সীতারাম রাজার প্রাসাদের উপাখ্যান

২০১১ এর শুরু দিকের কথা। একঘেয়ে পরিবেশে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে পড়েছিলাম। দীর্ঘদিন কোথাও ঘুরতে না যাওয়ায় যাবার তাড়নাটাও কাজ করছিল বেশ বাজেভাবে। আশেপাশের প্রায় সব জায়গাগুলো দেখা হয়ে গিয়েছে ততদিনে। তখন আমি মাগুরা সদর একালার দিকে থাকি। কোনো এক ছুটিতে বন্ধু সৌমেন সৌম্য আর রথিন মামা এলো গ্রামের বাড়িতে।

একা একা কোথাও ঘুরতে যাওয়া তখন আমার কাছে খুব বেশী উপভোগ্য ছিল না বলা চলে। কিন্তু দলে ভারী হয়ে খুঁজতে লাগলাম একদিনে কোথায় গিয়ে ঘুরে আসা যায়। হঠাৎ মনে পড়ল ফেসবুকে কারো পোস্টে সীতারাম রাজার প্রাসাদ দেখেছিলাম। মামাকে জানানোর সাথে সাথে খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারি ওটা মাত্র ৪২ কিলোমিটার দূরেই মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর থানার মধ্যেই রয়েছে।

দূর্গের ভেতর থেকে সামনের অংশ। ছবিঃ লেখক 

তাই যেই কথা সেই কাজ। পরদিন ভোরে উঠে মোহাম্মদপুরের বাস ধরলাম। মোটামুটি ৩০ কিলোমিটার পথ যেতে সময় লাগল ঘণ্টা দেড়েকের মতো। বাস স্ট্যান্ডে নেমে একটা ভ্যান ভাড়া করে চলে গেলাম সীতারাম রাজার প্রাসাদের সামনে। সপ্তদশ থেকে অষ্টাদশ শতকের সময়ে উন্নত একটি জনপদের প্রমাণ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই দুর্গটি।

মুর্শিদাবাদের নবাব সরকারের একজন ছিলেন এই সীতারাম রাজা। যিনি প্রাথমিকভাবে আমলা ও নবাবী করতেন এবং পরে এসে রাজা উপাধি গ্রহণ করেন। রাজা উপাধি পাবার পরই তিনি সৈন্যসামন্ত বাড়াতে থাকেন ও বিভিন্ন জমিদারদের সম্পত্তি দখল করতে শুরু করেন। প্রাচুর্য রক্ষার জন্য তিনি দুর্গ হিসেবেই এই সুবিশাল স্থাপনা নির্মাণ করেন।

প্রবেশ মূখের উপর কারূকার্য। ছবিঃ সৌমেন সৌম্য 

গেটের সামনে এসেই প্রাচীন কারূকার্যে চোখ বিধে যাচ্ছিল। বাইরে থেকে দেখেই বোঝা যায় এটাকে দুর্ভেদ্য করে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া এটা কাচারি বাড়ি হিসেবেও ব্যবহার করা হতো। এর পাশে নির্মাণ করা হয়েছিল বিশাল দেবালয়, মন্দির। খনন করা হয়েছিল পরিখা আর পেছনের অংশের বিশাল দীঘি।

কিছু অংশ এখনো মাটির নিচে অনাবিষ্কৃত অবস্থায় রয়ে গিয়েছে। দুর্গের সামনের অংশের দুই দিকে চোখে পড়ে বিশাল আকৃতির দুটি হাতির মাথা। যেন অতন্দ্র প্রহরীর মতো শত শত বছর ধরে তারা পাহারা দিয়ে চলেছে দুর্গটিকে। সামনের মূল প্রবেশ ফটকের সাথে রয়েছে উভয় পাশে পৃথক দুইটি প্রবেশ পথ এবং মূল প্রবেশ স্তম্ভের দুই পাশে দরজা আকৃতির বিশাল জানালার মতো অংশ।

দূর্গের ভেতরের কাঠামো । ছবিঃ রথীন বিশ্বাস 

প্রবেশ স্তম্ভটি মূলত দুইটি তলা নিয়ে গঠিত। উপরের তলায় রয়েছে একটি জলসা ঘর আর তার সামনে হয়েছে প্রহরী দাঁড়ানোর মতো বেশ কিছু খোলা জায়গা। সামনের দিকে তিনটি খিলান ও দুই পাশে আরো দুইটি পৃথক খিলান যুক্ত এর প্রহরার জায়গাটি দেখেই অত্যন্ত সুরক্ষিত মনে হয়।

ভেতরে প্রবেশের পর চোখে পড়বে চারদিক ঘিরে বিশাল বিশাল পিলার, যা ধরে রেখেছে উপরের ছাদটিকে। স্তম্ভগুলো মূলত চুন সুড়কি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে। যেগুলো পরবর্তীতে নতুন সিমেন্ট বালু ব্যবহার করে পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে। মাঝখানের উঠানটিতে রয়েছে পুরু ঘাসের গালিচা যা প্রাসাদটির শোভা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়।

