ভারতের হিমাচলের রহস্যময় গ্রাম মালানায় যাত্রা

পাঞ্জাব পৌঁছেছি দিন তিনেক হলো। এখান থেকেই আজ যাত্রা শুরু করার কথা চলছে হিমাচল প্রদেশে। আটজনের আঁটোসাটো ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে ট্যাক্সি ডাকতে যাওয়া দেখেই বুঝতে পারলাম আগে দুদিন যেতে যেতে না যাবার ব্যাপারটা আজ আর হচ্ছে না। দলের বাকি লোকেদের কাজেই আটকে ছিলাম তিনটা দিন, পাঞ্জাবের গা পুড়ে যাওয়া গরমে।

“সবাই রেডি?” পিনাকদা হাক দিলেন। শোরগোল করতে করতে যার যার ব্যাকপ্যাক কাঁধে নিয়ে বাকি সাতজন গিয়ে বসলাম ট্যাক্সিতে। বসে বসে ভাবছিলাম জালান্দার বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছতে দেরী হলে আজো মাটি হবে হিমালয় দর্শন। সবার উত্তেজনা দেখেই ড্রাইভার মশাই একটু জোরেই ছুটালেন গাড়ি। মিনিট পঁচিশেকের মাথায় বাস স্টপে পৌঁছে দেখলাম একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে মানিকারানের। তাও ছাড়ি ছাড়ি ভাব। দ্রুত টিকেট কেটে বাসে উঠলাম গাদাগাদি করে। দুই-তিন মিনিটের মাথায় স্টপেজ থেকে বেরিয়ে পাঞ্জাব মানালি হাইওয়ের দিকে ছুটল আমাদের বাস।

প্রথম কয়েক ঘণ্টা গল্প গুজবে কেটে যাচ্ছিলো বেশ। কিন্তু সময় তখন জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ। পাহাড়ি অঞ্চলে গাড়ি ঢুকতেই শুরু হলো ঝাকুনি আর তুমুল বৃষ্টি। দাঁতে দাঁত চেপে বসে আছি, গাড়ির চাকা পিছলে যাচ্ছে আর তখনি বেশ আচমকা ব্রেক কষলেন ড্রাইভার। এদিকের ড্রাইভারদের আবার পাইলট ডাকতে শুনলাম কিছু লোকের মুখে। ঘন অন্ধকারে বাইরের তেমন কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুধু বুঝতে পারলাম সামনে অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে, আর জানালার পাশ দিয়ে সাদা কুয়াশার মতো আভা। “কিরে খাবি নাকি একটু মেঘ ধরে?’’ সহযাত্রি রনিভাই এর এই প্রশ্নে আমি বোকা বনে গিয়ে বললাম, ‘মেঘ কই পাচ্ছেন’? 

বললেন, ‘জানালাটা খুলে নিচে দেখ’। একটু জোর লাগল জানালাটা সরাতে। আর কাঁচটা একটু ফাঁকা হতেই, হু হু শব্দে ঢুকল একপাল ঠাণ্ডা বাতাস। এক মুহূর্তেই কাঁপুনি ধরে আসল হাড়ে। তাকিয়ে দেখলাম রাস্তার বেশ নিচে থেকে উড়ে আসছে মেঘ এদিকেই। আর দূরে অনেক উঁচুতে শহরের মতো লাইট জ্বলছে। এত উঁচুতে প্রথমবার জ্বলজ্বলে শহর দেখে মনে হলো শহরগুলো আকাশে বানানো। ব্যাগ থেকে একটা সোয়েটার বের করে গায়ে চাপিয়ে বাস থেকে নামার জন্য প্রস্তুত হলাম। ততক্ষণে সামনে কী হয়েছে, তা জানার জন্য অনেকেই বাস থেকে নেমে গিয়েছেন।

বাসের সবুজ কাচের বাইরে এক স্নিগ্ধ সবুজের পৃথিবী।  ছবিঃরিফাত রাব্বি 

বাস থেকে নেমে আমার চোখ ছানাবড়া। বিশাল উঁচু পাহাড়ের গা ঘেঁষে রাস্তাগুলোতে যেন হাজার মাইল দূর থেকে আসা গাড়ি দেখা যাচ্ছে। অন্ধকারে গাড়ির লাইটগুলো দেখে মনে হচ্ছে আকাশ থেকে কিছু গাড়ি নামছে আর কিছু আকাশে উঠছে। আর চারদিকে তুলোর মতো মেঘ উড়ে বেড়াচ্ছে। খবর এলো পাহাড়ধ্বস হয়েছিলো। রাস্তা খুলে দেয়া হয়েছে। বাসে চেপে বসলাম শীতে কাঁপতে কাঁপতে।

