হাজারি গুড়ের খোঁজে মানিকগঞ্জের ঝিটকায়

সাভার বেড়াতে এসে, রাজা হরিশচন্দ্রের প্রাসাদ আর বিরুলিয়া জমিদার বাড়িগুলো দেখা শেষে, বালিয়াটি যাওয়ার জন্য আমরা মানিকগঞ্জের বাসে উঠলাম। সিট পাইনি, তাই ঝুলে ঝুলেই রওনা দিতে হলো।
অল্পসময় হাতে নিয়ে আসায় মানিকগঞ্জের অনেক কিছুই ঘোরা হয়নি। অসময়ে আসায় এত কাছে এসেও খাওয়া হয়নি মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী হাজারী গুড়। ভালোভাবে না জানা থাকলে কত কিছু মিস হয়ে যায়! হাজারি গুড়ের গল্পটা না বলে পারছি না।

হাজারি গুড়। সোর্স: somoyerkonthosor.com

মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা এলাকা গুড়ের জন্য বিখ্যাত। আসলে ঝিটকা বাজারের পাশে বালতা ইউনিয়নের শিকদারপাড়া গ্রামে এই এলাকায় নানা ধরনের গুড় পাওয়া যায়। তবে এখানকার ‘হাজারী গুড়’ গোটা দেশে এক নামেই পরিচিত। লোভনীয় স্বাদ আর মন মাতানো সুগন্ধে অতুলনীয় হাজারী গুড় একসময় ছিল বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। কিন্তু খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এবং গুড় শিল্পের প্রতি অযত্ন, অবহেলায় বাইরের পৃথিবীতে হাজারী গুড়ের সেই সুনাম দিন দিন ফিকে হয়ে আসছে।
এই গুড়ের গল্পটাও অনেক দিনের পুরোনো। ‘ঝিটকার হাজারী ও পাটালী গুড়’ বাংলার শেষ সুবেদার নবাব সিরাজউদ্দৌল্লা’র আমল থেকেই সুনাম বহন করে আসছে। এমনকি এই হাজারী গুড় তৎকালীন দিল্লীর বাদশা ও ইংল্যান্ডের রানীকে উপহার হিসেবে পাঠানো হতো। বিশ্বের কমপক্ষে ২০টি দেশের মানুষ এ গুড়ের স্বাদ নিতে মুখিয়ে থাকেন।
হাজারি সিলমোহর। সোর্স: প্রথম আলো

কথিত আছে, প্রায় ২০০ বছর আগে ঝিটকা অঞ্চলে হাজারি প্রামাণিক নামে একজন গাছি ছিলেন যিনি খেজুরের রস দিয়ে গুড় তৈরি করতেন। একদিন বিকালে খেজুরগাছ কেটে হাঁড়ি বসিয়ে গাছ থেকে নামামাত্রই একজন দরবেশ এসে তার কাছে রস খেতে চান। তখন ওই গাছি দরবেশকে বলেন, সবে গাছে হাঁড়ি বসানো হয়েছে। এ অল্প সময়ে বড়জোর ১০-১৫ ফোঁটা রস হাঁড়িতে পড়েছে। তবুও দরবেশ রস খাওয়ার আকুতি জানান এবং তাকে গাছে উঠে হাঁড়ি নামাতে বলেন। গাছি তখন খেজুরগাছে উঠে হতবাক হয়ে যান। দেখতে পান, মাত্র কয়েক মিনিটে পুরো হাঁড়ি রসে ভরে গেছে। গাছি হাঁড়িভরা রস নিয়ে নিচে নেমে দরবেশকে রস খাওয়ান এবং তার পা জড়িয়ে ধরেন। তখন দরবেশ গাছিকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘কাল থেকে তুই যে গুড় তৈরি করবি তা সবাই খাবে এবং তোর গুড়ের সুনাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়বে।’ বলেই দরবেশ দ্রুত চলে যান। ওই দিন থেকে হাজারী প্রামাণিকের নামেই এ গুড়ের ‘হাজারি’ নামকরণ হয়।
আবার প্রবীণ অনেকের মতে, গাছের রস থেকে বিশেষ কৌশলে সুগন্ধময় সফেদ এ গুড়ের উদ্ভাবন করেছিলেন হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা গ্রামের মিনহাজ উদ্দিন হাজারী। প্রকৃত হাজারী গুড় তৈরির গোপন কৌশল একমাত্র তার পরিবারের সদস্যদের মাঝেই রয়ে গেছে। তার নামেই এই গুড়ের নামকরণ হয়েছে ‘হাজারী গুড়’।
সিলমারা গুড়। সোর্স: 24ghanta.tv

তবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য জনশ্রুতি হলো, ব্রিটিশ আমলে রানী এলিজাবেথ ভারতবর্ষ সফরকালে রানীর খাবার টেবিলে দেওয়া হয়েছিল এই গুড়। রানী কৌতূহলবশত হাতে নাড়াচাড়া করে একটু চাপ দিতেই গুড়ের দলা ভেঙে হাজার টুকরা হয়ে গেলো। এই গুড়ের স্বাদ ও ঘ্রাণে মুগ্ধ হয়ে রানী হাজারি নামে একটি সীলমোহর প্রদান করেন। আর সেই থেকে এর নাম হয় হাজারি গুড়।
হরিরামপুর উপজেলায় ঝিটকা শিকদারপাড়া গ্রামের ৪২টি পরিবার এখন এই গুড় তৈরির সঙ্গে জড়িত। গ্রামের এই অংশটির নাম হাজারি পাড়া। জাহিদ হাজারিকে লোকে এক নামে চেনে।
শীতকালে ঝিটকা গ্রামের হাজারি পরিবারের ১৫-২০ জন গাছি খেজুরগাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরির সাথে সম্পৃক্ত। এই পরিবারের দেখাদেখি ঝিটকা গ্রামের অন্য গাছিরাও হাজারি গুড় উৎপাদন করে থাকেন। তবে প্রকৃত হাজারি গুড় তৈরির মূলমন্ত্র একমাত্র তার পরিবারের সদস্যরাই জানেন বলে জানা যায়।
রস নিয়ে যাচ্ছেন গাছি। সোর্স: প্রথম আলো

সব মিলিয়ে ৩০ থেকে ৩৫টি পরিবার এ পেশার সাথে জড়িত। বছরের অন্য সময় ঝিটকা গ্রামের মানুষজন অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকলেও শীত মৌসুমে সবাই গুড় তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকে। রস সংগ্রহ, জ্বাল দেয়া ও গুড় বানানো এ কাজে পরিবারের সবাই সহযোগিতা করে বলে জানা যায়। অন্য যেকোনো খেজুরের গুড়ের তুলনায় হাজারি গুড়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো- হাতে নিয়ে ঘষা দিলেই সাথে সাথে তা গুড়ো হয়ে যায়।
তবে বর্তমানে খেজুর গাছের সংখ্যা ব্যাপক হারে কমে যাচ্ছে এবং নতুন করে গাছ লাগানো হচ্ছে না। পাশাপাশি এই গুড় তৈরির কারিগর বা গাছীর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে এবং নতুন প্রজন্মের এই কাজের প্রতি আগ্রহ নেই। তাই অদূর ভবিষ্যতে হয়তো হারিয়ে যাবে হাজারি গুড়।
গুড় তৈরির প্রক্রিয়া। সোর্স: channelionline.com

ভালো গুড়ের জন্য দরকার খুব ঠাণ্ডা রোদ, ঝলমলে আবহাওয়া। হাঁড়িগুলো গরম জলে ধুয়ে রোদে শুকাতে হয়। কাকভোরেই গাছে উঠে রস নামাতে হয়। সকাল আটটার মধ্যে গুড় বানানো শেষ।
জাহিদ জানালেন, এ বছর ৬০টা গাছ কেনা হয়েছে। মূলত রসের সময় পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন—এ সময়টাতে দিনে মাত্র ছয়-সাত ঘণ্টা ঘুম হয় তাদের। জাহিদ হাজারিকে হাটে বা বাজারে গুড় ফেরি করে বেড়াতে হয় না। দূর-দূরান্ত থেকে ক্রেতা বাড়িতে এসে কিনে নিয়ে যান। গুড়ে মারা হয় হাজারি লেখা সিলমোহর। হাজারি পরিবারের কেউ সম্পত্তি চান না, চান সিলমোহর। যদিও বৃহত্তর হাজারি পরিবার এখন খণ্ডিত, তবে তাঁরা পাশাপাশি বাস করেন।
স্থানীয় গাছিরা দুপুরের পর থেকে খেজুর গাছ কেটে হাঁড়ি বসিয়ে দেন। সারা রাত ওই হাঁড়িতে রস পড়ার পর ভোরে আবার গাছ থেকে হাঁড়ি নামানো হয়। এরপর গাছি পরিবারের নারীরা মাটির চুলায় ভোর থেকে রস জ্বাল দিয়ে ঘন করেন। রসের ঘনত্ব বেড়ে গেলে একটি মাটির হাঁড়িতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় ঘুঁটে ঘুঁটে তৈরি করা হয় সাদা রঙের হাজারি গুড়। বেশি শীত অর্থাৎ ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এ গুড় উৎপাদনের নির্ভযোগ্য সময়। আগের দিন বিকেলে গাছ কেটে হাঁড়ি বেঁধে দেয়া হয়। পরদিন ভোরে, সূর্য ওঠার আগেই গাছ থেকে রস নামিয়ে ছেকে ময়লা পরিষ্কার করে মাটির জালা অথবা টিনের তাফালে (পাত্র) বাইনে (চুলা) জ্বালিয়ে গুড় তৈরি করতে হয়। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় খড়কুটো, নাড়া ও কাশবন। এ গুড় দেখতে যেমন সুন্দর, খেতেও তেমনি সুস্বাদু। প্রতি কেজি গুড় ৮০০ টাকা থেকে ১,২০০ টাকায় বিক্রি হয়। ৮০০ টাকার নিচে প্রকৃত হাজারি গুড় পাওয়া যাবে না।
হাজারি গুড়। সোর্স: প্রিয়.কম

