মালানা ভিলেজ, হিমালয়ের এক লুকানো রহস্য

ঝাপসা চোখে শেষবার তাকালাম গ্রামটির দিকে। ছবিঃ রিফাত রাব্বি
প্রথম পর্বের পর

ধুপ ধুপ শব্দে ঘুম ভাঙল। ওপরের তলায় কাঠের পাটাতনের উপর কেউ এখন এ-মাথা ওমাথা পায়চারি করছে। খেয়াল করলাম দলের সবাই আগেই উঠে গেছে। বালিশ থেকে মাথা সরাতেই বুঝতে পারলাম মাথার পেছনটা প্রচণ্ড ব্যথা। যেন চারদিক থেকে মগজে চাপ দিচ্ছে কেউ। সাড়ে আট হাজার ফুট উপরের অভিজ্ঞতা না থাকায় বুঝতে পারছিলাম না কিসের ব্যথা।

খালি পেটেই একটা নাপা এক্সট্রা খেয়ে বাইরে বেরোতেই দেখি ঠাণ্ডা কমেনি। ভোর সাতটা নাগাদ প্রাতরাশ সারলাম ডিম আর ম্যাগি দিয়ে। তর সইছিলো না গ্রামটা ঘুরে দেখে পাহাড়ে ওঠার। বন্ধু শুভ আর রনি ভাইকে রাজি করিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম গ্রামের দিকে। নিচে থেকে ভেসে আসছে মালানা রিভারের চুরমার শব্দ।

বিধ্বংসী মালানা রিভার। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

আগে থেকে মালানা সম্পর্কে ধারণা কম ছিল। তাই বের হয়ে গ্রামে ঢুকতেই চোখ ছানাবড়া হবার জোগাড়। পুরো গ্রামের বাড়িঘরগুলোর চারপাশে দিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ভাং আর গাঁজার অসংখ্য ঝোপ। হিমাচল প্রদেশে এগুলোর নিষেধ নেই তাই যেখানে সেখানে বসেই দেখলাম গোগ্রাসে গিলছেন অনেকে।

এই পাতা থেকেই গ্রামবাসীরা তৈরি করেন মালানা ক্রিম নামে এক ধরনের মাদক। অনেক পরিবার এই মালানা ক্রিম বিক্রি করেই সংসার চালাচ্ছেন বহুকাল ধরে। স্কুল না থাকায় বাচ্চাদের পড়াশোনার কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি তাই শ্রম দিয়েই এদের জীবন শুরু হয়।

চোখ ছানাবড়া করা ভাং আর গাঁজার ঝোপ। মালানা, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

মালানা গ্রামটি মূলত চন্দ্রখনি পাস আর দেওতিব্বা পর্বতের গহীনে লুকানো একটি গ্রাম। স্থানীয়দের মুখে শোনা যায় আলেকজেন্ডার যখন ভারত থেকে গ্রিসে ফিরে যাচ্ছিলেন, তখন এই গ্রামেই থেকে যান অনেকে দলবলে। তাই এখানকার মানুষ নিজেদের আলেকজেন্ডারের উত্তরসূরি বলেও দাবি করেন। ধর্মীয় আইন কানুনে এখানকার মানুষ অত্যন্ত স্পর্শকাতর। অধিকাংশই বুদ্ধ আর শিবের অনুসারী।

বহিরাগত কারো ছোঁয়া লাগলে অপবিত্র হয়ে যাবার বিশ্বাস আছে এখানকার মানুষের মনে। তাই ভুল করেও কোনো কিছু ছুঁয়ে ফেললে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হয়। এসব তথ্য নিলাম এই গ্রামেরই একজন বৃদ্ধের থেকে। দু-চার তলা পর্যন্ত দালানগুলো দাঁড়িয়ে আছে বেশ দূরত্ব নিয়ে। অধিকাংশ বাড়িঘর কাঠ আর পাথরের তৈরি। ওপরে রঙিন স্টিলের চাল দেয়া। গ্রামের শেষ প্রান্তে উঠে আসলাম মিনিট বিশেক হেঁটে। এরপর থেকেই চোখে ধরা দিতে থাকল সবুজ হিমালয়ের চোখ জুড়ানো রূপ।

হিমালয়ের সবুজ পাহাড়ে মেঘ জমেছে। মালানা, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