হঠাৎ এত গরম থেকে এই ঠান্ডায় এসে হতভম্ব লাগছিল। যাই হোক, চলতে চলতে মানিয়ে নিলাম শীতের ব্যাপারটা। চোখ লেগে আসছিল। গায়ে চাদর চাপিয়ে পাহাড়ি দুলুনি খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়েছি কখন যেন। ঘুম ভাঙল গাড়ির ব্রেকের শব্দে। উঁচু থেকে নিচে নামার সময় অনর্গল শব্দ হচ্ছে ব্রেকে। ততক্ষণে আলো ফুটে এসেছে পূবের আকাশে।চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে আসছে বিশাল বিশাল দানব আকৃতির পাহাড়েরা। আর চোখ বুজতে পারলাম না পাহাড়গুলো দেখে।

 পথের মাঝে এভাবেই বার বার পথ আগলে ছিলো বিশাল আকৃতির পাথুরে পর্বতগুলো। ছবিঃ রিফাত রাব্বি  

পাহাড়ের গাঁ ঘেঁষে হাজার হাজার ফুট উপর দিয়ে গাড়ি কখনো ওপরে কখনো নিচে যেতে যেতে ভোর সাতটায় আমরা পৌঁছালাম পাহাড় ঘেরা অপরূপ সুন্দর আর ছোট্ট শহর ক্যাসোলে। ভাতের অভাব শুরু হলো ক্যাসোলেই। ভাত বলতেই ফ্রাইড রাইস নয়তো মোমো, পানসে দই, পনিরের বিস্বাদ তরকারি আর রুটি খেয়েই বাঁচতে হবে কদিন।

অগত্যা কথা না বাড়িয়ে মোমো খেয়ে পেট ভরলাম সবাই। ভোরের দিকে ঠাণ্ডা একটু কম থাকায় হাফ প্যান্ট পরে নিলাম কারণ মালানা ভিলেজ যেতে ট্রেক করতে হবে কিছু রাস্তা। তাড়াহুড়ো করে খাওয়া শেষ করে ট্যাক্সি ভাড়া করে চেপে বসলাম। এত সুন্দর ক্যাসোলে থেকে যাবার ইচ্ছেটা আপাতত পুষে রাখা ছাড়া উপায় ছিল না, কারণ ফেরার পথে এখানে-ই থাকা লাগবে।

ট্যাক্সি পাইলট গাড়ি ছাড়তেই বুঝলাম এই যাত্রা সুখকর হবে না। ছয় হাজার ফুট উপর দিয়ে বেয়ে চলা, সেফটি ছাড়া রাস্তায় এই বেগে গাড়ি চালালে স্বয়ং আইনস্টাইন বাবুও ভয় পেতেন বৈকি। গাড়ি ছুটে চলেছে উপরের দিকে। জানালা থেকে দুই ফিট দূরেই রাস্তা সোজা নেমে গেছে হাজার হাজার ফিট নিচের বিধ্বংসী পাহাড়ি নদীতে। আর দৈত্যাকার ঝর্ণাগুলো আছড়ে পড়ছে সেই নদীতে।

আকশচুম্বী ঝর্ণার সাবলীলতা। ছবিঃ রিফাত রাব্বি 

বন্ধু শুভর কবজিতে নখ চেপে বসে আছি, দাঁত শক্ত করে। “কি খবর রিফাত? মজা পাচ্ছো?’’ তাউস ভাই সামনের সিটে বসে আমার কর্মকাণ্ড দেখে জিজ্ঞাসা করলেন। পুরো গাড়ির সবাই চুপচাপ। আমি কোনোমতে জড়ানো গলায় বললাম, ‘আরে, এ আর কী এমন রাস্তা’। এ কথার পর বাকি যারা ভয় পাচ্ছিল তারা সমেৎ সবাই হো হো করে হেসে উঠল।

এভাবেই চলতে চলতে হিমালয়ের পাহাড়ে অতি দীর্ঘ এক ঘণ্টার ভয়ংকর সুন্দর জীপ সাফারি করে আমরা পৌঁছলাম মালানা ভিলেজের গেটে। এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে বিশাল এক দানব পাহাড়ের কাঁধে চেপে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট মালানা গ্রামটি।

পাহাড়ের কাঁধে ঘাপটি মেরে থাকা গ্রামটি মালানা। ছবিঃ আতিকুর রহমান শুভ

গ্রামের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিলো পাহাড়টা একটু গাঁ-ঝাকা দিলেই টুপটাপ করে নিচে পড়ে যাবে চার-পাঁচ তলা দালানগুলো। এই গেট থেকেই ট্রেক শুরু করে প্রথম পৌঁছাতে হবে নিচে মালানা রিভারের পাড়ে। এরপর নদী পাড়ি দিয়ে উঠে যেতে হবে আট হাজার পাঁচশ ফুট উপরে এই গ্রামে।