শীত মৌসুমে খেজুর গাছ এ অঞ্চলে একটি শিল্পে পরিণত হয়। বিশেষ করে এই হাজারি গুড়ের বদৌলতে এখানে অর্থনীতিতে চাঙ্গা ভাব বিরাজ করে। রস থেকে গুড় উৎপাদন ও ভোক্তাদের হাতে পৌঁছে দিতে পেশাদার গাছি, কুমার, কামার, জ্বালানি ব্যবসায়ী, পরিবহনের শ্রমিক, ট্রাক মালিক-চালক, ভ্যান চালক, আড়তদারসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ সংযুক্ত রয়েছেন। পৌষের মাঝামাঝি থেকে মাঘ মাস পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই এই হাজারি গুড় দেশ বিদেশে চলে যায়।
শীত পেরুবার পর মানিকগঞ্জ যাওয়ায় আমার হাজারি গুড় খাওয়া কিংবা গুড় তৈরির প্রক্রিয়া আর দেখা হয়নি। তবে গুড় কেনার জন্য আসছে শীতে আমি আবার যাবো মানিকগঞ্জের ঝিটকায়।

কীভাবে যাবেন:

ঢাকার গুলিস্থান থেকে বি আর টি সি আর শুভযাত্রা মানিকগঞ্জের উদ্দেশ্যে চলাচল করে। বি আর টি সিতে ভাড়া পড়বে ৯০ টাকা। শুভযাত্রায় ৮০। এছাড়াও গাবতলি থেকেও যানজাবিল ও আর কিছু গাড়ি পাওয়া যায়। সেখান থেকে ৪০-৫০ টাকা ভাড়া পড়বে জন প্রতি। মানিকগঞ্জ থেকে ঝিটকার উদ্দেশ্যে প্রায় সারাদিন বাস থাকে। ভাড়া ৩০ টাকা।

সাদা রঙের হাজারি গুড়। সোর্স: channelionline.com

কোথায় থাকবেন:

বাস যেখানে নামিয়ে দেবে সেখানেই নবিন সিনেমা হলের পাশেই রয়েছে থাকার হোটেল। দুই সিটের প্রতি রুম ভাড়া ১৫০-২০০ টাকা। এছাড়াও টাউন হলের দিকে আরো কিছু হোটেল রয়েছে।

নোট:

খেজুরের রস খেতে হলে, গুড় বানানো দেখতে হলে, পৌষ-মাঘ মাসের খুব ভোরে ঝিটকা গিয়ে সেখান থেকে রিক্সা নিয়ে যাবেন হাজারি বাড়ির দিকে। ওদিকে গেলে পাবেন সকাল সকাল অনেক গাছির দেখা, তাদের কাছ থেকেই রস সংগ্রহ করতে পারবেন। আর হাজারি বাড়িতে গুড় বানানোও দেখতে পারবেন।
খেজুরের এক নম্বর গুড় নিতে হলে পরিচত কেউ থাকতে হয়। এক্ষেত্রে প্রতি কেজি দাম পড়বে ৭০০ টাকা। তাছাড়া বাজারে মোটামুটি ভালো গুড় ১২০-৩৫০ টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায় ।
তথ্যসূত্র :
১। http://www.prothomalo.com/amp/pachmisheli/article/1068475/
২। http://m.somewhereinblog.net/mobile/blog/Mesbah1983/30182283
৩। http://www.ittefaq.com.bd/wholecountry/2017/01/22/100766.html
ফিচার ইমেজ: steemitimages.com

Loading...

2 Comments

Leave a Reply

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    প্রাসাদের সাম্রাজ্য ইস্তানবুলের দর্শনীয় যত স্থান

    গোধূলি বেলায় আগ্রার তাজমহলে একদিন