অচেনা একটা ট্রেইল ধরে ধীরে ধীরে উঠছি আমরা। গতরাতে বৃষ্টির জন্য পিছলে যাচ্ছে জুতোর সোল। পাহাড়ে ওঠায় তখনো অভিজ্ঞতা তৈরি হয়নি আমাদের কারো। এত উচ্চতায় অক্সিজেনের স্বল্পতা খুব বেশী না হলেও মাথা ব্যথা ছিল বেশ।

তার উপর পিচ্ছিল ট্রেইল দুর্বোধ্য করে তুলছিল ওপরে ওঠা। কিন্তু এই পাহাড়ের অপর পাশের অন্য বিশাল পাহাড়ের সাথে আলো, মেঘের খেলা দেখতে দেখতে আমরা সম্মোহিত হয়ে ছুটছিলাম হাজার ফিট খাঁদের পাশ দিয়ে পিছলাতে পিছলাতে।

মেঘ পাহাড়ের সম্মোহন। ছবিঃ রিফাত রাব্বি

সঠিক জুতো নেই কারো পায়ে, অনভিজ্ঞ অবস্থায় পর্বতারোহনের লিড আমাকেই দিতে হচ্ছিল। শুভ দু-এক বার পিছলে যেতে যেতে বেঁচেছে। ভয় হচ্ছিল এখান থেকে কেউ পড়ে গেলে, তাকে খুঁজে পাওয়াই কষ্টকর হয়ে যাবে। গ্রামের উপরে দক্ষিণ রিজলাইন দিয়ে হাতড়ে পাচড়ে চার ঘণ্টা ওঠার পর মোবাইল এ্যাপসে দেখলাম দশ হাজার পাঁচশ ফিট। বড়সড় একটা পাথর দেখে বসে পড়লাম সবাই।

ট্রেকিংয়ের উপযুক্ত গিয়ার আর সময় না থাকায় আর উপরে ওঠার মতো পরিস্থিতি ছিল না। তাই ওখান থেকে গ্রামে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। ওপর থেকে আঁটোসাটো গ্রামটি বেশ সুন্দর দেখায়। দূরে চোখে পড়ে মালানা আসার একমাত্র সর্পিল রাস্তাটি।

দশ হাজার পাঁচশ ফুট উপর থেকে মেঘাচ্ছন্ন মালানা গ্রাম। ছবিঃ আতিকুর রহমান শুভ

গাছের পাতা বেয়ে বৃষ্টির পানি পড়া শুরু করেছে। তার মাঝেই পিচ্ছিল এই রাস্তা বেয়ে নামতে শুরু করলাম। বেশ কয়েকবার পিছলে গেলো শুভর পা। একটু ধীরে নামার জন্য বলল শুভ। রনি ভাই বেশ দ্রুত নামছেন দীর্ঘক্ষণ। শুভকে উঠিয়ে সামনে থাকাতেই রনি ভাইকে আর দেখতে পেলাম না। ধড়াস করে উঠল বুকের ভেতর। শুভও বেশ ভয় পেয়ে গিয়েছে। চিৎকার করে ডাকলাম কয়েকবার। সাড়া পেলাম না। ভয়ে আত্মা শুকিয়ে গেলো আমার।

শুভর মুখটাও ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। মনে জোর এনে বললাম দ্রুত চল, দেখা যাক কী হয়েছে। মিনিট পনেরো হাঁটার পর দেখলাম রনি ভাই বসে আছেন চুপ করে। পিছলে বেশ খানিকটা নিচে পড়ে গিয়েছিলেন।  কোনোমতে ঝোপ ঝাড় ধরে বেঁচেছেন এ যাত্রায়। গায়ের কিছু জায়গায় কাটা-ছেঁড়ার দাগ আর অল্প রক্তের ছোপ। তবে মেজর কোনো ইনজুরি হয়নি দেখে হাফ ছেঁড়ে বাচলাম। রনি ভাইকে দুজনে উঠিয়ে ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলাম আবার গ্রামের দিকে। ততক্ষণে বৃষ্টির পরিমাণ বেড়েছে খানিকটা।