এই অল্টিচিউডে জীবনের প্রথম ট্রেকিং। পাথর কেটে কখনো খাড়া, কখনো সমতল রাস্তায় প্রায় ঘণ্টা চারেক অক্লান্ত পরিশ্রমের পর, প্রায় হাল ছাড়তে ছাড়তে পৌঁছালাম সবুজ সুন্দর চন্দ্রখনি পাসের শোল্ডারে এই গ্রামটিতে। ট্রেকিংয়ের পথটি ছিল স্বর্গে ওঠার সিঁড়ির মতো।

আকাশের সিড়ি। মালানা, হিমাচল প্রদেশ। ছবিঃ রিফাত রাব্বি 

আটজনে একটা হোটেল রুম ভাড়া করে ম্যাগি অর্ডার করলাম আর চা। খাবারের দাম অত্যাধিক এখানে তাই ম্যগি ছাড়া উপায় ছিল না। ঘরে ফিরে বুঝতে পারলাম শীতে এখানে -১০ থেকে -১৫ পর্যন্ত তাপমাত্রা নেমে যায়। ঘরগুলো পাথর আর কাঠের দেয়ালে বানানো। প্রত্যেক ঘরের ভেতর রাখা আছে কয়লার হিটার।

আর সুন্দর কাঠের ডিজাইন করা দেয়াল, আলমারি । চারপাশে মোটা মোটা কম্বল দিয়ে স্তূপ করে রাখা। খাবার সেরে একটু সবাই কিছুক্ষণ খোশগল্প সেরে বাইরে আসতেই দেখি, চারদিকের আকাশ ফুঁড়ে উঠে যাওয়া পাহাড়গুলোতে সন্ধ্যের ছায়া পড়তে শুরু করেছে।  পাহাড়গুলো বেয়ে মেঘেরা ভেসে আসছে গ্রামের দিকে। মুহুর্তেই মেঘ আর অন্ধকারে ঢেকে গেলো পুরো পাহাড়।

বোদলেয়ারের চলিষ্ণু আশ্চর্য্য মেঘদল। মালানা, হিমাচল প্রদেশ।ছবিঃ রিফাত রাব্বি

কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম মনে নেই। এখানে নেটওয়ার্ক নেই তাই ফোনের দরকার হয় না। সময় দেখতেও জরুরি বোধ হলো না। তবে গুড়ি বৃষ্টি আর অন্ধকার ঘনিয়ে আসায় আমরা সবাই ঘরে জামানত হলাম। বাইরে বৃষ্টির সাথে শীত বাড়তে লাগল অতি দ্রুত। বাইরে তাপমাত্রা মাপার একটা মিটারে দেখলাম পাঁচ ডিগ্রী। রাত বাড়তে থাকল বাড়ি থেকে তিন হাজার কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের অনেক উঁচুতে একটা গ্রামে।

আগামীকাল আরো উঁচুতে উঠব সেই ভাবনা ভাবতে ভাবতে দেখলাম মাথার পেছনটা ভারি হয়ে আসছে। সবার গল্পগুজবের ভিড়েও চোখ বুজে এলো আমার। অনেক রাতে কেউ ডেকেছিল খাবারের জন্য। ঘুম ফেলে পাহাড়ের বিদঘুটে স্বাদের ম্যাগি আমার ধাঁতে সইল না। আমার চোখে যেন তখন রাজ্যের ঘুম।

রুট আর খরচের খসড়া:

কলকাতা থেকে ট্রেনে যেতে হবে পাঞ্জাবের জালান্দার অথবা চন্ডিগড়। ট্রেনে খরচ পড়বে শ্রেণী ভেদে ৬৭৫ থেকে ৩,২০০ রূপি। এই জায়গাগুলো থেকেই পেয়ে যাবেন ক্যাসোলগামী বাস বা ট্যাক্সি। বাস ভাড়া ৪৫০-১,০০০ রূপি, ট্যাক্সি ভাড়া ৮,০০০ রূপি। ক্যাসোল থেকে মালানা গেট পর্যন্ত ট্যাক্সি ভাড়া গাড়ির সাইজ অনুসারে পড়বে ৩,০০০-৫,০০০ পর্যন্ত। খাবার খরচ বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য প্রতিদিন ৪০০ রূপি ।  হোটেলের ভাড়া গড়ে ৬০০ – ১,০০০ রূপি।

Loading...

One Ping

  1. Pingback:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

হাওরে বৃত্ত’র সাথে পূর্ণিমা স্নান!

ছাত্রদের নিয়ে হাওর বিলাস