসার পূর্ণ সুযোগ।

উথেমু

উথেমু, ছবিঃ ttnotes.com

মালদ্বীপের একদম উত্তরের উপহ্রদ বেষ্টনকারী “হা আলিফ” এর সর্ব-উত্তরের দ্বীপ হলো উথেমু। প্রাকৃতিক দিক দিয়ে তো বটেই, ইতিহাসের দিক দিয়েও অনন্য এই উথেমু দ্বীপ ছিল মালদ্বীপের সুলতান থাকুরুফানুর আবাসস্থল। সুলতান থাকুরুফানু ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি ষোড়শ শতাব্দীতে অনুপ্রবেশকারী পর্তুগীজদের থেকে মুক্ত করেছিলেন মালদ্বীপকে। সাদা বালি আর নীল জলের ভারত সাগরের সৌন্দর্যলীলার পাশাপাশি এখানকার মূল আর্কষণ হলো উথেমু গান্দুভারু যেটা পুরোপুরি কাঠের তৈরী অসম্ভব সুন্দর জায়গা যেখানে কিংবদন্তী সুলতান থাকুরুফানু তাঁর শৈশব কাটিয়েছিলেন।

ফেইদহো

ফেইদহো, ছবিঃ t-ec.bstatic.com

ফেইদহো দ্বীপের কাহিনীটা একটু আলাদা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন ব্রিটিশরা মালদ্বীপে ঢুকে পড়ে তখন গান আইল্যান্ড নামক এক দ্বীপে গড়ে তোলা হয় যুদ্ধ বিমানবন্দর। সেই গান দ্বীপ থেকে মালদ্বীপের মানুষদের সেন্যু দ্বীপবেষ্টনকারীর অন্তর্ভুক্ত এক দ্বীপে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই দ্বীপটিই আজকের ফেইদহো দ্বীপ। সাগরের প্রশান্ত বাতাস, বালির সমুদ্র আর স্থানীয়দের বন্ধু সুলভ আচরণ যেকোনো পর্যটককে এই দ্বীপের প্রেমে পড়তে বাধ্য করে। মালদ্বীপে সামুদ্রিক খাবার-দাবারের স্বর্গ বলা হয় ফেইদহোকে।

মারাধো

মারাধো, ছবিঃ maldives-resort.com

গান দ্বীপের সাথে ফেইদহোর যোগাযোগ রক্ষার কাজ করে যে নয়নাভিরাম দ্বীপটি তার নাম মারাধো। মালদ্বীপের পূর্ব দিকে অবস্থিত এই দ্বীপটিকে উড়োজাহাজ থেকে দেখলে মনে হবে একটি বাঁকানো আঙুলের মতো। পাম গাছ, নারিকেল গাছের ছায়ায় ঘেরা মারাধো দ্বীপের স্থানীয়রা বেশ হাসিখুশি আর বন্ধুসুলভ। ঝালের রেসিপি হলো এখানকার খাবার-দাবারের মূলমন্ত্র। মারাধো ঘুরতে গেলে লিংক রোড দিয়ে যাবার সময় অনেক কফি আর স্যান্ডউইচ এর দোকান পড়বে, স্বাদ নিতে ভুলে যাবেন না যেন।

ভ্যালিগান্দু আইল্যান্ড

ভ্যালিগান্দু আইল্যান্ড, ছবিঃ maldivestourism.net

আগেই বলেছি এক হাজারেরও বেশি দ্বীপ আছে মালদ্বীপে। তাই মূল ভ্রমণ স্থানগুলো দ্বীপগুলোকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে। তেমনি একটি দ্বীপ ভ্যালিগান্দু আইল্যান্ড। মালদ্বীপে দম্পতিদের জন্য সর্বোত্তম দ্বীপ হিসেবে টানা খ্যাতিপ্রাপ্ত ভ্যালিগান্দু দ্বীপ যেন ভালোবাসারই সমার্থক শব্দমাত্র। অসাধারণ সব রিসোর্ট, ককটেইল বার, নয়নাভিরাম সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দম্পতিদের মাঝে ভ্যালিগান্দুর জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে দিয়েছে দিনে দিনে বহুগুণে। তবে বন্ধুবান্ধব নিয়ে আসলে একটুও খারাপ লাগার কথা নয়, সৌন্দর্য সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত এই দ্বীপে। বিশেষ করে এই দ্বীপে আছে সাগরের স্বচ্ছ পানিতে কায়াকিং করার সুযোগ।

ব্যানানা রিফ

ব্যানানা রিফে স্কুবা ডাইভিং, ছবিঃ secretparadisemaldives.files

এতক্ষণ ধরে মালদ্বীপের গল্প শুনছেন, সাগরের কথা উঠছে। কারো মনে প্রশ্ন জাগেনি স্কুবা ডাইভিং কোথায় করবো? যদি প্রশ্ন মনে জেগেই থাকে তবে পুরো মালদ্বীপ ঘুরে এর সবচেয়ে ভালো উত্তরটা পাবেন ব্যানানা রিফে। পুরো মালদ্বীপের ডাইভিং স্বর্গ বলা হয় ব্যানানা রিফকে। এখানে পর্যটকরা আসে কেবল ডাইভিং করার উদ্দেশ্য নিয়ে, তাই ফল-ফসারির আদলে গড়ে ওঠা এই ব্যানানা রিফের যেদিকেই চোখ পড়বে স্কুবা ডাইভিংয়ের সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলোই সবার আগে চোখে পড়বে। উত্তর মালে’র সাথে সংযুক্ত এই দ্বীপে ভিড় জমায় বিশ্বের নামীদামী সব স্কুবা ডাইভাররা আর ডাইভিং করে চলে কাঁচের মতো স্বচ্ছ নীল পানি ভেদ করে।
ফিচার ইমেজ- xinature.com

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফুন্টসলিংয়ের পথে পথে

বন্দরনগরী দার এস সালামে একদিন