হিমালয়ের নৈসর্গিক শহর মানিকারান উপাখ্যান

HRTC এর ছোট্ট বাসটি যখন পাহাড় বেয়ে নামতে নামতে মানিকারানে পৌঁছাল, মাথার উপর সুর্য তখন তেঁতে বসেছে। বারোটার দিকে পৌঁছে গেলাম নৌসর্গিক মাঝারি আকারের পাহাড়ি শহর মানিকারানে। উত্তাল পার্বতী নদী হিমালয়ের গহীন থেকে এসে বয়ে গেছে এই শহরের নিচে দিয়ে। 

হিন্দু ও শিখ ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র এই শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,৭৬০ মিটার উপরে অবস্থিত। পাহাড়ের গা ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে শহরের মূল কাঠামো। বাস স্টপে নেমেই মুগ্ধ হয়ে যেতে হয় পাহাড়, মেঘ আর আলোছায়ায় ঘেরা এই শহরটি দেখে।

মানিকারান নেমেই চোখে পড়বে এই সুন্দর দৃশ্য। মানিকারান, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ লেখক

বাসস্টপ থেকে একটু সামনে চোখে পড়ল পার্বতী নদীর উত্তাল রূপ। পাহাড় যেন তার সমস্ত শক্তি দিয়ে ঠেলে দিচ্ছে নদীর তীব্র স্রোতকে। এর উপর স্টিলের ব্রিজে দাঁড়িয়ে সামনে তাকালে মনে হবে পাহাড়ের গায়ে ঝুলে আছে যেন আস্ত একটা শহর।

হিমালয়ের অন্য সব ব্রিজগুলোর মতোই ব্রিজের চারপাশে ছেয়ে আছে রঙবেরঙের প্রেয়ার ফ্লাগ। স্থানীয়দের বিশ্বাস মতে, মন্ত্র লেখা এসব স্মারকই নদী বা পাহাড়ের ভয়াবহ দুর্যোগ থেকে শহরকে রক্ষা করে।

উত্তাল পার্বতী নদী। মানিকারান, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ লেখক

ব্রিজ পেরিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়ল সুন্দর গোছানো ছোটখাটো এই ঝুলন্ত শহরটি। প্রায় তিরিশটি ভিন্ন ভিন্ন মন্দির রয়েছে এই মানিকারানে। রয়েছে লোকাল মার্কেট, হোটেল আর স্থানীয়দের আবাস।

মানিকারান কুল্লু জেলার এই এলাকার শেষ বাস স্টপেজ। তাই আশেপাশের গ্রামগুলো ঘুরে টুরিস্ট বা স্থানীয়রা বাইরের শহরগুলোতে যাতায়াতের জন্য মানিকারানকেই ব্যবহার করেন। তাই টুরিস্টের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত বেশী। এছাড়া ধর্মীয় বিশ্বাসে পবিত্র স্থানের জন্য লোক সমাগম বেশী চোখে পড়ল অন্য সব এলাকা থেকে।

পাহাড়ে ঝুলে থাকা মানিকারান।মানিকারান নেমেই চোখে পড়বে এই সুন্দর দৃশ্য। মানিকারান, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ লেখক

সামনে এগিয়ে যেতে যেতে স্থানীয় কিছু ফুচকা আর মিষ্টি চেখে নিলাম। গরম কালোজামের স্বাদ না চেখে বোঝানো মুশকিল। শহরের প্রাণ কেন্দ্রে চোখে পড়ল অসাধারণ কাঠের কাজে গড়া নয়না ভগবতী মন্দির। হাতের কাজে কাঠ দিয়ে এত সুন্দর স্থাপনা এর আগে দেখিনি আমি। এখানে এসেই অনেকে পূজা বা মানত করে যাচ্ছেন। মন্দির থেকে দেয়া খাবার ফ্রিতেই খেয়ে আসা যায়।

টগবগে গরম পানির কুয়ো।মানিকারান, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ লেখক

এই মন্দিরের পাশেই রয়েছে গরম পানির ছোট একটা কুয়ো। লাভা স্তরের কোনো অংশ থেকে এই ফুটন্ত পানি ধর্মীয় বিশ্বাসের অন্যতম বিস্ময়। অনেকে বলেন অলৌকিকভাবেই এই পানি উঠে এসেছে ঈশ্বরের নির্দেশে।

অবাক হয়ে খেয়াল করলাম আসলেও মানুষ সৃষ্ট কোনো সোর্স থেকে আসছে না এই পানি। কুয়োর নিচে জমে থাকা পাথরের নিচে থেকে উঠে আসছে টগবগে গরম পানির এই স্রোতধারা। এই পানি দিয়েই মন্দিরের রান্নার কাজ করা হয় বলে শুনলাম একজন ঋষীর কাছ থেকে।

নয়না ভগবতী মন্দির। মানিকারান, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ লেখক

যত সামনের দিকে এগোচ্ছি, এক একটা করে সুন্দর মন্দির চোখে পড়ছে। ছবি তুলছি দেখে গেরুয়া পোষাকের এক সাধক আমাকে ডেকে জানতে চাইলেন কোথা থেকে এসেছি। বাংলাদেশ শুনে উনি অবাক হয়ে জানতে চাইলেন মানিকারানের গল্প আমি জানি কিনা। না সূচক মাথা নাড়তেই উনি গল্পবলা শুরু করলেন।

