চা বাগানের শহরের আনাচেকানাচে ইতিউতি পদচারণ

সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা নামক উপজেলায় মাধবকুণ্ড ঝর্ণা যা বাংলাদেশের সুউচ্চ জলপ্রপাত হিসেবে পরিচিত। এই সুন্দর নয়নাভিরাম জলপ্রপাতটির অবস্থান। একসময় পর্যটকদের কাছে প্রাকৃতিক জলপ্রপাত মানেই ছিল মাধবকুণ্ড। ডিপার্টমেন্ট ট্যুরে আমাদের দ্বিতীয় দিনে তাই ঠিক হলো আমরা মাধবকুণ্ড যাবো।

দ্বিতীয় দিন শিউলীর ডাকে ঘুম ভাঙলো। রেডি হয়ে, নাস্তা সেরে রওনা হলাম শ্রীমঙ্গলের দিকে। পথে বাস আটকালো পুলিশ সার্জেন্ট। অনেকটা সময় নষ্ট করে কাগজপত্র চেক করলো সে। কাগজপত্র সব কিছু ঠিক থাকার পরেও হাজার টাকা জরিমানা হলো। অথচ এই সার্জেন্ট নাকি চাঁদপুরের ছেলেই! তার উপরে আবার চাঁদপুর কলেজেরই স্টুডেন্ট!

মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত।  সোর্স: steemit.com

শ্রীমঙ্গল যাবার কথা থাকলেও, যাত্রাপথে আগে মাধবকুণ্ড থাকায় ওখানেই নামলাম আমরা। দশ টাকা করে টিকিট কেটে মাধবকুণ্ডের ঝর্না দেখতে এগিয়ে চললাম। সাইফুল্লাহ বলল, আগেরবার সে যখন এসেছিল, তখন এসব টিকিট কিংবা বাঁধানো পাকা রাস্তা ছিল না। প্রায় মিনিট পনেরো হাঁটার পর ঝর্ণার কাছে পৌঁছালাম। ঝর্ণা দেখে আমি পুরোই হতাশ! এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু ঝর্ণা? আগেই জেনেছি, ঝর্ণায় এই সময়ে পানি থাকে না। তবুও হতাশ হয়েছি খুব। কমার্শিয়াল করে ফেলেছে জায়গাটা।

যে পাহাড়টির গা বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে এ পাহাড়টি সম্পূর্ণ পাথরের যা পাথারিয়া পাহাড় নামে পরিচিত। এর বৃহৎ অংশজুড়ে রয়েছে ছড়া। এই পাহাড়ের উপর দিয়ে গঙ্গামারা ছড়া বয়ে চলেছে। এই ছড়া মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত হয়ে নিচে পড়ে হয়েছে মাধবছড়া। অর্থাৎ গঙ্গামারা ছড়া হয়ে বয়ে আসা জলধারা প্রায় ১৬২ ফুট উঁচু থেকে নিচে পড়ে মাধবছড়া হয়ে প্রবাহমান।

সাধারণত একটি মূল ধারায় পানি সব সময়ই পড়তে থাকে, বর্ষাকাল এলে মূল ধারার পাশেই আরেকটা ছোট ধারা তৈরি হয় এবং ভরা বর্ষায় দুটো ধারাই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় পানির তীব্র তোড়ে। জলের এই বিপুল ধারা পড়তে পড়তে নিচে সৃষ্টি হয়েছে বিরাট কুণ্ডের। এই মাধবছড়ার পানি পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হতে হতে গিয়ে মিশেছে হাকালুকি হাওড়ে।

মাধবকুণ্ড যাওয়ার পথে। সোর্স: অফরোড বাংলাদেশ

বান্দরবানের চিংড়িছড়া ঝর্ণায় ভিজে এসে মাধবকুণ্ড খুবই সাদামাটা লেগেছে আমার কাছে। তার উপরে আবার ঝর্ণার কাছে যাওয়ার পথও বন্ধ। রডের বেড়ি দিয়ে ঘের দেওয়া। আমার যেসব বন্ধুরা গোসল করার প্রিপারেশন নিয়ে এসেছিল, তারা সবাই বোকা বনে গেল।

ঝর্না ঘুরে এসে খিদে লেগে গেল। খেয়ে দেয়ে কেউ কেউ শপিংয়ে গেল, কেউ কেউ চা বাগানে। ওখান থেকে রওনা করতে করতে বিকেল হয়ে গেল। প্ল্যান ছিল মাধবকুণ্ড আর শ্রীমঙ্গল কভার করা। কিন্তু মাধবকুণ্ডে আমরা অযথা অনেক সময় নষ্ট করায় শ্রীমঙ্গল যেতে অনেক দেরি হয়ে গেল। যখন শ্রীমঙ্গল পৌঁছলাম, তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। আবছা আলোয় দু’পাশের পাহাড়ে চা বাগান দেখলাম। কিন্তু রাত হয়ে যাওয়ায় শ্রীমঙ্গলের কিছুই দেখতে পেলাম না।

