শান্তি মিশনের অগ্রদূত মহাত্মা করমচাঁদ গান্ধীর আশ্রমে একবেলা

নোয়াখালীতে বেড়াতে যাবো শুনে নীলান্তি প্রশ্ন করলো, ‘কই যাবি? নিঝুম দ্বীপ?’
আমি হাসতে হাসতে উত্তর দিলাম, ‘নিঝুম দ্বীপ ছাড়াও কিন্তু নোয়াখালীতে ঘোরার জায়গা আছে। নিঝুম দ্বীপ যাবো, তবে তোদের সাথে। এখন একা ঘুরছি, দ্বীপে গিয়ে মজা পাবো না।’
কথোপকথন এখানেই শেষ হলো। নিঝুম দ্বীপ ছাড়াও যে নোয়াখালীতে ঘোরার মতো জায়গা আছে, তা হয়তো বেশিরভাগ লোকেই জানে না। চৌরাস্তা থেকে সোনাইমুড়ীর দিকে রওনা দিলাম সেসব স্থাপনা দেখার জন্য।

দেবেন্দ্র নারায়ণ সরকার ও মদনমোহন চট্টোপাধ্যায়ের সমাধি। সোর্স: লেখিকা

বাঘপাঁচড়ায় বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের সংগ্রহশালা ও পাঠাগার দেখে পা বাড়ালাম জয়াগ গ্রামের দিকে। ওখানে আছে মহাত্মা করমচাঁদ গান্ধীর আশ্রম। গান্ধী আশ্রমটি নোয়াখালী জেলার ৩০ কিলোমিটার দূরের সোনাইমুড়ী উপজেলার জয়াগ গ্রামে অবস্থিত।
তৎকালীন জমিদার প্রয়াত ব্যারিস্টার হেমন্ত কুমার ঘোষের বাড়িতে উক্ত গান্ধী আশ্রম স্থাপিত হয়। ব্যতিক্রমধর্মী এ প্রতিষ্ঠানটির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, ১৯৪৬ সালের শেষভাগে সারা ভারতবর্ষের সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে।
তখন পশ্চিম বঙ্গের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার প্রভাব এসে পড়ে নোয়াখালীতে। বিশেষ করে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ থানায় সাম্প্রদায়িকতার তাণ্ডবলীলা দেখা দেয়। মশালের আগুনে পুড়ে যায় বহু সাজানো সংসার। সবুজ মাটি লাল হয়ে যায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রক্তের প্লাবনে।
অপেক্ষমান চারু চৌধুরী। সোর্স: লেখিকা

শান্তি মিশনের অগ্রদূত হয়ে নোয়াখালীতে ছুটে আসেন অসহযোগ ও অহিংস আন্দোলনের পুরোধা মহাত্মা গান্ধী। ১৯৪৬ সালের ৭ নভেম্বর চৌমুহনী রেলস্টেশনে প্রথম মহাত্মা গান্ধী নোয়াখালীর মাটিতে পদার্পন করেন। তৎকালীন এম.এল.এ. শ্রী হারান ঘোষ চৌধুরীর উদ্যোগে নোয়াখালীর প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয় চৌমুহনীতে। মহাত্মা গান্ধী সে জনসভায় প্রথম বক্তৃতা করেন।
তারপর জনসভা করেন দত্তপাড়া গ্রামে। ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে তাঁর পরিক্রমা। এভাবে ঘুরতে ঘুরতে ১৯৪৭ সালের ২৯ জানুয়ারি তিনি জয়াগ গ্রামে এসে পৌঁছেন। সেদিনই নোয়াখালী জেলার প্রথম ব্যারিস্টার জয়াগ গ্রামের কৃতী সন্তান হেমন্ত কুমার ঘোষ মহাশয় তাঁর জমিদারির স্থাবর- অস্থাবর সম্পত্তি জনকল্যাণ খাতে ব্যয়ের উদ্দেশ্যে মহাত্মা গান্ধীর নামে উৎসর্গ করেন।
তিনি তখন প্রতিষ্ঠা করেন অম্বিকা কালীগঙ্গা দাতব্য ট্রাস্ট। সেটি ১৯৭৫ সালে গান্ধী ট্রাস্ট নামে পরিবর্তিত হয়। শুরু থেকেই গান্ধী ট্রাস্ট এ এলাকার মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে আসছে।
গান্ধী আশ্রম। সোর্স: লেখিকা

এখানে গান্ধীজির নামে একটি জাদুঘর আছে। গান্ধীর ব্যবহৃত সামগ্রী, নোয়াখালী সফরের শতাধিক ছবি ও প্রকাশিত লেখা সংরক্ষিত আছে। আশ্রমের সঙ্গে গান্ধীর ভাস্কর্য রয়েছে। আশ্রম পরিচালনার ভার দেয়া হয় গান্ধীজীর স্নেহভাজন, জনসেবা ব্রতী, চিরকুমার শ্রীযুক্ত চারু চৌধুরী মহাশয়ের ওপর। তখন হতে উক্ত সম্পত্তি সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে স্থানীয় অধিবাসীর ভাগ্য উন্নয়নের কার্যক্রম শুরু হয়।
বর্তমানে গান্ধী আশ্রম নোয়াখালীর একটি সেবামূলক সংগঠন হিসেবে দেশব্যাপী খ্যাতি লাভ করেছে। গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের সচিব হিসেবে কর্মরত আছেন শ্রীমতি ঝর্ণা ধারা চৌধুরী। সম্প্রতি গান্ধী আশ্রমের তত্ত্বাবধায়ক ঝর্ণা চৌধুরী সমাজকল্যাণের জন্য ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদ্মভূষণ খেতাবে ভূষিত হয়েছেন।
মহাত্মা করমচাঁদ গান্ধীর নির্মানাধীন ভাস্কর্য। সোর্স: লেখিকা