‘এক সময় শিব আর পার্বতী এই মানিকারান অঞ্চল দিয়েই ঘুরছিলেন। শিব ভুল করে কোনো একটি মূল্যবান পাথর এই এলাকায় হারিয়ে ফেলে দিশেহারা হয়ে পড়েন। তৃতীয় চোখ খুলেও যখন পাথরটি খুঁজে পেলেন না তখন শিবের সঙ্গী সাপটি হিস হিস শব্দে পাহাড় কাঁপিয়ে পুরো এলাকা ধ্বংস করে ফেলে। তখন মাটির নিচে থেকে বেরিয়ে আসে সেই মূল্যবান পাথর।

শিব আর পার্বতী চলে যাবার পর এই এলাকাটি অত্যন্ত ভয়াবহ অবস্থায় থাকে। এই অবস্থা দেখে শিবের আদেশে পার্বতী নদী বয়ে যায় এই এলাকা দিয়ে। এর পরেই উর্বর হতে শুরু করে চারপাশের পাহাড়গুলো। এভাবেই এ এলাকায় মানুষের বসবাস শুরু হয়’। এর মধ্যে বন্ধু শুভর ফোনে আমায় তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে উঠতে হয়। পরবর্তীতে অবশ্য এই গল্প আমি ইন্টারনেটে খুঁজে কিছু ভিন্নতা খুজে পাই। কিন্তু আমি ঠিকই প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা বিশ্বাসে ভরা গল্প শুনতে শুনতে যে মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম।

পাহাড় আর মেঘ ছায়ার লুকোচুরি। মানিকারান, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ লেখক

দুপুরে কোনোমতে হাতে মুখে কিছু খেয়ে নিয়ে আবার ছুটলাম শহরের গলি ঘুপচিগুলো ঘুরে দেখতে। পাঞ্জাব ফেরার টিকেট করা হয়ে গিয়েছিল বিকেল পাঁচটার বাসে। হাতে তখনো দুই ঘণ্টা বাকি। লোকাল মার্কেটে হিমালয়ের পাহাড়ে বেঁচে থাকার জন্য সব রকম সরঞ্জামের বেচাকেনা চলছে।

পোশাক, খাবার, গয়না, মূর্তি, ট্রেকিং সরঞ্জাম সহ অনেক স্থানীয় পণ্য বেশ কম দামে কেনাকাটা করছেন অনেকে। এভাবেই অলিগলি ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়ল শ্রী রাম মন্দির। ইট-পাথরে চুনকাম করা সুন্দর আরেকটা স্থাপনা। পাহাড়ের কোলে গড়া এই মন্দিরেও রয়েছে গরম পানির আলৌকিক ধারা।

শ্রী রাম মন্দির,মানিকারান, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ লেখক

এভাবেই ঘুরতে ঘুরতে বুঝে ওঠার আগেই পেরিয়ে যাচ্ছিল সময়। এই সুন্দর হিমালয়ের পাহাড়, গ্রাম আর মানুষগুলো ছেড়ে আসতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। কিন্তু ফিরতে তো হবেই। সবাই মিলে পুরো শহরটা ঘুরে ফিরে এলাম বাস স্টপে।

বিকেলের আলো ম্লান হয়ে আসছে পাহাড়ের ওপর থেকে। আলোর সরু রেখাগুলো মেঘের ফাঁক দিয়ে এসে বিঁধে যাচ্ছে সুন্দর শহরের গায়ে। আর সেই আলোয় অপরূপ হয়ে উঠছে পাহাড়ি শহর মানিকারান।

সূর্যের আলো বিঁধে যাচ্ছে শহরের গায়ে।মানিকারান, কুল্লু, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ লেখক

ঠিক বিকেল সাড়ে পাঁচটায় আমাদের বাস পাঞ্জাবের দিকে ছুটতে শুরু করল। হিমাচলের সুন্দর শহরগুলো পেছনে সরে যেতে থাকল ধীরে ধীরে। এমনি ভালো খারাপ লাগার মিশ্র অনুভূতি হয় যখন আপনি পাহাড়ি স্বত্বা নিয়ে বেঁচে থাকার পর, পাহাড়কে পেছনে ফেলে আসবেন।

রুট আর খরচের খসড়া:

কলকাতা থেকে ট্রেনে যেতে হবে পাঞ্জাবের জালান্দার সিটি অথবা চন্ডিগড়। ট্রেনে খরচ পড়বে শ্রেণী ভেদে ৬৭৫ থেকে ৩,২০০ রূপি। এই জায়গাগুলো থেকে পেয়ে যাবেন মানিকারানগামী বাস বা ট্যাক্সি। বাস ভাড়া ৪৫০-১,০০০ রূপি, ট্যাক্সি ভাড়া ৮,০০০-১০,০০০ রূপি। খাবার খরচ বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য প্রতিদিন ৪০০ রূপি। হোটেলের ভাড়া গড়ে ৬০০ – ১,০০০ রূপি।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

নীলাদ্রি বা শহীদ সিরাজ লেক: সৌন্দর্যের পাশাপাশি লুকানো এক বীরের গল্পগাথা

'ভয়ংকর' স্থানসমূহে ভ্রমণের ক্ষেত্রে ৯টি নির্দেশনা