তিন ঘণ্টা পিছলে পিছলে হাঁটার পর সারাগায়ে কাদামাটি নিয়ে যখন গ্রামে ফিরলাম  তখন তিনটে বাজে। বৃষ্টি কমে এসেছে। সারাদিন পেটে কিছু না পড়ায় অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগছিল। পোশাক পাল্টে অর্ডার করা মোমো দিয়ে পেটপূজা করলাম। দলের বাকি সবাই চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল আট ঘণ্টা আমাদের খোঁজ না দেখে। আর উপর থেকে নিচে বেশী বৃষ্টি হওয়াতে ওদের অস্থিরতা বেশী ছিল। একটু রেস্ট নেবার পর পিনাক দা বললেন আজ ক্যাসোল ফিরে যেতে হবে।

বাজেটে শর্ট আর খাওয়াদাওয়ার সমস্যার জন্য ফেরার দরকার ছিল। আট ঘণ্টা ট্রেকের পর মন চাইছিল না আবার দুই ঘণ্টা নিচে নেমে গাড়িতে ওঠার। কিন্তু দলের জন্য করতে হবে, তাই অগত্যা দেরি না করে হোটেলে চেক আউট সেরে এগোলাম নামার পথের দিকে। দলের বাকি ৫ জন বেশ ফুর ফুর করে নেমে গেলেও আমাদের তিনজনের অবস্থা করুণ। এই বুঝি হাঁটু খুলে এলো। আশেপাশের পাহাড়গুলো দেখতে দেখতে নামার কষ্ট অনুভব হচ্ছিল কম। নামার সময় তেমন কোনো কথা হলো না কারো সাথেই, ঘটল না তেমন কোনো ঘটনা। শুধু মুখ চেপে নামতে থাকলাম চড়াই উৎরাই বেয়ে।

অনেক দূরে ফেরার পথের আঁকাবাঁকা রাস্তা চোখে পড়ছে। সাপের মত পাহাড়কে পেচিয়ে উঠে এসেছে রাস্তাগুলো। ছবিঃ তাউস খান

দেড় ঘণ্টা অমানবিক খাটুনির পর আমরা পৌঁছলাম মালানা গেটে। বৃষ্টি শুরু হওয়াতে যে যার মতো দ্রুত পৌঁছানোর চেষ্টা করেছে। তাই তাড়াহুড়ো করে মালানা ছেঁড়ে আসার পর দূর থেকেই খারাপ লাগছিল মালানাকে দেখে। ভেবেছিলাম পাহাড়টার চূড়ায় উঠব। একটু হতাশ হয়ে পড়েছিলাম আমি। ট্যাক্সি ঠিক করে শেষ একবার ঝাপসা চোখে তাকালাম গ্রামটির দিকে।

ক্লান্তি আর একটু হতাশা নিয়ে চেপে বসলাম গাড়িতে। তখন সন্ধ্যে নেমে এসেছে  হিমালয়ের পাহাড়গুলোতে। অনেক দূর থেকে কাজ সেরে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন গ্রামবাসীরা। আমাদের গাড়ি তাদের উল্টো পথে চলা শুরু করল এঁকেবেঁকে। এবার গন্তব্য অপরূপ ক্যাসোল।

রুট আর খরচের খসড়া:

কলকাতা থেকে ট্রেনে যেতে হবে পাঞ্জাবের জালান্দার অথবা চন্ডিগড়। খরচ পড়বে শ্রেণীভেদে ৬৭৫ থেকে ৩,২০০ রূপি। এই জায়গাগুলো থেকেই পেয়ে যাবেন ক্যাসোলগামী বাস বা ট্যাক্সি। বাস ভাড়া ৪৫০-১,০০০ রূপি, ট্যাক্সি ভাড়া ৮,০০০ রূপি। ক্যাসোল থেকে মালানা গেট পর্যন্ত ট্যাক্সি ভাড়া গাড়ির সাইজ অনুসারে পড়বে ৩,০০০-৫,০০০ পর্যন্ত। খাবার খরচ বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য প্রতিদিন ৪০০ রূপি।  হোটেলের ভাড়া গড়ে ৬০০ – ১,০০০ রূপি।

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

বিদেশের মাটিতে বাজেট ট্রিপ: কলকাতা ভ্রমণ

লাওস ভ্রমণ: মনোমুগ্ধকর ৫টি জলপ্রপাত