আলোক কুঠুরি। ছবিঃ লেখক 

চারদিকে ঘোরাঘুরি করে প্রাসাদের পেছনের অংশে ঢুকে বেশ অবাক হলাম। এখানে রয়েছে পৃথক কিছু কক্ষ। এখানকার গাইডের কাছে শুনে বুঝলাম কিছু শৌচালয়, রানী ও বাইজীদের থাকার জায়গা সহ বেশ কিছু কক্ষ অস্ত্রাগার হিসেবে ব্যবহার করা হতো। বাইরে থেকে দেখে এই কক্ষগুলোর উপস্থিতি বোঝা প্রায় অসম্ভব। একটি কক্ষের ছাদ সংস্কারের অভাবে ভেঙে পড়েছে ততদিনে আর বাদবাকি জায়গাগুলো মোটামুটি ভালো অবস্থাতেই ছিল।

পেছনে রয়েছে আরেকটি মাঝারি আকৃতির দরজা। গাইড বলল, দালানের ভেতরে অবস্থানকালীন অবস্থায় যেকোনো মানুষ এখান দিয়ে পলায়ন করত বা দীঘিতে গোসলের জন্য বের হতো। এছাড়া পেছনের অংশে বেশ কিছু পরিখা চোখে পড়েছিল যার অধিকাংশই চুন সুড়কি দিয়ে দুর্ভেদ্য করে বানানো হয়েছিল। 

প্রাসাদের সম্মুখ ভাগ। ছবিঃ রথিন বিশ্বাস। 

এক সময়ে নাকি এই অঞ্চলের নাম ছিল সীতারামপুর। এই সুবৃহৎ অঞ্চলটি ছিল সীতারাম রাজা কর্তৃক পরিচালিত এক হিন্দু এলাকা। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে এই নাম পরিবর্তন হয়ে মোহাম্মাদপুর রাখা হয়। যাই হোক, গল্প শুনতে শুনতে সামনের অংশে এসে আবার দাঁড়িয়ে পড়লাম। উপরের তলাটা তখনো দেখা হয়নি।

ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল বলে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নিষেধ ছিল। কিন্তু গাইড বলল এত দূর থেকে এসেছেন একটু দেখে আসেন, ভালো লাগবে। আমাদের খুশী আর দেখে কে! সরু গুহার মতো করে দালানের গাঁ বেয়ে সাপের মতো পেঁচিয়ে একটি সিঁড়ি উঠে গিয়েছে দুই তলার জলসা ঘরের দিকে। হিসেব মতো কয়েকশ বছর আগে রাজা এখানে বসেই রাজ্যের হিসেব নিকেশ আর ছক কষাকষি করতেন।

বাইরে থেকে জলসা ঘরের ভেতরের অংশ। ছবিঃ লেখক  

উপর তলায় উঠে বেশ ভালো লাগছিল। বিশাল আকারের একটি কক্ষের চারদিকে দেয়ালে খাঁজ কেটে কুপি জ্বালানোর জায়গা করা। উপর থেকে পুরো প্রাসাদটিকে দেখা যাচ্ছে খুব ভালোভাবে। উঠানের থেকে শুরু করে কাচারি, সবটুকু অংশের ভালোভাবে নজরদারি করা যায় এখান থেকে। মূল প্রবেশ গেটের উপরের খিলানের সামনে দাঁড়ালে সামনের ও আশেপাশের ২০০ গজের ভেতর সব অংশ বেশ ভালোভাবে চোখে পড়ে। 

কিছু আবাসিক ভবন আর একটি প্রাইমারি স্কুলের জন্য এই সময়ে বেশ কিছু দৃশ্যমান খোলা অংশ ঢাকা পড়ে গিয়েছে। সামনে তাকালে রাস্তার ওপাশের উঁচু শিব মন্দির চোখে পড়ে। এইসব দেখতে দেখতে যেন তলিয়ে যাচ্ছিলাম শত বছরের পুরনো সেই সব জনপদের মুহুর্তগুলোর মধ্যে। ততক্ষণে বেলা বেড়ে গিয়েছে। নিচে থেকে গাইড হাক দিলে বেরিয়ে পড়লাম এই সুবিশাল দুর্ভেদ্য দুর্গ থেকে।

রুট ও খরচের খসড়া:

ঢাকা থেকে প্রথমেই আসতে হবে মাগুরা জেলা শহরে।  ঢাকা থেকে ৪০০ টাকা নন এসি বাসের ভাড়া পড়বে। মাগুরা বিশ্বরোড এলাকা থেকে পাওয়া যাবে মোহাম্মাদপুরের বাস। ভাড়া নেবে ৫০-৮০ টাকার মতো। হোটেলে খাবার খরচ হবে প্রতিবেলা ৬০-১০০ টাকা। মোহাম্মদপুর থেকে ভ্যানে সীতারাম রাজার প্রাসাদের ভাড়া পড়বে ১৫-২০ টাকা। মাগুরাতে বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। সেখানে থাকার জন্য খরচ হতে পারে ৫০০-১,০০০ টাকার মতো।     

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

স্বর্ণ মন্দিরের সোনালী ছটার রূপরেখা

পিক৬৯ একটি অ্যাডভেঞ্চার আড্ডার গল্প