মাধবকুণ্ড যাওয়ার পথে। সোর্স: Trip adviser 

দেখা হয়নি, তাতে কী? মন খারাপ করে বসে থাকলে চলবে কেন? ১৭° সেলসিয়াস তাপমাত্রার ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে মাইলখানেক দূরে সাত লেয়ারের চা খেতে গেলাম। ডিপার্টমেন্টের হেড বলেছিলেন, তিনিই সবাইকে সাত লেয়ারের চা খাওয়াবেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে দেখা গেল, সাত লেয়ারের চায়ের দাম ৭৫ টাকা! ৫০ জন ছাত্রছাত্রীর জন্য তো আর স্যার এত টাকার বাজেট নিয়ে আসেননি। তাই তিনি দুই লেয়ারের চা অর্ডার করলেন সবার জন্য।

আমরা থার্ড ইয়ারের পনেরো জনের সবাই বাইরের এক টেবিলে বসেছিলাম গোল হয়ে। চা আসতে অনেক দেরি হবে, তাই সবাই মিলে মান্না দে’র “কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই” গানটা গাইলাম কোরাসে। সময় সিচুয়েশনের সাথে খুব মিলে গেল গানটা।

কিছুক্ষণ বাদে চা এলো। কিন্তু ভুলে আমাদের টেবিলে মাত্র আট কাপ চা এলো। চায়ের চেহারা দেখে বাকিরা আর এই চা অর্ডার না করে দুই লেয়ারের বদলে সাত লেয়ারের চা অর্ডার করলাম। গ্লাসের মধ্যে সাতটা লেয়ার কোন অদ্ভুত উপায়ে আলাদা রইল, জানি না।

চা দেখে ক্রিয়েটিভি’র প্রশংসা করতেই হবে।

স্বাদের কথা কিছু বলব না। স্বাদের জন্য তো আর এই চা বিখ্যাত হয়নি।

সাত লেয়ারের চা। সোর্স: Trip adviser 

শ্রীমঙ্গলের সৌন্দর্য দিনের আলোয় দেখা হয়নি ঠিকই, কিন্তু শীতের রাতে শ্রীমঙ্গলে রাস্তায় হাঁটতে যে রোমাঞ্চ অনুভব করেছি, তার কোনো তুলনা হয় না। আমরা যে শ্রীমঙ্গলে এসেছিলাম, তার প্রমাণ হিসেবে শ্রীমঙ্গল রেল স্টেশনে ছবি তুলে রেখেছি ঠিকই। তবুও কিছু আক্ষেপ ঘুচবার নয়।

নীলকণ্ঠ চা কেবিন থেকে চা খেয়ে এসে পানসি রেস্টুরেন্টে ভিন্ন স্বাদের রোস্ট, অসম্ভব ঝাল আর খুব মজার শুঁটকি ভর্তা আর ডাল দিয়ে তৃপ্তি সহ খাবার খেয়ে সিলেট ছাড়ার উদ্দেশ্যে বাসে উঠলাম আমরা। আর এরই সাথে শেষ হলো চা বাগানের শহর ভ্রমণের কাহিনী।

নীলকণ্ঠ টি কেবিন। সোর্স: Trip adviser 
 

শ্রীমঙ্গল ঘুরে বেড়ানোর নির্দিষ্ট সময় না থাকলেও, মাধবকুণ্ড যাওয়ার উত্তম সময় হচ্ছে বর্ষাকাল। এ সময় ঝর্ণা পানিতে পূর্ণ থাকে। বর্ষাকাল বাদে অন্য সময়ে গেলে আমাদের মতো হতাশ হতে হবে।

কীভাবে যাবেন

রাজধানী ঢাকার কমলাপুর ও ক্যান্টনমেন্ট রেলস্টেশন থেকে প্রতিদিন ৩টা ট্রেন ছাড়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে। ট্রেনগুলোর মধ্যে আছে জয়ন্তিকা, পারাবত, উপবন। ট্রেনের ভাড়া প্রকার ভেদে ১২০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত। আর সময় লাগবে ৭-৮ ঘণ্টা। ট্রেনে গেলে রাত ১০টার উপবন এক্সপ্রেসে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভালো।