গান্ধী আশ্রমের প্রবেশদ্বারের দুইপাশে দাঁড়িয়ে আছে কিছু মঠ। আশ্রম গেট ধরে পা বাড়াতেই একরাশ মুগ্ধতা ছেয়ে গেল। প্রথমেই ডানপাশে দুটো সমাধি চোখে পড়বে। একটা সমাধিতে লেখা আছে দুইজনের নাম। দেবেন্দ্র নারায়ণ সরকার ও মদনমোহন চট্টোপাধ্যায়।
গান্ধী আশ্রমের এই দুজন পুণ্যাত্মা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম চলাকালীন ৪ঠা সেপ্টেম্বর কর্তব্যরত অবস্থায় হানাদার সৈন্যদের হাতে একই দিনে বীরের মৃত্যু গ্রহণ করেন। সকলের মঙ্গল করাই ছিল তাদের ব্রত। সাধারণ জনগণের কাছে এরা ছিলেন দেবতা পুরুষ।
“অহিংসা সর্বোত্তম গুন, যা ভালোবাসা থেকে উৎসরিত হয়। অহিংসার মাধ্যমে সহিংসতা মোকাবিলা করুন।”

অন্য সমাধিটি চারু চৌধুরীর। চারু চৌধুরী ১৯৪৬ সালের ৭ই নভেম্বর এখানে শান্তির খোঁজে এসেছিলেন গান্ধীজীর সাথে। নোয়াখালী ছেড়ে যাওয়ার সময় গান্ধীজী বললেন, ‘চারু তুমি থাকো। আমি তো আবার আসব।’
রয়ে গেলেন তিনি। এই অপেক্ষায় যে গান্ধীজী আসবেন। তাঁর এই অপেক্ষার অবসান হলো মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। ১৯৯০ সালের ১৩ই জুন তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
গান্ধী আশ্রম ট্রাস্ট। সোর্স: লেখিকা

রাস্তার দুই ধারে ছোট ছোট বোর্ডে গান্ধীজীর বিভিন্ন বাণী লেখা। তারমধ্যে সবচেয়ে ভালো লেগেছে, “অহিংসা সর্বোত্তম গুণ, যা ভালোবাসা থেকে উৎসরিত হয়। অহিংসার মাধ্যমে সহিংসতা মোকাবিলা করুন।”
সাতটি সামাজিক অপরাধ, যা বিশ্ব জুড়ে সহিংসতার কারণ। সোর্স: লেখিকা

আশ্রমের ঠিক সামনেই লাঠি হাতে মহাত্মা গান্ধীর একটি প্রতিকৃতি তৈরি করা হচ্ছে। নির্মাণাধীন এই প্রতিকৃতির চারপাশে এখনো বাঁশ দিয়ে ঘেরা। কাজ শেষ হলে এটি চমৎকার একটি ভাস্কর্যে পরিণত হবে।
এখানে কুটিরশিল্পের তৈরি সামগ্রী ও তাঁতবস্ত্র পাওয়া যায়। নিরিবিলি গ্রামীণ পরিবেশে এমন একটি প্রতিষ্ঠান ভালো লাগবে।
কুটিরশিল্পের তৈরি সামগ্রী ও তাঁতবস্ত্র পাওয়া যায়। সোর্স: লেখিকা

কীভাবে যাওয়া যায়:

নোয়াখালী জেলা সদর মাইজদী হতে সোনাইমুড়ী গামী লোকাল বাস সার্ভিস জননীতে চড়ে জয়াগ বাজার। ভাড়া নেবে ৪০ টাকা। এছাড়া চাইলে সিএনজি অটোরিক্সা যোগে জয়াগ বাজার যাওয়া যায়। জয়াগ বাজার থেকে রিক্সায় বা পায়ে হেঁটে আধা কিলোমিটার পুর্বে গেলে গান্ধী আশ্রমে পৌঁছানো যাবে।
রাস্তা খুঁজে না পেলে বাজারের যেকোনো লোককে জিজ্ঞেস করলেই দেখিয়ে দেবে। রিকশায় যাওয়ার চেয়ে হেঁটে যাওয়াই ভালো। নইলে রাস্তার দুই পাশের আরোও অনেক কিছুই মিস করে ফেলবেন।
ফিচার ইমেজ: মাদিহা মৌ

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

টুমলিং থেকে কালাপোখারি: বাঁকে বাঁকে রোমাঞ্চ

বিশ্ব বিখ্যাত ও জনপ্রিয় কয়েকটি প্রাচীরের গল্প