এছাড়া বাসেও যাওয়া যাবে। বাসে যেতে চাইলে অনেক বাস আছে। এর মধ্যে শ্যামলী, রূপসী বাংলা, হানিফ, সোহাগ, এনা, ইউনিক উল্যেখযোগ্য। এছাড়াও আরো বিভিন্ন নামের একাধিক বাস রয়েছে, যেগুলো অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ায় যাত্রী সেবা দিয়ে থাকে। ভোর থেকে শুরু করে রাত ১টা পর্যন্ত এসব বাস পাবেন। বাসে যেতে সময় লাগবে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা। ননএসি ৩০০/৩৫০ টাকা। এসি ৯০০ টাকা পর্যন্ত।

বিমান পথে যেতে হলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের ফ্লাইট নং 4H-0511 এ করে সিলেট। মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, রবি সপ্তাহের এই চার দিন ঢাকা-সিলেট রুটে বিমানে করে যাওয়া যায়। ভাড়া ৩,০০০ টাকা। যোগাযোগ: ৮৯৩২৩৩৮, ৮৯৩১৭১২।

পাখির চোখে মাধবকুণ্ড।  সোর্স: thousand wonders

কোথায় থাকবেন

এখানে জেলা পরিষদের ২টি বাংলো ও ২টি আবাসিক হোটেল রয়েছে।

তাছাড়া আপনি চাইলে সিলেট কিংবা মৌলভীবাজার শহরের হোটেলেও থাকতে পারেন। সিলেটে থাকার মতো অনেকগুলো হোটেল আছে, সিলেটে আপনি আপনার প্রয়োজন ও সামর্থ্য অনুযায়ী যে কোনো ধরনের হোটেল পাবেন। কয়েকটি পরিচিত হোটেল হলো – হোটেল হিল টাউন, গুলশান, দরগা গেইট, সুরমা, কায়কোবাদ ইত্যাদি।

লালা বাজার এলাকায় কম ভাড়ায় অনেক মানসম্মত রেস্ট হাউস আছে৷ হোটেল অনুরাগ – এ সিঙ্গেল রুম ৪০০ টাকা (দুই জন আরামসে থাকতে পারবেন), তিন বেডের রুম ৫০০ টাকা (নরমালই ৪ জন থাকতে পারবেন)। রাত যাপনের জন্য দরগা রোডে বিভিন্ন মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে। রুম ভাড়া ৫০০/- টাকা থেকে ৫,০০০/- টাকা পর্যন্ত।

মাধবকুণ্ডের বাইরের চা বাগানে আমি। পাতা তোলা চা বাগান বড় রুক্ষ। সোর্স: লেখিকা

শহরের শাহজালাল উপশহরে হোটেল রোজ ভিউ (০৮২১-৭২১৪৩৯)।
দরগা গেইটে হোটেল স্টার প্যাসিফিক (০৮২১-৭২৭৯৪৫)।
ভিআইপি রোডে হোটেল হিলটাউন (০৮২১-৭১৬০৭৭)।
বন্দরবাজারে হোটেল মেট্রো ইন্টারন্যাশনাল (০৮২১-৭২১১৪৩)।
নাইওরপুলে হোটেল ফরচুন গার্ডেন (০৮২১-৭১৫৫৯০)।
জেল সড়কে হোটেল ডালাস (০৮২১-৭২০৯৪৫)।
লিঙ্ক রোডে হোটেল গার্ডেন ইন (০৮২১-৮১৪৫০৭)।
আম্বরখানায় হোটেল পলাশ (০৮২১-৭১৮৩০৯)।
দরগা এলাকায় হোটেল দরগাগেইট (০৮২১-৭১৭০৬৬)।
হোটেল উর্মি (০৮২১-৭১৪৫৬৩)।
জিন্দাবাজারে হোটেল মুন লাইট (০৮২১-৭১৪৮৫০)।
তালতলায় গুলশান সেন্টার (০৮২১-৭১০০১৮) ইত্যাদি।

কোথায় খাবেন

সিলেট শহরে খাওয়ার জন্য জিন্দাবাজারে বেশ ভালো তিনটি খাওয়ার হোটেল আছে। হোটেল গুলো হচ্ছে পাঁচ ভাই, পানসি ও পালকি। এগুলোতে প্রায় ২৯ প্রকারের ভর্তা আছে।

ফিচার ইমেজ: thousand wonders

Loading...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ধলাই ও পিয়াইনের স্বচ্ছ জলে ডুবোখেলায় প্রকৃতিকন্যা জাফলং

চট্টগ্রামের এক পাহাড়ে বায়েজিদ বোস্তামীর (রহ.) মাজার